রুকইয়াহ শারইয়াহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

রুকইয়া, রুকইয়াহ, রুকিয়া, রুকিয়াহ, রুকাইয়া সহ বিভিন্ন উচ্চারণ প্রচলিত রয়েছে, যার মূল হচ্ছে আরবি শব্দ (رقية)

রুকইয়াহ কী? এব্যাপারে শরিয়াতের বিধান কী?[সম্পাদনা]

[ক.] রুকইয়াহ মানে কী?

রুকইয়াহ অর্থঃ ঝাড়ফুঁক, মন্ত্র, তাবিজ... ইত্যাদি। আর রুকইয়াহ শারইয়্যাহ মানে শরিয়াত সম্মত রুকইয়াহ। তবে রুকইয়া শব্দটি সচরাচর ঝাড়ফুঁক করা বুঝাতে ব্যাবহার হয়, এই ঝাড়ফুঁক সরাসরি হতে পারে, অথবা কোনো পানি বা খাদ্যের ওপর করে সেটা ব্যাবহার হতে পারে। সবগুলোই সালাফ থেকে প্রমাণিত।

আমাদের লেখাগুলোতে রুকইয়াহ শোনার কথা এসেছে/আসবে বারবার, সেটা হচ্ছে কোরআন যেসব আয়াত ঝাড়ফুঁক এর জন্য বেশি ইফেক্টিভ সেসবের রেকর্ড ফাইল। তিলাওয়াতের রেকর্ড শোনা যদিওবা সরাসরি শোনার মত প্রভাব ফেলে না, তবুও এটা যথেষ্ট উপকারী এবং ক্ষেত্র বিশেষে এর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের উপহাদেশে এর প্রচলন কম, আরব দেশগুলো এবং ওয়েস্টার্ন কান্ট্রির মুসলমানদের মাঝে এটা খুব প্রসিদ্ধ।

এবিষয়ে শরয়ী বিধানের সারকথা হচ্ছে-

"কোরআনের আয়াত বা হাদীসে বর্ণিত দু'আ নিজে পড়া, সেটা দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা, লিখে বাচ্চাদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া জায়েজ। তবে এক্ষেত্রে আকিদা সহীহ রাখতে হবে, দু'আ ঝাড়ফুঁক এর কোনো ক্ষমতা নাই, এসব আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার একটা পন্থা মাত্র.."

[খ.] আসুন এবার দলিল-আদিল্লাহ দেখা যাক, এখানে উল্লেখিত অনেক হাদিস আমরা ইতিমধ্যে রুকয়া সিরিজে আলোচনা করেছি।

একজন বান্দি আয়েশা রা. এর কাছে এসেছিলো ঝাড়ফুঁক এর জন্য, এমতাবস্থায় রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে আসলেন। তখন ওই বান্দিকে দেখে রাসুল সা. বললেন- "কোরআন দ্বারা এর চিকিৎসা করো!"

(সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৬২৩২)

সহীহ বুখারিতে এরকম একটা ঘটনা আছে যেটায় উম্মে সালামা রা. এর ঘরে একজন মেয়ে এসেছিল, তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে ছিল। রাসুল সা. দেখে বললেন- "এ বদনজর আক্রান্ত হয়েছে, এরজন্য রুকয়া/ঝাড়ফুঁক করো"

এখানে রাসূল সা. কোনো নিয়ম ধরে বেঁধে দেননি যে কিভাবে করবে না করবে। অর্থাৎ আমরা বুঝতে পারছি এব্যাপারে প্রশস্ততা আছে।

দ্বিতীয় হাদিসটা বেশ লম্বা, আগেও এর আলোচনা হয়েছে। হাদিসের সারকথা হচ্ছে-

"কতক সাহাবী জিহাদ থেকে ফেরার পথে রাতে এক যায়গায়, সেখানে এক বেদুইন গোত্রের বসতি ছিল। তাদের মেহমানদারী করতে অনুরোধ করলে তারা অস্বীকার করে। পরে সাহাবিরা নিজেরাই তাবু-টাবু টাঙ্গিয়ে ব্যবস্থা করে নেন। ঘটনাক্রমে বেদুঈনদের সর্দারকে বিচ্ছু কামড়ায়, তখন ওরা সাহাবিদের কাছে হেল্প চায়। এবার সাহাবিরা পারিশ্রমিক ছাড়া রাজি হয়না, পরে একপাল ভেড়া দেয়ার শর্তে সাহাবাদের একজন ওই সর্দারকে ঝাড়ফুঁক করলে সে সুস্থ হয়ে যায়। পরে পারিশ্রমিক নেয়া জায়েজ হবে কিনা এব্যাপারে নিশ্চিত হতে মদিনায় ফেরার পর রাসূল সা.-কে ঘটনা জানায়, ইয়া রাসূলুল্লাহ ঘটনাতো এরকম আমি সুরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিয়েছিলাম, এর বদলায় পারিশ্রমিক হিসেবে এগুলা নিলে কি জায়েজ হবে?

রাসুল সা. ঘটনা শুনে হাসলেন, বললেন- তুমি কিভাবে বুঝলে যে, এটি (সূরা ফাতিহা) একটি রুক্বইয়াহ!! আচ্ছা, তোমরা এগুলো (ভেড়া) বণ্টন করে নাও এবং সাথে আমার জন্যও একটা অংশ রেখো।

-(বুখারি হাদিস নং ২১৩২, এছাড়া মুসলিম, তিরমিযি, আহমাদ ইত্যাদি অনেক কিতাবে হাদিসটি আছে)

এখন এখানে আমাদের দেখার বিষয় হচ্ছে, সাহাবাদের ট্যালেন্ট দেখে আর কোরআন দ্বারা ঝাড়ফুঁক করতে দেখে রাসূল সা. খুশি হয়েছেন। আর রাসূল সা. এর কথা "তুমি কিভাবে জানলে এটা রুকয়া?" এথেকে বুঝা যায় রাসূল সা. ঝাড়ফুঁকের জন্য সুরা ফাতিহার কথা স্পেসিফিকভাবে সাহাবাদের বললেননি, বরং আগের হাদিসের মত এখানেও প্রশস্ততা রেখেছিলেন।

এই হাদিসে অনেক কিছু শেখার আছে, ইমাম বুখারী রহ. শুধু এই হাদিসই অনেকবার এনেছেন।

[গ.] বুখারীতে 'তাগুতের অত্যাচার সহ্য করার প্রতিদান" অধ্যায়ের পর থেকে "কোমল হওয়া" অধ্যায়ের আগে পর্যন্ত ঝাড়ফুঁকের অনেকগুলো অধ্যায় আছে, সেখানে রাসূল সা. যেসব দু'আ পড়ে ঝাড়ফুঁক করতেন তার কিছু কিছু উল্লেখ আছে।

সেখানে কোনো হাদিসে দেখবেন- সাহাবারা কাউকে ঝাড়ফুঁক করেছে, কখনো রাসূল হুকুম দিয়েছে করতে, রাসূল সা. দোয়া পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে নিজ শরীরে বুলিয়ে নিয়েছেন, জিবরীল আ. বিভিন্ন দু'আ পড়ে রাসূল স.কে ঝাড়ফুঁক করেছেন, শেষ সময়ে রাসূল সা. যখন অনেক অসুস্থ ছিলেন তখন আয়েশা রা. বিভিন্ন সুরা বা দো'আ পড়ে রাসূল সা. এর হাতে ফু দিয়ে সেই হাত রাসূল সা. এর শরীরে বুলিয়ে দিতেন। আগ্রহীরা চাইলে অধ্যায়গুলো মুতালা'আ (স্ট্যাডি) করতে পারেন।

