ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থা
স্থাপিত ১৯০৯[১]
ধরন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
পরিচালক অনুরাগ কুমার[২]
ছাত্র ৩৫০০
অস্নাতক ৪০০
স্নাতকোত্তর ৯০০
অবস্থান বেঙ্গালুরু, কর্ণাটক, ভারত
প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজী টাটা
ওয়েবসাইট www.iisc.ernet.in
ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থার লোগো

ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থা (আইআইএসসি) (ইংরেজি: Indian Institute of Science) দক্ষিণ ভারতের বেঙ্গালুরু শহরে প্রতিষ্ঠিত উচ্চতর শিক্ষা এবং গবেষণার জন্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯০৯ সালে জামশেদজী টাটার সক্রিয় সমর্থনে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে এটি "টাটা ইনস্টিটিউট" নামে পরিচিত ছিলো।[৩] আইআইএসসি কম্পিউটিং, মহাকাশ এবং পারমাণবিক প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে, যে কারণে এটি ব্যাপকভাবে ভারতের সেরা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণ্য হয়। এই শিক্ষাপীঠে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রী-শিক্ষা ও গবেষণা করা হয়। স্নাতক-শিক্ষা সম্প্রতি ২০১১ সালে শুরু হয়েছে। এই ঐতিহ্যশালী প্রতিষ্ঠানের সাথে সি ভি রামন, জি এন রামচন্দ্রণ, সতীশ ধাওয়ান এবং আরও অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানীর নাম জড়িয়ে আছে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

পরিচালক[৪]
জামশেদজী টাটা, প্রতিষ্ঠাতা

ঐতিহ্য[সম্পাদনা]

১৮৯৩ সালে জাপান থেকে শিকাগো সমুদ্রযাত্রার সময়ে পারসী বণিক জামশেদজী টাটার সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ-এর পরিচয় হয়। স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো শহরে ধর্ম মহাসভায় তাঁর অতি-পরিচিত বক্তৃতা দিতে যাচ্ছিলেন। স্বামীজীর স্বাদেশিকতা মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে টাটা ভারতবর্ষের মাটিতে একটি গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান শুরু করতে উদ্যোগী হন।

টাটা তাঁর ও স্বামীজীর স্বপ্ন সার্থক করতে একটি কমিটি তৈরি করেন যেটি ১৮৯৮ সালে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জনের কাছে একটি রিপোর্ট পেশ করে। নোবেল লরিয়েট বিজ্ঞানী স্যার উইলিয়াম র‍্যামসে ব্যাঙ্গালো্র শহরটি মনোনয়ন করেন এই প্রতিষ্ঠানটির জন্যে। মাইসোর মহারাজ স্যার চতুর্থ কৃষ্ণরাজা ওয়াদেয়ার এই প্রতিষ্ঠানটির জন্যে ৩৭১ একর জমি দান করেন। টাটাও অনেক আর্থিক সাহা্য্য করেন। কিন্তু জামশেদজী তাঁর স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠানটি না দেখেই ১৯০৪ সালে পরলোকগমন করেন। আজও টাটা পরিবার এই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক।

এই সংস্থানের সংবিধান ১৯০৯ সালের ২৭শে মে[৮] লর্ড মিন্টো অনুমোদন করেন এবং ১৯১১ সালের প্রথম ভাগে মাইসোর মহারাজ এই প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২৪শে জুলাই প্রথম ব্যাচের ছাত্রছাত্রী সাধারণ ও ফলিত রসায়ন এবং বৈদ্যুতিক-প্রযুক্তিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হয়। কিছুদিনের মধ্যেই জৈব-রসায়ন বিভাগ শুরু হয়। প্রথম পরিচালক ছিলেন মরিস ট্র্যাভার্স, যিনি স্যার উইলিয়াম র‍্যামসের সঙ্গে নিষ্ক্রিয় গ্যাস আবিষ্কারের গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। প্রথম ভারতীয় পরিচালক ছিলেন সি ভি রামন, যিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৫৬ সালে স্বাধীন ভারতের ইউনিভারসিটি গ্রাান্টস কমিশন এই প্রতিষ্ঠানটিকে এক গণ্য বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গ্রহণ করে।

বর্তমানে[সম্পাদনা]

