বিজয় চাঁদ মহতাব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
বিজয় চাঁদ মহতাব
Sir Bijay Chand Mahtab, Maharaja Bahadur of Burdwan, in 1931.jpg
১৯৩১ সালে বিজয় মহতাব।
জন্ম(১৮৮১-১০-১৯)১৯ অক্টোবর ১৮৮১
ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু২৯ আগস্ট ১৯৪১(1941-08-29) (বয়স ৫৯)
বর্ধমান, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত

মহারাজাধিরাজ বাহাদুর স্যার বিজয় চাঁদ মহতাব GCIE KCSI (১৯ অক্টোবর ১৮৮১ - ২৯ আগস্ট ১৯৪১) [১] ১৮৮৭ থেকে ১৯৪১ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত বর্ধমান স্টেট বাংলার ব্রিটিশ ভারতের শাসক ছিলেন।.[২][৩]

জীবন[সম্পাদনা]

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

তার পূর্বসূরি, মহারাজা আফতাব চাঁদ মহতাব (শাসন: ১৮৭৯-৮৫) উত্তরাধিকারী ছাড়াই মারা যান, এবং তার বিধবা ১৮৪২-১৮৭৯ বর্ধমান এস্টেটের অতীতের শাসক মাহতাব চাঁদ বাহাদুরের একজন আত্মীয় বনবিহারী কাপুরের পুত্র বিজয় চাঁদ মহতাবকে দত্তক গ্রহণ করেন। দত্তক গহনের সময় ১৮৮৭ সালে ২৩ জুলাই কলিকাতা সেকালের ও একালের তিনি মাত্র ছয় বছর বয়সের ছিলেন তাই দেওয়ান সহ প্রতিপাল্যাধিকরণ, বন বিহারি কাপুর, (বিজয়চাদের জন্মদাতা পিতা) ১৯০২ অবধি এস্টেট শাসন করেন। সরকার ১৮৯৭ সালে রাজ্যে ৬০০ জন সশস্ত্র বাহিনী এবং ৪১টি কামান বজায় রাখার অনুমতি দেয়।[৪]

শিক্ষা[সম্পাদনা]

১৮৯৯ সালে, বিজয় চাঁদ মাহতাব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন এবং রাজ পরিবারে প্রথমবারের মতো একটি বিধিবৎ শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করেন।

শাসনকাল[সম্পাদনা]

১৯০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হন এবং বর্ধমান রাজের সিংহাসনে পূর্ণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। পরের বছর ১৯০৩ সালে, দিল্লি দরবারে তাকে 'রাজাধিরাজ' উপাধি দেওয়া হয়। বর্ধমানের প্রাসাদে একটি জাঁকজমকপূর্ণ রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে লেফটেন্যান্ট গভর্নর বোরডিলন সম্মান প্রদানের জন্য উপস্থিত ছিলেন। [৪]

১৯০৩ সালে, তিনি গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জনকে বর্ধমান প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান এবং গথিক শৈলীতে কার্জন গেট হিসেবে পরিচিত একটি গেট নির্মাণের অনুষ্ঠান উদযাপন করেন, যা আজ বর্ধমানের একটি প্রধান বিশিষ্ট চিহ্ন এবং বিজয়চন্দ্র রোড এবং গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের জংশনে অবস্থিত।[৫]

১৯০৩ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রেজারের জীবন রক্ষা করেছিলেন। ১৯০৮ সালের ৭ ই নভেম্বর ম্যালকম্যান্ট কর্তৃক বাংলার তদানীন্তন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রেজারকে হত্যা করার প্রয়াস করার সময়, তিনি তার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে রক্ষা করেছিলেন। ব্রিটিশদের প্রতি তার আনুগত্যের জন্য তিনি কে.সি.আই.ই এবং ইন্ডিয়ান অর্ডার অফ মেরিট (ক্লাস III)এর শিরোনামে সম্মানিত হন।[১][৪]

১৯০৬ সালে বিজয় চাঁদ

১৯০৮ সালে লর্ড মিন্টোর একটি ঘোষণা অনুযায়ী, 'মহারাজাধিরাজ্' উপাধিতে উত্তীর্ণ হয়, যা উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল।[৪]

তিনি বহু বছর ধরে আইন-প্রণয়নকারী পরিষদ্ এবং প্রাদেশিক পরিষদের মধ্যে বাংলার জমিদারদের প্রতিনিধিত্ব করেন।

১৯০৮ সালে তিনি ইংল্যান্ড ও ইউরোপ সফর করেন এবং পরে ডায়েরির অফ অ্যান ইউরোপীয় ট্যুর নামে একটি বই লিখেছিলেন।[১]

তিনি তার মানব কল্যাণের জন্যও সুপরিচিত ছিলেন, বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কল্যাণ ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯০৮ সালে তিনি রাঁচি আর্ট কলেজ, রাঁচি জন্য হোস্টেল এবং অন্যান্য সুবিধা নির্মাণের জন্য ৪০,০০০/ - দান করেন, যেখানে বর্ধমান রাজের বৃহৎ এস্টেট ছিল। বিজয় চাঁদ হাসপাতালও ১৯১০ এর দশকে তার রাজত্বকালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তিনি ১৯০৭ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য এবং ১৯০৯ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে রাজ্যের প্রশাসনের সাথে এবং ১৯১২-১৯২৪ সাল পর্যন্ত বাংলার নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন।

১৯১১-১৯১৮ এবং আবার ১৯২৫ সালে তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন।

১৯১৪ সালে তিনি বজবজ ও কোমাগাটা মারু দাঙ্গার তদন্ত কমিটির একজন সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন।[৬]

