সুনীতি সলোমন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
সুনীতি সলোমন

সুনীতি সলোমন (১৯৩৮ বা ১৯৩৯– ২৮ জুলাই, ২০১৫)  একজন ভারতীয় চিকিত্সক  এবং অণুজীব বিজ্ঞানী ছিলেন যিনি  এইডস গবেষণার  এবং ১৯৮৫ সালে ভারতের  চেন্নাইতে প্রথম ভারতীয়র এইডস ধরা পড়ার ঘটনার পর এইডস  প্রতিরোধের পথিকৃৎ।[১] তিনি চেন্নাইতে  ওয়াই আর গেসনেড  সেন্টার ফর এইডস গবেষণা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। ভারত সরকার তাকে জাতীয় নারী বায়ো-বিজ্ঞানী পুরস্কারে সম্মানিত করেন।[২][৩][৪][৫]

প্রাথমিক জীবন এবং শিক্ষা[সম্পাদনা]

সুনীতি সলোমন বা সুনীতি গেসনেড (তার বিবাহের পূর্বের নাম) চেন্নাইয়ের পেশায় চামড়া ব্যবসায়ী, একটি মারাঠী হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পরিবারের আট সন্তানের মধ্যে সপ্তম জন এবং একমাত্র কন্যা  ছিলেন।[৬][৭][৮] ২০০৯ সালের একটি  সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি  স্বাস্থ্য কর্মীদের টিকা দেবার জন্য বাত্সরিক ভিত্তিতে রোগীদের  বাড়ি যাওয়ার  ব্যাপারটি থেকে তিনি ওষুধের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।  [৬]

তিনি  মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে মেডিসিন নিয়ে পড়াশুনা করেন এবং তারপর যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রঅস্ট্রেলিয়ায় প্যাথোলজিতে প্রশিক্ষিত হন যতক্ষন না  ১৯৭৩ সালে, তিনি এবং তার স্বামী ভিক্টর সলোমন চেন্নাইতে ফিরে আসেন। সুনীতি মনে করেছিলেন ভারতে তার সেবার বেশি প্রয়োজন। তিনি  মাইক্রোবায়োলজিতে ডক্টরেট করেন[৭] এবং মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজের, ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোবায়োলজিতে যোগদান করেন। [৯]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

সলোমন তার কর্মজীবনের শুরুতে বিদেশে, লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতালে একজন জুনিয়র চিকিত্সক হিসেবে কাজ করেন।[৯]  ভারতে ফেরার পর, সলোমন, মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে  অণুজীব বিজ্ঞানী হিসাবে কাজ করেন এবং পদোন্নতি হয়ে অধ্যাপক হন। [২]  তিনি ১৯৮১ সালে এইচআইভি আবিষ্কারের এবং এইডসের ক্লিনিকাল বিষয়ক লেখাগুলি পড়তে থাকেন এবং ১৯৮৬ সালে ১০০ জন মহিলা যৌনকর্মীকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত  নেন,  যেহেতু ভারতে কোন প্রকাশ্য সমকামী সম্প্রদায় ছিল না।  একশজনের  রক্তের নমুনার মধ্যে  ছয়টি নমুনা এইচআইভি পজিটিভ পাওয়া গেল।  সলোমন পরে বাল্টিমোরের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে নমুনা পুনরায় পরীক্ষার জন্য পাঠান,যা ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত করে।[৯] ভারতে এই আবিষ্কারটি এইচআইভির প্রথম ডকুমেন্টেশন।[৭][১০] তারপর থেকে, সলোমন তার জীবন ও কর্মক্ষেত্র, এইচআইভি/এইডস গবেষণা, চিকিত্সা এবং সচেতনতা প্রসারে সমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বর্ণনা করেছেন কিভাবে মানুষ এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তিদের পরিত্যাগ করেছেন; এমনকি তাঁঁর স্বামীও চান নি, যে তিনি এইচআইভি পজিটিভ রোগীদের সঙ্গে কাজ করুন যাদের অধিকাংশই  ছিলেন সমকামী যাঁঁরা নিজেরা ইনজেকশনের মাধ্যমে ড্রাগ নিতেন ও যৌন কর্মী ছিলেন। সলোমন উত্তর করেন , "আপনি তাঁঁদের সঙ্গে কথা বললে,  এই এক কথা বলবেন না।"[৬] সলোমন ছিলেন প্রথম মানুষ যিনি   এইচআইভি ও তার পাশাপাশি অপযশের কথা প্রকাশ্যে আলোচনা করেন,  তিনি একবার বলেন, " অপযশ এবং বৈষম্য এইডস আক্রান্ত মানুষগুলিকে বেশি হত্যা করছে।" [২]