এসবই বৈধ, ইসলাম যে ব্যাপারে প্রশস্ততা রেখেছে আমাদের অধিকার নাই সেটা সংকীর্ণ করার।

[ঘ.] আচ্ছা প্রথমে যে হাদিসটা উল্লেখ করেছিলাম, ইমাম আবু হাতেম ইবনে হিব্বান রহ. হাদিসটা বর্ণনা করার পর নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন, উনি বলছেন-

"রাসুল সা. কোরআন দ্বারা চিকিৎসা করো বলতে হয়তো বুঝিয়েছেন কোরআন যেভাবে চিকিৎসা করা বা ঝাড়ফুঁক করা বৈধ বলছে সেভাবে করো। জাহিলিয়্যাতের যামানায় বিভিন্ন শিরকি তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে ঝাড়ফুঁক করা হতো, এর বিপরীতে রাসুল সা. কোরআন যা জায়েজ বলে তা দ্বারা ঝাড়ফুঁক করতে উৎসাহ দিয়েছেন।"

এতগুলো হাদিস এরপর মুহাদ্দিসিনে কিরামের মন্তব্য দেখে আমরা বুঝতে পারছি এব্যাপারে যারা এখন আপত্তি করছে তারা নিসন্দেহে ভুঁইফোড় কোনো বিদআতি শায়খের কথায় বিভ্রান্ত হয়েছে। এজন্য ইসলাম সম্পর্কে যাচ্ছেতাই মন্তব্য করছে!তাওহিদ সম্পর্কে তাঁর মৌলিক জ্ঞানই নেই।

সহিহ মুসলিম শরিফের হাদিসে আছে- "রাসূল সা. এর পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তিনি সুরা ফালাক আর সুরা নাস পড়ে ফুঁ দিতেন।"

এখন কেউ যদি বলে ঝাড়ফুঁক করা শিরক নিঃসন্দেহে সে রাসুল সা. এর ওপর শিরকের অপবাদ দিলো।

[ঙ.] শেষকথাঃ রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁকের ক্ষেত্রে উলামাদের মতামতের সারকথা হচ্ছে- যদি ঝাড়ফুঁকে শিরকি কিছু না থাকে তাহলে সেটা বৈধ হবে। এক্ষেত্রে সতর্কতাবশত কোরআন এর আয়াত অথবা দু'আয়ে মাসুর (যা হাদিস বা আসারে সাহাবায় আছে) এসব দ্বারা করা উত্তম।

দলিল হিসেবে একটি হাদিস উল্লেখ করা যায়, হাদিসটি মুসলিম শরিফের।

"...আওফ ইবনু মালিক আশজাঈ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জাহেলী যুগে বিভিন্ন মন্ত্র দিয়ে ঝাড়-ফুঁক করতাম। তাই আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আরয করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এব্যাপারে আপনার কি অভিমত? তিনি বললেন, তোমাদের মন্ত্রগুলো আমার কাছে পেশ করতে থাকবে, যদি তাতে শিরক না থাকে তাহলে কোনো সমস্যা নেই।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ইফাঃ ৫৫৪৪, ইসলাম ওয়েব ২২০০)

এটা হলো ঝাড়ফুঁকের ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে ইসলামের বিধান, যে রাসুল সা. জাহেলি যুগের মন্ত্র দিয়েও ঝাড়ফুঁকের অনুমতি দিয়েছেন। শর্ত হচ্ছে, তাতে যেন শিরক না থাকে। ব্যাস!

সবচে বড় কথা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার বাণী-

"আমি কোরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা এবং রহমত। আর জালেমদের জন্য তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়!"

এখন আল্লাহর কথা অনুযায়ী যদি কোরআন তিলাওয়াত করে কেউ যদি উপকার পায়, তাহলে অবশ্যই অন্যকে উপদেশ দিবে।

কারণ রাসূল সা. বলেছেন- "মঙ্গলকামনাই হচ্ছে দ্বীন!"

(বুখারী ও মুসলিম)

ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

শরঈ বিধান[সম্পাদনা]

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "রুকইয়াতে যদি শিরক না থাকে, তাহলে কোনো সমস্যা নেই।”[১]

বিশুদ্ধ আক্বিদা[সম্পাদনা]

উলামায়ে কিরামের মতে রুকইয়া করার পূর্বে এই আক্বিদা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া উচিত ‘রুকইয়া বা ঝাড়ফুঁকের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই, সব ক্ষমতা আল্লাহ তা’আলার, আল্লাহ চাইলে শিফা হবে, নয়তো হবে না।’

শিরকি রুকইয়াহ[সম্পাদনা]

অনেক পথভ্রষ্ট কবিরাজ নিজেদের যাদুটোনার তাবিজকে রুকইয়া বলে প্রচার করে থাকে, যেগুলোকে বলা হয় রুকইয়াহ শিরকিয়্যাহ্‌।[২]

রুকইয়াহ্‌'র প্রকারভেদঃ[সম্পাদনা]

রুকইয়াহ দুই প্রকার। যথাঃ ১। রুকইয়াহ্‌ শারইয়্যাহ্‌ ও

২। রুকইয়াহ্‌ শিরকিয়্যাহ্‌ ।

বিভিন্ন ভাবে রুকইয়াহ করা হয়, যেমনঃ দোয়া বা আয়াত পড়ে ফুঁ দেয়া হয়, মাথায় বা আক্রান্ত স্থানে হাত রেখে পড়া হয়। এছাড়া পানি, তেল, খাদ্য বা অন্য কিছুতে দোয়া/আয়াত পড়ে ফুঁ দিয়ে খাওয়া বা ব্যবহার করা হয়। [৩]

রুকইয়ার পূর্বশর্ত[সম্পাদনা]

রুকইয়া করে উপকার পাওয়ার জন্য তিনটি জিনিসের প্রয়োজন।

  • নিয়্যাত (কেন রুকইয়া করছেন, সেজন্য নির্দিষ্টভাবে নিয়াত করা)।
  • ইয়াক্বিন (এব্যাপারে ইয়াকিন রাখা যে, আল্লাহর কালামে শিফা আছে)।
  • মেহনত (অনেক কষ্ট হলেও, সুস্থ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে রুকইয়া চালিয়ে যাওয়া)।

লক্ষণীয়ঃ রুকইয়া থেকে পুর্ণ ফায়দা পাওয়ার জন্য দৈনন্দিনের ফরজ ইবাদাত অবশ্যই পালন করতে হবে, পাশাপাশি সুন্নাতের প্রতিও যত্নবান হতে হবে। (যেমনঃ প্রতিদিনের নামাজ, মেয়েদের পর্দার বিধান) যথাসম্ভব গুনাহ থেকে বাঁচতে হবে। ঘরে কোনো প্রাণীর ছবি / ভাস্কর্য রাখা যাবেনা। আর সুরক্ষার জন্য সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন আমলগুলো[৪] অবশ্যই করতে হবে। আর ইতিমধ্যে শারীরিক ক্ষতি হয়ে গেলে, সেটা রিকোভার করার জন্য রুকইয়ার পাশাপাশি ডাক্তারের চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হবে।

বদনজরের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি:-


বদনজর (১)

[ক]আল্লাহর নামে শুরু করছি..

