রুয়াল আমুনসেন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রুয়াল আমুনসেন
Nlc amundsen.jpg
রুয়াল আমুনসেন
জন্ম (১৮৭২-০৭-১৬)জুলাই ১৬, ১৮৭২
বিয়োর্গ, অসফোল্ড , সুইডেন-নরওয়ে
মৃত্যু c. জুন ১৮, ১৯২৮(১৯২৮-০৬-১৮) (৫৫ বছর)
বিয়োর্নোয়া, সভালবার্ড, নরওয়ে
পেশা ভ্রমণকারী-আবিস্কারক
পিতা-মাতা ইয়েন্স আমুনসেন

রুয়াল আমুনসেন (নরওয়েজীয়: রূয়াল্‌ আম্যুন্স্যন্‌ আ-ধ্ব-ব: [ˈɾuːɑl ˈɑmʉnsən], পূর্ণ নাম Roald Engelbregt Gravning Amundsen) (১৬ জুলাই,১৮৭২-১৮ জুন,১৯২৮(নিখোঁজ)) একজন বিখ্যাত নরওয়েজীয় মেরু অভিযাত্রী এবং আবিষ্কারক ছিলেন। তিনি ১৯১০ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে দক্ষিণ মেরুতে পদার্পণকারী প্রথম অভিযাত্রীদলের নেতৃত্ব দেন। একই সাথে উত্তর এবং দক্ষিণ মেরুজয়ী অভিযাত্রীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বপ্রথম। নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ (ইংরেজি: Northwest Passage) সর্বপ্রথম ব্যবহারের জন্যও তিনি পরিচিত। ১৯২৮ সালের ১৮ জুন এক উদ্ধার তৎপরতায় অংশগ্রহনকালে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। মেরু অভিযানের স্বর্ণযুগে ডগলাস মসন , রবার্ট স্কট , আর্নেস্ট শ্যাকেলটনের পাশাপাশি তিনিও দক্ষিণ মেরু অভিযানের নেতৃত্ব দেন ।

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

রুয়াল আমুনসেন ফ্রেড্রিকস্টাড এবং শার্পসবর্গ শহরের মধ্যবর্তী বর্জ শহরের এক নরওয়েজিও জাহাজ মালিক এবং নাবিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ইয়েন্স আমুনসেন। তিনি ছিলেন পরিবারের চতুর্থ সন্তান। তাঁর মা তাঁকে পারিবারিক জাহাজ-শিল্প থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং তাঁকে ডাক্তারি পেশা গ্রহণের জন্য চাপ দেন। মায়ের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আমুনসেন তাঁর ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখান। কিন্তু তাঁর ভেতর অভিযাত্রীদের জীবনের প্রতি আগ্রহ সবসময়ই সুপ্ত ছিল, প্রধানত ফ্রিটজফ ন্যানসেনের ১৮৮৮ সালের গ্রীনল্যান্ড অতিক্রম এবং বিফল হওয়া ফ্র্যাংকলিন অভিযাত্রা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। তাই ২১ বছর বয়সে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে নাবিক জীবন বেছে নেন।

মেরু অভিযানসমূহ[সম্পাদনা]

বেলজীয় দক্ষিণমেরু অভিযান ১৮৯৭-৯৯[সম্পাদনা]

১৮৯৭-৯৯ সালে সংঘটিত বেলজিয়ান দক্ষিণমেরু অভিযানে তিনি একজন ফার্স্ট মেট হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। "বেলজিকা" (Belgica) নামের জাহাজ নিয়ে আদ্রিয়াঁ দ্য গেরলাশের (Adrien de Gerlache) নেতৃত্বাধীন এই অভিযান ছিল দক্ষিণমেরুতে শীতকালে সংঘটিত প্রথম অভিযান। ডিজাইনের ত্রুটি অথবা নাবিকদের ভুলে বেলজিকা অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের পশ্চিমে অ্যালেকজ্যান্ডার ল্যান্ডে (ইংরেজি: Alexander Land, ৭০°৩০'দক্ষিণ) সামুদ্রিক বরফে আটকে যায়। জাহাজের অভিযাত্রীদের তখন এমন এক শীতকাল অতিবাহিত করতে হয় যার জন্য তাঁরা উপযুক্তভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। আমুনসেনের নিজস্ব ধারণা অনুযায়ী, জাহাজের মার্কিন ডাক্তার ফ্রেডেরিক কুক (ইংরেজি: Frederick Cook) পশু শিকার করে তাজা মাংস খাইয়ে অভিযাত্রীদের স্কার্ভি রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছিলেন। আমুনসেনের ভবিষ্যতের অভিযানগুলোর জন্য এটা ছিল খুবই দরকারী একটি শিক্ষা।

নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ[সম্পাদনা]

১৯০৩ সালে আমুনসেন আরও ছয়জন অভিযাত্রীর নেতৃত্ব দিয়ে ৪৭ টন ওজনবিশিষ্ট গোইয়া নামের সীল-শিকারী জাহাজে প্রথমবারের মত আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যবর্তী নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করতে সক্ষম হন। প্রকৃতপক্ষে ক্রিস্টোফার কলম্বাস (ইংরেজি: Christopher Columbus, মূলতঃ ইতালীয়: Cristoforo Colombo), জন ক্যাবট (ইংরেজি: John Cabot, মূলতঃ ইতালীয়: Giovanni Caboto জোভ়ান্নি কাবোতো), জাক কার্তিয়ে (ফরাসি: Jacques Cartier ঝ়াক্‌ কার্তিয়ে) এবং হেনরি হাডসনের (ইংরেজি: Henry Hudson) যুগ থেকেই অভিযাত্রীরা নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ অতিক্রমের চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু আমুনসেনের পূর্বে তাঁরা কেউই সাফল্য লাভ করেন নি। আমুনসেন তাঁর জাহাজে একটি ছোট গ্যাস ইঞ্জিন যুক্ত করেছিলেন। তাঁরা ব্যাফিন উপসাগর, ল্যাংকাস্টার, পীল সাউন্ড এবং জেমস রস, সিম্পসন ও রে প্রণালী অতিক্রম করেন এবং কিং উইলিয়াম দ্বীপে দুটি শীতকাল অতিবাহিত করেন। এ স্থানটি বর্তমানে কানাডার নুনাভুট প্রদেশে গোইয়া হেভেন নামে পরিচিত।

এসময় আমুনসেন স্থানীয় নেটসিলিক অধিবাসীদের কাছ থেকে উত্তরমেরুর প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার কিছু কলাকৌশল শিখে নেন যা পরবর্তীতে খুবই উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তিনি স্লেড কুকুর ব্যবহার করতে শেখেন এবং ভারী, ঊলেন পার্কার বদলে পশুর চামড়া ব্যবহার শুরু করেন। বরফে আটকাবস্থায় তৃতীয় শীতকাল অতিবাহিত করার পর আমুনসেন বোফোর্ট সাগরে (ইংরেজি: Beaufort Sea) একটি প্যাসেজ খুঁজে পান যা তাঁকে বেরিং প্রণালীতে (ইংরেজি: Bering Strait) নিয়ে যায়। এভাবে তাঁর নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ অতিক্রম সম্পূর্ণ হয়। তিনি ভিক্টোরিয়া দ্বীপের আরো দক্ষিণে অগ্রসর হতে থাকেন এবং ১৯০৫ সালের ১৭ আগস্ট কানাডিয়ান আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জ অতিক্রম করেন। কিন্তু শীতের কারণে তিনি আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে পৌঁছার পূর্বেই থামতে বাধ্য হন। সেখান থেকে পাঁচশ মাইল (আটশ কিলোমিটার) দূরে আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের ঈগল সিটিতে একটি টেলিগ্রাফ অফিস ছিল। আমুনসেন স্থলপথে সেখানে পৌঁছে ১৯০৫ সালের ৫ ডিসেম্বর একটি সাফল্যবার্তা প্রেরণ করেন এবং আবার জাহাজে ফিরে যান। ১৯০৬ সালে তিনি নোম পৌঁছান। তাঁর এই যাত্রাপথে কোথাও কোথাও পানির গভীরতা ছিল মাত্র ৩ ফুট (০.৯১ মিটার), ফলে কোনও বড় জাহাজের পক্ষে কখনওই এই পথ ব্যবহার করা সম্ভব হত না।

