আলি মোস্তাফা মোশারাফা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ড. আলি মোস্তাফা মোশারাফা পাশা
Ali Mosharrafa.jpg
জন্ম১১ জুলাই ১৮৯৮
দমইয়াত, মিশর
মৃত্যুজানুয়ারি ১৬, ১৯৫০(১৯৫০-০১-১৬) (aged 51)
বাসস্থানকায়রো, লন্ডন
জাতীয়তামিশরীয়
কর্মক্ষেত্রপদার্থ
প্রতিষ্ঠানকায়রো বিশ্ববিদ্যালয়

আলি মোস্তাফা মোশারাফা (মিশরীয় আরবি: على مصطفى مشرفة) (১১ জুলাই ১৮৯৮ - ১৬ জানুয়ারি ১৯৫০) একজন মিশরীয় তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ছিলেন। তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ফলিত গণিতের অধ্যাপক ছিলেন এবং এর প্রথম ডিন হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন।[১] তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বের পাশাপাশি আপেক্ষিকতা তত্ত্বের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন।

জীবনী[সম্পাদনা]

জন্ম এবং প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

তিনি তাঁর ক্লাসের সবচেয়ে কনিষ্ঠ শিক্ষার্থী হলেও সবচেয়ে মেধাবি ছিলেন। ১৯১০ সালে তিনি প্রাথমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় সারা দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯১৪ সালে ১৬ বছর বয়সে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন যা তত্কালীন সময়ে সবচেযে কম বয়সে এই জাতীয় ডিগ্রি অর্জন করার রেকর্ড। তিনি গণিতে গভীর আগ্রহের কারণে মেডিসিন বা ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের পরিবর্তে শিক্ষক কলেজে ভর্তি হন।

তিনি ১৯১৭ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। গণিতে দক্ষতার কারণে মিশরীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে ইংল্যান্ডে পাঠায়, সেখানে তিনি ১৯২০ সালে নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। মিশরীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার ডক্টরাল থিসিস সম্পূর্ণ করার জন্য মোশারাফাকে আরও একটি বৃত্তি প্রদানের বিষয়ে একমত হয়। লন্ডনে অবস্থানকালে তাঁর বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রখ্যাত বিজ্ঞান ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি ১৯২৩ সালে কিংস কলেজ লন্ডন থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, সেখানের নিয়ম অনুসারে স্বল্পতম সময়ে এটি সম্পন্ন করা যায়। ১৯২৪ সালে মোশারাফা ডক্টর অব সাইয়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেন, তিনি প্রথম মিশরীয় এবং বিশ্বের মধ্যে একাদশতম বিজ্ঞানী যিনি এ জাতীয় ডিগ্রি অর্জন করেন।

একাডেমিক জীবন[সম্পাদনা]

তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর শিক্ষক কলেজে একজন শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন, তার বয়স ৩০ বছরের কম হওয়ায় তিনি বিজ্ঞান অনুষদে গণিতের সহযোগী অধ্যাপক হন কারণ অধ্যাপক হওয়ার জন্য সর্বনিম্ন ৩০ বছর বয়স হওয়া প্রয়োজন। ১৯২৬ সালে অধ্যাপক হিসাবে তাঁর পদোন্নতির বিষয়টি সাদ জগলুলের সভাপতিত্বে পরিচালিত সংসদে উত্থাপিত হয়। সংসদ তার যোগ্যতা এবং মেধার প্রশংসা করে যা ইংরেজি অনুষদের ডিনের চেয়েও বেশি ছিল এবং তাকে অধ্যাপক হিসাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

তিনি বিজ্ঞান অনুষদে ফলিত গণিতের প্রথম মিশরীয় অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৩৬ সালে তিনি ৩৮ বছর বয়সে অনুষদের ডিন হন। ১৯৫০ সালে তিনি মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব[সম্পাদনা]

১৯২০-১৯৩০ এর দশকে তিনি ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ এবং বিশেষ আপেক্ষিকতা বিষয়ে অধ্যয়ন করেন এবং অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল।

মোশারাফা কোয়ান্টাম তত্ত্ব, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং বিকিরণ ও পদার্থের মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশিষ্ট বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকিতে ২৫ টি মূল প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেলেন। তিনি আপেক্ষিকতা এবং গণিত বিষয়ে প্রায় ১২ টি বিজ্ঞান বিষয়ক বই প্রকাশ করেছেন। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সম্পর্কিত তাঁর বইগুলি ইংরেজি, ফরাসী, জার্মান এবং পোলিশ ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। তিনি আরবিতে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিতের ১০ টি বই অনুবাদ করেছেন।

মুশারাফা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষত মধ্যযুগের আরব বিজ্ঞানীদের অবদান বিষয়ে অধ্যয়নে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর ছাত্র এম. মুরসি আহমদের সাথে তিনি আল-খোয়ারিজমির বই দ্য কমপেন্ডিয়াস বুক অন ক্যালকুলেশন বাই কমপ্লেশন অ্যান্ড ব্যালেন্সিং বইটি প্রকাশ করেন (কিতাব আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা)।

