উতবা ইবনে গাযওয়ান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

উতবা ইবনে গাযওয়ান (عُتبة بن غَزْوان) (আনু. ৫৮২-৬৩৯) মুহাম্মদের এরজন সাহাবা বা সঙ্গী ছিলেন ।তিনি বসরার প্রথম শাসক ছিলেন ও দক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন । তিনি একজন হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবা ছিলেন । তিনি ইসলামের ৭ম ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবা ।[১]

নাম ও বংশ পরিচয়[সম্পাদনা]

উতবা ইবনে গাযওয়ান এর মূলনাম উতবা এবং উপনাম আবু আবদিল্লাহ ।তার পিতার নাম গাযওয়ান ইবন জাবির। ‍ইসলাম পূর্বযুগে তার গোত্র বনী নাওফাল ইবন আবদে মান্নাফের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিল।

ইসলাম গ্রহণ ও হিজরত[সম্পাদনা]

উতবা ইসলামের সূচনালগ্নেই একত্ববাদের আহবানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন । তিনি ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ৭ম ব্যক্তি ছিলেন ।[১]

মক্কায় কুরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে হাবশার দ্বিতীয় হিজরতে অংশগ্রহণ করেন। তখন তার বয়স ৪০ বছর। কিছুদিন হাবশায় থাকার পর আবার মক্কায় ফিরে এসে বসবাস করতে থাকেন।[২]

উতবা ইবনে গাযওয়ান এবং মিকদাদ ইবনে আমর কুরাইশ বাহিনীর সাথে মদীনার দিকে যাত্রা করেন। ইকরামা ইবন আবি জাহল ছিল কাফির বাহিনীর নেতা । পথিমধ্যে মদিনার মুসলিম একটি ক্ষুদ্র দলের সাথে এই কাফির বাহিনীর ছোট-খাট একটি সংঘর্ষ হয়। এই মুসলিম দলটির নেতা ছিলেন উবাইদা ইবনুল হারিস। উতবা এবং মিকদাদ সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, তারা সুযোগমত মুসলিম দলটির ‍সাথে যোগ দেন। মদিনায় পৌঁছে উতবা আবদুল্লাহ ইবনে সালামা আজলানীর অথিতি হন এবং হযরত আবু দুজানা আনসারীর সাথে তার ভাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ।[৩]

যুদ্ধে অংশগ্রহন[সম্পাদনা]

উতবা ইবনে গাযওয়ান ছিলেন একজন দক্ষ তীরন্দাজ। বদর, উহুদ, খন্দক ছাড়াও যে সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন তার সবগুলোতো তিনি অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেন। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের নেতৃত্বে নবি যে অনুসন্ধানী দলটি নাখলার দিকে পাঠান, তিনি সেই দলেরও সদস্য ছিলেন (হায়াতুস সাহাবা-২/৩৫০)।

উবুল্লা ও মায়সান অভিযান[সম্পাদনা]

হিজরী ১৪ সনে দ্বিতীয় খলিফা উমার ইরাকের সামুদ্রিক বন্দর উবুল্লা, মায়সান ও তার আশ পাশের এলাকায় অভিযানের জন্য উতবা ইবনে গাযওয়ানের নেতৃত্বে মদিনা থেকে ৩০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন।[৪]

উতবা ইবন গাযওয়ান তার বাহিনী নিয়ে রওয়ানা দিলেন। এই বাহিনীতে তার স্ত্রীসহ ১৫ জন মহিলা সদস্য ছিলো,যারা উবুল্লায় প্রবেশের পূর্বে মাথায় কাপড় বেঁধে প্রচুর পরিমাণে ধুলো উড়িয়েছিল ফলে উবুল্লাবাসির নেতা কর্মীরা ভাবে এই দলের পিছনে আরো বিশাল সৈন্য বাহিনী রয়েছে ।তাই তারা দিজলা নদী দিয়ে দ্রুত পালাতে শুরু করে । ফলে অতি সহজেই মুসলিম বাহিনী উবুল্লা শহর বিজয় করতে সমর্থ হয় ।

উবুল্লা ছিল দিজলা নদীর তীরের সুদৃঢ় সামুদ্রিক বন্দর যা উতবা ইবনে গাযওয়ানের নেতৃত্বে সাধারণ যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে মুসলিম বাহিনী অতি সহজেই জয় করতে সক্ষম হয় ।

বসরা শহরের ভিক্তি স্থাপন[সম্পাদনা]