১৯৮৮ থেকে ১৯৯৩, সলোমন  মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে ভারতের প্রথম এইডস সহায়ক দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং  বিভিন্ন এইডস গবেষণা এবং সামাজিক সেবা চালু করেন।  ভারতে কোনো প্রাইভেট এবং পাবলিক সেক্টরের দ্বারা এইচআইভি/এইডস সুবিধা প্রদানের আগে, এই দলটি ছিল প্রথম। [১০] ১৯৯৩ সালে সলোমন তার বাবার নামে  'ওয়াই আর জি সেন্টার ফর এইডস রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন' (ওয়াই আর জি কেয়ার) প্রতিষ্ঠা করেন। [৯] এটি ছিল ভারতের   স্বেচ্ছামূলক এইচআইভি কাউন্সেলিং এবং টেস্টিংএর অন্যতম প্রথম স্থান। ২০১৫ সাল অনুযায়ী, সেখানে দৈনিক ১০০ জন রোগী বহির্বিভাগে দেখা হয়েছে  এবং ১৫০০০ রোগীদের  নিয়মিত ভাবে ফলো-আপ করা হয়েছে। তার  কেন্দ্রটি এবং তার কাজ কে  " এইচআইভি মহামারীকে মন্থর করার উল্লেখযোগ্য কারণ হিসাবে বর্ণনা করা হয়"। তিনি   অন্য ডাক্তার ও ছাত্রদেরও  এইচআইভি এবং তার চিকিত্সা সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করেন।[৭] সলোমন চেন্নাইয়ের এইডসের ডাক্তার হিসাবে পরিচিত ছিলেন। [৯] তিনি ভারতের এইডস সোসাইটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। [৩]

সলোমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথে, একটি বহুদেশীয় এইচআইভি / এসটিডি প্রতিরোধ পরীক্ষা, মার্কিন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস দ্বারা পরিচালিত এইচআইভি দমন পরীক্ষার নেটওয়ার্ক,  দক্ষিণ ভারতে স্বাস্থ্যপরিষেবা স্থাপনায়, এইচআইভির দূর্নাম বিষয়ক  NIH এর একটি সমীক্ষা এবং  ৬% সি এস জেল(CONRAD সংস্থার একটি মাইক্রোবিসাইড) বিষয়ে তৃতীয়  দফার অধ্যয়ন সহ আন্তর্জাতিক গবেষণায় সহযোগিতা করেন।  [৩]

ব্যক্তিগত জীবন[সম্পাদনা]

সলোমন মাদ্রাস কলেজে মেডিসিন নিয়ে পড়বার সময় তার স্বামী ভিক্টর সলোমন যিনি একজন হৃদরোগের শল্যচিকিত্সক, তার সংগে দেখা হয়। তিনি স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  এবং অস্ট্রেলিয়ায় যান। ভিক্টর সলোমন  ২০০৬ সালে মারা যান। তাদের পুত্র সুনীল সলোমন বাল্টিমোরে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মহামারী বিশেষজ্ঞ। সলোমন  জুলাই ২৮, ২০১৫ তে ৭৬ বছর বয়সে চেন্নাইতে তাঁঁর বাড়ীতে মারা যান, মৃত্যুর দুমাস আগে তাঁঁর অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। [৭]

পুরস্কার[সম্পাদনা]

সলোমন  নিম্নলিখিত পুরস্কারগুলি পেয়েছেন:[৪]

  • ২০০১ সালে রাজ্য সরকার  পরিচালিত মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা এইচআইভি/এইডসে অগ্রগামী কাজের জন্য প্রথম লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার পান।
  • ২০০৫ সালে তাঁঁর এইচআইভি  বিষয়ে অবদানের জন্য তামিল নাড়ু রাজ্য এইডস কন্ট্রোল সোসাইটি  দ্বারা দ্বিতীয় লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার  পান। 
  • ২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা DMS (Honoris Cusa) পান।
  • ২০০৯সালে ভারতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের  'জাতীয় নারী বায়ো-সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড' পান।
  • ২০১০ সালে ফেলোশিপ অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস পান।[১১]
  • ২০১২ সালে রাজ্য সরকার পরিচালিত ডক্টর এমজিআর মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চেন্নাই দ্বারা  'লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ফর সারভিস অন এইচআইভি/এইডস' পুরস্কার পান।
  • এবং বিভিন্ন অন্যান্য পুরস্কার যথা, শিক্ষা ও মানবিক সেবার জন্য  'মাদার তেরেসা মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড'

কাজ[সম্পাদনা]

  • Solomon, Suniti; Subramadam, S; Madanagopolan, M (১৯৭৬)। "In vitro sensitivity of enteric bacteria to epicillin, chloramphenicol, ampicillin and furazolidone"। Current Medical Research and Opinion4 (3): 229–232। doi:10.1185/03007997609109309 
  • Solomon, S; Kumarasamy, N; Jayaker Paul, S A; Venilla, R; Amairaj, R E (১৯৯৫)। "Spectrum of opportunistic infections among AIDS patients in Tamil Nadu, India"। International journal of STD & AIDS6 (6): 447। 
  • Kumarasamy, N; Solomon, S; Jayaker Paul, S A; Edwin, R; Sridhar, S (১৯৯৫)। "Neurological manifestations in aids patients in South India"। Journal of Neuroimmunology63 (1): 100। doi:10.1016/0165-5728(96)80989-1 
  • Solomon, S; Madhaven, H; Biswas, J; Kumarasamy, N (১৯৯৭)। "Blepharitis and lid ulcer as initial ocular manifestation in acquired immunodeficiency syndome patients"। Indian Journal of Ophthalmology45 (4): 233-234। 
  • Solomon, S; Kumarasamy, N; Ganesh, A K; Amairaj, R (১৯৯৮)। "Prevalence and risk factors of HIV-1 and HIV-2 infection in urban and rural areas in Tamil Nadu, India"। International Journal of STD & AIDS9 (2): 98-103। doi:10.1258/0956462981921756 

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]