বিষয়বস্তুতে চলুন

নর্স পুরাণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ভোলভা, একজন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার মহিলা পৌরাণিক ভবিষ্যদ্বক্তা, বর্শাধারী দেবতা ওডিনকে বলছেন কি হয়েছে এবং কি হবে।চিত্রঃ ওডিন ও ভোলভা, শিল্পীঃ লরেঞ্জ ফ্রোলিচ (১৮৯৫)

নর্স পুরাণ হচ্ছে উত্তর জার্মানিয় মানুষের পৌরণিক সংকলন যা নর্স পৌত্তলিকতা থেকে উদ্ভূত এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার খ্রিস্টানিকরণের পরও অব্যাহত ছিল এবং আধুনিক যুগের স্ক্যান্ডিনেভিয়ার লোককাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান। জার্মানিয় পুরাণের সর্ব উত্তরদিকের প্রসার, নর্স পুরাণ বিভিন্ন দৈত্য, দেবতা, এবং নায়কে সন্নিহিত যা পৌত্তলিক সময়ের আগে ও পরে বিভিন্ন উৎস হতে উদ্ভূত, যার মধ্যে মধ্যযুগীয় পান্ডুলিপি, প্রত্নতাত্ত্বিক উপস্থাপনা, এবং লোক-ঐতিহ্য বিদ্যমান।

মূল গ্রন্থে অনেক দেবতার উল্লেখ করা হয়েছে যেমন হাতুড়ি-ধারী, মানবতা-সুরক্ষকর্তা বজ্র দেবতা থর, যে নিরলসভাবে তার শত্রুদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত; একচক্ষুবিশিষ্ট, কাক কাঁধে দেবতা ওডিন, যে চাতুর্যভাবে সারা বিশ্বব্যাপী জ্ঞানের অন্বেষণ করে এবং মানবজাতিকে রুনিক বর্ণমালা দান করেছে; সুন্দর,যাদুবিদ্যা পারদর্শী, পালকের আলখাল্লা পরিহিত দেবী ফ্রাইয়া যে যুদ্ধে গমন করে নিহতদের মাঝখান থেকে পছন্দ করার জন্য; প্রতিহিংসাপরায়ণ, স্কিইং দেবী স্কাদী, যিনি সুমদ্রতটে শীতের পাহাড়ের নেকড়ে ডাক পছন্দ করেন; শক্তিশালী দেবতা এনজোর্ড যিনি সাগর ও আগুন উভয়কেই শান্ত করতে পারেন এবং জমি ও সম্পদ দান করেন; দেবতা ফ্রেই, যার আবহাওয়া এবং কৃষির সাথে সম্পৃক্ততা মানবজাতির জন্য শান্তি ও আনন্দ বয়ে আনে; দেবী ইদুনা, যিনি আপেল রক্ষা করেন যা চিরযৌবন দান করে; রহস্যময় দেবতা হাইমডাল, যার নয়টি মা থেকে জন্ম হয়েছে, ঘাসের গজানো শুনতে পারেন, সোনার দাঁত আছে,  এবং একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী শিঙা বহন করেন; এবং যোটান লোকি, যে দেবী ফ্রিগের সুন্দর পুত্র বালডরের মৃত্যুর কুটচাল দ্বারা দেবতাদের দুর্ভাগ্য বয়ে আনেন; এবং আরও বিভিন্ন দেব ও দেবী।