[৯] ২০০৯ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১০০ বছরে পদার্পণ করেছে। বর্তমানে ৩৯ টি ডিপার্টমেন্টে ৫০০ এরও বেশি গবেষক এই প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত। এছাড়াও প্রায় ৩৫০০ ছাত্রছাত্রী বর্তমানে বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত। এর মধ্যে প্রায় ২০০০ গবেষণায় জড়িত, ৯০০ নানা বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত। ২০১১ সালে একটি অনন্য অস্নাতক শিক্ষাক্রম শুরু হয়েছে, যা ভারতবর্ষে প্রথম সার্থক ৪ বছরের অস্নাতক পাঠক্রম।[১০] গবেষণা-কেন্দ্রিক এই অস্নাতক বিভাগে বর্তমানে ৪০০ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে। আই আই এস সি-র বর্তমান পরিচালক অনুরাগ কুমার, যিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে পরিচালক মনোনীত হন এবং শপথগ্রহণ করেন ২০১৪ সালের অগাস্ট মাসে।

ক্যাম্পাস[সম্পাদনা]

ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থার ক্যাম্পাসটি শহরের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন থেকে ৪ কিমি এবং বেঙ্গালুরু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩৫ কিমি দূরে যশবন্তপুর এলাকায় অবস্থিত। এই প্রতিষ্ঠানটির আশেপাশে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, রামন রিসার্চ প্রতিষ্ঠান, সি পি আর আই, এন সি বি এস প্রভৃতি অনেক গুলি বিজ্ঞান-গবেষণায় জড়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যে কারণে বেঙ্গালুরু বিজ্ঞান গবেষণায় দেশের রাজধানী হিসেবে উঠে এসেছে। ৩৯টি ডিপার্টমেন্ট ৪০০ একরের এই বিদ্যায়তনে ছড়িয়ে আছে, যার মধ্যে কয়েকটি হল পদার্থ-বিজ্ঞান, জৈব-রসায়ন, আণবিক প্রাণ-পদার্থবিদ্যা, কম্পুটার সায়েন্স, গণিতবিদ্যা ইত্যাদি। সম্পূর্ণ আবাসিক এই প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের জন্যে ৯ টি, ছাত্রীদের জন্যে ৫ টি এবং গবেষক ও অশিক্ষক কর্মীদের জন্যে স্টাফ কোয়ার্টার আছে। শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের ক্রীড়া ও বিনোদনের জন্য আছে জিমখানা। এছাড়া ক্যাম্পাসের ভিতর আছে একটি সুইমিং পুল, ৫টি ক্যাফেতারিয়া ও দুটি সাধারণ বাজার। ক্যাম্পাস টি সবুজ গাছপালা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্য বিখ্যাত। এখানে প্রায় ১১০ প্রজাতির গাছ, রাসেল ভাইপার সহ ১২ প্রজাতির সাপ এবং বহু ধরনের প্রজাপতি, পাখি, জন্তু ইত্যাদি পাওয়া যায়।

মূল ভবন[সম্পাদনা]

IISc convo hall 2.jpg

বিদ্যায়তনটির কেন্দ্রীয় ভবনটি বেঙ্গালুরুর একটি প্রসিদ্ধ স্থাপত্য, যার সামনে জামশেদজী টাটার একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি আছে। এই ভবনটি ক্লাসিকাল স্টাইলে তৈরি এবং এটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এটির কেন্দ্রীয় প্রস্তরনির্মিত মিনার। এই ভবনেই রয়েছে ঐতিহাসিক ফ্যাকাল্টি হল এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অফিস গুলি।

গ্রন্থাগার[সম্পাদনা]

১৯১১ সালে প্রথম দুটি বিভাগের সঙ্গে গ্রন্থাগারটিও উদ্বোধন করা হয়। পরবর্তী কালে, ১৯৯৫ সালে এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জে আর ডি টাটা স্মারক গ্রন্থাগার। এখানে ভারতবর্ষের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান-বিষয়ক সংগ্রহ আছে।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

সংগঠন[সম্পাদনা]

বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে ৭টি প্রধান অনুষদ আছেঃ

  • জীব-বিজ্ঞান বিষয়ক: ৬ টি বিভাগ আছে এই অনুষদের মধ্যে - সবগুলোই জীববিজ্ঞানের নিত্যনতুন মৌলিক তত্ব ও ফলিত প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা বিষয়ক।
  • রসায়ন বিজ্ঞান বিষয়ক: ৫টি রসায়ন সম্বন্ধীয় বিভাগ এই অনুষদের অন্তর্ভুক্ত।
  • বৈদ্যুতিক বিজ্ঞান সম্বন্ধীয়: ৪টি বিভাগ - প্রধানত ইলেক্ট্রনিক ও ইলেকট্রিকাল প্রকৌশল ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ে এখানে গবেষণা হয়।
  • আন্ত-বিভাগীয় গবেষণা সম্বন্ধীয়: নানা আন্ত-বিভাগীয় বিষয়ে এই অনুষদের অন্তর্ভুক্ত ৭টি বিভাগে গবেষণা করা হয়। এই অনুষদে ২টি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হল - সুপারকম্পিউটার শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র এবং ন্যানো-বিজ্ঞান ও প্রকৌশল কেন্দ্র। নব বিজ্ঞানের তীরবর্তী অঞ্ছল গুলিতে গবেষণার জন্য এই অনুষদটি প্রসিদ্ধ।
  • পদার্থ ও গাণিতিক বিজ্ঞান বিষয়ক: এই অনুষদের ৬টি বিভাগে পদার্থ ও গণিতবিদ্যায় মৌলিক গবেষণা হয়ে থাকে।
  • বলবিজ্ঞান সম্বন্ধীয়: এই অনুষদের ১১টি কেন্দ্রে ফলিত বলবিজ্ঞানের ও প্রকৌশলে নিত্যনতুন গবেষণা হয়ে থাকে।

