বিষয়বস্তুতে চলুন

পিএইচ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বিভিন্ন পরিচিত পদার্থের পিএইচ মানের একটি সাধারণ চিত্রভিত্তিক স্কেল। লাল রং অম্লীয়, সবুজ রং নিরপেক্ষ এবং নীল রং ক্ষারীয় পদার্থ নির্দেশ করে।

পিএইচ (ইংরেজি: pH) হলো একটি জলীয় দ্রবণের অম্লতা (acidity) বা ক্ষারীয়তা (alkalinity) পরিমাপের একটি আন্তর্জাতিক লগারিদমিক স্কেল[১]। সহজ কথায়, কোনো দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়নের () সক্রিয়তা বা ঘনমাত্রা কত, তা পিএইচ স্কেলের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। পিএইচ যত কম হবে দ্রবণটি তত বেশি অম্লীয়, আর পিএইচ যত বেশি হবে দ্রবণটি তত বেশি ক্ষারীয়।

রসায়ন, জীববিজ্ঞান, কৃষি, চিকিৎসা বিজ্ঞান, খাদ্য বিজ্ঞান এবং পরিবেশ বিদ্যায় পিএইচ স্কেলের ব্যবহার অত্যন্ত ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। মানবদেহের রক্ত থেকে শুরু করে সমুদ্রের পানি, শিল্পকারখানার বর্জ্য থেকে কৃষিজমির মাটি — সর্বত্র পিএইচ পরিমাপ একটি অপরিহার্য হাতিয়ার।

নামকরণ ও ব্যুৎপত্তি

[সম্পাদনা]

'pH' শব্দটি মূলত একটি গণিতীয় ও রাসায়নিক সংকেত। এর পূর্ণরূপ ও উৎস নিয়ে দুটি প্রধান মতবাদ প্রচলিত:

  • Potenz of Hydrogen — জার্মান শব্দ Potenz অর্থ "ক্ষমতা" বা "শক্তি"। এখানে 'p' অক্ষরটি এই জার্মান শব্দ থেকে এসেছে এবং 'H' দ্বারা হাইড্রোজেন আয়ন () নির্দেশ করা হয়।
  • Potential of Hydrogen — ইংরেজিতে "হাইড্রোজেনের সম্ভাব্যতা" অর্থে ব্যবহৃত হয়, বিশেষত তড়িৎরাসায়নিক পরিমাপের সাথে সংযুক্ত।[২]

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিশুদ্ধ ও ফলিত রসায়ন সংস্থা (আন্তর্জাতিক বিশুদ্ধ ও ফলিত রসায়ন সংস্থা) অনুযায়ী 'p' চিহ্নটি "−log₁₀" অপারেটরের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ 'pH' মানে হলো হাইড্রোজেন আয়নের ঘনমাত্রার ঋণাত্মক দশমিক লগারিদম।

ইতিহাস

[সম্পাদনা]
ডেনিশ রসায়নবিদ সোরেন পেডার লরিটজ সোরেনসেন (১৮৬৮–১৯৩৯), পিএইচ স্কেলের উদ্ভাবক।

সোরেনসেনের উদ্ভাবন (১৯০৯)

[সম্পাদনা]

১৮৬৮ সালে ডেনমার্কে জন্মগ্রহণকারী বিজ্ঞানী সোরেন পেডার লরিটজ সোরেনসেন (Søren Peder Lauritz Sørensen) কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে চিকিৎসা বিজ্ঞান অধ্যয়ন শুরু করেন, পরবর্তীতে তাঁর শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় রসায়নে চলে আসেন[৩]।

কোপেনহেগেনের বিখ্যাত কার্লসবার্গ ল্যাবরেটরিতে (Carlsberg Laboratory) তিনি ৩৭ বছর ধরে প্রধান রসায়নবিদ হিসেবে কাজ করেন। ওই সময় উচ্চমানের বিয়ার প্রস্তুতির জন্য তিনি প্রোটিন ও এনজাইমের কার্যকলাপ গবেষণা করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন যে হাইড্রোজেন আয়নের ঘনমাত্রা এনজাইমের কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাইড্রোজেন আয়নের এই ঘনমাত্রা সহজে প্রকাশ করার জন্য তিনি ১৯০৯ সালে পিএইচ স্কেলের ধারণা প্রবর্তন করেন[২]। তাঁর গবেষণাপত্রটি একই সাথে জার্মান, ফরাসি ও ডেনিশ ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল[৪]।

