সাইয়িদা আল-হুররা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সাইয়িদা আল-হুররা (আরবি: السيدة الحرة‎‎) (English : Sayyida al Hurra । মূল নাম লাল্লা আয়েশা বিনতে আলি ইবনে রশিদ আল-আলমি। তার বাবার নাম আলি ইবনে রশিদ এবং মায়ের নাম লাল্লা (লেডি) জোহরা ফার্নান্দেজ। তার  উপাধি: তিতওয়ানের রাণি।জন্ম ১৪৮৫ থেকে ১৪৯০ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক সময়, মৃত্যু: ১৪ জুলাই ১৫৬১ খ্রিষ্টাব্দ।  তিনি ১৫১৫ থেকে ১৫৪২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মরক্কোর উত্তর উপকূলবর্তী শহর তিতওয়ানের রাণি ছিলেন। একই সময়ে তিনি নারী জলদস্যু হিসেবেও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ছিলেন সমধিক পরিচিত। সাইয়িদা আল-হুররাকে পশ্চিম আফ্রিকা অঞ্চলে আধুনিক ইসলামি যুগের সবচে গুরুত্বপূর্ণ নারীচরিত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়।

সাইয়িদা আল-হুররা বিখ্যাত তুর্কি নৌসেনাধ্যক্ষ আলজিয়ার্সের বারবারোসা ভাইদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ভূমধ্যসাগরে দস্যুবৃত্তিতে পারঙ্গমতা অর্জন করেন। তিনি পশ্চিম ভূমধ্যসাগর এবং বারবারোসা ভাইয়েরা ভূমধ্যসাগরের পূর্ব প্রান্ত কব্জা করে রাখেন। ১৫১৫ সালে তার স্বামীর মৃত্যুর পর ‘আল হুররা’ উপাধি ধারণ করে তিতওয়ানের শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। ইসলামি ইতিহাসে তার পর আর কোনো নারী আল হুররা উপাধি গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে তিনি মরক্কোর সুলতান আহমাদ আল-ওয়াত্তাসির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে মরক্কোর রীতি অনুযায়ী বরের বাড়িতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার বদলে বিয়ের সকল অনুষ্ঠান আল-হুররার বাড়ি তিতওয়ানে আয়োজন করা হয়। এবং মরক্কোর ইতিহাসে প্রথম কোনো সুলতান রাজধানী ফেজ থেকে কনের বাড়িতে এসে বিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।

উপাধি ‘সাইয়িদা আল-হুররা’ অর্থ : সার্বভৌম স্বাধীন রাণি। এমন রাণি যে কারো সামনে মাথানত করে না।

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

সাইয়িদা আল-হুররা ১৪৮৫ (হিজরি ৮৯০) সাল বা তার কিছু সময় পর মুসলিম শাসনাধীন স্পেনের তৎকালীন রাজধানী গ্রানাডায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষগণ প্রথমে আরব থেকে মরক্কো এসে সেখানে ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে মরক্কো থেকে স্পেনের গ্রানাডায় বসতি গড়ে তোলেন। তার পরিবার গ্রানাডার প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে পরিগণিত হতো। ১৪৯২ সালে স্পেনের রাজ্য অ্যারাগনের রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও ক্যাস্টিলের রাণি ইসাবেলার হাতে গ্রানাডার পতন ঘটলে তিনি অল্প বয়সে তার পরিবারের সাথে মরক্কো চলে আসেন। মরক্কোর উত্তর উপকূলবর্তী শহর শেফশাউনে তার পরিবার নতুন করে বসতি স্থাপন করে। সেখানেই তিনি বেড়ে ওঠেন।

গ্রানাডা থেকে শরণার্থী হিসেবে শেফশাউনে এলেও, সাইয়িদার বাল্যকাল নিরাপদেই কাটে। তার বাবা আলি ইবনে রশিদ তার ও তার ভাই ইবরাহিমের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য মুহাম্মদ আল-গাজওয়ানি নামের একজন আলেমকে নিযুক্ত করেন। 
সাইয়িদার বয়স যখন ১৬ বছর তখন তার বিয়ে হয় স্থানীয় তিতওয়ান প্রদেশের প্রশাসক আবুল হাসান আল-মান্দারির সঙ্গে। আল-মান্দারি তার চেয়ে বয়সে ৩০ বছরের বড় হলেও তিনি ছিলেন তার বাবার বন্ধু। তবে আল-মান্দারি সাইয়িদাকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। সাইয়িদার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কারণে বিয়ের কিছুদিন পর তিনি তাকে তিতওয়ানের প্রধান রাণি ঘোষণা করেন।  কোনো কোনো সূত্র জানায়, আবুল হাসান আল-মান্দারি নয়, সাইয়িদার বিয়ে হয়েছিল আল-মান্দারির ছেলের সঙ্গে। যদিও এ ব্যাপারে তেমন কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায় না। 

