নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে সংঘটিত বিমান দুর্ঘটনাগুলো

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

নেপালের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হচ্ছে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এছাড়া নেপালে অনেকগুলো অন্তর্দেশীয় বিমানবন্দর আছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি রাজধানীর কেন্দ্র থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে কাঠমান্ডু উপত্যকায় অবস্থিত। সমুদ্র সমতল থেকে এর উচ্চতা ১,৩৩৮ মিটার এবং এর রানওয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন কিলোমিটার।

নেপালের ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের কারণে এখানে প্রচুর উঁচু পাহাড় আছে যা মাঝে মাঝেই বিমান দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ‘যান্ত্রিক অবতরন ব্যবস্থা’ নেই। খারাপ আবহাওয়ার কারণে খালি চোখে রানওয়ে দেখা না গেলেও যন্ত্রের সাহায্যে রানওয়ের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

দুর্ঘটনা[সম্পাদনা]

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ২১১, ২০১৮[সম্পাদনা]

২০১৪ সালে তোলা বিমানটির ছবি

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ২১১ বাংলাদেশের ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউএস-বাংলা বিমানের একটি আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ফ্লাইট হিসেবে নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা ছিল। ১২ মার্চ ২০১৮ সালে স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে (ইউটিসি +৫:৪৫) একটি বম্বার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ৪০০ উড়োজাহাজে করে ফ্লাইটটি চালানোর সময় তা নেপালে অবতরণ করার সময় বিধ্বস্ত হয়। উড়োজাহাজটিতে মোট ৭১ জন আরোহী ছিল। যার মধ্যে ৫১ জন নিহত হয় ও ২০ জনকে জীবিত উদ্ধার হয়। প্রাথমিক কারণ হিসেবে বিমানটি গুরুতরভাবে আগুনের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করা হচ্ছে।[১]

তুর্কি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট, টিকে ৭২৬, মার্চ ২০১৫[সম্পাদনা]

২০১৫ সালের ৪ মার্চ ইস্তাম্বুল থেকে কাঠমান্ডুগামী টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ত্রিভুবন বিমানবন্দরের রানওয়েতে দুর্ঘটনার শিকার হয়। এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট টিকে ৭২৬ এর এয়ারবাস ৩৩০ বিমানটি এর ২২৪ জন যাত্রী এবং ১১জন ক্রুসহ সাত ঘন্টার যাত্রা শেষে যখন কাঠমান্ডুতে অবতরণের চেষ্টা করে। কুয়াশার কারণে প্লেনটি প্রথমবার অবতরণে ব্যর্থ হয়ে আধঘন্টা ধরে কাঠমান্ডুর আকাশে চক্কর দিতে থাকে। দ্বিতীয়বার যখন এটি রানওয়েতে নামার চেষ্টা করে, তখন শিশির ভেজা রানওয়েতে প্লেনটির চাকা পিছলে যায় এবং রানওয়ে থেকে সরে পাশের নরম ঘাসের মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে। প্লেনটির যাত্রী বা ক্রুদের কেউ গুরুতর আহত হয়নি। আরোহীদেরকে দ্রুত টার্মিনালে সরিয়ে নেওয়া হয়। দুর্ঘটনার কারণে বিমানবন্দরটিতে সেদিনের জন্য বিমান ওঠা-নামা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সিতা এয়ার ফ্লাইট ৬০১, সেপ্টেম্বর ২০১২[সম্পাদনা]

ফ্লাইট ৬০১

২০১২ সালের ২৮ ডিসেম্বর নেপালের অাভ্যন্তরীণ ফ্লাইট সিতা এয়ার ফ্লাইট ৬০১ ত্রিভুবন বিমানবন্দর ছেড়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্থান লুকলার তেনজিং-হিলারী বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। যাত্রা শুরুর পরপরই পাইলট কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে যোগাযোগ করেন এই বলে যে, তিনি প্লেনটিতে অস্বাভাবিকত্ব অনুভব করছেন। তিনি ত্রিভুবনে ফিরে আসার অনুমতি চান।

