লক্ষণাব্দ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

লক্ষণাব্দ (বা লক্ষ্মণ সেনের সাল) হল বর্ষ সংখ্যা গণনা পদ্ধতি যার প্রণয়নকারী ছিলেন মধ্যযুগীয় বাংলার সেন রাজবংশের চতুর্থ রাজা লক্ষ্মণ সেন যিনি ১১৭৮ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ব ভারত শাসন করেন।[১][২] এই পঞ্জিকা সালের সূচনা সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতপার্থক্য থাকলেও অধিকাংশ ইতিহাসবিদ একমত হয়েছেন যে এর প্রথম বর্ষ শুরু হয়েছে ১১১৮-১১১৯ খ্রিস্টাব্দে।[২][৩]

এই পঞ্জিকা সালের সূচনা লক্ষ্মণ সেনের সিংহাসন প্রাপ্তির বছরের ষাট বছর পূর্বে। কেন এই বছরটিকে সূচনা হিসেবে নির্ধারণ করা হলো সেই বিষয়ে গবেষকরা কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। সম্ভবত এটি লক্ষ্মণ সেনের জন্ম সাল ছিল।[৪]

গবেষকগণ লক্ষণাব্দের সূচনা নির্ধারণ করতে আবুল ফজলের লেখা আকবরনামা, সংস্কৃত, বাংলামৈথিলী ভাষার ফলকে লিখিত তারিখ এবং তামার প্লেটের শিলালিপি ব্যবহার করেন।[২] আকবরনামায় আবুল ফজল উল্লেখ করেন যে "বং (বঙ্গ) দেশে লাখমান সেনের শাসনের সূচনা হতে তারিখ শুরু করা হয়।"[২][৪] আবুল ফজল শকাব্দ এবং বিক্রম সংবৎ সহ সেই সময়ের আরো কিছু অব্দের কথা উল্লেখ করেন এবং পঞ্জিকা সালগুলোর সাথে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রণীত আকবরের নতুন পঞ্জিকা সাল তারিখ-ই-ইলাহি এর সম্পর্ক দেখানো হয়[৪] যার আধুনিক রূপ হচ্ছে বাংলাদেশী পঞ্জিকা[৫] মৈথিলী-ভাষী পণ্ডিতগণ বিদ্যাপতির লেখাপত্র ব্যবহার করতেন যেখানে তিনি লক্ষণাব্দ ও শকাব্দ ব্যবহার করেছিলেন।[৬]

এই পঞ্জিকা সাল বঙ্গবিহারের বিভিন্ন শিলালিপিতে পরবর্তী ৪০০ বছর পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছিলো।[২] মধ্যযুগীয় মিথিলার বিভিন্ন ঘটনার তারিখ এই অব্দ ব্যবহার করে লেখা হয়েছে।[৩]

আরেক মত অনুসারে ১১১৯ খ্রিস্টাব্দেে লক্ষণ সেনের সিংহাসন আরোহণ কাল থেকে এই সন গণনা শুরু হয়।[৭][৮] এই সনের মাস ছিল বাংলা সনের অনুরূপ যথা: বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বি, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র। এই সাল পরে বাঙলায় পরগণাতি সন নামে পরিচিত হয় কিন্তু মিথিলায় এখনো লক্ষণাব্দ প্রচলিত রয়েছে।

উৎসব[সম্পাদনা]

শৈব সেন রাজারা নতুন বর্ষ উপলক্ষে চরক পূজা[৯] করতেন,এ উৎসবে শিবের গাজন হত, নীল পূজা হত। বাঙলার বাহিরে বিহার (মিথিলা) রাজ্যে এখনো শিবের গাজনকে লক্ষণ সম্বৎ বলে পালিত হয়। যেসব প্রজারা কর ফাঁকি দিত তাদেরকে চরক উৎসবে বরশির মত অস্ত্র দ্বারা বিঁধে ঘোরানো হত।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Sen, Sailendra (২০১৩)। A Textbook of Medieval Indian History। Primus Books। পৃষ্ঠা 35–36। আইএসবিএন 978-9-38060-734-4 
  2. F., Kielhorn (১৮৯০)। "The Epoch of the Lakshmanasena Era"The Indian Antiquary, A Journal of Oriental ResearchXIX 
  3. Jha, Pankaj Kumar (২০১৪)। "Beyond the local and the universal: Exclusionary strategies of expansive literary cultures in fifteenth century Mithila"The Indian Economic & Social History Review (ইংরেজি ভাষায়)। 51 (1): 1–40। আইএসএসএন 0019-4646এসটুসিআইডি 145373596ডিওআই:10.1177/0019464613515549 
  4. Beveridge, H. (১৮৮৮)। "The Era of Lacchman Sen"Journal of the Asiatic Society of Bengal। LVII Part 1। 
  5. Nanda R. Shrestha (২০০২)। Nepal and Bangladesh: A Global Studies Handbook। ABC-CLIO। পৃষ্ঠা 200। আইএসবিএন 978-1-57607-285-1 
  6. Jha, Pankaj (২০১৯-০২-১৪), "Vidyapati and Mithila", A Political History of Literature (ইংরেজি ভাষায়), Oxford University Press, পৃষ্ঠা 3–36, আইএসবিএন 978-0-19-948955-8, ডিওআই:10.1093/oso/9780199489558.003.0001, সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৩-০৭ 
  7. https://bn.wikisource.org/wiki/পাতা:ঢাকার_ইতিহাস_দ্বিতীয়_খণ্ড.djvu/৪২৯
  8. dailypurbodesh.com/মধ্যযুগের-পুঁথি-সাহিত্যে/
  9. "সংসদ বাংলা-ইংরেজি অভিধান"। ১৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৮ জুলাই ২০২০