বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় উভয় ব্যবস্থার কারণে বহুবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়েছে। [১] ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় তফসিল অনুসারে, সংসদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতেন একটি গোপন ভোটে। [২] পরে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী অনুসারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতির বিধান চালু করা হয়। তবে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর পরেই সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান চালু করা হয়েছিল। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্তমানে সংসদ সদস্যদের দ্বারা পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। [৩]

পদ্ধতি[সম্পাদনা]

প্রয়োজনীয়তা যোগ্যতা[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের সংবিধান ব্যক্তির রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করেছে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য এই মানদণ্ডগুলি অবশ্যই মেনে চলতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচনের যোগ্য হতে পারবেন না যদি তারা:

  • বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের কম; বা
  • সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচনের যোগ্যতা অর্জন করেননি; বা
  • এই সংবিধানের অধীনে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরানো হয়েছে। [৩]

মেয়াদকাল[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী:

  • রাষ্ট্রপতি তার পদে প্রবেশের তারিখ থেকে পাঁচ বছরের জন্য মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে শর্ত থাকে যে তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও রাষ্ট্রপতি তাদের উত্তরসূরি অফিসে প্রবেশ না করা অবধি পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন।
  • কোনও ব্যক্তি দু'বারের অধিক মেয়াদে রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না, এটি পরপর হোম বা না হোক।
  • রাষ্ট্রপতি স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখে পদত্যাগ করতে পারেন।
  • রাষ্ট্রপতি তাদের কার্যকালীন সময়ে সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচনের জন্য যোগ্য নন এবং সংসদের কোনও সদস্য রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হলে তারা রাষ্ট্রপতির পদে প্রবেশের দিন সংসদে তাদের আসন খালি ঘোষণা করবেন। [৪]

নির্বাচন প্রক্রিয়া[সম্পাদনা]

যখনই রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়ে যায়, নতুন রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন। [৩] যদিও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এমপিদের কাছ থেকে প্রকৃত ভোটদানের সাথে জড়িত, তারপরও তাদের মধ্যে সর্বসম্মতভাবে নিজ নিজ দল-সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে বৈধ অভিযোগ আনা হলে এবং সংসদের দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি ভোটের সমর্থন পেলে তাকে অভিশংসন করা যায়।

শপথ এবং নিশ্চিতকরণ[সম্পাদনা]

রাষ্ট্রপতিকে জাতীয় সংসদের স্পিকারের উপস্থিতিতে শপথ নিতে হয়। নিম্নলিখিত আকারে একটি শপথ (অথবা নিশ্চিতকরণ) স্পীকার দ্বারা পরিচালিত হয়⎯

সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ (বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা) করিতেছি যে, আমি আইন-অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি-পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব;

আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব;

আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান করিব;

এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন-অনুযায়ী যথাবিহীত আচরণ করিব।

— ১৪৮ অনুচ্ছেদ, বাংলাদেশের সংবিধান

ইতিহাস[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এগারোটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে তিনটি সরাসরি নির্বাচন ছিল। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৪ সালে, সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ নির্বাচনের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন।[৫][৬] রাষ্ট্রপতি সরকার প্রবর্তনের আগে তিনিই প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৪ জানুয়ারী ১৯৭৪ সালে। নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা তাকে সর্বসম্মতভাবে নির্বাচিত করেন।

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সাধারণ ভোটারদের অংশগ্রহণে ১৯৭৮ সালের ৩ জুলাই প্রথম সরাসরি বা গণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।[২][৬] ১১ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেন। প্রাথমিকভাবে ২টি মনোনয়নপত্র অনুমোদন করা হয়নি। যাইহোক, পরে দুই জন অযোগ্য প্রতিযোগীর একজনের আবেদন গৃহীত হলে প্রতিযোগী সংখ্যা ১০ জনে বৃদ্ধি পায়। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেই নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।[৭]

দ্বিতীয়বারের মতো সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর একইভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নির্বাচনের ৮৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। ১১ টি মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। বৈধ প্রার্থীদের সংখ্যা কমে ৭২ জন হয়। পরে, ৭২ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩৩ জন প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিলেন প্রতিযোগীর সংখ্যা হয় ৩৯ জন। ওই নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিচারপতি আবদুস সাত্তার।[৬][৮]