রক্ষা পাওয়া অধিকাংশ পৌরাণিক কাহিনী, দেবতাদের অবস্থা এবং তাদের পারস্পরিক আদান প্রদানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে যা তারা অন্যান্য প্রাণীদের সাথে করে থাকে, যেমন মানবজাতি ও যোটনার, অন্যান্য সত্তা যা তাদের বন্ধু, প্রিয়তমা, শত্রু বা দেবতাদের পরিবারের সদস্যরা। নর্স পৌরাণিক মহাবিশ্ব নয়টি পৃথিবী নিয়ে গঠিত যার কেন্দ্রদেশে একটি কেন্দ্রীয় মহাজাগতিক গাছ,ইগড্রাসিল, অবস্থিত। সময়ের একক এবং বিশ্বতত্ত্বের উপাদান সমূহকে বিভিন্ন দেবতা বা প্রাণী দ্বারা প্রকাশ করা হয়। একটি সৃষ্টিতত্ত্ব পুরাণের বিভিন্ন কাঠামোয় স্মরণ করা হয়,যেখানে বিশ্ব আদিম প্রাণী ইমির এর মাংস থেকে তৈরি করা হয়ছে, এবং প্রথম দুইজন মানুষ হচ্ছে আস্ক ও এম্ব্ল্যা। ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়ছে যে এই বিশ্বগুলো পুনর্জন্ম লাভ করবে রাগনারক এর ঘটনার পর, যেখানে দেবতা ও তাদের শত্রুদের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়, এবং বিশ্বগুলোকে আগুনে গ্রাস করে, শুধুমাত্র নতুনভাবে পুনর্জন্ম ঘটার আগে। সেখানে জীবিত দেবতাদের দেখা হবে, এবং জমি সবুজ ও উর্বর হবে, এবং দুইজন মানুষ বিশ্বকে পুনরায় জনপূর্ণ করবে।

১৭শ শতাব্দী থেকে নর্স পুরাণ বিভিন্ন পণ্ডিতদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে, যখন মূল গ্রন্থ ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক বৃত্তের নজরে আনা হয়। তুলনামূলক পুরাণ ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের উপায় দ্বারা,পণ্ডিতরা আবিষ্কার করেন যে জার্মানিয় পুরাণ প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ধর্ম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আধুনিক সময়ে, রোমান্টিক ভাইকিং রেনেসাঁ এই বিষয়ের পুনর্জাগরন ঘটিয়েছে, এবং আধুনিক জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিভিন্ন জায়গায় নর্স পুরাণের উল্লেখ পাওয়া যায়। জার্মানিয় নতুন পৌত্তলিকদের মধ্যে ধর্মীয় প্রসঙ্গে ব্যবহারের কারণে এই পুরাণের আরও প্রচলন লাভ ঘটেছে।

উৎস সমূহ

[সম্পাদনা]
দ্যা রক রুনিস্টোন (Ög ১৩৬), রক, সুইডেনে অবস্থিত, যাতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার রুনিক শিলালিপিতে ক্ষুদিত যেখানে নর্স পুরাণের বিভিন্ন উল্লেখ করা হয়েছে।

নর্স পুরাণ প্রাথমিক ভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে প্রাচীন নর্স কথ্য ভাষার সাথে, একটি উত্তর জার্মানিয় ভাষা যা ইউরোপীয় মধ্যযুগে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার লোকেরা কথা বলতো, এবং এটা আধুনিক স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ভাষার পূর্বপুরুষ। এই  প্রাচীন নর্স গ্রন্থের অধিকাংশ আইসল্যান্ডে সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে এর কথ্যরীতি, যা প্রাক-খ্রিষ্টান আদিবাসদের থেকে উদ্ভত, সংগৃহীত করা হয়েছিল এবং বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে নথিবদ্ধ করা হয়েছিল। এইগুলো প্রাথমিক ভাবে ১৩শ শতাব্দীতে করা হয়েছিল। এই গ্রন্থসমূহদের মধ্যে ছিল প্রোস এড্ডা (Prose Edda), যা ১৩শ শতাব্দীতে স্নোরী স্টার্লসন দ্বারা রচিত হয়েছিল, এবং পোয়েটিক এড্ডা (Poetic Edda), আরম্ভিক ঐতিহ্যবাহী বিষয়সমূহ দ্বারা কবিতার সংকলন যা ১৩শ শতাব্দীতে অজ্ঞাত দ্বারা প্রণীত হয়েছিল।[]

