ইসলাম, হ্যাঁ; ইসলামী দল, না

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ইসলাম, হ্যাঁ; ইসলামী দল, না হলো ইন্দোনেশিয়ার প্রভাবশালী মুসলিম পণ্ডিত নূরখলিশ মাজিদ প্রবর্তিত একটি স্লোগান। ১৯৭০ সালে জাকার্তার তামান মারজুকি ইসমাইলে (টিআইএম) দেওয়া এক ভাষণে তিনি এই স্লোগান প্রবর্তন করেন।[১][২] স্লোগানটি খুব দ্রুত ইন্দোনেশিয়ার জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইসলামী দলগুলোর বিরুদ্ধে মুসলমানদের ভোট দেওয়া পাপ এমন ধারণার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে।[৩][৪]

পটভূমি[সম্পাদনা]

১৯৫০ এর দশকে ইন্দোনেশিয়ার ইসলামী দলগুলি এই ধারণা প্রচার করছিল যে মুসলমানদের কেবল ইসলামী দলের পক্ষেই ভোট দেওয়া উচিত। অনেক মুসলিম আলেমরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন এবং এমন দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে এই ধারণা প্রচার করতে থাকেন যে মুসলমান ভোটারদের ভোট তাদের পরকালীন মুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। এই প্রেক্ষাপটে বিশিষ্ট মুসলিম পন্ডিত নূরখলিশ মাজিদ ১৯৭০ এর দশকে "ইসলাম, হ্যাঁ; ইসলামী দল, না" নামে স্লোগানটি চালু করেছিলেন। স্লোগানটি দ্রুতই খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং মুসলমান ভোটারদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থেকে তাদের ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করতে সহায়তা করে। ফলশ্রুতিতে ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানরা ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির পক্ষে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে বলে দেখা যায়।[৪]

তত্ত্বীয় নির্দেশনা[সম্পাদনা]

ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী দল বা ইসলামী রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে ঐশ্বরিক কিছু নেই বলে মাজিদ মনে করতেন। মুসলমানদেরকে তাই পার্থিব এই বিষয়গুলোর ব্যাপারে ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাব পোষণ বা আচরণ করার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয় বলে তিনি মত দেন।[৫] তিনি মানবসৃষ্ট সংগঠন অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আল্লাহর ইচ্ছার একীভূতকরণের সমালোচনা করেছেন। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ঐশী অনুমোদনের দোহাই দিয়ে থাকে। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আল্লাহর ইচ্ছার সাথে মানবীয় এজেন্ডার সমীকরণ তৈরি করে যে রাজনৈতিক দলগুলি ইসলামের নামকে কাজে লাগাচ্ছে তারা মূর্তিপূজার সঙ্গে জড়িত।[৬] তিনি মত দেন যে, ইসলাম ও ইসলামী দলগুলি একে অপরের সাথে তুলনীয় নয়। কারণ, ইসলামকে কেবলই একটি রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিণত করা যায় না।[৭] মাজিদের দৃষ্টিতে ইসলাম ও ইসলামী দলগুলিকে একত্রে চিহ্নিত করা কেবল ভুলই নয়, বিপজ্জনকও। কারণ, যদি কোনদিন ইসলামী দলগুলির রাজনীতিবিদরা জঘন্য কাজ করে, যার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, তবে ধর্ম হিসাবে ইসলামকে দোষী হিসাবে দেখা হতে পারে। তেমনিভাবে যদি কোনও ইসলামী দল হেরে যায়, তবে ধর্ম হিসেবে ইসলাম হেরে গেছে বলেও মনে হতে পারে। রাজনৈতিক ব্যবস্থার ইসলামীকরণের এমন অসুবিধার কথা বিবেচনা করে মাজিদ স্লোগানটি ইসলামী দল ও তথাকথিত ইসলামী সমাজগুলোর সমালোচনার অংশ হিসাবে চালু করেছিলেন যারা ইন্দোনেশীয় জনগণের চোখে ইসলামী দলগুলিকে পবিত্র ও ঐশ্বরিক করে তুলেছিল।[৮][৯]

রাজনৈতিক প্রভাব[সম্পাদনা]

