আঁতেল
| বুদ্ধিজীবিতা |
|---|
| ধারাবাহিকের একটি অংশ |
আঁতেল হল আধুনিক বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত একটি ফরাসি-ভাষা-আগত বিশেষ্য ও বিশেষণবাচক শব্দ, যা "বুদ্ধিজীবী" শব্দের অপভ্রংশ।[১][২] আভিধানিক অর্থে, আঁতেল হল (ব্যঙ্গে) পণ্ডিত, বিদ্বান, বুদ্ধিজীবীর ধরনধারণবিশিষ্ট (ব্যক্তি), যা ফরাসি আঁতেলেক্ত্যুয়েল (ফরাসি: intellectuel, উচ্চারণ: [ɛ̃.tɛ.lɛk.tɥɛl] ())-এর অপভ্রংশ, কিংবা ইং. intellectual-এর ফরাসিভঙ্গিম উচ্চারণ থেকে আগত।[৩] পুথিগত বিদ্যায় পারদর্শী তবে বাস্তববুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞানের অভাব এমন ব্যক্তিকে আঁতেল বলা হয়। যে জ্ঞানীর ভান করে তাকেও আঁতেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।[১] ভাষাতত্ত্ববিদ পবিত্র সরকারের মতে, "চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী বাঙালির আত্মপ্রকাশ ঘটে, যারা নিয়মিত কফি হাউসে বসতেন, পাঞ্জাবি পরতেন ও নিজেদের সেরা মনে করতেন; এসব বুদ্ধিজীবীকে দেখে অন্যান্যদের বিদ্রুপ এবং প্রতিক্রিয়াতেই ‘আঁতেল’ শব্দটির প্রয়োগ শুরু।"[২]
ব্যবহার
[সম্পাদনা]সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার বিজয়ী ভারতীয় লেখক নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির মতে, “বুদ্ধিজীবী শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতে, দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায়। অর্জুন ও রাজা-মহারাজাদের আগমনের পরপরই সভাস্থলে উপস্থিত হয় ‘নিপুণা বুদ্ধিজীবিন’ কথাটি। এই সংশয়সূচক মন্তব্যটি করা হয়েছিল লক্ষ্যভেদ হবে কি হবে না এই প্রসঙ্গে। মহাভারতের কর্ণের চরিত্রকে তিনি আঁতেল হিসেবে তুলে ধরেন। তার মতে, "কর্ণের ‘আমি সব পারি’ মানসিকতার পরিচয় পাই আমরা। তার আচরণে অহংবোধ প্রকাশ পায়। যুদ্ধক্ষেত্রে দুঃশাসনের মৃত্যু হয়েছে, কর্ণ কিন্তু কিছুই করতে পারেন না। অথচ দুর্যোধনকে অভয় দেন চিন্তা না করতে। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও বোঝা যায়, জ্ঞান পরিপূর্ণ নয় যেখানে, সেখানেই থাকে ওপরচালাকির প্রবণতা। তাই ধীরে ধীরে আঁতেল শব্দটির অর্থও আমাদের কাছে বদলে গিয়েছে।"[২]
বাংলাদেশী কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ তার এলেবেলে গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে আঁতেল শব্দটি উল্লেখ করে লিখেছেন, "কিছু কিছু জিনিসের প্রতি আমার এলার্জি আছে। আঁতেল বাবা মার পুত্র কন্যারা হচ্ছে সেই সব জিনিসের একটি। আঁতেল সহ্য করা যায় কিন্তু তাদের অফ- স্প্রীং অসহনীয়। এই সব অফ-স্প্রীং জ্ঞানী জ্ঞানী আবহাওয়ায় থেকে কেমন যেন ভ্যাবদা মেরে যায়। বুদ্ধি শুদ্ধি নতুন লাইনে চলে। সেই লাইন ভয়াবহ লাইন। .... কিছু কিছু শব্দের অর্থ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সত্যি পাল্টে যাচ্ছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই উল্টো অর্থ হচ্ছে। যেমন ধরুন বুদ্ধিজীবী। অভিধানিক অর্থ হচ্ছে – বুদ্ধি বলে বা বুদ্ধির কাজ দ্বারা জীবিকা অর্জনকারী। আজ বুদ্ধিজীবী শব্দের অর্থ কি দাঁড়িয়েছে? আজ বুদ্ধিজীবী শব্দটি গালাগালি অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। বুদ্ধিজীবী বলতে আমরা বুঝি নাকউঁচু সুবিধাবাদী একদল মানুষ যাদের প্রধান কাজ হচ্ছে বিবৃতি দেয়া। আমার এক বন্ধু কিছুদিন আগে বলছিলেন - দেশে কত রকম আন্দোলন হয়। আন্দোলনে ছাত্র মরে, শ্রমিক মরে, টোকাই মরে কিন্তু কখনাে কোন বুদ্ধিজীবী মরে না। ছলে বলে কৌশলে তারা বেঁচে থাকে। কারণ তারা মরে গেলে বিবৃতি দেবে কে? শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির দেখভাল করবে কে? সভা-সমিতিতে প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি হবে কে? আমার লেখার ভঙ্গি দেখে কেউ কেউ মনে করে বসতে পারেন আমি বিবৃতি দেয়াটাকে খুব সহজ কাজ ধরে নিয়ে ব্যাপারটাকে ছোট করতে চাচ্ছি। মােটেই তা না। আমি এ দেশের একজন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতিতে সই করার সময়ের কি অন্তরঙ্গ মুহূর্ত দেখেছি – আমি জানি কাজটা কত কঠিন। বিবৃতিতে সই করার সময় একজন বুদ্ধিজীবীকে কত দিকেই না খেয়াল করতে হয়। প্রথমেই দেখতে হয় তার আগে কারা কারা সই করেছে। যারা সই করেছে তাদের ব্যাকগ্রাউণ্ড কি? প্রাে চায়না, প্রাে রাশিয়া না কি আমেরিকা পন্থী? তারপর চিন্তা করতে হয় বিবৃতিতে সই করলে সরকারী লােকজন ক্ষেপে যাবে কিনা, সই না করলে পাবলিক ক্ষেপবে কি-না। এ ছাড়াও সমস্যা আছে - খবরের কাগজে তার নাম ঠিকমত ছাপা হবে তাে? সিনিয়ারিটি মেইনটেইন করা হবে তাে। তাঁর আগে কোন চেংড়ার নাম চলে যাবে না তাে? আমি লক্ষ্য করে দেখেছি বুদ্ধিজীবীরা বড়ই সাবধানী। তারা কাউকেই রাগাতে চান না। নিজেরাও রাগেন না। তাদের মুখের হাসি হাসি ভাবটা থেকেই যায়। তারা এই অসম্ভব কি করে সম্ভব করেন কে জানে।"