তিতওয়ানের প্রশাসক[সম্পাদনা]

সাইয়িদা আল-হুররা স্বামী আল-মান্দারির পাশে থেকে রাজ্য পরিচালনা এবং ব্যবসা পরিচালনার অনেক কিছু শিখেন। তাই ১৫১৫ সালে তার স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি উত্তর মরক্কোর তিতওয়ানের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ সময় তার বয়স ছিল ৩০ বা তার চেয়ে কিছু বেশি। স্প্যানিশ এবং পর্তুগিজ সূত্র থেকে সাইয়িদা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘এবার কূটনৈতিক লড়াই শুরু হবে।’

সাইয়িদা যখন প্রায় প্রৌঢ় তখন উত্তর মরক্কোর সুলতান আহমেদ আল-ওয়াত্তিসি তাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। সাইয়িদা বিয়ের প্রস্তাব কবুল করেন। তবে তিনি শর্ত প্রদান করেন, সুলতানকে স্বয়ং বিয়ের বরযাত্রী নিয়ে তিতওয়ানে আসতে হবে। তিনি বিয়ে উপলক্ষে উত্তর মরক্কোর রাজধানী ফেজ-এ যাবেন না। সুলতান তার এ শর্ত মেনে নিয়ে তাকে বিয়ে করার জন্য তিতওয়ানে চলে আসেন। এটা ছিল মরক্কোর রাজকীয় ইতিহাসের প্রথম বিয়ে, যেখানে বর বিয়ের জন্য কনের বাড়ি গমন করে।

সাইয়িদা আল-হুররা তিতওয়ানের রাণি হলেও তিনি কোনোদিন গ্রানাডায় ফেলে আসা তার অতীতকে ভুলতে পারেননি। গ্রানাডা থেকে তাদের বিতাড়নের ইতিহাস বার বার তাকে আহত করতো। এ কারণে, রাণি হিসেবে অধিষ্ঠিত হবার পর তিনি ভূমধ্যসাগরে চলাচলরত স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ বাণিজ্যিক জাহাজ লুট করার সিদ্ধান্ত নেন। ‘খ্রিষ্টান দুশমনদের’ শাস্তি দিতে তিনি তৎকালীন দুর্ধর্ষ নৌযোদ্ধা ও জলদস্যু বলে খ্যাত আলজিয়ার্সেবারবারোসা ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।  তিনি তার তিতওয়ানে বসবাসরত গ্রানাডার পুরোনো নাবিক ও নতুন যোদ্ধা সহযোগে তার নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। জলদস্যু হিসেবে তার ভূমধ্যসাগরে পদার্পণের কারণ ছিল দুটো। ১. শত্রুজাহাজ ধ্বংস করে তাদের দামি মালামাল লুট করা। অসংখ্য শত্রুজাহাজে লুট করে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি তিতওয়ানকে সমৃদ্ধ নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ২. এবং আবার আন্দালুসে (স্পেন) ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা। অনেকদিন ধরে তিনি ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম প্রান্তে তার নৌ-আধিপত্য ধরে রাখেন। ফলে, স্প্যানিশ ও পর্তুগিজদের যথেষ্ট সম্মান আদায় করতে সক্ষম হন। Forgotten Queens of Islam গ্রন্থে ফাতিমা মেরনিসি উল্লেখ করেছেন, ১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দের এক স্প্যানিশ ঐতিহাসিক দলিলে উল্লেখ আছে- ‘জিব্রাল্টার প্রণালির কাছাকাছি স্প্যানিয়ার্ড এবং সাইয়িদা আল-হুররার মাঝে নৌযুদ্ধের পর সাইয়িদা অনেক মূল্যবান সম্পদ লুট করে নিয়ে যান এবং অনেক মানুষকে বন্দী করেন।’

অনেক ইতিহাসবিদ বিশ্বাস করেন, সাইয়িদা আল-হুররা মূলত একজন নারীশাসকই ছিলেন। যেমনটা স্পেন ও পর্তুগালের ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায়। ক্যাস্টিলের রাণি ইসাবেলা যেমন ছিলেন। তবে অধিকাংশের মত হলো, তিনি তিতওয়ানের সফল রাণি হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের একজন সফল জলদস্যু। সাইয়িদার জীবন ছিল অভিযান আর উত্তেজনায় ভরপুর। একই সঙ্গে তিনি কূনৈতিকভাবেও ছিলেন দারুণ সফল। তিনি তার ভাই ইবরাহিমকে ফেজ-এর সুলতানের দরবারে মন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। ফলে, মরক্কোতে রশিদ পরিবারের সম্মান আরও বর্ধিত হয়। তার কূটনৈতিক ও নৌ অভিযানের ফলে দ্বিধাবিভক্ত মরক্কো স্পেন ও পর্তুগালের বিপক্ষে শক্তিশালী নৌশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।[১].