মাজিদ প্রবর্তিত এই স্লোগানটি কাকতালীয় ভাবে ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ নির্বাচনের মুহুর্তের সাথে মিলে যায়। দৈবক্রমে বা অন্য কোন কারণে, ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ক নয়া এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের মনেরই যেন প্রতিধ্বনি ছিল। ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জনগণের পছন্দের প্রতিচ্ছবি থেকে এটি দেখা যায়। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় যে, ইসলামী দলগুলি চূড়ান্ত পরাজয়ের শিকার। এটি ১৯৫৫ সালের পর থেকে ইসলামী দলগুলির দীর্ঘ যাত্রারও কিছুটা সমাপ্তি টেনেছিল। বিপরীতে, ইন্দোনেশিয়ায় তখন ইসলামের নবায়নও নতুনভাবে শুরু হয়।[১০] স্লোগানটি এইভাবে ইন্দোনেশীয় সমাজে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এমন সময়ে যখন রাজনৈতিক ইসলাম ইতিমধ্যে একটি ধাক্কার সম্মুখীন। এটি ইন্দোনেশীয়দের মধ্যে একটি আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক এবং বৌদ্ধিক শক্তি হিসাবে ইসলামকে পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে এক অসামান্য ভূমিকা পালন করে যা ধর্মের শুধু আনুষ্ঠানিক ও আইনগত দিক নয় বরং নৈতিক ও ব্যবহারিক নীতিসমূহের উপর জোর প্রদান করে।[১১]

সমালোচনা[সম্পাদনা]

ইসলামী দলগুলোর বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থানের কারণে মাজিদ বেশ সমালোচিত হন। বিশেষতঃ রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে। বহু দলীয় নেতা তার বিরুদ্ধে ইসলামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিযোগ আনেন।[১২]

আধুনিককালে প্রাসঙ্গিকতা[সম্পাদনা]

ইন্দোনেশিয়ার বিশিষ্ট মুসলিম চিন্তাবিদ দাওয়াম রাহারজো বিশ্বাস করতেন যে ১৯৭০ সালে মাজিদ যে স্লোগান প্রবর্তন করেছিলেন তা ইসলাম ও মুসলমানদের তৎকালীন উদ্ভূত সমস্যার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে করেছিলেন। কারণ তার মতে, সেই সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী ইসলামী দলগুলি তখনো ইসলামকে একটি অনুমোদিত রাজনৈতিক আন্দোলন হিসাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। অন্য অনেকেই একই মতামতের প্রতিধ্বনি করেছেন যে, মাজিদ রাজনৈতিক ইসলামের বিরোধিতা করেছিলেন কারণ ইসলামী দলগুলির অবস্থা ছিল তখন খুবই নাজুক এবং ইসলামী দলগুলি তখনো ইন্দোনেশিয়ার বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মের ভাষাকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি।[১৩] তবে ইন্দোনেশিয়ার অনেক ধর্মীয় নেতা এখনও বিশ্বাস করেন যে মাজিদের চিন্তাভাবনা এবং তাঁর বিখ্যাত স্লোগান আধুনিক সময়ের পরিস্থিতির সাথে এখনো প্রাসঙ্গিক।[২]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Perlez, Jane (২০০২-০৩-১৬)। "THE SATURDAY PROFILE; An Islamic Scholar's Lifelong Lesson: Tolerance"The New York Times (ইংরেজি ভাষায়)। আইএসএসএন 0362-4331। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৩ 
  2. ""Islam Yes, Partai Islam No" Cak Nur Masih Relevan"www.voaindonesia.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৩ 
  3. Nader Hashemi, Islam, secularism, and liberal democracy (Oxford University Press, USA, March 11, 2009) p. 163
  4. "POLITICS-INDONESIA: Islamic Parties Woo Votes, But Chances Poor | Inter Press Service"www.ipsnews.net। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৩ 
  5. Abdullahi Ahmed An-Na'im, Islam and the secular state (Harvard University Press, Jun 30, 2009) p. 254
  6. "Indonesia and the Future of Islam"Stratfor (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৪ 
  7. "Islam Yes, Partai Islam No, Pemikiran Nurcholis Madjid Diamini Ahok"Poskota News (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৭-০৩-২৩। ২০১৯-১২-২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৩ 
  8. "Muslim democrats at work from Indochina to Tunisia"The Nation Thailand (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৪ 
  9. Izad, Rohmatul (২০১৮-০৯-০৯)। "Islam Yes, Partai Islam No!"GEOTIMES (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৩ 
  10. "PUSAD Paramadina | 40 Tahun 'Islam Yes Partai Islam No' Diperingati" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৭ 
  11. Hasan, Pipip Ahmad Rifa'i। "Why Islam matters in Indonesian politics"The Conversation (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৩ 
  12. "PUSAD Paramadina | Nurcholish Madjid: Remembering Indonesia's Pre-eminent Islamic Reformer" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৮ 
  13. Fatih, Hadi Abu (২০১৪-০৪-০৮)। "Islam Yes, Partai Islam Yes"dakwatuna.com (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-১১-১৭