নোয়াপাড়া-ঈষাণচন্দ্রনগর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

নোয়াপাড়া-ঈষাণচন্দ্রনগর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত অন্যতম বৃহৎ অনাবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ধ্বংসাবশেষের বেশির ভাগ অংশ বাংলাবৌদ্ধ আমলের। অনেক পণ্ডিতরা মনে করেন যে, এই নিদর্শনগুলো হারিয়ে যাওয়া নগরী কর্মান্ত ভাসাকার, যা ৭ম শতকের সমতটের রাজধানী খাদগা

অবস্থান ও সীমানা[সম্পাদনা]

স্থানটি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই ধারে আরো ৯ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। মহাসড়কের পশ্চিমে নোয়াপাড়া গ্রাম যার প্রত্নত্ত্বাত্বিক আয়তন ছোট বলে মনে করা হয়। সড়কের পূর্ব দিকের এলাকা দক্ষিণ থেকে উত্তরে তিনটি গ্রাম ঈষাণচন্দ্রনগর, রাজেন্দ্রপুর এবং রাঙামাটিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। নির্দর্শনগুলো আরো উত্তরে সুলাকিয়া গ্রামেও পাওয়া গেছে। পূর্বদিকের নিদর্শনস্থান থেকে সামান্য দুরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা আছে। উচ্চ ভূমি ও লাল মাটির এই গ্রামগুলোতে প্রাচীন ধ্বংশাবশেষ আছে। নিদর্শনগুলোর অধিকাংশ হারিয়ে গেলেও অনেকগুলো এখনো অবশিষ্ট আছে এবং স্থানটির প্রাচীন বৈশিষ্ট এখনও অনাবিষ্কৃত হয়ে আছে।

বর্তমান সময়ের যে তিনটি গ্রাম যেগুলো ধ্বংশাবশেষের স্থানসমূহ অধিকার করে আছে তার মধ্যে বৃহত্তম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল দক্ষিণের ঈষাণচন্দ্রনগর। দুটি প্রাচীন পানির কুয়া আছে, যার মধ্যে বড়টি পশ্চিম দিকের নোয়াপাড়ামুখী এবং ছোটটি পূর্বদিকে ত্রিপুরা পর্বতের দিকে অবস্থিত। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীন বসতিটি গঠনমূলক ও নিরাপদ ছিল। স্থানটিতে একটি প্রাসাদ ও প্রাচীন মহানগরীর একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র আছে বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়। গ্রামের সর্বত্র বিপুল পরিমাণ প্রাচীন ইট এবং ভাঙা অংশ পাওয়া গেলেও কোন চমকপ্রদ সাংস্কৃতিক দ্রব্য পাওয়া যায় না।

বৌদ্ধ অবশেষ[সম্পাদনা]

নোয়াপাড়া বৌদ্ধ স্তুপের জন্য পরিচিত। একে বৌদ্ধ ধর্মীয় কার্যাবলীর কেন্দ্র হিসেবে ধারণা করা হয়। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের জন্য ১০ একরের একটি এলাকা পৃথক করে গড়ে তোলা হয়েছিল। অতি সাম্প্রতিককালে স্থানটির পশ্চিমের কিছু অংশ ভরাট করে রাস্তা চওড়া করা হয়েছে, তবে এজন্য একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন- ৩৫ ফুট উঁচু এবং ৩০০ বছরের পুরনো একটি হিন্দু মঠ ভেঙে ফেলা হয়েছে। স্তুপ এলাকাটি বর্ধন বা বর্ধন রাজার মুরা বা ভাজান মুরা নামে পরিচিত। এটি ভবচন্দ্রএর নামের সাথে জড়িত, যিনি কুমিল্লা এলাকার একজন জনপ্রিয় ও প্রবাদপ্রতিম রাজা ছিলেন।

নোয়াপাড়ার দুটি বৃহৎ বৌদ্ধ স্তুপ ধ্বংশের সম্মুখীন, জায়গাগুলোতে সবজি চাষ করা হয় এবং আগাছা দিয়ে ছেয়ে গেছে। স্তুপগুলোর উচ্চতা ২৫ ফুট। ১৯৮৮ সালে প্রত্মতাত্ত্বিকেরা দেয়াল থেকে অনেকে পোড়ামাটির নিদর্শন আবিষ্কার করেছেন,। , যেগুলোর সাথে শালবন বিহার এর নমুনাগুলোর মিল আছে। এই পুরাকীর্তিটিও নব্বইয়ের দশকে ধ্বংশ হয়ে গেছে। নোয়াপাড়ার অপর স্তুপটির আকার আরও ছোট এবং আরো বেশি ধ্বংশপ্রাপ্ত। এর নিকটেই বর্তমান কালের একটি কবরস্থান আছে যা এই নিদর্শনটি থেকে ৫০০ ফুট উত্তরে অবস্থিত। ১৯৭৬ সালে এটি ১২ ফুট উচু ছিল। পরবর্তীতে এটিকে সম্পুর্ণভাবে ধ্বংশ করা হয়, খুব সম্ভবত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির জন্য যা এখন উক্ত এলাকাটিতে অবস্থিত।

দোল সমুদ্র এবং রাঙামাটিয়া[সম্পাদনা]

নোয়াপাড়ার পশ্চিম দিকে একটি বিস্তৃত জলাবদ্ধ এলাকা আছে যা "দোল সমুদ্র" নামে জনপ্রিয়। এটি চৌদ্দগ্রাম ও লাকসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা এটি প্রাচীনকালে একটি বড় নদী ছিল, যা প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রাজ্যের সীমানা হিসেবে কাজ করত। অল্পকিছুদিন আগেও দুই গ্রামের মাঝ দিয়ে ফেরি চলাচল করত। বন্দরটির নাম ছিল রাজঘাট, এটি একটি বৃহৎ নির্মাণ সামগ্রীর ঘাটের কথা বলে যা প্রাচীনকালে এখানে ছিল। স্থানীয় সংস্কৃতিতেও একটি রাজবাড়ী (প্রাসাদ) এবং একটি রাজধানীর কথা উল্লেখ আছে।

সর্বউত্তরের গ্রাম রাঙামাটিয়াকে তিনবার কৈলাস চন্দ্র সেন প্রাচীন রাজ্য রাজামালা (ত্রিপুরার ইতিহাস) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নির্দিষ্ট স্থানের কথা উল্লেখ না থাকলেও ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ করে এটি কমলাঙ্কা বা পতিকারা রাজ্যের পূর্বে অবস্থিত। রাঙামাটিয়া প্রাচীন রাজ্যটির কেন্দ্র হতে পারে। রাঙামাটিয়াকে কেউ রোহিতাগিরির অন্তর্ভূক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। এটি প্রথম দিকের একটি রাজ্য এবং চন্দ্রদের আবাসস্থল ছিল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]