সোরেনসেন বহুবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন, যদিও পুরস্কারটি পাননি। তিনি ১৯৩৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

আধুনিক সংশোধন ও IUPAC সংজ্ঞা

[সম্পাদনা]

১৯২৪ সালে ডেনিশ রসায়নবিদ কার্স্টেন সোরেনসেন এবং পরবর্তীতে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় আধুনিক বৈদ্যুতিক পরিমাপ পদ্ধতির (glass electrode) সাথে সামঞ্জস্য রেখে পিএইচ স্কেলকে পরিমার্জন করা হয়[৫]। বর্তমান IUPAC সংজ্ঞা অনুযায়ী পিএইচ হলো হাইড্রোজেন আয়নের থার্মোডাইনামিক সক্রিয়তার ঋণাত্মক লগারিদম, যা শুধু ঘনমাত্রার চেয়ে অধিক সুনির্দিষ্ট।

গাণিতিক সংজ্ঞা ও রসায়ন

[সম্পাদনা]

মৌলিক সূত্র

[সম্পাদনা]

সাধারণ রসায়নে, কোনো জলীয় দ্রবণে উপস্থিত হাইড্রোজেন আয়নের () মোলার ঘনমাত্রার ঋণাত্মক দশমিক লগারিদমকে (negative base-10 logarithm) ওই দ্রবণের পিএইচ বলা হয়[৬]:

জলীয় দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়ন মুক্ত অবস্থায় থাকে না; এটি পানির অণুর সাথে যুক্ত হয়ে হাইড্রোনিয়াম আয়ন () গঠন করে:

তাই সূত্রটিকে সমতুল্যভাবে এভাবেও লেখা যায়:

এখানে বা হলো প্রতি লিটার দ্রবণে হাইড্রোজেন বা হাইড্রোনিয়াম আয়নের মোল সংখ্যা ()।

বিপরীতভাবে, পিএইচ জানা থাকলে হাইড্রোজেন আয়নের ঘনমাত্রা বের করা যায়:

পিএইচ মান ও হাইড্রোজেন আয়নের ঘনমাত্রার সম্পর্ক
পিএইচ মান (mol/L)প্রকৃতি
0তীব্র অম্লীয়
1অম্লীয়
7নিরপেক্ষ
14তীব্র ক্ষারীয়

থার্মোডাইনামিক সংজ্ঞা (IUPAC অনুযায়ী)

[সম্পাদনা]

উচ্চতর রসায়নে এবং অত্যন্ত ঘন দ্রবণের ক্ষেত্রে পিএইচ-এর সরল সূত্রটি সর্বদা সঠিক ফল দেয় না। IUPAC অনুমোদিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, পিএইচ হলো হাইড্রোজেন আয়নের থার্মোডাইনামিক সক্রিয়তার (thermodynamic activity) ঋণাত্মক লগারিদম:

এখানে হলো হাইড্রোজেন আয়নের সক্রিয়তা (activity), যা ঘনমাত্রা এবং সক্রিয়তা গুণাঙ্কের () গুণফল:

অতি লঘু দ্রবণে () সক্রিয়তা গুণাঙ্কের মান ১-এর কাছাকাছি হওয়ায় () ঘনমাত্রা দিয়েই হিসাব করা যায়। কিন্তু তীব্র দ্রবণে আয়নের মধ্যকার পারস্পরিক বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ ও আকর্ষণের কারণে সক্রিয়তা গুণাঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে ১ থেকে বিচ্যুত হয়, তাই সক্রিয়তা বিবেচনা করা আবশ্যক।

পানির স্ব-আয়নীকরণ, Kw এবং pOH

[সম্পাদনা]
পানির স্ব-আয়নীকরণ বিক্রিয়া: পানির দুটি অণু পরস্পরের মধ্যে একটি প্রোটন বিনিময় করে হাইড্রোনিয়াম ও হাইড্রোক্সাইড আয়ন তৈরি করে।

