সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
জন্ম (১৯৩০-১০-১৪)অক্টোবর ১৪, ১৯৩০
খোশবাসপুর, জেলা মুর্শিদাবাদ
মৃত্যু সেপ্টেম্বর ৪, ২০১২(২০১২-০৯-০৪) (৮১ বছর)
কলকাতা, ভারত
জীবিকা সাংবাদিক
জাতীয়তা ভারতীয়
জাতি বাঙালি
নাগরিকত্ব ভারতীয়

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ( জন্ম : ১৪ অক্টোবর, ১৯৩০[১] - মৃত্যু: ৪ সেপ্টেম্বর ২০১২ ) একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। কর্ণেল তাঁর সৃষ্ট একটি গোয়েন্দা চরিত্র ।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মুর্শিদাবাদ খোশবাসপুর গ্রামে ১৯৩০ সালে অক্টোবর মাসে জন্মগ্রহণ করেন ৷ প্রথম জীবনে বাড়ি থেকে পলাতক কিশোরের জীবন অতিবাহিত করেছেন ৷ রাঢ় বাংলার লোকনাট্য "আলকাপের" সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাচ-গান-অভিনয়ে নিমজ্জিত হয়ে জেলায় জেলায় ঘুরেছেন ৷ তিনি ছিলেন 'আলকাপ' দলের "ওস্তাদ" (গুরু) । নাচ-গানের প্রশিক্ষক । নিজে আলকাপের আসরে বসে হ্যাসাগের আলোয় দর্শকের সামনে বাঁশের বাঁশি বাজাতেন । নিজের দল নিয়ে ঘুরেছেন সারা পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, এমনকি বিহার-ঝাড়খন্ডেও । তাই পরবর্তী জীবনে কলকাতায় বাস করলেও নিজেকে কলকাতায় প্রবাসী ভাবতেই ভালবাসতেন । তাই সুযোগ পেলেই বার বার মুর্শিদাবাদের গ্রামে পালিয়ে যেতেন । সেই পলাতক কিশোর তাঁর চরিত্রের মধ্যে লুকিয়ে ছিল । ঘুরতেন সেই রাখাল বালকের মাঠে, হিজলের বিলে, ঘাসবন ও উলুখড়ের জঙ্গলে, পাখির ঠোঁটে খড়কুটো আর হট্টিটির নীলাভ ডিম -সেই মায়াময় আদিম স্যাঁতসেতে জগতে ।

তাঁর পিতার সঙ্গে বর্ধমানের কর্ড লাইনে নবগ্রাম রেল স্টেশনের কাছে কিছুদিন ছিলেন । সেখানে গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন । সেই নবগ্রাম গোপালপুরের প্রেক্ষাপটে তিনি লিখেছিলেন 'প্রেমের প্রথম পাঠ' উপন্যাস । তাঁর লেখকজীবনের প্রথম দিকের অপূর্ব উপন্যাস । গোপালপুর থেকে পাশ করে তিনি ভর্তি হন বহরমপুর কলেজে ।


কর্মজীবন[সম্পাদনা]

তাঁর "ইন্তি, পিসি ও ঘাটবাবু", "ভালোবাসা ও ডাউনট্রেন", "তরঙ্গিনীর চোখ", "জল সাপ ভালোবাসা", "হিজলবিলের রাখালেরা", "নৃশংস", "রণভূমি", "মাটি", "উড়োপাখির ছায়া", "রক্তের প্রত্যাশা", "মানুষের জন্ম", "মৃত্যুর ঘোড়া", "গোঘ্ন", "রানীরঘাটের বৃত্তান্ত", ইত্যাদি অসংখ্য ছোটগল্পের জন্য বিশ্বসাহিত্যের দরবারে স্থায়ী আসন পেয়েছেন ৷ পঞ্চাশ-ষাটের দশকে একঝাঁক লেখক বাংলা সাহিত্যে উদিত হন, যেমন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, যশোদাজীবন বন্দ্যোপাধ্যায়, রতন ভট্টাচার্য, স্মরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, মতি নন্দী -- এঁদেরই সঙ্গে আবির্ভাব ঘটে সিরাজের । তবে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল বিপুল,তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র ছিল দ্বারকা নদীর অববাহিকায় আদিম প্রবৃত্তিতে ভরা নারীপুরুষ ও উন্মুক্ত প্রকৃতি । এই এলাকার নাম ' হিজল' । কান্দী মহকুমার অন্তর্গত । তাঁর 'হিজলকন্যা" উপন্যাসে সেই অঞ্চলের নরনারীকে ধরা আছে । মুস্তাফা সিরাজ কলকাতায় পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন ষাটের দশকের শুরুতে ৷ দীর্ঘদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় সাংবাদিক হিসাবে চাকরি ও লেখালেখি সমানতালে চালিয়ে গেছেন ৷ তাঁর জ্ঞান ও অধীত বিদ্যাসমূহ তাঁকে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হিসাবে বিদ্বানসমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে ৷ইতিহাস,সমাজতত্ত্ব , নৃতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব, বিজ্ঞান, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব - সব বিষয়েই তাঁর জ্ঞান ও বিদ্যার গভীরতা তাঁকে পন্ডিতমহলে পরিচিত করে তুলেছে৷


