মক্কার বলি খেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
(বলী খেলা)
Boli Khela, Pohela Boishakh (2014) (19204236770).jpg
লক্ষ্যপ্রতিপক্ষকে আঘাত
কঠোরতাপূর্ণ সংস্পর্শ
উত্পত্তির দেশFlag of Bangladesh.svg বাংলাদেশ
বিখ্যাত অনুশীলনকারীদিদারুল আলম
মূলঐতিহাসিক
অলিম্পিক খেলানা

মক্কার বলি খেলা বা মক্কারো বলিখেলা এক বিশেষ ধরনের কুস্তি খেলা, যা চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার অন্তর্গত মাদার্শা ইউনিয়নে প্রতিবছরের বাংলা সনের ০৭ই বৈশাখে অনুষ্ঠিত হয়। এই খেলায় অংশগ্রহনকারীদেরকে বলা হয় বলী। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কুস্তি, বলীখেলা নামে পরিচিত। তিন শতাধিক বছর পূর্বে ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের মক্কা থেকে আগত ইয়াছিন মক্কীর নাতি কাদের বক্সু ১৮৭৯ সালে তাদের প্রজাদের থেকে খাজনা আদায়ের সময় আনন্দ দেওয়ার জন্য সর্বপ্রথম বলি খেলার সূচনা করেন। পরবর্তীতে তার মৃত্যুর পর এটি মক্কারো বলি খেলা নামে পরিচিত লাভ করে। বলি খেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার জায়গাজুড়ে বৈশাখী মেলারও আয়োজন করা হয়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

সাতকানিয়ার মাদার্শা মক্কার বাড়ির বংশধর, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক ড. আবুল আলা মুহাম্মদ হোছামুদ্দিন বলেন, এখন থেকে তিন শতাধিক বছর পূর্বে তাদের পূর্ব পুরুষ সৌদি আরবের মক্কার বাসিন্দা ইয়াছিন মক্কী ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সাতকানিয়ায় আসেন এবং মাদার্শার পাহাড়ি এলাকায় বসবাস শুরু করেন।

এরপর থেকে এলাকাটি মক্কা বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইয়াছিন মক্কী এলাকায় ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি কিছু ব্যবসাও শুরু করেন। হজ্ব মৌসুমে তিনি বাংলাদেশের অনেক হাজীকে হজ্ব করানোর জন্য সৌদি আরবে নিয়ে যেতেন। এক সময় তিনি সাতকানিয়ার মাদার্শা এলাকায় স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। সে সুবাদে সাতকানিয়া ছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে তিনি বিপুল পরিমান জায়গা কিনে নেন। বিয়েও করেছেন বাংলাদেশ থেকে। ইয়াছিন মক্কী এক হজ্ব মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু হাজী নিয়ে সৌদি আরবে যান এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ইয়াছিন মক্কীর পরবর্তী প্রজন্ম জমিদারি প্রথা চালু করেন। ১৮৭৯ সালে ইয়াছিন মক্কীর নাতি কাদের বক্সু চৌধুরী খাজনা দিতে আসা প্রজা এবং এলাকার লোকজনকে আনন্দ দেয়ার উদ্দেশ্যে সর্ব প্রথম বলী খেলার আয়োজন করেন। এরপর থেকে এটি মক্কার বলি খেলা নামে পরিচিত লাভ করে। [১] [২] কাদের বক্স এর নাতি ও বর্তমানে মক্কার বলী খেলার মূল আয়োজক নাজেমুল আলম চৌধুরী বলেন, আমার দাদা মূলত খাজনা দিতে আসা লোকজন এবং এলাকার মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য বলীখেলার আয়োজন করতেন। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ৭ তারিখে সবাই দল বেঁধে খাজনা দিতে আসতেন। ওই দিন মক্কার বাড়ি এলাকায় খাজনা দিতে আসা লোকদের ভিড় জমে যেতো। আমার দাদা খাজনা দিতে আসা লোকদের জন্য মেজবানের আয়োজন করতেন। খাজনা প্রদানকারী এবং এলাকার মানুষকে বাড়তি আনন্দ দিতে বলী খেলার আয়োজন করতেন। শুরুর দিকে বাড়ির সামনে বিশালাকৃতির একটি গাছের টুকরো রাখতেন।