উবুল্লা জয়ের পর উতবা ইবনে গাযওয়ান চিন্তা করলেন এই স্থানে তার মুসলিম সৈন্যরা বসবাস করলে উবুল্লা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি তাদের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে তাই তিনি উবুল্লা বন্দরের নিকটবর্তী একটি স্থানে ৮০০ লোক নিয়ে যান,যেখানে পারস্য ‍উপসাগরে চলাচলরত ভারতবর্ষ ও পারস্যের জাহাজসমূহ নোঙ্গর করতো । এবং তিনি এই স্থানের নামকরণ করেন বসরা। তিনি প্রত্যেক গোত্রের জন্য তিনি পৃথক মহল্লা নির্ধারণ করে দেন। জামে মসজিদ নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ করেন মিহজান ইবনুল আদরা এর উপর। নগরীর বাড়ী ঘর প্রথমত গাছ পাথর দিয়ে তৈরী হয়।[৪]

উতবা ইবনে গাযওয়ান এই নতুন শহরের প্রথম শাসক নিযুক্ত হন এবং ছয় মাস যাবত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তার প্রজাদের পার্থিব সুখ-সম্পদ ও ভোগ বিলাসের প্রতি নিরুৎসাহ দিয়ে,

ঐতিহাসিক এক ভাষণ দেন তার কিছু অংশ এমন,

“বন্ধুগণ! দুনিয়া গতিশীল ও বিলীয়মান। তার বেশি অংশ অতিক্রান্ত হয়েছে। তোমরা নিশ্চিতভাবে এই দুনিয়া থেকে এমন এক স্থানে স্থানান্তরিত হবে যার কোন ধ্বংস নেই। তাহলে সর্বোত্তম পাথেয় সংগে নিয়ে যাচ্ছ না কেন? আমাকে বলা হয়েছে, যদি কোন প্রস্তর খন্ড জাহান্নামের কিনারা থেকে নিক্ষেপ করা হয় তাহলে সত্তর বছরেও তার তলদেশে পৌঁছতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহর কসম! তোমরা তা পূর্ণ করে ফেলবে। কি, তোমরা অবাক হচ্ছো? আল্লাহর কসম আমাকে বলা হয়েছে, জান্নাতের দরযা এত প্রশস্ত হবে যে, সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে চল্লিশ বছর লাগবে। কিন্তু এমন একদিন আসবে যখন সেখানে প্রচণ্ড ভীড় জমে যাবে। আমি যখন ঈমান আনি তখন মুহাম্মদ সঙ্গে মাত্র ছয় ব্যক্তি। অভাব ও দারিদ্র্যের এমন চরম অবস্থা ছিল যে, গাছের পাতাই ছিল আমাদের জীবন ধারণের প্রধান অবলম্বন। সেই পাতা খেতে খেতে আমাদের ঠোঁটে ঘা হয়ে যেত। একদিন আমি একটি চাদর কুঁড়িয়ে পাই। সেটা ফেঁড়ে আমি ও সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস পরনের তহবন্দ বানিয়ে নেই। কিন্তু আজ এমন দিন এসেছে যখন আমাদের প্রত্যেকেই কোন না কোন শহরের আমীর হয়েছে। আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে বড় মনে করি-এমন অবস্থা থেকে আল্লাহর পানাহ চাই। নবুওয়াত শেষ হয়েছে। অবশেষে রাজতন্ত্র কায়েম হবে এবং খুব শিগগিরই তোমরা অন্যান্য আমীরদের পরীক্ষা করবে।[৫]

অতঃপর তিনি মাজাশি ইবনে মাসউদ কে ফুরাতের তীরবর্তী অঞ্চল সমূহে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন এবং মুগীরা ইবনে শুবাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা রওনা দেন।

মক্কা গিয়ে উমরের নিকট তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান কিন্তু খলিফা উমর এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন এবং বসরায় ফিরে গিয়ে দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। উতবা হজ্ব শেষে মক্কা থেকে পথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেন ।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

মক্কা থেকে বসরা ফিরে যাবার পথে মাদানে সালীম নামক স্থানে ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু সন হিজরী ১৭ মতান্তরে ২০।[৬]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. (উসুদুল গাবা-৩) 
  2. (আল ইসতিসাব, উসুদুল গাবা-৩/৩৬৪) 
  3. (তাবাকাতে ইবন সা’দ-৩/৬৯) 
  4. (উসুদুল গাবা-৩/৩৬৪) 
  5. (মুসনাদে আহমাদ ইবন হাম্বল-৪/১৭৪) 
  6. আসহাবে রাসূলের জীবনকথা। ২য় খণ্ড।