শেষ জীবন[সম্পাদনা]

মরক্কোর সুলতান আহমেদ আল-ওয়াত্তিসিকে তিনি বিয়ে করেন ১৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে। ১৫৪২ খ্রিষ্টাব্দে তারই এক জামাতা তাকে তিতওয়ানের রাণির আসন থেকে ক্ষমতাচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। তার পৈতৃক আবাস শেফশাউনে তিনি তার জীবনের বাকি দিনগুলো নির্বাসনে কাটান। দীর্ঘ ২০ বছর নির্বাসিত থাকার ১৫৬১ সালে তিনি মারা যান।

সূত্র[সম্পাদনা]

  1. Verde, Tom; Solans Verde, Leonor (জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। "Malika VI: Sayyida Al-Hurra"AramcoWorld। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুলাই ২০১৮ CS1 maint: Date format (link) Verde, Tom; Solans Verde, Leonor (জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। "Malika VI: Sayyida Al-Hurra"AramcoWorld। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুলাই ২০১৮ 

উদ্ধৃতি ত্রুটি: <references>-এ সংজ্ঞায়িত "Yemen Times" নামসহ <ref> ট্যাগ পূর্ববর্তী লেখায় ব্যবহৃত হয়নি।
উদ্ধৃতি ত্রুটি: <references>-এ সংজ্ঞায়িত "AramcoWorld" নামসহ <ref> ট্যাগ পূর্ববর্তী লেখায় ব্যবহৃত হয়নি।
উদ্ধৃতি ত্রুটি: <references>-এ সংজ্ঞায়িত "The Daring Daughters" নামসহ <ref> ট্যাগ পূর্ববর্তী লেখায় ব্যবহৃত হয়নি।
উদ্ধৃতি ত্রুটি: <references>-এ সংজ্ঞায়িত "Mernissi18" নামসহ <ref> ট্যাগ পূর্ববর্তী লেখায় ব্যবহৃত হয়নি।
উদ্ধৃতি ত্রুটি: <references>-এ সংজ্ঞায়িত "Mernissi193" নামসহ <ref> ট্যাগ পূর্ববর্তী লেখায় ব্যবহৃত হয়নি।
উদ্ধৃতি ত্রুটি: <references>-এ সংজ্ঞায়িত "Mernissi115" নামসহ <ref> ট্যাগ পূর্ববর্তী লেখায় ব্যবহৃত হয়নি।
উদ্ধৃতি ত্রুটি: <references>-এ সংজ্ঞায়িত "SAYYIDA AL-HURRA" নামসহ <ref> ট্যাগ পূর্ববর্তী লেখায় ব্যবহৃত হয়নি।
উদ্ধৃতি ত্রুটি: <references>-এ সংজ্ঞায়িত "dictionary" নামসহ <ref> ট্যাগ পূর্ববর্তী লেখায় ব্যবহৃত হয়নি।

উদ্ধৃতি ত্রুটি: <references>-এ সংজ্ঞায়িত "al-Raida" নামসহ <ref> ট্যাগ পূর্ববর্তী লেখায় ব্যবহৃত হয়নি।

২. https://web.archive.org/web/20110718141222/http://www.yementimes.com/defaultdet.aspx?SUB_ID=33836

৩. http://revistas.ucm.es/fll/11303964/articulos/ANQE0000110311A.PDF

৪. https://books.google.com.bd/books?id=t8toAmyqmN0C&printsec=frontcover&dq=forgotten+queens+of+islam&redir_esc=y&hl=en#v=snippet&q=the%20woman%20sovereign%20who%20bows%20to%20no%20superior%20authority&f=false

৫. https://books.google.com.bd/books?id=8KiCl5-MxMMC&pg=PA316&dq=%22Sayyida+al+Hurra%22&redir_esc=y&hl=en#v=onepage&q=%22Sayyida%20al%20Hurra%22&f=false

৬. https://ece.umd.edu/~sellami/JUNE96/kahena.html

৭. http://inhouse.lau.edu.lb/iwsaw/raida101-102/EN/p010-043.pdf

৮. https://www.aramcoworld.com/en-us/Articles/January-2017/Malika-VI-Sayyida-Al-Hurra