সাহিত্যিক জীবন[সম্পাদনা]

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের লেখক সত্তায় জড়িয়ে ছিল রাঢ়ের রুক্ষ মাটি । মুর্শিদাবাদের পাশের জেলা বীরভূম, যেখানে লাভপুর গ্রামে তারাশঙ্করের জন্ম । একই জলহাওয়া তাঁদের দুজনকেই প্রাণোন্মাদনা দিয়েছিল । তাই তারাশঙ্কর বলতেন, "আমার পরেই সিরাজ, সিরাজই আমার পরে অধিষ্ঠান করবে ।"

তাঁর "ইন্তি, পিসি ও ঘাটবাবু", "ভালোবাসা ও ডাউনট্রেন", "তরঙ্গিনীর চোখ","জল সাপ ভালোবাসা", "হিজলবিলের রাখালেরা", "রণভূমি", "উড়োপাখির ছায়া", "রক্তের প্রত্যাশা", "মৃত্যুর ঘোড়া", "গোঘ্ন", "রানীরঘাটের বৃত্তান্ত", ইত্যাদি অসংখ্য ছোটগল্প অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে । তাঁর প্রথম মুদ্রিত উপন্যাস - "নীলঘরের নটী"। পর পর প্রকাশিত হয় "পিঞ্জর সোহাগিনী", "কিংবদন্তীর নায়ক","হিজলকন্যা","আশমানতারা", "উত্তর জাহ্নবী", "তৃণভূমি", "প্রেমের প্রথম পাঠ", "বন্যা","নিশিমৃগয়া","কামনার সুখদুঃখ", "নিশিলতা", "এক বোন পারুল", "কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি", "নৃশংস","রোডসাহেব", "জানগুরু" ইত্যাদি ইত্যাদি ৷ তাঁর গল্প ও একাধিক গ্রন্থ ভারতের সমস্ত স্বীকৃত ভাষায় অনূদিত হয়েছে, এমনকি ইংরেজি তো বটেই, বিশ্বের বহু ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে ৷

তাঁর লেখা 'তৃণভূমি" উপন্যাসে কান্দী মহকুমার এক বৃহৎ অঞ্চল ধরা আছে । "উত্তর জাহ্নবী" উপন্যাসে ধরা আছে এক বিশেষ সময় ও সমাজের কথা, যা বাংলা সাহিত্যে অনাস্বাদিত । আর "অলীক মানুষ" এক বিস্তৃত ভুবনের কাহিনী, যা এক মুসলিম পীর বা ধর্মগুরুর বংশে জাত পুরুষের আত্মানুসন্ধান । ব্রিটিশের রাজত্বের শেষভাগে এক পরিবর্তনীয় সময়ের নিখুঁত স্থির ছবি । এই অলীক মানুষ তাঁকে ভিন্ন লেখকের মর্যাদার চূড়ান্ত শিখরে উন্নীত করেছে ।