অনুমতি পাওয়ার পরপর পাইলট প্লেনটির দিক ঘুরিয়ে ল্যান্ড করার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু রানওয়েতে পৌঁছার পূর্বেই ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মনোহারা নদীর তীরে প্লেনটি বিধ্বস্ত হয়। প্লেনটির ১৯ জন আরোহীর সবাই ঘটনাস্থলে নিহত হয়।[২][৩] এটি ছিল ২০০২ সাল থেকে শুরু করে তখন পর্যন্ত সংঘটিত বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ দশটি বিমান দুর্ঘটনার একটি। পরবর্তীতে তদন্তে দেখা যায়, শকুনের আঘাতে প্লেনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল।

বুদ্ধ এয়ার ফ্লাইট ১০৩, সেপ্টেম্বর ২০১১[সম্পাদনা]

নেপালের বুদ্ধ এয়ার ফ্লাইট ১০৩ হচ্ছে দর্শনার্থীদেরকে প্লেনে করে হিমালয় দেখানোর একটি বিশেষ ফ্লাইট। ২০১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ১৬ জন যাত্রী[৪] নিয়ে হিমালয় দর্শন শেষে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ফেরার সময় ফ্লাইটটির বিচক্র্যাফট ১৯০০ ডি প্লেনটি বিধ্বস্ত হয়। প্রচণ্ড কুয়াশা এবং বৃষ্টিপাতের কারণে দৃষ্টিসীমা হ্রাস পাওয়ায় প্লেনটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। এটি কাঠমান্ডু থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গোদাভরি এলাকায় কোতদাদা নামের একটি পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এটি একটি বাড়ির ছাদেও আঘাত করে। প্লেনটির ১৯ জন আরোহীর সকলেই ঘটনাস্থলে নিহত হয়।[৫][৬]

অগ্নি এয়ার ফ্লাইট ১০১, আগস্ট ২০১০[সম্পাদনা]

২০১০ সালের আগস্টের ২৪ তারিখে নেপালের স্থানীয় অগ্নি এয়ারের ফ্লাইট ১০১ এর ডর্নিয়ার ২২৮ প্লেনটি ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল পর্যটন শহর লুকলার উদ্দেশ্যে।[৭][৮] এতে ১১ জন যাত্রী এবং ৩ জন ক্রু ছিল। যাত্রা শুরুর ২০ মিনিটের মাথায়ই ক্রুরা কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে যোগাযোগ করে যান্ত্রিক ত্রুটির কথা জানায় এবং ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানায়।[৯] কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে ত্রিভুবন বিমানবন্দর প্লেনটিকে সেখানে অবতরণের অনুমতি না দিয়ে সিমারা নামক অন্য একটি বিমানবন্দরে অবতরণের পরামর্শ দেয়।

এর ৫ মিনিট পরেই প্লেনটির সাথে ত্রিভুবনের কন্ট্রোল টাওয়ারের সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে কাঠমান্ডু থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে বাসিতপুর নামক এলাকায় প্লেনটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়।[১০] খারাপ আবহাওয়া এবং যান্ত্রিক ত্রুটির সমন্বিত কারণে প্লেনটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর ধ্বংসাবশেষ প্রায় ১০০ মিটার ব্যাসার্ধের এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর আঘাতে স্থানীয় একটি স্কুলের মাঠে ৩ মিটার গভীর খাদের সৃষ্টি হয়। ১৪ জন আরোহীর সকলেই নিহত হয়।

লুফথান্সা কার্গো ফ্লাইট ৮৫৩৩, জুলাই ১৯৯৯[সম্পাদনা]

১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই জার্মানির লুফথান্সা কার্গো এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৮৫৩৩ এর একটি বোয়িং ৭২৭ প্লেন ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। প্লেনটিতে মোট ২১ টন কার্গো ছিল, যার অধিকাংশই ছিল উলের কার্পেট। গন্তব্যস্থল ছিল ভারতের দিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। যাত্রা শুরুর ৫ মিনিটের মাথায়ই প্লেনটি কাঠমান্ডু থেকে ১১ কিলোমিটার দূরের একটি পাহাড়ের গায়ে বিধ্বস্ত হয় এবং এর ৫ ক্রুর সকলে নিহত হয়। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ক্রুদের অনভিজ্ঞতাকে দায়ী করা হয়।