খাজনা দিতে আসা এবং স্থানীয় লোকদের মধ্য থেকে যারা ওই গাছের টুকরো উপরে তুলতে পারতেন তারাই কেবল বলী খেলার উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হতেন। গাছের টুকরা ওঠানোর যারা যোগ্যতা অর্জন করতেন তাদের মধ্যে মূল প্রতিযোগিতা বলি খেলা হতো এবং বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার দিতেন। গাছের টুকরো তুলে প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জনকারীরা বলীখেলায় হেরে গেলেও তাদের মাঝে শান্তনা পুরস্কার বিতরণ করতেন। এভাবে চলতে চলতে মক্কার বলীখেলা এক পর্যায়ে এলাকার মানুষের আনন্দের মূল কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। সাতকানিয়া ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে বলী খেলা দেখতে উৎসুক জনতা মক্কার বাড়ি এলাকায় ভিড় জমান। এরপর থেকে বলী খেলা উপলক্ষে মেলার আয়োজন শুরু হয়।[৩]

নাজেমুল আলম চৌধুরী আরো জানান, আমার দাদা যেহেতু বৈশাখের ৭ তারিখে খেলার আয়োজন করতেন আমরাও একই তারিখে বলী খেলা এবং মেলার আয়োজন করি। কোন ধরনের প্রচার প্রচারণা ছাড়াই এই মক্কার বলী খেলায় চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য লোক খেলা দেখতে ছুঁটে আসেন। বলী খেলা উপলক্ষে মক্কার বাড়ির আশপাশে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসবে বৈশাখী মেলা। মেলার আগের দিন থেকে দোকানীরা নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। সেখানে খাবার, কাপড়-চোপড়, কসমেটিকসের দোকান ছাড়াও বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিসপত্র, নানা কৃষি উপকরণসহ গ্রামীণ পরিবারে সারা বছরের প্রয়োজনীয় যাবতীয় সামগ্রী মেলায় পাওয়া যায়। লোকজন বলী খেলা উপভোগের পাশাপাশি মেলা থেকে ব্যবহারের সব জিনিসপত্রও কিনে নেন।

তিনি আরো জানান, বৈশাখ মাসের ৭ তারিখে সকাল থেকে মেলায় কেনা-কাটা হলেও বলী খেলা শুরু হয় মূলত বিকালে। সমস্ত মেহমান এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বলীদের খাবারের পর দুপুর আড়াই টার দিকে মক্কার বাড়ির লোকজন হলুদ রঙের বিশাল আকৃতির ছাতা মাথায় দিয়ে বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে মাঠে প্রবেশের পর শুরু হয় বলী খেলার মূল কার্যক্রম। মক্কার বাড়ির লোকজন মাঠে উপস্থিত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থান হতে আগত বলিদের মধ্যে থেকে বলি খেলা শুরু হয় এবং খেলা শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

মল্ল পরিবার ও বলীখেলা[সম্পাদনা]

চট্টগ্রামে বলি খেলার একটি দৃশ্য।

চট্টগ্রাম বলির দেশ। কর্ণফুলীশঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থানের উনিশটি গ্রামে মল্ল উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল। প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির অধিকারী মল্লরা সুঠামদেহী সাহসী পুরুষ এবং তাদের বংশানুক্রমিক পেশা হচ্ছে শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন। এই মল্লবীরেরাই ছিলেন বলিখেলার প্রধান আকর্ষণ ও বলিখেলা আয়োজনের মূল প্রেরণা। চট্টগ্রামের বাইশটি মল্ল পরিবার ইতিহাস প্রসিদ্ধ। আশিয়া গ্রামের আমান শাহ মল্ল, চাতরি গ্রামের চিকন মল্ল, কাতারিয়া গ্রামের চান্দ মল্ল, জিরি গ্রামের ঈদ মল্ল ও নওয়াব মল্ল, পারি গ্রামের হরি মল্ল, পেরলা গ্রামের নানু মল্ল, পটিয়ার হিলাল মল্ল ও গোরাহিত মল্ল, হাইদগাঁওর অলি মল্ল ও মোজাহিদ মল্ল, শোভনদন্ডীর তোরপাচ মল্ল, কাঞ্চননগরের আদম মল্ল, ঈশ্বরখাইনের গনি মল্ল, সৈয়দপুরের কাসিম মল্ল, পোপাদিয়ার যুগী মল্ল, খিতাপচরের খিতাপ মল্ল, ইমামচরের ইমাম মল্ল, নাইখাইনের বোতাত মল্ল, মাহাতার এয়াছিন মল্ল, হুলাইনের হিম মল্ল, গৈরলার চুয়ান মল্ল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]