পানির অণু নিজে নিজেই সামান্য পরিমাণে ভেঙে হাইড্রোনিয়াম ও হাইড্রোক্সাইড আয়নে রূপান্তরিত হয়, একে পানির স্ব-আয়নীকরণ (autoionization বা autoprotolysis) বলে:

তাপমাত্রায় বিশুদ্ধ পানির আয়নিক গুণফল ():

এই সমীকরণ থেকে পিএইচ () এবং পিওএইচ ()-এর মধ্যকার মৌলিক সম্পর্কটি পাওয়া যায়:

যেখানে:

এই সম্পর্কটি শুধুমাত্র তাপমাত্রায় প্রযোজ্য। অন্য তাপমাত্রায় -এর মান পরিবর্তিত হয় বলে এই যোগফল ১৪ থাকে না।

পিকেএ এবং দুর্বল অ্যাসিডের পিএইচ

[সম্পাদনা]

একটি দুর্বল অ্যাসিড HA-এর জন্য বিয়োজন বিক্রিয়া:

এর বিয়োজন ধ্রুবক:

এবং:

একটি দুর্বল অ্যাসিডের যত বেশি, সে তত দুর্বল। উদাহরণ:

  • অ্যাসিটিক অ্যাসিড ():
  • কার্বনিক অ্যাসিড ():
  • অ্যামোনিয়াম আয়ন ():

পিএইচ স্কেলের বিন্যাস ও বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]
পিএইচ স্কেলের বিন্যাস — ০ থেকে ১৪ পর্যন্ত।

সাধারণত পিএইচ স্কেলের কার্যকরী সীমা ০ থেকে ১৪ পর্যন্ত হলেও এটি কোনো পরম সীমা নয়। অত্যন্ত তীব্র অ্যাসিডের (যেমন: ব্যাটারি অ্যাসিড) ক্ষেত্রে পিএইচ ঋণাত্মক (Negative pH) হতে পারে এবং অত্যন্ত তীব্র ক্ষারের ক্ষেত্রে ১৪-এরও বেশি হতে পারে। তাপমাত্রাকে আদর্শ ধরে স্কেলটিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:

অম্লীয় বা অ্যাসিডীয় দ্রবণ (Acidic Solution)
যে দ্রবণের পিএইচ এর মান ৭-এর কম ()। পিএইচ যত কমবে, অ্যাসিডের তীব্রতা তত বাড়বে। অম্লীয় দ্রবণে ।
নিরপেক্ষ দ্রবণ (Neutral Solution)
যে দ্রবণের পিএইচ এর মান ঠিক ৭ ()। বিশুদ্ধ পানি এই শ্রেণির উদাহরণ। এখানে ।
ক্ষারীয় দ্রবণ (Alkaline/Basic Solution)
যে দ্রবণের পিএইচ এর মান ৭-এর বেশি ()। পিএইচ যত বাড়বে, ক্ষারের তীব্রতা তত বৃদ্ধি পাবে। ক্ষারীয় দ্রবণে ।

তাপমাত্রার প্রভাব

[সম্পাদনা]

পিএইচ স্কেলের নিরপেক্ষ বিন্দু সর্বদা '৭' থাকে না; এটি সম্পূর্ণভাবে তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে পানির স্ব-আয়নীকরণ বৃদ্ধি পায় এবং -এর মান বেড়ে যায়, ফলে নিরপেক্ষ বিন্দুর পিএইচ কমে আসে:

বিভিন্ন তাপমাত্রায় বিশুদ্ধ পানির পিএইচ এবং Kw
তাপমাত্রা (mol²/L²)বিশুদ্ধ পানির pHমন্তব্য
৭.৪৭নিরপেক্ষ (কিন্তু ক্ষারীয় মনে হয়)
৭.২৭নিরপেক্ষ
৭.০০মানক তাপমাত্রা
৬.8১মানবদেহের তাপমাত্রা
৬.৫১নিরপেক্ষ
৬.১৪নিরপেক্ষ (তবু অম্লীয় মনে হয়)

গুরুত্বপূর্ণ: -তে বিশুদ্ধ ফুটন্ত পানির পিএইচ ৬.১৪ হলেও এটি অম্লীয় নয় — কারণ এতে এবং সমান থাকে, তাই এটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ।