পিআইএ ফ্লাইট ২৬৮, সেপ্টেম্বর ১৯৯২[সম্পাদনা]

১৯৯২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ২৬৮ এর একটি এয়ার বাস বিমান করাচির জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ত্রিভুবনের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের নির্দেশ অনুযায়ী কাঠমান্ডু থেকে ৬৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘রোমিও’ নামক পয়েন্ট থেকে প্লেনটির ১৫ হাজার ফুট থেকে শুরু করে সাতটি ধাপে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসার কথা ছিল।

কিন্তু পাইলটের ভুলের কারণে এটি প্রতিটি ধাপের হিসেব একটু আগে থেকে শুরু করে দেয়। ফলে কাঠমান্ডুতে প্রবেশের পূর্বে যখন এর থাকার কথা ছিল ৯,৫০০ ফুট উপরে, তখন এটি উড়ছিল ৭,৩০০ ফুট উপর দিয়ে। এরকম অবস্থায় প্লেনটি ৮,২৫০ ফুট উঁচু একটি পাহাড়ের গায়ে আঘাত করে এবং টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে। এর ১৬৭ যাত্রীর সবাই ঘটনাস্থলে নিহত হয়। এটি ত্রিভুবন বিমানবন্দরের সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।[১১][১২][১৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "নামার সাথে সাথে বিমানটি কাঁপছিলো: প্রত্যক্ষদর্শী"বিবিসি বাংলা। ১২ মার্চ ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১২ মার্চ ২০১৮ 
  2. Samiksha, Koirala (২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২)। "All 19 on board die in Sita Air crash"República। ১ অক্টোবর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০১২  (ইংরেজি)
  3. Shengnan, Zhao; Yunbi, Zhang (২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২)। "19 killed as plane crashes in Nepal"China Daily। ২০১২-১০-০১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ অক্টোবর ২০১২ 
  4. Molnar, Matt (২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১)। "Mount Everest Tour Plane Crashes in Nepal"http://nycaviation.com। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১  |সংবাদপত্র= এ বহিঃসংযোগ দেয়া (সাহায্য)(ইংরেজি)
  5. "18 dead after tourist plane crashes in Nepal"ABC News। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১ (ইংরেজি)
  6. "Buddha Bud Air plane crashes, 19 dead"My Republica। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১ (ইংরেজি)
  7. "Rescue operations ongoing at Agni Air Dornier 228 crash site"। Flightglobal.com। ২৪ আগস্ট ২০১০। ২৭ আগস্ট ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ আগস্ট ২০১০ (ইংরেজি)
  8. "14, include 6 foreigners killed in air crash"। Hindustan Times। ২৪ আগস্ট ২০১০। ২৪ আগস্ট ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ আগস্ট ২০১০ (ইংরেজি)
  9. "Crash: Agni D228 at Bastipur on Aug 24th 2010, technical problems"। The Aviation Herald। ২৪ আগস্ট ২০১০। সংগ্রহের তারিখ ২৪ আগস্ট ২০১০ (ইংরেজি)
  10. "4 Americans among 14 killed in plane crash in Nepal"। Los Angeles Times। ২৪ আগস্ট ২০১০। ২৫ আগস্ট ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ আগস্ট ২০১০ (ইংরেজি)
  11. এভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্কে দুর্ঘটনার বিবরণ (ইংরেজি)
  12. Gero, David (২০০০)। Aviation Disasters: The World's Major Civil Airliner Crashes since 1950 (3rd সংস্করণ)। Sparkford, nr. Yeovil, Somerset: Patrick Stephens (Haynes)। পৃষ্ঠা 232। আইএসবিএন 9781852606022 (ইংরেজি)
  13. McGirk, Tim; Wolmar, Christian (৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৯২)। "Hunt goes on for black box in Airbus wreckage"The Independent  (ইংরেজি)