এসময় আমুনসেন জানতে পারেন যে নরওয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সুইডেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে এবং নতুন রাজা তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। আমুনসেন নতুন রাজা সপ্তম হাকোনকে বার্তা পাঠান যে "এটা নরওয়ের জন্য একটি মহান সাফল্য"। তিনি আরও সাফল্যের আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং স্বাক্ষর করেন, "আপনার অনুগত প্রজা, রুয়াল আমুনসেন"।

দক্ষিণ মেরু অভিযান (১৯১০-১২)[সম্পাদনা]

নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ অতিক্রমের পর আমুনসেন উত্তর মেরুতে পা রকখার এবং নর্থ পোলার বেসিন আবিষ্কারের পরিকল্পনা করেন। এ উদ্দেশ্যে তহবিল সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি যথেষ্টে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। ১৯০৯ সালে তিনি জানতে পারেন যে প্রথমে ফ্রেডেরিক কুক এবং পরবর্তীতে রবার্ট পিয়েরী উত্তর মেরু বিজয়ের কৃতিত্ব দাবী করেছেন। এসব কারণে আমুনসেন তাঁর পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনেন এবং দক্ষিণ মেরু অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। তবে তিনি তাঁর এ পরিকল্পনা স্কট এবং নরওয়েজিয়ানদের কাছ থেকে গোপন রাখেন। ১৯১০ সালের ৩ জুন তিনি ফ্রাম ("ফরোয়ার্ড") নামের একটি জাহাজ নিয়ে অসলো থেকে দক্ষিণ দিকে যাত্রা করেন। মাঝসমুদ্রে পৌছে আমুনসেন তাঁর পরিকল্পনার কথা তাঁর সাথীদের জানান এবং স্কটকে একটি টেলিগ্রাম বার্তা প্রেরণ করেন। বার্তাটি ছিল সরল এবং সংক্ষিপ্তঃ "বিনীতভাবে অবগত করছি যে ফ্রাম দক্ষিণ মেরুর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে - আমুনসেন"। ১৯১১ সালের ১৪ জানুয়ারি অভিযাত্রীরা রস আইস শেলফের পূর্ব দিকে একটি বিশাল খাঁড়িতে পৌছান। খাঁড়িটি তিমি উপসাগর নামে পরিচিত ছিল। আমুনসেন এখানেই তাঁর বেস ক্যাম্প নির্বাচন করেন এবং জায়গাটির নামকরণ করেন "ফ্রামহেইম"। তিনি পূর্ববর্তী দক্ষিণ মেরু অভিযানে ব্যবহৃত ঊলেন কাপড়ের বদলে এস্কিমোদের মত চামড়ার পোশাক চালু করেন।