মানুষ সামাজিক জীব, এজন্য আমাদের দৈনন্দিনের হাসি-কান্না সুখ-দুঃখ সবার সাথে ভাগাভাগি করে আমরা বেচে থাকি। মানুষ একে অপরের কল্যাণকামী হবে এটাই স্বাভাবিক.. তবে সবসময় তা হয় না!!এই সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশের পেছনে কিছু নিরব ফিৎনা চলে। যেমনঃ হিংসা, নজর, যাদু ইত্যাদি..

এসব সর্বকালেই কমবেশি ছিলো, তবে সময়ের এই ক্রান্তিকালে প্রতিটি ফিতনা যেমন মরণকামড় বসাচ্ছে.. তেমনি এই ফিৎনাগুলোও মহামারির রুপ নিয়েছে।

আমরা 'বদনজর' দ্বারা আমাদের আলোচনা শুরু করতে পারি!

এখানে প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে "বদনজর, যাদু, আসর" এসবের অস্তিত্ব অনেকে বিশ্বাসই করতে চায়না। কেউ বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে.. আবার কেউ এসব স্রেফ কুসংস্কার মনে করে উড়িয়ে দেন। যারা ইসলামে বিশ্বাস করেননা, বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে এসব অস্বীকার করেন তারা আমাদের অডিয়েন্স না। আমাদের মুখ্য হচ্ছে ঈমানদার ভাই এবং বোনেরা; যারা এব্যাপারে সন্দিহান... অতএব আমরা আজ কোরআন-হাদিস থেকে 'বদনজর' সম্পর্কে বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বিদা জানবো...

[খ] ১। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে আছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: "বদনজর সত্য!"

২। সহীহ মুসলিম এবং মুসনাদে আহমাদের হাদিসে আছে, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “বদনজর সত্য, ভাগ্যের চেয়েও আগে বেড়ে যায় এমন কিছু যদি থাকতো, তাহলে অবশ্যই সেটা হতো বদনজর! যদি তোমাদের বদনজরের জন্য গোসল করতে বলা হয় তবে গোসল করে নিও.."

৩। মুসনাদে আবু দাউদে আছে জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আল্লাহর ফায়সালা ও তাক্বদিরের পর, আমার উম্মতের সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হবে বদনজরের কারণে!”

৪। আরেকটি হাদীস আছে ইবনে মাজাহ শরীফে,

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও, কেননা বদনজর সত্য!”

৫। আরেকটি হাদীস রয়েছে মুসনাদে শিহাবে, হাদিসটির সনদ হাসান।

জাবের রা. এবং আবু যর গিফারী রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “বদনজর মানুষকে কবর পর্যন্ত আর উটকে রান্নার পাতিল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়!”

৬। মুসনাদে আহমাদ, মু'জামে তাবারানীতে হাসান সনদের অপর একটি হাদিস আছে এরকম

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “বদনজর মানুষকে উঁচু থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়!”

রাসূল সা. থেকে বিশুদ্ধ সনদে এমন অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে বদনজর সত্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবুও এরপর আমরা কোরআনুল কারীমের কিছু আয়াত লক্ষ্য করি..

[গ] ১। ..."ইয়াকুব আ. বললেনঃ হে আমার সন্তানেরা! (শহরে প্রবেশের সময়) তোমরা সবাই একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না, বরং পৃথক পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহর কোন বিধান থেকে আমি তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারি না, নির্দেশ আল্লাহরই চলে। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি, আর ভরসাকারীদের তাঁর উপরেই ভরসা করা উচিত ।" (সুরা ইউসুফ আয়াত ৬৭)

ইবনে আব্বাস রা. ইমাম মুজাহিদ রহ. কাতাদাহ রহ. সহ সকল মুফাসসিররাই এই আয়াত প্রসঙ্গে বলেন,

"ইয়াকুব আ. সন্তানদের ব্যাপারে বদনজরের আশংকা করেছিলেন, যে উনার সন্তানদের দেখে লোকদের বদনজর লাগতে পারে.. (হয়তোবা তাঁরা স্বাস্থ্যবান বা সুন্দর চেহারার অধিকারী ছিলো) এজন্য সন্তানদের শহরে প্রবেশের সময় আলাদা আলাদাভাবে প্রবেশ করতে বলেছেন। পাশাপাশি এটাও উল্লেখ করে দিয়েছেন 'এসব (বদনজর) তো আসলে আল্লাহর তৈরি সিস্টেম, এখানে আমার কিছু করার নাই.. আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া!"

(বিস্তারিত জানতে তাফসীরে ইবনে কাসির অথবা বয়ানুল কোরআনে আয়াতের প্রাসঙ্গিক আলোচনা দেখা যেতে পারে..)

২।"তবে যখন তুমি তোমার বাগানে প্রবেশ করলে, তখন কেন "মা-শা-আল্লাহ, লা-ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" বললে না?"

(সুরা কাহফ, আয়াত ৩৯)

এই আয়াতকে আলেমরা একথার প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন যে, কোনো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে সাথেসাথে মাশা-আল্লাহ, সুবহানাল্লাহ অথবা আলহামদুলিল্লাহ্‌ এসব বলতে হয়। যদি আলোচ্য আয়াতে উল্লেখিত ব্যক্তি নিজের বাগান দেখে মুগ্ধ হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতো, আল্লাহকে স্মরণ করতো তাহলে ওর বাগান হয়তো নষ্ট হতো না।

এব্যাপারে বায়হাকী শরিফের হাদিস উল্লেখযোগ্য, আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন- "কোনো পছন্দনীয় বস্তু দেখার পর যদি কেউ বলে,

مَا شَاء اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّه

ِ(আল্লাহ যা চেয়েছে তেমন হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া কারো ক্ষমতা নেই) তাহলে কোনো (বদনজর ইত্যাদি) বস্তু সেটার ক্ষতি করতে পারবে না।"

তবে আলোচ্য আয়াত থেকে এটাও প্রমাণ হয় যে, নিজের নজর নিজেকেই লাগতে পারে, নিজের সম্পদে বা নিজ সন্তানদেরও লাগতে পারে। (বিস্তারিত জানতে দুররে মানসুর অথবা ইবনে কাসির দেখা যেতে পারে)

৩। "..কাফেররা যখন কোরআন শুনে, তখন তারা (এমন ভাবে তাকায় যে মনে হয়) তাদের দৃষ্টি দ্বারা যেন আপনাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দিবে এবং তারা বলেঃ ও তো একজন পাগল!!" (সুরা কলাম, আয়াত ৫১)

এ আয়াত প্রসঙ্গে মুফাসসিররা বলেন, এক লোক বদজরের কারণে প্রসিদ্ধ ছিলো, (মানে আমাদের ভাষায় লোকটার নজর খারাপ ছিলো) তো মক্কার কাফিররা ওই লোকটাকে কোত্থেকে নিয়ে এসেছিলো, রাসূল সা. যখন কোরআন পড়তে বসতেন, তখন ওই লোকটা চেষ্টা করতো নজর দিতে!! শেষে যখন কাজ হতো না, তখন বলতো ধুর! এতো পাগল (নাউযুবিল্লাহ) এজন্য এর কিছু হচ্ছেনা..!!(বিস্তারিত জানতে তাফসীরে মাযহারি বা মা'রিফুল কোরআনের পুর্ণাঙ্গ এডিশনটা দেখা যেতে পারে)

তো, এথেকে বুঝা যায় অনেক লোকের নজর খুব বেশি লাগে, আবার অনেকে এমন আছে যারা একটুতেই নজর আক্রান্ত হয়। ইনশাআল্লাহ এবিষয়ে সামনে হাদিস আসবে..।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, সাধারণত নজর তো ইচ্ছাকৃত লাগেনা, কোনো কিছু দেখে খুব মুগ্ধ হলে, তখন যিকির না করলে লাগে। কিন্তু ব্ল্যাক ম্যাজিকের কিছু রিচ্যুয়াল আছে, যা দ্বারা যাদুকর ইচ্ছাকৃত ভাবে কাউকে নজর দিতে পারে। হতে পারে ওই লোকটা এরকম কিছু জানতো...