এগুলি ছাড়াও ৪টি কেন্দ্র সরাসরি পরিচালকের তত্বাবধানে রয়েছে।

অস্নাতক[১১][সম্পাদনা]

২০১১ সালে অস্নাতক বিভাগটি শুরু করা হয়- দেশে অস্নাতক শিক্ষার আঙ্গিনায় এটি একটি অনন্য পাঠক্রম। ৪/৫ বছরের এই পাঠক্রমে ছাত্রছাত্রীদেরকে নিত্যনতুন গবেষণার স্বাদ দেওয়া হয়ে থাকে।

স্নাতকোত্তর[সম্পাদনা]

দুই মূল ধরনের ডিগ্রী - গবেষণা কেন্দ্রিক অথবা পাঠক্রম নির্ভর - আই আই এস সি-তে দেওয়া হয়ে থাকে। গেট পরীক্ষার খুবই কমসংখ্যক উচ্চমানের ছাত্রছাত্রীদের গ্রহণ করা হয়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি[১২][সম্পাদনা]

২০১১, ২০১২, ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা এ আর ডাবলু ইউ এর র‍্যাঙ্কিং-এ আই আই এস সি একমাত্র ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেটি প্রথম ৫০০র ভিতরে। ৩০১-৪০০ বিভাগে থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিদ্যায় ৪৩তম ও কম্পিউটার সায়েন্সে ৫১-৭৫ সারিতে রয়েছে। টাইম পত্রিকার রাঙ্কিং-এ বিশ্বে আই আই এস সি ৯১-১০০এর সারিতে - সবচেয়ে উঁচুতে থাকা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

ছাত্র উদ্যোগ[সম্পাদনা]

প্রবেগ[১৩][সম্পাদনা]

প্রবেগ আই আই এস সির নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক ফেস্টিভ্যাল যেটি ২০১৪ সালে অস্নাতক ছাত্রছাত্রীরা শুরু করে। ২০১৫ সালে তিরিশে জানুয়ারী থেকে দোসরা ফেব্রুয়ারী এই ফেস্টিভ্যাল পালিত হবে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসে এই ফেস্টিভ্যালে যোগদান করতে।

সমন্বয়[১৪][সম্পাদনা]

ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থার ছাত্র সংসদের পরিচালনায় সমন্বয় বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের মেলবন্ধনের উদ্দ্যেশ্যে একটি প্রচেষ্টা। নানা কোম্পানি থেকে প্রতিনিধি ও বিজ্ঞান জগতের অনেক বিশিষ্ট ব্যাক্তি এই মেলায় যোগদান করেন। ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কাজে সাহাজ্য করাটাই এর মূল উদ্দ্যেশ্য।

এছাড়াও সাংস্কৃতিক নানা বিষয়ে এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা ভীষণ উদ্যোগী - গানবাজনা ও নাট্যাদির জন্যে রিদমিকা ও রঙ্গমঞ্চ, চিত্রকলা চর্চার জন্যে ফটোগ্রাফি ক্লাব, দুস্থ ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাদানের জন্যে নোটবুক ড্রাইভ ইত্যাদি অত্যন্ত সফল সঙ্ঘসমূহ। আরও আছে ক্রীড়া চর্চার জন্যে স্পোর্টস ক্লাব, সমকামীদের স্বার্থরক্ষার খাতিরে QueerIISc ইত্যাদি। এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা কোয়ার্কস, ভয়েসেস ইত্যাদি ম্যাগাজিনও প্রকাশ করে।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি[সম্পাদনা]

উল্লেখযোগ্য প্রাক্তন ছাত্র[সম্পাদনা]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

স্থানাঙ্ক: ১৩°০১′১১″ উত্তর ৭৭°৩৩′৫৮″ পূর্ব / ১৩.০১৯৭৮° উত্তর ৭৭.৫৬৬০৫° পূর্ব / 13.01978; 77.56605