স্কী এবং কুকুর টানা স্লেজ ব্যবহার করে আমুনসেন এবং তাঁর সাথীরা দক্ষিণ মেরু বরাবর একটি সরলরেখায় ৮০°, ৮১° এবং ৮২° দক্ষিণ দ্রাঘিমাংশে তিনটি সাপ্লাই ডিপো স্থাপন করেন। পাশাপাশি তিনি ফেরার পথে কিছু কুকুর হত্যা করে তাদেরকে তাজা মাংসের উৎস হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। ১৯১১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করার একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯ অক্টোবর, ১৯১১ আমুনসেন পুনরায় যাত্রা করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ওলাফ যাল্যান্ড, হেলমার ইয়েন্সেন, ভের হ্যাসেল এবং অস্কার উইজটিং। তাঁদের সাথে ৪টি স্লেজ এবং ৫২টি কুকুর ছিল। ইতিপূর্বে অজ্ঞাত এক্সেল হাইবার্গ গ্লেসিয়ারের মধ্যবর্তী একটি পথ ব্যবহার করে চার দিন পর ২১ নভেম্বর তাঁরা পোলার উপদ্বীপে পৌছান। ১৯১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁদের পাঁচজনের দলটি ১৬টি কুকুর সাথে নিয়ে মেরুতে (৯0°00'দক্ষিণ) পৌছে। স্কটের দলের ৩৫ দিন পূর্বেই আমুনসেন ও তাঁর সাথীরা মেরুতে পৌছান। আমুনসেন দক্ষিণ মেরুতে তাঁদের ক্যাম্পের নাম দেন পোলহেইম, "হোম অফ দ্য পোল"। পাশাপাশি তিনি এন্টার্কটিক উপত্যকার নাম বদলে রাজা সপ্তম হাকান উপদ্বীপ রাখেন। যদি তাঁরা ঠিকমত ফ্রামহেইমে ফিরে যেতে না পারেন এই আশংকায় আমুনসেন ও তাঁর দল একটি তাঁবু ও তাঁদের কীর্তির উল্লেখ করে একটি চিঠি রেখে আসেন। ১৯১২ সালের ২৫ জানুয়ারি ১১টি কুকুর সহ দলটি ফ্রামহেইমে ফিরে যায়। ১৯১২ সালের ৭ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার হোবার্টে পৌছার পর আমুনসেনের সাফল্যের কথা সর্বসমক্ষে ঘোষণা করা হয়।

আমুনসেনের সাফল্যের পেছনে মূল কারণ ছিল তাঁর সাবধানী পূর্বপ্রস্তুতি, উন্নত সরঞ্জাম, যথোপযুক্ত পোশাক, কুকুর ও স্কী এর কার্যকর ব্যবহার এবং প্রাথমিক লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকা (তিনি পথে কোন প্রকারের জরীপকার্য চালাননি এবং বলা হয়ে থাকে যে তিনি মাত্র দুটি ছবি তুলেছিলেন)। স্কটের অভিযাত্রীদলের দুঃখজনক পরিণতির তুলনায় আমুনসেনের ভ্রমণ ছিল একেবারেই নিরুপদ্রব এনং বৈচিত্র্যহীন।

আমুনসেনের নিজের ভাষায়,

"আমার মনে হয় অভিযানের সাফল্যের পেছনে মুল কারণ ছিল এর পূর্বপ্রস্তুতি। প্রতিটি সম্ভাব্য প্রতিকূলতা আগে থেকেই চিন্তা করা হয়েছিল এবং সেটার মুখোমুখি হবার অথবা এড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সকল প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে সাফল্য সেই পায় যে সবকিছু সুষ্ঠুভাবে পরিকল্পনা করতে পারে - আমরা তখন তাকে বলি সৌভাগ্যবান। অপরদিকে যে ব্যক্তি সময়মত প্রস্তুতি নিতে অবহেলা করে তার ব্যর্থতা অনিবার্য - আর এটাকেই আমরা বলি দুর্ভাগ্য।" - রুয়াল আমুনসেন, দ্য সাউথ পোল থেকে

পরবর্তী জীবন[সম্পাদনা]

ক্যাপ্টেন রুয়াল আমুনসেন উত্তর মেরুর পথে বাড়ী ত্যাগ করছেন।

১৯১৮ সালে আমুনসেন মড নামে আরেকটি জাহাজ নিয়ে নতুন অভিযানে বের হন যা ১৯২৫ সালে শেষ হয়। মডের যাত্রাপথ ছিল নর্থওয়েস্ট প্যাসেজের মধ্য দিয়ে পশ্চিম থেকে পুর্ব দিকে (১৯১৮-১৯২০)। এ পথটি বর্তমানে নর্দার্ন রুট নামে পরিচিত। তিনি চেয়েছিলেন মডকে পোলার আইস ক্যাপে আটকে ফেলে বরফের সাথে ভেসে ধীরে ধীরে উত্তর মেরুর দিকে এগিয়ে যেতে, যেমনটি নেনসেন ফ্রামকে নিয়ে করেছিলেন। যদিও তাঁর এ চেষ্টা সফল হয়নি, কিন্তু এ অভিযানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বিশেষ করে হ্যারাল্ড ভেরড্রাপের কাজ ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