প্রোস এড্ডা রচিত হয়েছিল স্কাল্ডিক কবিতার গদ্যরচনার সারগ্রন্থ হিসেবে —ঐতিহ্যবাহী নর্স কবিতা যা স্কাল্ডদের(কবি) দ্বারা রচিত হত। মুলত মুখে মুখে রচিত এবং প্রচলিত হত, স্কাল্ডিক কবিতা অনুপ্রাসধর্মী পদ, আলংকারিক ভাগভঙ্গি এবং বিভিন্ন ছন্দোময় রূপের সদ্ব্যবহার করে। প্রোস এড্ডা  খ্রিস্টানি করনের আগে ও পরের বিভিন্ন স্কাল্ডদের দ্বারা কাজের অনেক উদাহরণ উপস্থাপন করে এবং প্রায়শই পোয়েটিক এড্ডায় প্রাপ্ত বিভিন্ন কবিতার উল্লেখ করে। পোয়েটিক এড্ডা সম্পূর্ণরূপে কবিতা দ্বারা গঠিত, সঙ্গে কিছু গদ্য আখ্যান যোগ করে, এবং এই কবিতা—এড্ডিক কবিতা—অল্প আলংকারিক ভাগভঙ্গির সদ্ব্যবহার করে। স্কাল্ডিক কবিতার তুলনায়, এড্ডিক কবিতা অপেক্ষাকৃত নিরলংকার হয়।

প্রোস এড্ডাতে পাওয়া যায় বিভিন্ন স্তরের ইউহেমেরাইজেসন, একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে দেবদেবী ও অতিপ্রাকৃত মানুষকে উপস্থাপন করা হয় আসল , যাদুবিদ্যায় পারদর্শী মানুষ হিসেবে যারা সময়ের সাথে ঈশ্বরত্ব প্রাপ্ত হয়েছে বা খ্রিস্টান পুরাণ দ্বারা শয়তান হিসেবে গণ্য হয়েছে।[] হাইমস্ক্রিংলা  এর মত গ্রন্থসমূহে ,যা ১৩শ শতাব্দীতে স্নোরী এবং গেস্টা ড্যানোরাম দ্বারা এবং ১২শ শতাব্দীতে স্যাক্সো গ্রামাটিকাস দ্বারা ডেনমার্কে লাতিন ভাষায় রচিত হয়েছিল, বৃহৎ ইউহেমেরাইজেস প্রচেষ্টার ফলাফল।[]

আরও বহু গ্রন্থে, যেমন সাগা, আরও তথ্য প্রদান করে। সাগা সংকলনে পুরানো নর্স ভাষায় হাজার হাজার কাহিনী আছে যাদের মধ্যে আইসল্যান্ডিক পারিবারিক ইতিহাস (আইসল্যান্ডার্সদের কাহিনী) থেকে শুরু করে দেশান্তর সময়ের কাহিনী (কিংবদন্তি কাহিনী) যাদের মধ্যে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যেমন আতিলা দ্যা হান, উল্লেখ থাকে। বস্তু এবং স্মারক যেমন রক রুনিস্টোন এবং কেভিনেবি কবচ যা রুনিক শিলালিপি বৈশিষ্ট্যযুক্ত—রুনিক বর্ণমালায় লিখিত যা জার্মানিক আদিবাসী জাতির বর্ণমালা—গুলোতে নর্স পুরাণের বিভিন্ন ব্যক্তি এবং ঘটনার উল্লেখ থাকে।[]

প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড থেকে প্রাপ্ত বস্তগুলকে নর্স পুরাণের বিভিন্ন বিষয়ের চিত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যেমন দেবতা থরের হাতুড়ী মিয়লনীরের  রক্ষাকবচ যা বিভিন্ন পৌত্তলিক সমাধির মধ্যে পাওয়া যায় এবং ছোট রূপালী মহিলা মানবমূর্তি যা যুদ্ধ, ভাগ্য বা পূর্বপুরুষের রীতির সাথে সম্পর্কিত ভ্যালক্রিস বা ডিজির দের বলে ধরা হয়।[] ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ও তুলনামূলক পুরাণের প্রসঙ্গক্রমে, জার্মানিক পুরাণের অন্যান্য সত্যায়িত শাখাগুলোর (পুরানো উচ্চ জার্মানীয় মার্সবার্গ জাদুমন্ত্র)  সাথে তুলনায় নতুন ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে।[] পণ্ডিতদের দ্বারা অন্যান্য ইন্দো-ইউরোপীয় জাতিসমূহের পুরাণের ব্যাপক তুলনা প্রাচীন পুরাণের সম্ভাবনাময় পুনর্গঠনে সাহায্য করেছে।[]