(আল্লাহই ভালো জানে..)

[ঘ] সব মিলিয়ে আসা করছি বদনজর বিষয়ক বিশ্বাসে কারো কোনো অস্পষ্টতা নেই। এটা যদিও কোনো মৌলিক আকিদা না, যা ঈমানের সাথে সম্পর্ক রাখে। তবুও এরকম কোরআন হাদিস ইজমা দ্বারা প্রমাণিত একটা বিষয় অস্বীকার করলে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাতো নিশ্চিত..

বদনজর আক্রান্ত হওয়ার লক্ষন:-


কিভাবে বুঝবেন আপনার নজর লেগেছে কিনা? নিচের লক্ষনগুলো এখনি মিলিয়ে দেখুন। সবগুলো মিলতে হবে এমন কোন কথা নেই। ২-১ টা মিললেও বলা যায় অল্প-স্বল্প নজরের সমস্যা আছে।

মুম্বাইয়ের একজন অভিজ্ঞ আলেম মুফতি জুনাইদ সাহেব নজর লাগার অনেকগুলো আলামত বর্ণনা করেছিলেন। যেমনঃ-

১। শরীরে জ্বর থাকা, কিন্তু থার্মোমিটারে না উঠা।

২। কোনো কারণ ছাড়াই কান্না আসা..

৩। প্রায়সময় কাজে মন না বসা, নামায যিকর ক্লাসে মন না বসা।

৪। প্রায়শই শরীর দুর্বল থাকা, ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব লাগা।

৫। চেহারা ধুসর/হলুদ হয়ে যাওয়া।

৬। বুক ধড়পড় করা, দমবন্ধ অস্বস্তি লাগা।

৭। অহেতুক মেজাজ বিগড়ে থাকা।

৮। আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের সাথে দেখা হলেই ভালো না লাগা।

৯। অতিরিক্ত চুল পড়া। শ্যাম্পুতে কাজ না করা।

১০। পেটে প্রচুর গ্যাস হওয়া।

১১। বিভিন্ন সব অসুখ লেগে থাকা যা দীর্ঘদিন চিকিৎসাতেও ভালো হয় না। (সর্দিকাশি, মাথাব্যথা ইত্যাদি)

১২। হাত-পায়ে মাঝেমধ্যেই ব্যাথা করা, পুরো শরীরে ব্যাথা দৌড়ে বেড়ানো।

১৩। ব্যবসায় ঝামেলা লেগে থাকা।

১৪। আপনি যে কাজে অভিজ্ঞ সেটা করতে গেলেই অসুস্থ হয়ে যাওয়া।

বদনজর এর জন্য রুকইয়াহঃ[সম্পাদনা]

[বদনজরের জন্য রুকইয়াহ- ১]

[ক] যদি জানা যায় কার নজর লেগেছে তাহলে সাহল ইবনে হুনাইফ রা. এর হাদিসটা অনুসরণ করলেই হবে।

অর্থাৎ যার নজর লেগেছে তাকে অযু করতে বলবে, অযুর পানিগুলো একটা পাত্রে জমা করবে, এরপর সেটা আক্রান্ত ব্যাক্তির গায়ে ঢেলে দিবে। তাহলেই নজর কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ।

এই পদ্ধতিতে সাধারণ একবারেই বদনজরের প্রভাব দূর হয়ে যায়। তবেঁ, প্রয়োজনে ২-৩দিন করা লাগতে পারে। আর হ্যাঁ! অনেকের ক্ষেত্রে এই ওযু করার পানি ঢালার পর, প্রচণ্ড পায়খানা বা প্রসাবের বেগ আসে, সেটা হয়ে গেলে আলহামদুলিল্লাহ সুস্থ হয়ে যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কুলির পানিও কি জমা করবে?

উত্তরঃ যদিওবা এক হাদিসে আছে কুলির কথা, তবে না নিলেও সমস্যা নেই। এমনকি অধিকাংশের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একজনের হাতমুখ ধোয়া পানি নিয়ে অপরজন হাতমুখ ধৌত করলেই বদনজর নষ্ট হয়ে যায়।

উহ্য প্রশ্ন-২: যদি নিজের নজর নিজেকেই লাগে?

উত্তরঃ তাহলে ওযু করবে, এবং পানিগুলো জমা করবে, এরপর সেটা নিজের গায়ে ঢালবে।

[খ] আর যদি আপনি না জানেন আপনার উপর কার নজর লেগেছে, যদি অনেক দিনের সমস্যা হয়, কিংবা যদি অনেকজনের নজর লাগে, তাহলে এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। বদনজরের সেলফ রুকইয়া হিসেবে এই পদ্ধতি সাজেসটেড।

১. রুকইয়ার আয়াতগুলো প্রতিদিন তিলাওয়াত করবেন অথবা শুনবেন, সরাসরি শোনা সম্ভব না হলে অডিও রেকর্ড শুনবেন।

রুকইয়াহর আয়াত নিজেই তেলাওয়াত করা সর্বোত্তম। কাজেই আপনার তেলাওয়াত শুদ্ধ হলে সম্ভব হলে রুকইয়াহ আয়াত তেলাওয়াত করবেন। তা না হলে অডিও শুনবেন। বদনজরের রুকইয়াহর পিডিএফ নিচের লিংকে পাবেন।

ruqyahbd.org/pdf

পিডিএফ পড়তে সমস্যা হলে কুরআন থেকে দেখে দেখে তেলাওয়াত করতে পারেন। আয়াতের লিস্ট নিচের লিংকে পাবেন।

https://facebook.com/thealmahmud/posts/1159125980843597

২. আর প্রতিদিন রুকইয়ার গোসল করবেন।

রুকইয়াহ অডিওর ডাউনলোড পেজের লিংক: http://ruqyahbd.org/download (সেখান থেকে "বদনজর Evil Eye অথবা Eye Hasad যেকোনোটি শুনতে পারেন। এছাড়া সা'দ আল গামিদীর আধাঘণ্টার রুকয়াটাও শুনতে পারেন। যেটাই শুনবেন, শোনার সময় নিয়ত রাখবেন, আমি বদনজরের জন্য রুকইয়াহ করছি।)

যদি আপনার কোনো সমস্যা থাকে তাহলে আপনি ফিজিক্যালি এর প্রভাব টের পাবেন। যেমনঃ প্রচণ্ড ঘুম আসবে, মাথাব্যথা করতে পারে, হাত-পা কামড়াতে পারে, হার্টবিট বেড়ে যেতে পারে, শরীর ঘামতে পারে, বেশি বেশি প্রসাব হতে পারে- ইত্যাদি ইত্যাদি।

তবে এরপরেও শুনতে থাকবেন, ঘুম আসলে জেগে থাকতে চেষ্টা করবেন। আর একান্তই না পেরে ঘুমিয়ে গেলেও দুশ্চিন্তার কিছু নাই। আর সমস্যা সমাধান হলেই ভালো ফিল করতে লাগবেন ইনশাআল্লাহ! দুশ্চিন্তার কারণ নাই।

.