বাফার দ্রবণ

[সম্পাদনা]
একটি বাফার দ্রবণে সামান্য অ্যাসিড বা ক্ষার যোগ করলেও তার পিএইচ প্রায় অপরিবর্তিত থাকে।

যে দ্রবণে সামান্য পরিমাণে অ্যাসিড বা ক্ষার যোগ করার পরেও পিএইচ মানের কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয় না, তাকে বাফার দ্রবণ (Buffer Solution) বলে। বাফার দ্রবণ সাধারণত একটি দুর্বল অ্যাসিড এবং তার অনুবন্ধী ক্ষারের মিশ্রণে (বা একটি দুর্বল ক্ষার ও তার অনুবন্ধী অ্যাসিডের মিশ্রণে) তৈরি হয়।

হেন্ডারসন-হাসেলবাখ সমীকরণ

[সম্পাদনা]

বাফার দ্রবণের পিএইচ গণনার জন্য বিখ্যাত হেন্ডারসন-হাসেলবাখ সমীকরণ (Henderson–Hasselbalch equation) ব্যবহার করা হয়:

এখানে:

  • = অ্যাসিডের বিয়োজন ধ্রুবকের ঋণাত্মক লগারিদম
  • = অনুবন্ধী ক্ষারের মোলার ঘনমাত্রা
  • = দুর্বল অ্যাসিডের মোলার ঘনমাত্রা

যখন , তখন । এই বিন্দুটিকে বাফারের অর্ধ-নিরপেক্ষীকরণ বিন্দু বলে, এখানে বাফার সবচেয়ে কার্যকরভাবে পিএইচ স্থির রাখতে পারে।

জৈবিক বাফার ব্যবস্থা

[সম্পাদনা]

মানবদেহে পিএইচ নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনটি প্রধান বাফার ব্যবস্থা সক্রিয় থাকে:

  1. কার্বোনেট-বাইকার্বোনেট বাফার — রক্তের প্রধান বাফার ();
  2. ফসফেট বাফার — কোষের অভ্যন্তরে ();
  3. প্রোটিন বাফার — হিমোগ্লোবিন ও অন্যান্য প্রোটিনের আয়নযোগ্য অ্যামাইনো গ্রুপ

পিএইচ পরিমাপের পদ্ধতিসমূহ

[সম্পাদনা]
একটি আধুনিক ডিজিটাল পিএইচ মিটার।

কোনো দ্রবণের পিএইচ সঠিকভাবে নির্ধারণ করার জন্য মূলত চারটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়:

১. লিটমাস পেপার (Litmus Paper)

[সম্পাদনা]

এটি সবচেয়ে প্রাচীন ও সহজ পদ্ধতি। লিটমাস হলো একটি প্রাকৃতিক রঞ্জক (lichens থেকে প্রস্তুত) যা পিএইচ অনুযায়ী রং পরিবর্তন করে:

  • নীল লিটমাস পেপার: অ্যাসিডে লাল হয়
  • লাল লিটমাস পেপার: ক্ষারে নীল হয়

তবে এর মাধ্যমে শুধুমাত্র দ্রবণটি অম্লীয় না ক্ষারীয় তা জানা যায়, নিখুঁত পিএইচ মান পাওয়া যায় না।

২. ইউনিভার্সাল ইন্ডিকেটর (Universal Indicator)

[সম্পাদনা]

এটি কয়েকটি নির্দেশকের (যেমন: মিথাইল রেড, ব্রোমোথাইমল ব্লু, ফেনলফথ্যালেইন) মিশ্রণ, যা ভিন্ন ভিন্ন পিএইচ মানে ভিন্ন বর্ণ ধারণ করে:

ইউনিভার্সাল ইন্ডিকেটরের বর্ণ পরিবর্তন
পিএইচ মানবর্ণ
১–৩লাল
৪–৫কমলা / হলুদ
৬হলুদ-সবুজ
৭সবুজ
৮–৯নীলাভ সবুজ / সায়ান
১০–১৪নীল / বেগুনি

৩. পিএইচ মিটার (pH Meter)

[সম্পাদনা]