২০১৭ সালে নিখোঁজ হওয়ার পর উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশী সমাজকর্মী ও লেখক ফরহাদ মজহারের দিকে ইঙ্গিত করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ অধিবেশনে বলেন, “আমাদের একজন স্বনামধন্য আঁতেল গুম হয়ে গেলেন। পরে দেখা গেল উনি গুম হননি। উনি নিজে নিজেই খুলনায় গেলেন। পরে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল। এর দোষটা আমাদের৷ এ ধরনের আরও অনেক ঘটনা তো ঘটে যাচ্ছে৷ আমি তার নামধাম বলতে চাই না।“[৪][৫]
বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রনয়ণ কমিটির সদস্য ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সফিউদ্দিন আহমেদ "আমাদের প্রজন্মকে কতোটুকু সম্ভাবনাময়ী মনে করছেন" প্রশ্নের উত্তরে বলেন, "পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের ছেলে মেয়েদের তুলনায় আমাদের ছেলে-মেয়েরা যথেষ্ট মেধাবী। খেয়াল করলে দেখবেন, তারা যখন বাইরে যায় তখন সেখানে পড়াশুনায়, উদ্ভাবনে, উদ্যোক্তা হিসেবে ভালো কৃতিত্বের সাক্ষর রাখে। কিন্তু এখানে তারা তা পারছে না। কেনো পারেনা? কারণ, আমি নিজে তাকে সেই শিক্ষা দিতে পারছি না। একটা জাতির শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, বুদ্ধিজীবী যখন আঁতেল, দলকানা, পরগাছা হয়ে যায়, তখন সেই জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা এখন সেই সময়টা পার করছি। ফলে আমাদের প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।"[৬]
ভারতের চলচ্চিত্র পরিচালক রাজ চক্রবর্তীও তার এক সাক্ষাৎকারে আঁতেল শব্দটি উল্লেখ করেন, "প্রযোজক হিসেবে কীভাবে ছবি বাছেন" এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "আমি নিজে যেহেতু এখন বাণিজ্যিক ছবি না করে ঐতিহাসিক বা ছোটদের ছবি করছি, তাই প্রযোজক হিসেবে বাণিজ্যিক ছবিই বেছে নেব। এমনিতেই এই ধরনের ছবির পরিচালক হাতে গোনা। তার উপর আমার ওই আরবান আঁতেল ছবি খুব একটা ভাল লাগে না। লোকে যতই খারাপ ভাবুক, আমি মফস্বলের ছেলে। বাণিজ্যিক ছবি দেখে বড় হয়েছি। এখনও টিপিক্যাল বলিউড মসালা ছবি দেখতেই পছন্দ করি। তাই কমার্শিয়াল ছবিতেই বিনিয়োগ করতে চাই।"[৭]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 "চলতি শব্দের অভিধান - পর্ব-এক"। মোহাম্মদ মামুন অর রশীদ। বাংলা ট্রিবিউন। ৭ মার্চ ২০১৬। ৮ মে ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মে ২০১৮।
- 1 2 3 "আঁতেল কারে কয়"। রেশমি বাগচি। আনন্দবাজার পত্রিকা। ২০ মার্চ ২০১৩। ২৪ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মে ২০১৮।
- ↑ "Meaning of আঁতেল - Bangla to Bangla / English Dictionary"। www.ovidhan.org। অভিধান.অর্গ। ২০ মে ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ মে ২০১৮।
- ↑ "গুম আমেরিকায় আরও ভয়াবহ: হাসিনা"। বিডিনিউজটুয়েন্টিফোর। ২৩ নভেম্বর ২০১৭। ২১ মে ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মে ২০১৮।
- ↑ "সংসদে গুম নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য কী ইঙ্গিত দেয়?"। ডয়চে ভেলে। ২৪ নভেম্বর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মে ২০১৮।
- ↑ "'শিগগিরই কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হোক'"। একুশে টেলিভিশন। ৯ মে ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মে ২০১৮।
- ↑ "পরিচালক হিসেবে 'টং লিং'এর চেয়েও সাহসী কাজ করেছি"। পৃথা বিশ্বাস। ওবেলা। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। ২০ মে ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মে ২০১৮।