তিনি সংগীত এবং গণিতের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়েও আগ্রহী ছিলেন এবং ১৯৪৫ সালে সংগীত অনুরাগীদের মিশরীয় সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন।[২][৩]

সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

তিনিই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে সমাজ সংস্কার ও উন্নয়নের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি জনসাধারণের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার আগ্রহী ছিলেন এবং জনসাধারণের জন্য সহজ ভাষায় বেশ কয়েকটি বিজ্ঞান বিষয়ক নিবন্ধ এবং বই লিখেছেন। তিনি আরবি ভাষায় অনুবাদকে উৎসাহিত করেছেন। তিনি আরব বিজ্ঞান বিশ্বকোষ এবং আরবদের বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য নিয়ে বই লেখার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। তিনি যুদ্ধে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং ধ্বংসের মাধ্যম হিসাবে বিজ্ঞানকে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন।

সম্মাননা[সম্পাদনা]

  • বাদশাহ ফারুক তাকে "পাশা" উপাধি প্রদান করেন, কিন্তু তিনি এই পদবী গ্রহণে অস্বীকার করে বলেন যে বিজ্ঞানে পিএইচডি-র চেয়ে অন্য কোন উপাধি বেশি দামি নয়।
  • মিশরের কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদে তাঁর নামে একটি পরীক্ষাগার এবং একটি মিলনায়তনের নামকরণ করা হয়েছে।
  • তার পরিবার কর্তৃক তাঁর নামে প্রবর্তিত একটি বার্ষিক পুরস্কার গণিতের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়।
  • মিশর ও ইউরোপ ম্যাগাজিন একটি কার্টুন প্রকাশ করেছে যাতে দেখা যায় কুণ্ডলী পাকানো একটি কাগজ হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছেন আর দুই পাশে রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয় পরাশক্তিই বিজ্ঞানের গোপন রহস্য উন্মোচনের অপেক্ষায় রয়েছে।
  • ১৯৪৭ সালে ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি মোশারাফাকে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক হিসাবে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তবে রাজা তা অনুমোদন করেননি।
  • তাঁর এবং স্যার আইজ্যাক নিউটনের নামে নিউটন-মোশারাফা তহবিল এর নামকরণ করা হয়েছে।

বই এবং প্রবন্ধ[সম্পাদনা]

তিনি প্রাকৃতিক ঘটনার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা সহ ২৬ টি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি আপেক্ষিকতা এবং গণিত বিষয়ে ১৫ টি বই লিখেছেন। যার মধ্যে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব লিখিত বইটি ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান এবং পোলিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুনঃমুদ্রণ করা হয়েছে। তিনি আপেক্ষিকতা, গণিত, পরমাণু এবং মহাকাশ অভিযান সম্পর্কে প্রায় ১৫ টি বিজ্ঞান বিষয়ক বই লিখেছেন। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইগুলি হ'ল:

  • আমরা ও বিজ্ঞান
  • বিজ্ঞান ও জীবন
  • পরমাণু এবং পরমাণু বোমা
  • বৈজ্ঞানিক দাবি
  • ফেরাউন টাইমস এ যন্ত্রবিদ্যা

প্রবন্ধ[সম্পাদনা]

তাঁর কিছু প্রবন্ধ[সম্পাদনা]

১- স্টার্ক এফেক্টে অপ্রতিসম উপাদানের উপস্থিতি (ফিলোসোফিক্যাল ম্যাগাজিন খন্ড ৪৩, পৃষ্ঠা ৯৪৩) - (১৯২২)

২- শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে স্টার্ক এফেক্ট (ফিলোসোফিক্যাল ম্যাগাজিন খন্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ৩৭১) - (১৯২২)

৩- কোয়ান্টাম তত্ত্বে জটিল জিমান এফেক্ট (ফিলোসোফিক্যাল ম্যাগাজিন খন্ড ৪৬, পৃষ্ঠা ১৭৭) - (১৯২৩)

৪- কোয়ান্টাম তত্ত্বের দ্বিতীয় আসন্ন মানের উপর সাধারণ জিমন এফেক্ট (ফিলোসোফিক্যাল ম্যাগাজিন খন্ড ৪৬, পৃষ্ঠা ৫১৪) - (১৯২৩)

৫- শক্তিশালী ক্ষেত্রে স্টার্ক এফেক্ট (ফিলোসোফিক্যাল ম্যাগাজিন খন্ড ৪৬, পৃষ্ঠা ৭৫১) - (১৯২৩)

৬- কোয়ান্টাম তত্ত্বের উপর সাধারণ জিমান এফেক্ট (রয়্যাল সোসাইটির কার্যক্রম - পার্ট এ, খন্ড ১০২, পৃষ্ঠা ৫২৯) - (১৯২৩)

৭- স্টার্ক এফেক্ট তত্ত্বে অর্ধ ইন্টিগ্রাল কোয়ান্টাম সংখ্যা এবং ভগ্নাংশ কোয়ান্টাম সংখ্যার একটি সাধারণ অনুমান (Roy. Soc. Proc. খন্ড ১২৬, পৃষ্ঠা ৬৪১) - (১৯৩০)

৮- ডিজেনারেট সিস্টেমস-এ কোয়ান্টাম ডায়নামিক্স (রয়্যাল সোসাইটির কার্যক্রম - পার্ট এ, খন্ড ১০৭, পৃষ্ঠা ২৩৭) - (১৯২৫)

৯- জিম্যান ত্রয়ীর কোয়ান্টাম ব্যাখ্যা (ন্যাচার, খন্ড ১১৯, পৃষ্ঠা ৯৬, নং ২৯০৭, ১৮ জুলাই) - (১৯২৫)

১০- তরঙ্গ প্রপঞ্চ হিসাবে লরেন্টজ ইলেক্ট্রনের গতি (ন্যাচার, খন্ড ১২৪, পৃষ্ঠা ৭২৬, নং ৩১৩২, ৯ নভেম্বর) - (১৯২৯)

১১- তরঙ্গ বলবিদ্যা এবং পদার্থ ও বিকিরণের দ্বৈত দিক (রয়্যাল সোসাইটির কার্যক্রম - পার্ট এ, খন্ড ১২৬, পৃষ্ঠা ৩৫) - (১৯৩০)

১২- পদার্থ এবং বিকিরণীয় তরঙ্গ (রয়্যাল সোসাইটির কার্যক্রম - পার্ট এ, খন্ড ১৩১, পৃষ্ঠা ৩৩৫) - (১৯৩১)

১৩- পদার্থ এবং বিকিরণকে একই বিশ্ব-অবস্থার দুটি দিক হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে (ভার্হান্ডলুঞ্জেন ডার ইন্টারনেশনালেন কংগ্র্রেস, জুরিখ, সুইজারল্যান্ড) - (৯৩২)

১৪- পদার্থ ও বিকিরণের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে কিছু অভিমত (বুলেটিন দে ল'ইনস্টিটিউট দ'ইজিপ্ট, T. XVI, পৃষ্ঠা ১৬১) - (১৯৩৯)

১৫- আধুনিক মিশরীয় সংগীতের ধরন (ন্যাচার, নং ১৩৫, পৃষ্ঠা ৫৪৮-৫৪৯) - (১৯৩৭)

১৬- ম্যাক্সওয়েলীয় সমীকরণ এবং আলোর পরিবর্তনশীল গতি (মিশরের গণিত ও পদার্থবিদ সমাজের কার্যবিবরণী, নং ১, খন্ড ১) - (১৯৩৭)

১৭- অনির্দিষ্টতার মূলনীতি এবং বিশ্ব রেখার কাঠামো (মিশরের গণিত ও পদার্থবিদ সমাজের কার্যবিবরণী, খন্ড ২, নং ১) - (১৯৪৪)

১৮- বিশ্ব রেখার সাথে যুক্ত তরঙ্গ পৃষ্ঠসমূহ (মিশরের গণিত ও পদার্থবিদ সমাজের কার্যবিবরণী, খন্ড ২, নং ২) - (১৯৪৩)

১৯- মোচাকৃতি রূপান্তর (মিশরের গণিত ও পদার্থবিদ সমাজের কার্যবিবরণী, নং ২, খন্ড ৩) - (১৯৪৪)

২০- আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের একটি ইতিবাচক নির্ধারিত মেট্রিক (মিশরের গণিত ও পদার্থবিদ সমাজের কার্যবিবরণী, খন্ড ২, নং ৪) - (১৯৪৪)

২১- মেট্রিক স্পেসের এবং একটি আধানযুক্ত কণার গতির সমীকরণ (মিশরের গণিত ও পদার্থবিদ সমাজের কার্যবিবরণী, খন্ড ৩, নং ১) - (১৯৪৫)

২২- মিশরীয় বিজ্ঞান একাডেমি (ন্যাচার, খন্ড ১৫৭, পৃষ্ঠা ৫৭৩, নং ৩৯৯২, মে) - (১৯৪৬)

২৩- স্পেস এবং ভরের অসম্পূর্ণতার মেট্রিক (ফিলোসোফিক্যাল ম্যাগাজিন) - (১৯৪৮)

২৪- পারমাণবিক শক্তির ভর-ত্রুটিযুক্ত বক্র রেখা (ন্যাচার, খন্ড ১৬৪, ১৫ অক্টোবর) - (১৯৪৯)

এছাড়াও[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Google Translate"translate.google.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-১০-২৭ 
  2. "Google Translate"translate.google.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-১০-২৭ 
  3. "Text Viewer"modernegypt.bibalex.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৭-১০-২৭ 

তাঁর প্রবন্ধের তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]