এটি একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র যা দ্রবণে থাকা হাইড্রোজেন আয়নের সক্রিয়তা পরিমাপ করে ডিজিটাল পর্দায় নিখুঁত (দশমিকসহ) পিএইচ মান প্রদর্শন করে। পিএইচ মিটারে মূলত দুটি অংশ থাকে:

  • গ্লাস ইলেকট্রোড (glass electrode): একটি বিশেষ কাচের পাতলা পর্দার ভেতর দিয়ে হাইড্রোজেন আয়নের প্রবাহের ফলে সৃষ্ট বিভব পার্থক্য পরিমাপ করে।
  • রেফারেন্স ইলেকট্রোড (reference electrode): স্থির বিভব সরবরাহ করে।

গবেষণাগার ও শিল্পকারখানায় পিএইচ মিটার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।

৪. পিএইচ পেপার স্ট্রিপ (pH Paper Strips)

[সম্পাদনা]

ইউনিভার্সাল ইন্ডিকেটর দ্রবণে ভেজানো বিশেষ কাগজ, যা দ্রবণে ডুবালে রং পরিবর্তন করে। একটি রেফারেন্স কার্ডের সাথে মিলিয়ে আনুমানিক পিএইচ মান জানা যায়। সুইমিং পুল, অ্যাকোয়ারিয়াম পরীক্ষায় বহুল ব্যবহৃত।

দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন পদার্থের পিএইচ মাত্রা

[সম্পাদনা]
সাধারণ পদার্থের পিএইচ মান
পদার্থের নামপিএইচ () মানপ্রকৃতিমন্তব্য
ব্যাটারির অ্যাসিড ()< ১.০তীব্র অম্লীয়ঋণাত্মক পিএইচও হতে পারে
পাকস্থলীর অ্যাসিড (HCl)১.৫ – ২.০তীব্র অম্লীয়খাদ্য পরিপাকে সহায়ক
লেবুর রস২.০ – ২.৬অম্লীয়সাইট্রিক অ্যাসিড
ভিনেগার২.৪ – ৩.৪অম্লীয়অ্যাসিটিক অ্যাসিড
কোমল পানীয় (কোলা)২.৫ – ৩.৫অম্লীয়কার্বনিক ও ফসফরিক অ্যাসিড
টমেটোর রস৪.০ – ৪.৫মৃদু অম্লীয়ম্যালিক অ্যাসিড
অ্যাসিড বৃষ্টি< ৫.০অম্লীয়স্বাভাবিক বৃষ্টি ৫.৬
ব্ল্যাক কফি৫.০ – ৫.৫মৃদু অম্লীয়
মূত্র (প্রস্রাব)৪.৫ – ৮.০পরিবর্তনশীলখাদ্যের ওপর নির্ভরশীল
দুধ৬.৩ – ৬.৮সামান্য অম্লীয়ল্যাক্টিক অ্যাসিড
বৃষ্টির পানি (স্বাভাবিক)৫.৬সামান্য অম্লীয়CO₂ দ্রবণের কারণে
লালা (Saliva)৬.৪ – ৬.৮সামান্য অম্লীয়
বিশুদ্ধ পানি ()৭.০নিরপেক্ষ
রক্ত (মানবদেহ)৭.৩৫ – ৭.৪৫সামান্য ক্ষারীয়কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত
সমুদ্রের পানি৭.৮ – ৮.৩সামান্য ক্ষারীয়CO₂ বৃদ্ধিতে অম্লীভূত হচ্ছে
বেকিং সোডা ()৮.৩ – ৮.৫মৃদু ক্ষারীয়
মিল্ক অব ম্যাগনেশিয়া১০.০ – ১০.৫ক্ষারীয়অ্যান্টাসিড
অ্যামোনিয়া দ্রবণ১১.০ – ১২.০তীব্র ক্ষারীয়পরিষ্কারক
ব্লিচিং পাউডার দ্রবণ১২.৫তীব্র ক্ষারীয়
সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH)১৩.০ – ১৪.০অত্যন্ত তীব্র ক্ষারীয়শক্তিশালী ক্ষার

বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিএইচ-এর গুরুত্ব ও উপযোগিতা

[সম্পাদনা]

মানবদেহ ও চিকিৎসা বিজ্ঞান

[সম্পাদনা]

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য শরীরের বিভিন্ন অংশের পিএইচ সঠিক সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি:

মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের পিএইচ
অঙ্গ/তরলপিএইচ মানভূমিকা
রক্ত (ধমনী)৭.৩৫ – ৭.৪৫অক্সিজেন পরিবহন, এনজাইম সক্রিয়তা
পাকস্থলী১.৫ – ৩.৫খাদ্য পরিপাক, ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস
ক্ষুদ্রান্ত্র৬.০ – ৭.৪পুষ্টি শোষণ
কোলন (বৃহদান্ত্র)৫.৫ – ৭.০পানি শোষণ
মূত্র৪.৫ – ৮.০বর্জ্য নির্গমন
ত্বক৪.৫ – ৫.৫অণুজীব প্রতিরোধ
লালা৬.৩ – ৬.৮অ্যামাইলেজ এনজাইমের কার্যকারিতা
যোনি (Vagina)৩.৮ – ৪.৫সংক্রমণ প্রতিরোধ

রক্তের পিএইচ -এর নিচে নামলে (অ্যাসিডোসিস) বা -এর উপরে উঠলে (অ্যালকালোসিস) কোষের এনজাইমগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

কৃষি খাত ও মাটি ব্যবস্থাপনা

[সম্পাদনা]

ফসলের ফলন মাটির পিএইচ-এর ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল:

বিভিন্ন ফসলের জন্য উপযুক্ত মাটির পিএইচ
ফসলের নামউপযুক্ত পিএইচ
ব্লুবেরি৪.৫ – ৫.৫
চা৪.৫ – ৬.০
আলু৫.০ – ৬.০
ধান৫.৫ – ৬.৫
গম৬.০ – ৭.০
ভুট্টা৬.০ – ৭.০
টমেটো৬.০ – ৬.৮
মটরশুটি৬.০ – ৭.৫
  • মাটি অতিরিক্ত অম্লীয় হলে চুন ( বা ) প্রয়োগ করে পিএইচ বাড়ানো হয়।
  • মাটি অতিরিক্ত ক্ষারীয় হলে গন্ধক (সালফার) বা জিপসাম ব্যবহার করে পিএইচ কমানো হয়।
  • মাটির পিএইচ ৬.০–৭.৫ এর মধ্যে থাকলে উদ্ভিদ নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়ামসহ সব প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সহজে মাটি থেকে গ্রহণ করতে পারে।

শিল্পক্ষেত্র ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ

[সম্পাদনা]
  • ওষুধ শিল্প: ইনজেকশন, আই-ড্রপ এবং নাকের স্প্রের পিএইচ শরীরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ (pH ৬–৮) রাখতে হয়, অন্যথায় তীব্র ব্যথা বা টিস্যু ক্ষতি হতে পারে।
  • খাদ্য সংরক্ষণ: আচার, সস ও ক্যান করা খাবারে পিএইচ এর নিচে রাখা হয় যাতে ক্লোস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম (Clostridium botulinum) বা অন্যান্য ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করতে না পারে।
  • দুগ্ধজাত শিল্প: পনির তৈরিতে পিএইচ নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপ নিশ্চিত করা হয়।
  • প্রসাধনী: শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ ও ময়েশ্চারাইজার তৈরিতে ত্বকের পিএইচ (৪.৫–৫.৫)-এর দিকে নজর রেখে উৎপাদন করা হয়।
  • কাগজ শিল্প: অ্যাসিডমুক্ত কাগজ () দীর্ঘস্থায়ী হয়।