১৯২৫ সালে আমুনসেন এন-২৪ ও এন-২৫ নামের দুটি বিমান নিয়ে ৮৭° ৪৪' উত্তর অক্ষাংশের দিকে যাত্রা করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন লিংকন এলসওয়ার্থ, বৈমানিক যামার রিজার-লারসেন এবং আরো তিনজন অভিযাত্রী। এটি ছিল তখন পর্যন্ত বিমান নিয়ে পৌছানো সর্বাধিক উত্তর অক্ষাংশ। বিমান দুটি পরস্পর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবতরণ করে। যাত্রীদের মধ্যে কোন প্রকার বেতার-যোগাযোগ না থাকা সত্ত্বেও তাঁরা একত্রিত হতে সক্ষম হন। এন-২৪ বিমানটি অবতরণের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমুনসেন এবং তাঁর সঙ্গীরা তিন সপ্তাহ অক্লান্ত পরিশ্রম করে বরফ পরিষ্কার করে অপর বিমানটির উড্ডয়নের জন্য একটি রানওয়ে প্রস্তুত করেন। এসময় তাঁরা মোট ৬০০ টন বরফ পরিষ্কার করেন, যদিও তাঁদের দৈনিক খাদ্যের বরাদ্দ ছিল মাত্র এক পাউন্ড (৪০০ গ্রাম)। অবশেষে ছয় জন অভিযাত্রী ঠাসাঠাসি করে একমাত্র অক্ষত বিমান এন-২৫ এ ওঠেন এবং রিজার-লারসেন এক অবিস্মরণীয় প্রচেষ্টার পর ফাটল ধরা বরফের উপর কোনক্রমে বিমানটিকে উড্ডয়ন করাতে সক্ষম হন। যখন সবাই ধারণা করছিল যে অভিযাত্রীরা বরফের বুকে চিরকালের মত হারিয়ে গেছেন ঠিক তখনই তাঁরা বিজয়ীবেশে আবির্ভূত হন।

১৯২৬ সালে আমুনসেন, এলসওয়ার্থ, রিজার-লারসেন, উইজটিং এবং ইতালিয় উড়োজাহাজ প্রকৌশলী আম্বার্তো নোবিল প্রথমবারের মত আর্কটিক অতিক্রম করেন। তাঁরা নোবিলের ডিজাইনকৃত একটি এয়ারশিপ নোর্জ ব্যবহার করেন। ১৯২৬ সালের ১১ মে তাঁরা স্পীটসবার্জেন থেকে রওনা দেন এবং দুই দিন পর আলাস্কায় অবতরণ করেন। আমুনসেন ও তাঁর দলের এই অভিযানের পূর্বে আরও তিনজন উত্তর মেরুতে পৌছানোর দাবী করেছিলেন, প্রথমবার ফ্রেডেরিক কুক ১৯০৮ সালে, দ্বিতীয়বার রবার্ট পিয়েরী ১৯০৯ সালে এবং তৃতীয়বার রিচার্ড ই বেয়ার্ড ১৯২৬ সালে, আমুনসেনের অভিযানের মাত্র কয়েকদিন পূর্বে। কিন্তু এই তিনটি দাবীই ছিল বিতর্কিত; সেগুলোর স্বপক্ষে হয় শক্তিশালী প্রমাণ ছিল না, অথবা তাঁদের দাবী ছিল ভিত্তিহীন। এ কারণে আগের তিনটি অভিযানের সত্যতা নিয়ে সন্দিহান অনেকে আমুনসেন ও তাঁর সহ-অভিযাত্রীদেরকেই প্রথম সন্দেহাতীতভাবে উত্তরমেরুতে পৌছানো অভিযাত্রী বলে স্বীকৃতি দেন। যদি নোর্জ অভিযান সত্যিই উত্তর মেরুতে পৌছানো প্রথম অভিযান হয়ে থাকে তবে আমুনসেন এবং উইজটিং হবেন প্রথম দুই অভিযাত্রী যাঁরা দুই মেরুতেই পদার্পণ করেছিলেন।