১৯২৪ সালে স্যার চার্লস টডহান্টার পরিচালিত একটি কমিটিতে তিনি একজন সদস্য ছিলেন, যেটি ব্রিটিশ ভারতে করারোপণ সংস্কারের দিকে তত্ত্বাবধান করে ১৯২৫ সালে তার প্রতিবেদন জমা দেয় [৭] এবং ১৯২৪ সালের ভারতীয় পুনর্গঠন তদন্ত কমিশনের সদস্যও ছিলেন।

ব্রিটিশদের প্রতি তার আনুগত্য সত্ত্বেও, তিনি মহাত্মা গান্ধীকে উষ্ণ আতিথেয়তা প্রদান করেন, যখন তিনি ১৯২৫ সালে বর্ধমানে আসেন এবং ১৯২৮ সালে পৌর নির্বাচনে প্রচারের জন্য সুভাষচন্দ্র বসু যখন বর্ধমান যান তখন তাকেও তিনি স্বাগত জানান। যদিও, শাসনামলের পরবর্তী অংশে অব্যাবস্থার সঙ্গে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল এবং রাজের প্রশাসন পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশ প্রশাসন বর্ধমান রাজের সম্পূর্ন পরিচালনা গ্রহন করে এবং ১৯২৯-১৯৩৬ সাল পর্যন্ত বিজয় চাঁদকে পরিচালনার দায়িত্ব হেকে বঞ্চিত হতে হয়।

১৯৩৬ সালে, তিনি ব্রিটিশ দ্বারা তার এস্টেটের পরিচালনার দায়িত্ব পুনরায় ফিরে পান । ১৯৩২ সালে তিনি ফ্রান্সিস ফ্লাউড কমিশনের সদস্য ছিলেন।

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিবর্তন করার পরামর্শ দেন কমিশন। রয়টারওয়ারী ( প্রজাস্বত্ব) ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদারি ব্যবস্থার পরিবর্তনের সুপারিশ করে, যার মধ্যে প্রজার কাছে জমির মালিকানা ন্যস্ত থাকবে এবং তার দ্বারা প্রদেয় জমি রাজস্ব নিয়মিতভাবে সংশোধিত হতে পারে। ফজলুল হক মন্ত্রণালয়ের মতপার্থক্যের কারণে প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

যদিও, ভারতের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হওয়ার সঙ্গে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে জমিদার এবং রাজকীয় দিন শেষ হয় আসছে। এটি উপলব্ধি করে বিজয়চাঁদ মাহতাব কংগ্রেসকে পরোক্ষ সমর্থনে উৎসাহিত হন।

লেখক[সম্পাদনা]

বিজয়চন্দ্র মহতাব বাংলা সাহিত্যে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯১৪ সালে বর্ধমানের বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের ৮ তম অধিবেশনে অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি যে, কুড়িটি বই লিখেছেন সেগুলির মধ্য থেকে ইম্প্রেসন, দ্য ইন্ডিয়ান হরাইজন, মেডিটেশন, স্টাডিজ, বিজয়গীতিকা (তার সুরারোপিত সংগৃহীত গান) , ত্রয়োদশী (কবিতা), রনজিৎ (নাটক), এবং মনালিসা (বিজ্ঞান-নাটক) উল্লেখযোগ্য।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

২৯ আগস্ট বর্ধমানে বিজয় চাঁদ মহতাবের মৃত্যু হয়। [৮] তার রাজত্ব যা ১৮৮৭ সালে শুরু হয় এবং ১৯৪১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়, এটি বর্ধমান রাজের ইতিহাসে দীর্ঘতম শাসনকাল।

উত্তরাধিকারী[সম্পাদনা]

তিনি দুই পুত্র উদয় চাঁদ এবং অভয় চাঁদ এবং দুই কন্যা ছেড়ে চলে যান, যার ফলে বর্ধমান রাজের উত্তরাধিকারের জন্য দত্তক গ্রহণের দীর্ঘ ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে। তার বড় ছেলে উদয় চাঁদ মহতাব বর্ধমান রাজের সিংহাসনে বসেন।

খেতাব[সম্পাদনা]

সম্মান[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Journal of the Royal Asiatic Society (New Series) Table of Contents – October 1941 – Volume 73, Issue 04 pp: 387–388 Obituary : Maharaja Adhiraja Bijay Chand Mahatab of Burdwan.
  2. Imperial gazetteer of India: provincial series, 1909 – Volume 5 – Page 270
  3. Komagata maru, a challenge to colonialism: key documents by Komagata maru, a challenge to colonialism: key documents। Unistar Books। ২০০৫। পৃষ্ঠা 245–46। 
  4. Imperial Gazetteer of India by Sir William Wilson Hunter, 1908 – Page 101
  5. "Curzon Gate"। ২৫ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ মে ২০১৮ 
  6. The Voyage of the Komagata Maru: The Sikh Challenge to Canada's Colour Bar By Hugh Johnston। ২০১১। পৃষ্ঠা 109। 
  7. Taxation and the Indian Economy by S.M. Jha, 1990– Page 166
  8. "Maharaja of Burdwan Dead"The Straits Times। ৩১ আগস্ট ১৯৪১। পৃষ্ঠা 2। সংগ্রহের তারিখ ৯ মে ২০১৭ 
  9. "নং. 28210"দ্যা লন্ডন গেজেট (সম্পূরক) (ইংরেজি ভাষায়)। ২৯ ডিসেম্বর ১৯০৮। 
  10. "নং. 28559"দ্যা লন্ডন গেজেট (সম্পূরক) (ইংরেজি ভাষায়)। ৮ ডিসেম্বর ১৯১১। 
  11. "নং. 32893"দ্যা লন্ডন গেজেট (সম্পূরক) (ইংরেজি ভাষায়)। ২৮ ডিসেম্বর ১৯২৩। 

বহিসংযোগ[সম্পাদনা]