আর আপনি কয়েকবার মনোযোগ দিয়ে শোনার পরেও যদি কোনোই ইফেক্ট না বুঝতে পারেন, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ্‌ আপনার কোনো সমস্যা নাই। আপনার যদি প্রবলেম থাকে তাহলে রুকইয়াহ শুনলে অবশ্যই প্রভাব টের পাবেন।

.

[গ] রুকইয়ার গোসলের পদ্ধতি হচ্ছে-

একটা বালতিতে পানি নিবেন, তারপর ওই পানিতে দুইহাত ডুবিয়ে পড়বেন -

"দরুদ শরিফ, ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, চারকুল (কাফিরুন, ইখলাস, ফালাক্ব, নাস) প্রত্যেকটা ৭ বার। শেষে আবার দরুদ শরিফ ৭ বার পড়বেন।

লক্ষণীয়ঃ

১. পড়ার পর হাত উঠাবেন এবং পানি দিয়ে গোসল করবেন। এগুলা পড়ে পানিতে ফু দিবেন না, এমনিই গোসল করবেন।

২. যদি টয়লেট আর গোসলখানা একসাথে হয় তখন এসব অবশ্যই বাহিরে এনে পড়তে হবে।

৩. কোনদিন হাতে সময় কম থাকলে এসবের মধ্যে সুরা কাফিরুন বাদ দিতে পারেন আর দরুদ শরিফ ৩বার করে পড়তে পারেন।

৪. প্রথমে এই পানি দিয়ে গোসল করলেন পরে অন্য পানি দিয়ে ভালোমতো করলেন অসুবিধে নেই।

৫. যার সমস্যা সে যদি পড়তে না পারে, তাহলে অন্যজন পানিতে হাত রেখে পড়ে দিবে, এরপর গোসল করবেন।

৬. উত্তম হচ্ছে, প্রথমে রুকইয়াহ শুনে এরপর গোসল করতে যাবেন। গোসলের আগে শুনতে না পারলে সমস্যা নাই, দিনের যেকোন সময় শুনলেই হবে ইনশাআল্লাহ।

৭. রুকইয়ার গোসল বাদ দিয়ে, খালি অডিও শোনা থেকে নিরুৎসাহিত করছি। এতে কষ্ট বেশি কিন্তু উপকার কম হওয়ার আশংকা রয়েছে।

.

[ঘ] মোটকথা, প্রতিদিন রুকইয়া শুনবেন এবং উপরের নিয়ম অনুযায়ী রুকইয়ার গোসল করবেন। সমস্যা অনুযায়ী ৩-৭ থেকে দিন লাগতে পারে। সমস্যা বেশি মনে হলে ২১দিন করতে পারেন।

সমস্যা কম হলে কখনো একদিনেও ভালো হয়ে যায়। তবে ভালো হওয়ার পরেও ২-৩দিন করা উচিত।

[বদনজরের জন্য রুকইয়াহ-২]

বাচ্চাদের নজর লাগলে কি করবেন? কিংবা যদি নজর লাগে আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে? আপনার দোকানে, খামারে? ঘর-বাড়িতে? গাছে? বা অন্য কোথাও?

নিচে একে একে পদ্ধতিগুলো লেখা হল।

[১ম পদ্ধতি] যদি জানা যায় কার নজর লেগেছে তাহলে সাহল ইবনে হুনাইফ রা. এর হাদিসটা অনুসরণ করলেই হবে।

অর্থাৎ যার নজর লেগেছে তাকে অযু করতে বলবে, অযুর পানিগুলো একটা পাত্রে জমা করবে, এরপর সেটা আক্রান্ত ব্যাক্তির গায়ে ঢেলে দিবে। তাহলেই নজর কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ।

এই পদ্ধতিতে সাধারণ একবারেই বদনজরের প্রভাব দূর হয়ে যায়। তবেঁ, প্রয়োজনে ২-৩দিন করা লাগতে পারে। আর হ্যাঁ! অনেকের ক্ষেত্রে এই ওযু করার পানি ঢালার পর, প্রচণ্ড পায়খানা বা প্রসাবের বেগ আসে, সেটা হয়ে গেলে আলহামদুলিল্লাহ সুস্থ হয়ে যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কুলির পানিও কি জমা করবে?

উত্তরঃ যদিওবা এক হাদিসে আছে কুলির কথা, তবে না নিলেও সমস্যা নেই। এমনকি অধিকাংশের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একজনের হাতমুখ ধোয়া পানি নিয়ে অপরজন হাতমুখ ধৌত করলেই বদনজর নষ্ট হয়ে যায়।

উহ্য প্রশ্ন-২: যদি নিজের নজর নিজেকেই লাগে?

উত্তরঃ তাহলে ওযু করবে, এবং পানিগুলো জমা করবে, এরপর সেটা নিজের গায়ে ঢালবে।

[নোটঃ এই পদ্ধতি বাচ্চা-বয়স্ক, ছেলে-মেয়ে সবার জন্য। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যদি জানা না যায় কার নজর লেগেছে তাহলে নিচের দ্বিতীয় পদ্ধতি ফলো করতে হবে।]

[২য় পদ্ধতি] রোগীর মাথায় হাত রেখে এই দুয়াগুলো পড়বেন। এবং মাঝেমাঝে রোগীর গায়ে ফুঁ দিবেন, এভাবে কয়েকবার করবেন। নিজের সমস্যা থাকলে নিজের মাথায় বা বুকে হাত রেখেই পড়তে পারেন। অথবা পড়ার পর হাতে ফুঁ দিয়ে পুরা শরীরে হাত বুলিয়ে নিতে পারেন।

১.

أُعِيْذُكُمْ بِكَلِمَاتِ اللّٰهِ التَّامَّةِ ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

উ"ঈযুকুম বিকালিমা-তিল্লা-হিত্তা-ম্মাহ। মিং কুল্লি শাইত্বা-নিও- ওয়াহা-ম্মাহ। ওয়ামিং কুল্লি "আঈনিল্লা-ম্মাহ।

২.

بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

বিসমিল্লা-হি আরকীক। মিং কুল্লি শাইয়িই ইউ'যীক। মিং শাররি কুল্লি নাফসিন আও "আইনি হাসিদ। আল্লা-হু ইয়াশফীক। বিসমিল্লা-হি আরকীক।

৩.

بِاسْمِ اللَّهِ يُبْرِيكَ، وَمِنْ كُلِّ دَاءٍ يَشْفِيكَ، وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ، وَشَرِّ كُلِّ ذِي عَيْنٍ

বিসমিল্লা-হি ইউবরীক। ওয়ামিং কুল্লি দা-ঈই ইয়াশফীক। ওয়ামিং শাররি হাসিদিন ইযা- হাসাদ। ওয়া শাররি কুল্লি যী "আঈন ।

৪.

اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبْ الْبَاسَ، اشْفِ وَأَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا

আল্লা-হুম্মা রাব্বান না-স। আযহিবিল বা'স । ইশফি ওয়াআংতাশ শা-ফী। লা-শিফাআ ইল্লা-শিফাউক। শিফাআল লা-ইউগা-দিরু সাক্বামা-।

এরপর সুরা ফাতিহা এবং আয়াতুল কুরসি ১বার। এবং সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস ৩ বার পড়বেন এরপর রুগীকে/নিজেকে ফুঁ দিবেন। চাইলে সুরা ফালাক নাস অনেকবার পুনরাবৃত্তি করতে পারেন, সবধরনের রুকইয়ায় এগুলো বিশেষভাবে উপকারী।

সমস্যা বেশি হলে উল্লেখিত পদ্ধতিতে রুকইয়া করা শেষে, আরেকবার এগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে প্রতিদিন খাবেন এবং গোসল করবেন। সমস্যা ভালো হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন করবেন এই দুটো কাজ। এছাড়া কোন অঙ্গে ব্যাথা থাকলে এসব দোয়া-কালাম পড়ে তেলে ফুঁ দিয়ে প্রতিদিন মালিশ করতে পারেন।

বদনজর আক্রান্ত কারো কারো ওপর রুকইয়া করতে চাইলে এই পদ্ধতিটা অনুসরণ করা উচিত। অনুরূপভাবে ছোট বাচ্চাদের বিবিধ সমস্যা / রোগবালাইয়ের জন্য রুকইয়া করতে চাইলেও এটা অনুসরণ করা যায়।

আর হ্যাঁ! উল্লেখিত সবগুলো দোয়া রাসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদিস থেকে নেয়া।

[৩য় পদ্ধতি] যদি কোনো গাছ, খামার, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অথবা বাড়িতে নজর লাগে তাহলে প্রথমে এগুলোর মালিক নিজের জন্য বদনজরের রুকইয়াহ করবেন। আর এসব সম্পত্তির জন্য উপরের দু'আ এবং কোরআনের আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিবেন, এরপর ওই পানিটা গাছে, ঘরে অথবা দোকানে ছিটিয়ে দিবেন। গৃহপালিত পশুপাখির ওপর নজর লাগলে তাদের মাথায় হাত রেখে এসব পড়তে পারেন, কিংবা কোন খাদ্যের ওপর এসব পড়ে ফুঁ দিয়ে খাইয়ে দিতে পারেন।

তাহলে ইনশাআল্লাহ বদনজর নষ্ট হয়ে যাবে। প্রয়োজনে এভাবে পরপর কয়েকদিন রুকইয়া করুন।

[বদনজরের জন্য রুকইয়াহ-৩]

[ক] গতপর্বে আমরা বদনজর বিষয়ে সালাফের মতামত এবং বদনজর লাগার কিছু লক্ষণ জেনেছি। আজ বদনজর থেকে বাঁচার উপায় এবং এসম্পর্কিত কিছু সত্য ঘটনা জানবো।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “নিজের প্রয়োজন পূরণ হওয়া পর্যন্ত সেটা গোপন রাখার মাধ্যমে সাহায্য লাভ করো! কেননা, প্রতিটা নিয়ামত লাভকারীর সাথেই হিংসুক থাকে!” (তাবারানী)

এটা নজর এবং হিংসা থেকে বাচার একটা টিপস। নিয়ামত গোপন রাখার মানে হচ্ছে অন্য কারো সামনে অহেতুক নিজের, নিজের সম্পদের, প্রশংসা না করা, সন্তানের প্রশংসা না করা, মেয়েরা নিজ স্বামীর প্রশংসা অন্যদের সামনে না করা, ছেলেরা নিজ স্ত্রীর প্রশংসা অন্যদের সামনে না করা। নিজের প্রজেক্টের প্রপার্টির ব্যাবসার গোপন আলোচনা অন্যদের সামনে প্রকাশ না করা। অনেকে অহেতুক অন্যদের সামনে গল্প করেন, অমুক প্রজেক্টে এতো লাভ হলো, অমুক চালানে এতো টাকার বিক্রি হলো।

মোটকথা: অহেতুক অন্যের সামনে নিজের কোনো নিয়ামতের আলোচনা না করাই উত্তম। প্রসঙ্গক্রমে করলেও কথার মাঝে যিকর করা। যেমনঃ 'আলহামদুলিল্লাহ্‌, এবছর ব্যাবসায় কোনো লস যায়নি।' "আল্লাহর রহমতে আমার ছেলে বেশ ভালো রেজাল্ট করেছে!" "মা-শা-আল্লাহ ভাবি! আপনি তো কাপড়ে অনেক ভালো ফুল তুলতে পারেন!!" ইত্যাদি ইত্যাদি...

শুধু খারাপ মানুষের নজর লাগে এমন কিন্তু না। ভালো মানুষের নজরও লাগতে পারে। বদনজর লাগার আসল কারণ হচ্ছে, আমরা যখন কোনো বস্তুর বা ব্যাক্তির প্রশংসা করি তখন এর মাঝে আল্লাহকে স্মরণ করি না। মা-শা-আল্লাহ, বারাকাল্লাহ বলি না। কোন কিছু দেখলে আমরা ওয়াও, অসাম! বাপরে! কি দেখাইলো মাইরি! হেব্বি হইছে! এক্কেরে ফাডালাইছে.. এসব বলি। অথচ আমাদের উচিত ছিলো মা-শা-আল্লাহ, বারাকাল্লাহ, বলা।

সূরা কাহাফে এক ঘটনায় আল্লাহ্‌ বলেন: “যখন তুমি তোমার বাগানে প্রবেশ করলে, তখন 'মা-শা-আল্লাহ; লা-কুও্ওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহ' (সব আল্লাহর ইচ্ছাতে হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া কারো ক্ষমতা নেই) কেন বললে না?” (১৮:৩৯)

এখন অন্য কেউ যদি আপনার কিছুর প্রশংসা করে, তাহলে উনি যিকর না করলে আপনার উচিত হবে যিকর করা। উদাহরণ স্বরুপ কেউ বললো- ভাবি আপনার ছেলেটা তো অনেক কিউট! আপনি বলুন- আলহামদুলিল্লাহ্‌... মনে মনে বলুন- আল্লাহর কাছে বদনজর থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আপনি অন্যের প্রশংসা করতে গিয়ে কথার মাঝে যিকর করুক। "মাশা-আল্লাহ! আপনার রান্না অনেক সুন্দর।"

আর অধিক পরিমাণে সালামের প্রচলন করুন, ইনশাআল্লাহ হিংসা দূর হয়ে যাবে।

সর্বোপরি আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও, কেননা বদনজর সত্য!”

[খ] নজর থেকে বাচার একটা দুয়া, রাসুল সা. এটা পড়ে হাসান এবং হুসাইন রা.কে ফুঁ দিয়ে দিতেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই একই দু'আ আমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম আ.-ও ইসমাইল আ. এবং ইসহাক আ. এর জন্য পড়তেন। দুয়াটি হচ্ছে-

.

أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

উচ্চারণঃ আ'উযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মাহ। মিং-কুল্লি শাইত্বনিও ওয়াহা-ম্মাহ। ওয়ামিং-কুল্লি 'আইনিল্লা-ম্মাহ।

অর্থঃ আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমার দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টির অনিষ্ট হতে পানাহ চাচ্ছি।

(দোয়াটি পিকচার বানিয়ে কমেন্টে দিলাম)

এই হাদিসটি আছে- বুখারি, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাযাহ, মুসতাদরাকে হাকেম, তাবারানী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে বাযযার, মুসান্নাফ, মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকে..

এই দু'আ সকাল-সন্ধ্যায় কয়েকবার পড়ে বাচ্চাদের ফুঁ দিয়ে দিবেন, নিজের জন্যও পড়বেন। ইনশাআল্লাহ তাবিজ-কবচ টোটকা ইত্যাদির কোনো দরকার হবেনা। আল্লাহই হিফাজত করবে।

[গ] বদনজর বিষয়ে অনেকগুলো ঘটনা আগেরবার (প্রথম সিরিজে) বলা হয়েছে, সেসব আর উল্লেখ না করি.. আমি আগের পোস্টগুলোর লিংক কমেন্টে দিয়ে দিচ্ছি। তবে সাহল ইবনে হুনাইফ রা. এর ঘটনা; যা মুয়াত্তা মালেক, মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাযাহ এবং নাসাঈ শরিফে আছে! সেটা এটা এখানে না বললেই নয়..