১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর তৃতীয় সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই নির্বাচনে ১৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, তবে চার প্রার্থীর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরে মোট প্রতিযোগীর সংখ্যা বারো জন হয়ে যায়। উল্লেখযোগ্যভাবে প্রধান বিরোধী দলগুলি, যারা সামরিক আইন তুলে নেওয়ার দাবি করেছিল, তারা এই নির্বাচনগুলি বয়কট করেছিল।[৯][১০] দায়িত্বপ্রাপ্ত লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যিনি তার নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানের পরে ৩ বছর আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, সেই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।[৬][১১]

১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পূনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।[৬][১২] সংসদীয় ব্যবস্থা পুনপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে সংসদ সদস্যদের দ্বারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। ১৯৯১ সালের পর যারা রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা হলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস,[১৩] বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী,[১৪] অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ,[১৫] জিল্লুর রহমান[১৬] এবং আব্দুল হামিদ।[১৭][১৮] তাদের সবাই-ই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তালিকা[সম্পাদনা]

নির্বাচনের আদেশ বছর নির্বাচিত সরকারী ব্যবস্থা নির্বাচনের ধরণ
প্রথম ১৯৭৪ মোহাম্মদ মো সংসদীয় ব্যবস্থা [১] গোপন ব্যালটের মাধ্যমে অপ্রত্যক্ষ নির্বাচন [২]
দ্বিতীয় ১৯৭৮ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক সমর্থিত রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা জনগণের ভোটদানের মাধ্যমে সরাসরি নির্বাচন
তৃতীয় ১৯৮১ আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি সিস্টেম প্রত্যক্ষ নির্বাচন, জনগণের ভোটের মাধ্যমে
চতুর্থ ১৯৮৬ হুসেন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক সমর্থিত রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ নির্বাচন, জনগণের ভোটের মাধ্যমে
পঞ্চম ১৯৯১ আবদুর রহমান বিশ্বাস সংসদীয় ব্যবস্থা সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে পরোক্ষ নির্বাচন
ষষ্ঠ ১৯৯৬ শাহাবুদ্দিন আহমেদ সংসদীয় ব্যবস্থা পরোক্ষ নির্বাচন, সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে
সপ্তম ২০০১ এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংসদীয় ব্যবস্থা পরোক্ষ নির্বাচন, সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে
অষ্টম ২০০২ ইয়াজউদ্দিন আহমেদ সংসদীয় ব্যবস্থা পরোক্ষ নির্বাচন, সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে
নবম ২০০৯ জিল্লুর রহমান সংসদীয় ব্যবস্থা পরোক্ষ নির্বাচন, সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে
দশম ২০১৩ আবদুল হামিদ সংসদীয় ব্যবস্থা পরোক্ষ নির্বাচন, সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে
একাদশ ২০১৮ আব্দুল হামিদ সংসদীয় ব্যবস্থা পরোক্ষ নির্বাচন, সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Prime Minister - Banglapedia"en.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  2. "Rastrapati - Banglapedia"en.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  3. "Article 48 of Bangladesh Constituition - bdlaws.minlaw.gov.bd"bdlaws.minlaw.gov.bd (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  4. "Article 50 of Bangladesh Constitution - bdlaws.minlaw.gov.bd"bdlaws.minlaw.gov.bd (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  5. "Mohammad Mohammadullah - Banglapedia"en.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  6. "History Presidetial election of Bangladesh"www.channelionline.com। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  7. "Ziaur Rahman - Banglapedia"en.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  8. "Abdus Sattar - Banglapedia"en.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  9. Stevens, William K.; Times, Special To the New York (১৯৮৩-১২-১২)। "Bangladesh Leader in Military Regime Assumes Presidency"The New York Times (ইংরেজি ভাষায়)। আইএসএসএন 0362-4331। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-১২-২৭ 
  10. Weisman, Steven R.; Times, Special To the New York (১৯৮৬-১০-১৭)। "Bangladesh Chief Claims Vote Victory"The New York Times (ইংরেজি ভাষায়)। আইএসএসএন 0362-4331। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-১২-২৭ 
  11. "Hussain Muhammad Ershad - Banglapedia"en.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  12. "The rise and fall and rise of politics - Thedailystar"www.thedailystar.net (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  13. "Abdur Rahman Biswas - Banglapedia"en.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  14. "AQM Babdruddoza Chowdhury - Banglapedia"en.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  15. "Iajuddin Ahmed - Banglapedia"en.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  16. "Zillur Rahman - Banglapedia"en.banglapedia.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  17. "First term of Abdul Hamid as president - Thedailystar"www.thedailystar.net (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 
  18. "Second term of Abdul Hamid as president - Thedailystar"www.thedailystar.net (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৪-২৭ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]