পরিবেশ বিদ্যা ও জলজ বাস্তুতন্ত্র

[সম্পাদনা]
অ্যাসিড বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অরণ্য।
  • অ্যাসিড বৃষ্টি: বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক পিএইচ প্রায় (বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইডের সাথে কার্বনিক অ্যাসিড তৈরির কারণে)। কিন্তু বায়ু দূষণের ফলে সৃষ্ট সালফার ডাই অক্সাইড () ও নাইট্রোজেন অক্সাইড () বৃষ্টির পানির সাথে মিশে পিএইচ বা তার নিচে নামিয়ে দেয়, যাকে অ্যাসিড বৃষ্টি (Acid Rain) বলে। এটি বনের গাছপালা, মাছ ও ইমারতের ক্ষতি করে।
  • সমুদ্রের অম্লীকরণ: বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পিএইচ ধীরে ধীরে কমছে (প্রাক-শিল্প যুগে ৮.২ থেকে বর্তমানে প্রায় ৮.১)। এটি প্রবাল প্রাচীর (coral reef) এবং ঝিনুকের কঙ্কাল গঠনকে ব্যাহত করছে।
  • জলজ বাস্তুতন্ত্র: নদী বা পুকুরের পানির পিএইচ থেকে এর মধ্যে না থাকলে মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ও জীবনধারণ ব্যাহত হয়। পিএইচ এর নিচে গেলে বেশিরভাগ মাছ বেঁচে থাকতে পারে না।
  • পানি শোধন: পানীয় জল শোধন কেন্দ্রে পানির পিএইচ ৬.৫–৮.৫ এর মধ্যে রাখা বাধ্যতামূলক (WHO নির্দেশিকা)।

অম্ল-ক্ষার তত্ত্বের সাথে পিএইচ-এর সম্পর্ক

[সম্পাদনা]

পিএইচ অম্ল-ক্ষার ধারণার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বিভিন্ন তত্ত্বে অম্ল-ক্ষারের সংজ্ঞা:

আরেনিয়াস তত্ত্ব (১৮৮৪)

[সম্পাদনা]
  • অম্ল: জলীয় দ্রবণে আয়ন সরবরাহ করে।
  • ক্ষার: জলীয় দ্রবণে আয়ন সরবরাহ করে।

ব্রনস্টেড-লাউরি তত্ত্ব (১৯২৩)

[সম্পাদনা]
  • অম্ল: প্রোটন () দাতা (proton donor)।
  • ক্ষার: প্রোটন গ্রহীতা (proton acceptor)।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী পানি উভধর্মী (amphoteric): এটি অম্লের সামনে ক্ষার হিসেবে এবং ক্ষারের সামনে অম্ল হিসেবে আচরণ করে।

লুইস তত্ত্ব (১৯২৩)

[সম্পাদনা]
  • অম্ল: ইলেকট্রন জোড় গ্রহীতা (electron pair acceptor)।
  • ক্ষার: ইলেকট্রন জোড় দাতা (electron pair donor)।

গণনার উদাহরণ

[সম্পাদনা]

উদাহরণ ১: শক্তিশালী অ্যাসিডের পিএইচ

[সম্পাদনা]

HCl দ্রবণের পিএইচ:

HCl সম্পূর্ণ বিয়োজিত হয়, তাই:

উদাহরণ ২: শক্তিশালী ক্ষারের পিএইচ

[সম্পাদনা]

NaOH দ্রবণের পিএইচ:

উদাহরণ ৩: দুর্বল অ্যাসিডের পিএইচ

[সম্পাদনা]

অ্যাসিটিক অ্যাসিড () দ্রবণের পিএইচ:

সারাংশ চিত্র

[সম্পাদনা]
পিএইচ, হাইড্রোজেন আয়ন ঘনমাত্রা এবং হাইড্রোক্সাইড আয়ন ঘনমাত্রার তুলনামূলক চার্ট
pH (mol/L) (mol/L)উদাহরণ
0ব্যাটারির অ্যাসিড
1পাকস্থলীর রস
2লেবুর রস
3ভিনেগার
4টমেটো
5কফি
6দুধ
7বিশুদ্ধ পানি
8সমুদ্রের পানি
9বেকিং সোডা
10মিল্ক অব ম্যাগনেশিয়া
11অ্যামোনিয়া
12সাবান পানি
13ব্লিচ
14NaOH দ্রবণ

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ↑ "pH"। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২৬।
  2. 1 2 "Who Invented The pH Scale In Chemistry?"। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২৬।
  3. ↑ "Sørensen And The pH Scale"। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২৬।
  4. ↑ "S.P.L. Sørensen, the pH concept and its early history"। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২৬।
  5. ↑ "pH Scale"। ইউএসজিএস (USGS)। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২৬।
  6. ↑ "pH and pOH"। Chemistry LibreTexts। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুন ২০২৬।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

বাহ্যিক সংযোগ

[সম্পাদনা]