"সাহল ইবনে হুনাইফ রাযি. কোথাও গোসলের জন্য জামা খুলেছিলেন। উনি বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। বদরী সাহাবী আমির ইবনে রবী'আ রাযি. তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন, এতো সুন্দর মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। এমনকি এত সুন্দর কোন যুবতীকেও দেখিনি। আমির রাযি. কথাটা বলার পরপরই সাহাল রাযি. সেখানে বেহুশ হয় পড়ে গেলেন। তাঁর গায়ে জ্বর চলে আসলো। মারাত্মক জ্বরে ছটফট করতে লাগলেন হযরত সাহাল রাযি.।

অন্য সাহাবিরা রাসূল সা. কে জানালেন, সংবাদ পেয়ে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবস্থা দেখতে আসলেন। সাহল রাযি. কে হঠাৎ করে এমনটা হবার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি ঘটনাটা খুলে বললেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন: "তোমরা কেন তোমাদের ভাইকে নজর দিয়ে হত্যা করছো?” আমির ইবনে রবী'আকে ডেকে বললেন: “তুমি যখন তাকে দেখলে, তখন আরো বরকতের দু'আ কেন করলেনা? বারাকাল্লাহ কেন বললে না?" (অর্থাৎ দুয়া করলে নজর লাগতো না)

এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন আমির রাযি. কে বললেন: অজু কর! আমির রাযি. অজু করলেন। অতঃপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর নির্দেশে অযুর পানি সাহল এর গায়ে ঢেলে দিলেন। আল্লাহর রহমতে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন।"

এটা বিশুদ্ধ সনদে নাসাঈ এবং ইবনে মাজাহতে বর্ণিত প্রসিদ্ধ একটি ঘটনা, যা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। আমরা বুঝতে পারি, ভালো মানুষের নজরও লাগতে পারেরে, এখানে আমির ইবনে রবিয়া রা. তো বদরি সাহাবি, বদরী সাহাবিদের আগের পরের সব গুনাহ মাফ!! এরকম মানুষের নজর লেগেছে, সেখানে অন্যরা কোন ছার..

[ঘ] আরেকটা হাদিস.. উম্মুল মুমিনিন হাফসা রা. কোনো সাহাবির বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে রাসুল সা.কে ওদের হালহাকিকত শোনালেন। বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ওই সাহাবির সন্তানরা প্রায় সময় অসুস্থ হয়ে থাকে.. রাসূল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আসলে বদনজর তাদের দিকে খুব দ্রুত কাজ করে!"

আসমা রা. এর ব্যাপারেও এরকম ঘটনা পাওয়া যায়.. (হাদিসগুলো মুসলিম শরিফে আছে)

আমার বাড়ির একটা গল্প বলি, এবার ছুটিতে গিয়ে আম্মুকে আমার বদনজর নিয়ে লেখা আগের প্রবন্ধগুলো দেখালাম। সেখানে "বদনজর মানুষকে কবর পর্যন্ত আর উটকে রান্নার পাতিল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়!" হাদিসটা দেখিয়ে আমি হাসতে হাসতে বললাম 'হাদিসটা মজাদার না'?!!

আম্মু দেখি মন খারাপ করে বলছে- কয়েকদিন আগে আমার একটা মুরগী মরে গেছে..

জিগাইলাম কিভাবে?

আম্মু বলছে- "সন্ধ্যায় সব মুরগিকে খাওয়ার দিয়ে আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, তখন ওই মুরগিটার দিকে তাকায়া বললাম ইশ! এরকম আর একটা মুরগিও হলোনা.. একটা মুরগিও এরকম বড়সড় না, আর এর মতো একটাও ডিম দেয় না... তারপর সব মুরগি কুটিরে উঠেছে, ওই বড়সড় মুরগিটাও উঠেছে। পরদিন সকালে দেখি ওই মুরগিটা আর বের হয়না! পরে কুটিরের ভিতরে তাকায়া দেখি মুরগিটা এক কোণায় মরে পড়ে আছে... একদম ভালো মুরগি, কোনো অসুখ ছিল না, আমার ওই কথাগুলা বলার সময় কি নজর লাগছিল?"

- আমি বললাম.. "হ্যা...."

জ্বিন আসরের জন্য রুকইয়াহ (জ্বিন ছাড়ানোর পদ্ধতি)[সম্পাদনা]

যিনি রুকইয়া করবেন তিনি প্রথমে সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে নিজের শরীরে হাত বুলিয়ে নিবেন। এরপর রুকইয়া শুরু করবেন। জ্বিনের রুগীর ক্ষেত্রে সাধারণত কথাবার্তা বলে জ্বিন বিদায় করতে হয়, এক্ষেত্রে যিনি রুকইয়া করবেন তাঁকে উপস্থিতবুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে। ঘাবড়ানো যাবেনা। রুগীর মাথায় হাত রেখে অথবা (গাইরে মাহরাম হলে) পাশে বসে জোর আওয়াজে রুকইয়ার আয়াতগুলো পড়তে থাকুন।

রুকইয়ার অনেক আয়াত আছে, তবে স্বাভাবিকভাবে

  • সুরা ফাতিহা।
  • আয়াতুল কুরসি।
  • সুরা বাকারার শেষ ২ আয়াত।
  • সুরা ফালাক।
  • সুরা নাস।
  • সুরা মু’মিনুনের ১১৫-১১৮ নং আয়াত।
  • সুরা সফফাতের প্রথম ১০ আয়াত।

পড়তে পারেন। ইনশাআল্লাহ যথেষ্ট হবে। জ্বিন ছেড়ে দেয়া পর্যন্ত এগুলো বারবার পড়তে হবে আর ফুঁ দিতে হবে, অথবা রুগীর মাথায় হাত রেখে পড়তে হবে। তাহলে ইনশাআল্লাহ জ্বিন পালাতে বাধ্য হবে।

বাড়িতে জ্বিনের উৎপাত থাকলেঃ[সম্পাদনা]

বাড়িতে জ্বিনের কোনো সমস্যা থাকলে পরপর তিনদিন পূর্ন সুরা বাক্বারা তিলাওয়াত করুন, এরপর আযান দিন। তাহলে ইনশাআল্লাহ সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। তিলাওয়াত না করে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কয়েকবার যদি সুরা বাক্বারা প্লে করা হয় তাহলেও ফায়দা পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। তবে সবচেয়ে ভালো ফল পেলে তিলাওয়াত করা উচিত। এরপর প্রতিমাসে অন্তত এক দুইদিন সুরা বাকারা পড়বেন। আর ঘরে প্রবেশের সময়, বের হবার সময়, দরজা-জানালা বন্ধের সময় বিসমিল্লাহ বলবেন। তাহলে ইনশাআল্লাহ আর কোন সমস্যা হবে না।

ওয়াসওয়াসা (OCD) রোগের জন্য রুকইয়াহ।[সম্পাদনা]

  1. এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়া। প্রতিদিন ১০০বার। কম হলেও ৩৩বার। أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ، مِنْ غَضَبِهٖ وَعِقَابِهِ، وَشَرِّ عِبَادِهِ، وَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِيْنِ، وَأَنْ يَّحْضُرُوْنِ
  2. আয়াতুল হারক (আযাব এবং জাহান্নাম সংক্রান্ত আয়াত) বেশি বেশি তিলাওয়াত করা। এবং প্রতিদিন ৩-৪বার এসবের তিলাওয়াত শোনা। (ডাউনলোড পেইজ দ্রষ্টব্য[৫])
  3. নাপাক থেকে বেঁচে থাকা, বিশেষত প্রস্রাবের ছিটা থেকে বাঁচা। যথাসম্ভব সর্বদা ওযু অবস্থায় থাকা।
  4. জামাআতের সাথে নামাজ পড়া, মুত্তাকী পরহেজগারদের সাথে উঠাবসা করা।
  5. সকাল-সন্ধ্যায় ও ঘুমের আগের আমলগুলো গুরুত্বের সাথে করা। টয়লেটে প্রবেশের দোয়া পড়া।[৪]

যাদু / বান মারা / তাবিজ করা ব্যক্তির জন্য রুকইয়াহঃ[সম্পাদনা]

যাদুর প্রকারভেদ অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকার রুকইয়া করা হয়। তবে কমন সেলফ রুকইয়া হচ্ছে, প্রথমে সমস্যার জন্য নিয়াত ঠিক করে নিন, ইস্তিগফার দরুদ শরিফ পড়ে শুরু করুন। তারপর কোন রুকইয়া শুনে নিশ্চিত হয়ে নিন আসলেই সমস্যা আছে কি না! শাইখ সুদাইসের রুকইয়া অথবা সিহরের রুকইয়া শুনতে পারেন (ডাউনলোড পেইজ দ্রষ্টব্য[৫])। সবশেষে একটি বোতলে পানি নিন, এরপর-

  1. সুরা আ'রাফ ১১৭-১২২ আয়াত।
  2. ইউনুস ৮১-৮২ আয়াত।
  3. সুরা ত্বহা ৬৯" আয়াতগুলো পড়ে ফুঁ দিন।
  4. শেষে সুরা ফালাক্ব, সুরা নাস ৩বার পড়ে ফুঁ দিন।
১.[৬]

وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ مُوسَىٰ أَنْ أَلْقِ عَصَاكَ ۖ فَإِذَا هِيَ تَلْقَفُ مَا يَأْفِكُونَ (117) فَوَقَعَ الْحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (118) فَغُلِبُوا هُنَالِكَ وَانقَلَبُوا صَاغِرِينَ (119) وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ (120)قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ (121) رَبِّ مُوسَىٰ وَهَارُونَ (122)

২.[৭]

فَلَمَّا أَلْقَوْا قَالَ مُوسَىٰ مَا جِئْتُم بِهِ السِّحْرُ ۖ إِنَّ اللَّهَ سَيُبْطِلُهُ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ (81) وَيُحِقُّ اللَّهُ الْحَقَّ بِكَلِمَاتِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُونَ (82)

৩.[৮]

وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا ۖ إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ ۖ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَىٰ (69)

তিন থেকে সাতদিন সকাল-বিকাল এই পানি খেতে হবে, আর গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করতে হবে। আর ৩/৪ সপ্তাহ প্রতিদিন কমপক্ষে দুইঘণ্টা রুকইয়া শুনতে হবে। একঘণ্টা সাধারণ রুকইয়া, আর একঘণ্টা সুরা ইখলাস, ফালাক, নাসের রুকইয়াহ। (অডিওর জন্য ডাউনলোড পেইজ দ্রষ্টব্য[৫]) আর পাশাপাশি তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে দোআ করতে হবে।

বেশীরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম সপ্তাহেই উন্নতি টের পাওয়া যায়, তবে এরপরের কয়েক সপ্তাহ একঘন্টা করে হলেও রুকইয়া শুনে যেতে হবে। বাদ দেয়া যাবে না। তাহলে ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুতই সুস্থ হয়ে যাবে। সমস্যা যদি দুই-তিন সপ্তাহ পরেও ভালো না হয়, তবে আবার অনুরূপ করতে হবে।

যাদুর জিনিশ অথবা তাবিজ খুঁজে পেলেঃ[সম্পাদনা]

কি দিয়ে যাদু করেছে যদি পাওয়া যায়, অথবা সন্দেহজনক কোন তাবিজ পেলে উপরে বলা আয়াতগুলো পড়ে পানিতে ফুঁ দিন, এরপর তাবিজ অথবা যাদুর জিনিশগুলো ডুবিয়ে রাখুন কিছুক্ষণ, তাহলে ইনশাআল্লাহ যাদু নষ্ট হয়ে যাবে। পরে সেগুলো পুড়িয়ে বা নষ্ট করে দিন।

যাদু আক্রান্ত হলে বুঝার উপায়ঃ[সম্পাদনা]

রুকইয়ার আয়াতগুলো যাদু আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর পড়লে, অথবা রুকইয়ার আয়াতের অডিও শুনলে যাদুগ্রস্তের অস্বাভাবিক অনুভূতি হয়। যেমনঃ- শরীর ঘর্মাক্ত হওয়া, প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, পেট ব্যথা, বুক ধড়ফড় করা ইত্যাদি।

রুকইয়ার আয়াত[সম্পাদনা]

কোরআন মাজিদের বিভিন্ন আয়াত দ্বারা রুকইয়া করা হয়, তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ কিছু আয়াত হচ্ছে[৯]

  1. সুরা ফাতিহা।
  2. সুরা বাকারা ১-৫ আয়াত।
  3. সুরা বাকারাহ ১০২ আয়াত
  4. সুরা বাকারাহ ১৬৩-১৬৪ আয়াত।
  5. সুরা বাকারাহ ২৫৫ আয়াত।
  6. সুরা বাকারাহ ২৮৫-২৮৬ আয়াত।
  7. সুরা আলে ইমরান ১৮-১৯ আয়াত।
  8. সুরা আ'রাফ ৫৪-৫৬ আয়াত।
  9. সুরা আ'রাফ ১১৭-১২২ আয়াত।
  10. সুরা ইউনুস ৮১-৮২ আয়াত।
  11. সুরা ত্বহা ৬৯ আয়াত।
  12. সুরা মু'মিনুন ১১৫-১১৮ আয়াত।
  13. সুরা সফফাত ১-১০ আয়াত।
  14. সুরা আহকাফ ২৯-৩২ আয়াত।
  15. সুরা আর-রাহমান ৩৩-৩৬ আয়াত।
  16. সুরা হাশর ২১-২৪ আয়াত।
  17. সুরা জিন ১-৯ আয়াত
  18. সুরা ইখলাস।
  19. সুরা ফালাক।
  20. সুরা নাস।
রুকইয়ার সাধারণ আয়াতসমূহ.pdf

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ইফাঃ ৫৫৪৪, ইসলাম ওয়েব ২২০০) 
  2. "রুকইয়াহ আশ-শিরকিয়্যাহ" 
  3. "প্রবন্ধঃ মুখতাসার রুকইয়াহ শারইয়্যাহ (তৃতীয় সংস্করণ)" 
  4. "[প্রবন্ধ] জিন এবং যাদুর ক্ষতি থেকে বাচার উপায়" 
  5. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; :0 নামের সূত্রের জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  6. সুরা আরাফ, আয়াত ১১২-১১৭ 
  7. সুরা ইউনুস, আয়াত ৮১-৮২ 
  8. সুরা ত্বহা, আয়াত ৬৯ 
  9. الصارم البتار في التصدي للسحرة الأشرار (২০তম সংস্করণ)। মিসর: শাইখ ওয়াহিদ বিন আব্দুস সালাম।