ক্ষুদে ও কিশোর পাঠকদের দাবি মেটাতে তিনি সৃষ্টি করলেন "গোয়েন্দা কর্নেল" নামে একজন রহ্স্যময় চরিত্র , যাঁর মাথা জোড়া টাক, ঠোঁটে চুরুট, অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারি অফিসার, এখন প্রজাপতি ও পাখি দেখতে ভালোবাসেন ৷ অথচ তিনি অনেক অপরাধ ও হত্যার কিনারা করে শখের গোয়েন্দাগিরি করেন ৷"গোয়েন্দা কর্নেল" পাঠকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ৷"গোয়েন্দা কর্নেল সমগ্র" খন্ডে খন্ডে প্রকাশিত হয়ে চলেছে ৷ অনেকের ধারণা, কর্নেলের যে চেহারা ও অবয়ব চিত্রিত হয়েছে তা নাকি ফাদার দ্যতিয়েনের সঙ্গে মিলে যায় !

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান ছিল প্রবল । সংবাদপত্রে চাকরি করলেও কোনও মালিকানাগোষ্ঠীর কাছে মাথা নিচু করেন নি । 'অলীক মানুষ' উপন্যাস ছাপা হয় ধারাবাহিকভাবে 'চতুরঙ্গ' নামে একটি লিট্‌ল ম্যাগাজিনে । "তৃণভূমি" ছাপা হয় অধুনালুপ্ত 'ধ্বনি' নামক এক ছোট পত্রিকায় । বড় পত্রিকায় চাকরি করলেও তাঁর সেরা উপন্যাসগুলি ছাপা হয়েছে ছোট পত্রিকায় । লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকদের প্রতি ছিল তাঁর সস্নেহ পক্ষপাত । মিডিয়ার আলো ও প্রচারের প্রতি তাঁর আকুলতা ছিল না । নিজের আত্মসম্মানবোধ নিয়ে প্রায় একা উন্নত গ্রীবায় ছোট ফ্ল্যাটে জীবনকে কাটিয়ে গেছেন । মাথা উঁচু করে থাকার দর্পী মনোভাবের জন্য তাঁকে অনেক মনোকষ্ট পেতে হলেও তিনি দমে যাননি । তবে তাঁর পাঠকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল মধুর । তাঁর ব্যবহারে ও আচরণে ছিল পরিশীলিত ভদ্রতা ও আন্তরিকতা ।


পুরস্কার ও সম্মাননা[সম্পাদনা]

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'অলীক মানুষ' উপন্যাসটি ভারত সরকারের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বঙ্কিম পুরস্কার - এসব ছাড়াও ভুয়ালকা পুরস্কার দ্বারা সম্মানিত । তাঁর 'অমর্ত্য প্রেমকথা' বইয়ের জন্য জন্য তিনি পেয়েছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত নরসিংহদাস স্মৃতিপুরস্কার । এছাড়া ১৯৭৯ সালে পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার । পেয়েছেন বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কার,সুশীলা দেবী বিড়লা স্মৃতি পুরস্কার, দিল্লির OUF সংস্থার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুরস্কার, শরৎচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার ইত্যাদি আরও অনেক পুরস্কার তিনি তাঁর সামগ্রিক সাহিত্য-কৃতিত্বের জন্য পেয়েছেন । তাঁর অনেক কাহিনী চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে , যেমন 'কামনার সুখ দুঃখ' উপন্যাস অবলম্বনে 'শঙ্খবিষ" । দীনেন গুপ্তের পরিচালনায় 'নিশিমৃগয়া' । উত্তমকুমার অভিনীত 'আনন্দমেলা' । অঞ্জন দাশ পরিচালনা করেছেন সিরাজের ছোটগল্প 'রানীরঘাটের বৃত্তান্ত' অবলম্বনে 'ফালতু' । সিরাজের "মানুষ ভূত" কাহিনী চলচ্চিত্র ছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে মঞ্চে ক্রমাগত অভিনীত হয়ে চলেছে ৷ এই স্কুল পালানো মানুষটিই পেয়েছিলেন সাম্মানিক ডক্টরেট ।

তথ্যসুত্র[সম্পাদনা]

  1. কর্নেল সমগ্র ,দেব সাহিত্য কুটীর, লেখক পরিচিতি


বহি:সংযোগ[সম্পাদনা]