নিরুদ্দেশ এবং মৃত্যু[সম্পাদনা]

আমুনসেনের স্মরণে গড়া ভাস্কর্য, নরওয়ে

১৯২৮ সালের ১৮ জুন আমুনসেন নরওয়েজিও বৈমানিক লেফ দিয়েত্রিখসন, ফরাসি বৈমানিক রেনে গুইলবো এবং আরও তিন ফরাসি অভিযাত্রীসহ বিমানযোগে এক উদ্ধার অভিযানে অংশগ্রহণ করে নিখোঁজ হন। তাঁরা নোবিলের নতুন এয়ারশীপ ইতালিয়া, যা উত্তর মেরু থেকে ফেরার পথে বিধ্বস্ত হয়েছিল আর তার নিখোঁজ আরোহীদের খুঁজছিলেন। পরবর্তীতে ট্রোমজো কোস্টের কাছে তাঁর ব্যবহৃত ফরাসি ল্যাথাম-৪৭ মডেলের ফ্লাইংবোটটির একটি পন্টুন পাওয়া যায়, যা লাইফবোটে রূপান্তর করা হয়েছিল। ধারণা করা হয় যে ব্যারেন্ট সাগরে কুয়াশার কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় এবং আমুনসেন সেই দুর্ঘটনায় সাথে সাথেই অথবা অল্প কিছু সময় পর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়নি অবশ্য। সেপ্টেম্বর মাসে নরওয়েজিয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর সন্ধানকার্যের সমাপ্তি ঘোষণা করে। ২০০৩ সালে একটি নতুন ধারণায় বলা হয় তাঁর বিমানতি নরওয়ের বেয়ার আইল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে ভূপাতিত হয়েছিল।

স্মৃতিচিহ্ন[সম্পাদনা]

আমুনসেনের নামে বেশ কিছু স্থানের নামকরণ করা হয়েছেঃ

  • আমুনসেন-স্কট সাউথ পোল স্টেশন, তাঁর প্রতিদ্বন্দীর সাথে যৌথভাবে
  • আমুনসেন সাগর, এন্টার্কটিকা উপকূলে
  • আমুনসেন গ্লেসিয়ার, এন্টার্কটিকায়
  • আমুনসেন উপসাগর, আর্কটিক মহাসাগরে, কানাডার নর্থওয়েস্ট টেরিটরির উপকূলে (মূল ভূখন্ড এবং ব্যাংকস আইল্যান্ড ও ভিক্টোরিয়া আইল্যান্ডের পশ্চিম অংশের মধ্যবর্তী স্থানে)
  • চাঁদের দক্ষিণমেরুতে একটি বৃহদাকার খাদের নামকরণ করা হয় আমুনসেন ক্রেটার

তাঁর নামে কিছু জাহাজেরও নামকরণ করা হয়ঃ

  • কানাডিয়ান কোস্টগার্ড তাদের একটি আইসব্রেকারের নাম রাখে সিজিসিএস আমুনসেন। আর্কটিক মহাসাগরে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানোর জন্য এই জাহাজটি ব্যবহৃত হয়।
  • নরওয়েজিয় নৌবাহিণী কিছু এজিস ফ্রিগেট তৈরি করছে, এদের দ্বিতীয়টির নামকরণ করা হয়েছে এইচএনওএমএস রুয়াল আমুনসেন। জাহাজটির নির্মাণকাজ ২০০৬ সালে শেষ হয়।
  • জার্মান ব্রিগ রুয়াল আমুনসেন।

তাঁর অন্যান্য সম্মাননার মধ্যে রয়েছেঃ

  • লেখক রুয়াল ডাল এর নামকরণ করা হয় আমুনসেনের নামানুসারে।
  • নোবেল বিজয়ী রসায়নবিদ ও কবি রুয়াল হফম্যানের নামকরণ করা হয় আমুনসেনের নামানুসারে।
  • আমুনসেন ট্রেইল, স্টেটেন আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক
  • আমুনসেন হাই স্কুল, শিকাগো, ইলিনয়

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

আমুনসেন এর কর্মকান্ড: