যুগল কিশোর রায় চৌধুরী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

যুগল কিশোর রায় চৌধুরী হলেন নবাব সিরাজউদ্দোলা এবং মাধবী তথা আলেয়ার পুত্র এবং ময়মনসিংহের জমিদার। মোহনলালের বোন মাধবীর সাথে নবাব সিরাজউদ্দোলার অবৈধ সম্পর্কের মাধ্যমে যুগল কিশোর রায় চৌধুরীর জন্ম হয়। পলাশীর যুদ্ধের পর তিনি মোহনলালের সাথে পালিয়ে ময়মনসিংহে চলে আসেন এবং ব্রিটিশদের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকতে নাম পরিবর্তন করে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেন।[১] তখন তার বয়স ছিলো ছয় বছর।

জন্ম[সম্পাদনা]

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মোহনলাল কাশ্মির থেকে বাংলায় আসেন। মোহনলালের বোনের নাম মাধবী। কিশোর সিরাজউদ্দোলার সাথে মাধবী প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সিরাজউদ্দোলা মাধবীর নাম দিয়েছিলেন হীরা। মুর্শিদাবাদে মাধবী তখন হীরা নামে পরিচিত ছিলো। হীরার গর্ভে সিরাজউদ্দোলার একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। এতে তিনি প্রচন্ড ভয় পেয়ে যান। তার ধারণা ছিলো নবাব আলীবর্দী খান জানতে পারলে তাকে কঠোর শাস্তি দিতে পারেন। কথিত আছে যে, সিরাজউদ্দোলা তখন একটি ঘোড়ায় শিশু পুত্রকে বেঁধে দিয়ে ঘোড়াকে তীরবিদ্ধ করেন। তীরের জখমে ঘোড়া দৌড়ে পালিয়ে যেতে থাকে। তার ধারণা ছিলো কেউ না কেউ ঘোড়াটি ধরে বাচ্চার জীবন রক্ষা করবে। ঘোড়া এবং বাচ্চার ঘটনা মোহনলাল জেনে গেলে তিনি প্রচন্ড রাগ করেন এবং তার বোনকে নিয়ে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। নবাব আলীবর্দী তা জানতে পেরে হীরাকে মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত করে মুসলিম রীতি মেনে সিরাজউদ্দোলার সাথে তার বিয়ে দেন। বিয়ের পর হীরার নাম হয় আলেয়া।

পলাশীর যুদ্ধের পরের জীবন[সম্পাদনা]

পলাশীর যুদ্ধের পর মোহনলাল সিরাজউদ্দোলার পুত্রকে সাথে নিয়ে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে ময়মনসিংহে চলে আসেন। ব্রিটিশরা মোহনলাল এবং সিরাজউদ্দোলার পুত্রকে হত্যা করার জন্য সারাদেশে গুপ্তচর পাঠাতে শুরু করেন। তখন মোহনলাল ময়মনসিংহের জমিদারি অন্তর্ভুক্ত বোকাই নগর দুর্গে তিনি আশ্রয় গ্রহণ করেন। অল্প কিছুদিন পর ব্রিটিশরা গুপ্তচর পাঠিয়ে তাদের ধরার চেষ্টা করছে, এই খবর পেয়ে মোহনলাল বোকাই নগর থেকে পালিয়ে যান। তখন তিনি তার সঙ্গী বাসুদেবের পরামর্শে তার চাচা বিনোদ রায়ের বাড়িতে সিরাজউদ্দোলার পুত্রকে রেখে আসেন।

দত্তক[সম্পাদনা]

মোহনলাল সিরাজউদ্দোলার পুত্রকে দত্তক রাখার জন্য ময়মনসিংহের জমিদার কৃষ্ণকিশোর চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেন। কৃষ্ণকিশোর চৌধুরী দত্তক নিতে রাজী হন। তার ছোটভাই কৃষ্ণগোপাল ছিলেন নিঃসন্তান। কৃষ্ণকিশোর ও কৃষ্ণগোপাল কেউই জানতেন না বাচ্চাটির প্রকৃত পরিচয়। তাদের বলা হয় আমহাটির বিনোদ রায়ের দ্বিতীয় ছেলেকে তারা দত্তক হিসেবে নিচ্ছেন। দত্তক অনুষ্ঠান করে কৃষ্ণগোপাল এই পুত্রকে দত্তক নেন। দত্তক নেওয়ার পর তার নাম হয় যুগল কিশোর রায়চৌধুরী। শুধুমাত্র বাসুদেব এবং হরনন্দ এই বিষয়টি জানতেন। তারা দুইজনেই ছিলেন সেনাপতি মোহনলালের বিশ্বস্ত সঙ্গী। দত্তক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দত্তক পুত্র যুগল কিশোর রায়চৌধুরী কৃষ্ণ গোপালের পিণ্ডাধিকারী ও উত্তরাধীকারী হিসেবে বিবেচিত হন। পরবর্তীতে কৃষ্ণকিশোর রায় ও গোপাল কিশোর রায় মারা যাবার পর যুগল কিশোর রায় জমিদারি লাভ করেন।

জমিদারি লাভ[সম্পাদনা]

যুগল কিশোর রায় চৌধুরী ময়মনসিংহে প্রতাপের সাথে জমিদারি পরিচালনা করতে শুরু করেন। কিছুদিন পর সিন্ধ্যা পরগনার মুসলিম জমিদারের সাথে তিনি বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। তখন সিন্ধ্যা পরগনার জমিদারের ও তার সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষ হয় যুগল কিশোর রায় চৌধুরীর। এতে মামলা হয় যুগল কিশোর রায় চৌধুরীর বিরুদ্ধে। মামলায় তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। কিন্তু এতে তার অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়। সেই সময় তার দুই পালক মা তার বিরোধীতা শুরু করে। তারা যুগল কিশোরের বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং সম্পত্তির অর্ধেক তাদের নামে নিয়ে নেন। তখন যুগলকিশোর চৌধুরী নিজের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারেন। তার দুই পালিত মা তাকে ইংরেজদের কাছে ধরিয়ে দিতে পারেন এই ভয়ে তিনি শ্রীহট্ট (বর্তমান সিলেট) জেলায় গিয়ে আত্মগোপন করেন। তিনি ময়মনসিংহের গৌরিপুর ছেড়ে সিলেটের কাজলশহর (বর্তমানে কাজলশাহ) এসে জমিদারি ক্রয় করেন।

পরিবার[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার যাপুর গ্রামের ভট্টাচার্য পরিবারের রুদ্রাণী দেবীকে বিয়ে করেছিলেন যুগলকিশোর রায়চৌধুরী। তাদের দুইজন পুত্র ও চার জন কন্যা সন্তান ছিলো। তাদের পুত্রদের নাম হলোঃ হরকিশোর এবং শিবকিশোর এবং কন্যাদের নাম হলো অন্নদা, বরদা, মোক্ষদা এবং মুক্তিদা। এদের মধ্যে শিবকিশোর অল্প বয়সেই মারা যান। শিব কিশোর রাজশাহী জেলার বীকুৎসা গ্রামের কাশীনাথ মজুমদারের মেয়ে ভাগীরথী দেবীকে বিয়ে করেন। তাদের একজন কন্যা সন্তান জন্মলাভ করেন। তার নাম ছিলো কৃষ্ণমণি। কৃষ্ণমণি শৈশবেই তার বাবকে হারান।

রুদ্রাণী দেবীর দুই পুত্র সন্তান মারা গেলে যুগলকিশোর আবার বিয়ে করেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম যমুনা। তাদের একজন পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে। তার নাম প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরী। প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরীকে সমস্ত ইতিহাস বলে গিয়েছিলেন যুগলকিশোর রায়চৌধুরী।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

যুগলকিশোর রায়চৌধুরীর সঠিক মৃত্যুসাল সম্পর্কে জানা যায় না। তবে ১৮১১-১২ সালের মধ্যে তার মৃত্যু হয় বলে মনে করা হয়। যুগলকিশোর রায়চৌধুরীর ইচ্ছে অনুসারে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তাকে সমাধিস্থ করেন প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরী।

বংশধারা[সম্পাদনা]

মূলত প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরীর মাধ্যমে যুগলকিশোর রায়চৌধুরী তথা সিরাজউদ্দোলার বংশের ধারা অব্যাহত থাকে। প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরীর প্রথম পুত্র কাজল বারো বছর বয়সে মারা যান। দ্বিতীয় পুত্র শৌরীন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রাণকৃষ্ণনাথ রায়চৌধুরী তার পুত্র শৌরীন্দ্রকিশোরকে নিজেদের পারিবারিক পরিচয় সম্পর্ক জানান এবং এই আন্দোলন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। তখন শৌরীন্দ্রকিশোর নিজের নাম বদল করে প্রথমে প্রসন্ন চন্দ্র রায়চৌধুরী এবং পরে প্রসন্ন কুমার দে রাখেন। তিনি ১৮৪৮ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তখন হিন্দু কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তরিত হয়। শৌরিন্দ্র কিশোরের তিন স্ত্রী ছিল। তার প্রথম স্ত্রী ত্রিপুরেশ্বরী দেবী এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। তার নাম হলো উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী। ত্রিপুরেশ্বরী দেবী সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর আত্মীয়রা সন্দেহ করেন শৌরিন্দ্র কিশোর-ই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী। তারা শৌরিন্দ্র কিশোরের বিরুদ্ধে মামলা করেন। কিন্তু পুলিশী তদন্তে এই মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং শৌরিন্দ্র কিশোরকে মুক্তি দেওয়া হয়। তার পুত্র উপেন্দ্র কিশোর বরিশালে নানার বাড়িতে পালিত হতে থাকেন। এরপর শৌরিন্দ্র কিশোর আবার বিয়ে করেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম মোহিনী। মোহিনীর গর্ভে শৌরিন্দ্র কিশোরের দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তাদের প্রথমপুত্রের নাম নলিনী কিশোর ওরফে বিজয় কুমার (নাম পরিবর্তন করেছিলেন)। তিনি আবারও নাম পরিবর্তন করে বিজয় কুমার থেকে লালা বিজয় কুমার নাম ধারণ করেন। অন্যদিকে প্রসন্ন কুমারের দ্বিতীয় পুত্র হেমন্ত কুমার। প্রসন্ন কুমারের প্রথম স্ত্রীর ভাই ছিলেন পুলিশ। তিনি যখন সিলেটে বদলি হয়ে আসেন তখন তিনি তার বোনের মৃত্যুর ঘটনা পুনঃতদন্ত শুরু করেন। এই অবস্থায় প্রসন্ন কুমার দে বিপদের আশঙ্কা করে কাজল শাহর জমিদারি তার ম্যানেজারের দায়িত্বে দিয়ে সুনামগঞ্জে জমিদারি কিনেন এবং সেখানে চলে যান। সেখানে যেয়ে তিনি আবার নাম পরিবর্তন করে প্রসন্ন চন্দ্র থেকে প্রসন্ন কুমার দে নামধারণ করেন। অন্যদিকে তার ম্যানেজার বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং কাজল শাহের জমিদারি হাতছাড়া হয়ে যায় প্রসন্ন কুমারের।

প্রসন্ন কুমারের দ্বিতীয় স্ত্রী মারা গেলে তিনি আবার বিয়ে করেন। তার তৃতীয় স্ত্রীর নাম হীরন্ময়ী। হীরন্ময়ী ছয়জন পুত্র ও একজন কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। তার পুত্রদের নাম হলোঃ পূর্ণেন্দু, ঘনেন্দু, নীরেন্দু,শরদিন্দু, প্রশান্ত ও নওয়াল কুমার। প্রসন্নকুমার সুনামগঞ্জে ‘জুবলি স্কুল’ নামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পরে তা মাধ্যমিকে রূপান্তরিত হয়। তিনি সেখানে প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে চাকরি করেন। তিনি সুনামগঞ্জে প্রথম প্রিন্টিং প্রেস ‘জুবিলি প্রিন্টার্স’ স্থাপন করেন।

প্রসন্নকুমার দে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ৮৫ বছর বয়সে সুনামগঞ্জে মারা যান।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]