পৌরাণিক কাহিনী এবং কবিতা যা মধ্যযুগ, ভাইকিং যুগ, অস্তিত্ব ছিল বলে ধারণা করা হয়, ভাইকিং যুগ, দেশান্তর সময়কাল এবং এর আগে অস্তিত্ব ছিল বলে ধারণা করা হয় তার অল্পকিছু মাত্র রক্ষা পেয়েছে।[] পরবর্তী উৎসসমূহ যা বর্তমান যুগে প্রবেশ করেছে, যেমন মধ্যযুগীয় কবজ যা ব্যবহার করেছিল একজন নরওয়েজিয়ান নারী র্যান্ডহিল ট্রেগ্যাগাস—যে ১৪ শতকে ডাকিনীবিদ্যায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন —এবং মন্ত্র যা আইসল্যান্ডিক গ্যাল্ড্রাবোক গ্রিমৌরে (যাদুর বস্তু তৈরি করার উপায় সংবলিত বই) পাওয়া যায় তাতে বিভিন্ন ভাবে নর্স পুরাণের উল্লেখ পাওয়া যায়।[] অন্যান্য চিহ্ণ, যেমন জায়গার নাম বিভিন্ন দেবতা সম্পর্কে আরও তথ্য প্রদান করে, যেমন তাদের নামে নামংকিত জায়গার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে দেবতাদের মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র, তাদের স্থানীয় জনপ্রিয়তা, এবং ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সঙ্গে যোগসূত্র।[১০]

পুরাণ

[সম্পাদনা]

দেবতা এবং অন্যান্য মানুষ

[সম্পাদনা]
দেবতা থর নদী দিয়ে কষ্ট করে চলছেন যখন এইসার বিফ্রস্ট সেতু দ্বারা চলছেন।লরেঞ্জ ফ্রোলিচ দ্বারা একটি চিত্রণ (১৮৯৫)

নর্স পুরাণ দেবতাদের অবস্থা এবং তাদের পারস্পরিক আদানপ্রদানকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে যা তারা অন্যান্য প্রাণীদের সাথে করে থাকে, যেমন মানবজাতি ও যোটনার, অন্যান্য সত্তা যা তাদের বন্ধু, প্রিয়তমা, শত্রু বা দেবতাদের পরিবারের সদস্যরা। উৎস গ্রন্থে অনেক দেবতাদের কথা উল্লেখ করা হইয়েছে।ব্যক্তিগত নাম এবং জায়গার নামকে প্রমাণ হিসেবে ধরে, ভাইকিং যুগে স্ক্যান্ডিনেভিয়াদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবতা ছিল থর, যিনি কঠোর ভাবে নিজের শত্রুদের দমন করেন, হাতে পর্বত-চূর্ণকারী, বজ্রময় হাতুড়ী মিয়োলনীর নিয়ে। পুরানে, থর বহু সংখ্যক যোটনার হত্যা করেছেন যারা দেবতা ও মানবতার শত্রু ছিল, এবং স্বর্ণকেশী সুন্দরী দেবী সিফ এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন।[১১]

বেঁচে যাওয়া গ্রন্থগুলোতে দেবতা ওডিনকেও অনেকবার উল্লেখ করা হয়েছে। একচক্ষুবিশিষ্ট, নেকড়ে ও কাক পাঁশে, এবং বর্শা হাতে, ওডিন সারা বিশ্বময় জ্ঞানের অন্বেষণ করেন। আত্মত্যাগের উদাহরণ হিসেবে, তিনি রুনিক বর্ণমালার জ্ঞান আরোহণের জন্য মহাজাগতিক গাছ,ইগড্রাসিল, থেকে আত্মহত্যা করেন, যে জ্ঞান পরে তিনি মানুষকে দান করেন, এবং জ্ঞান, কবিতা ও মৃত্যুর সাথে তাকে সম্পর্কিত করা হয়। মৃত্যুর সঙ্গে ওডিনের একটি শক্তিশালী সংশ্লেষ আছে; ওডিনকে ভালহালার শাসনকর্তা হিসেবে দেখানো হয়, যুদ্ধে মৃত অর্ধেককে যেখানে ভ্যালকেরিরা বয়ে নিয়ে যায়।ওডিনের স্ত্রী হচ্ছে শক্তিশালী দেবী ফ্রিগ যে ভবিষ্যৎ দেখতে পারে কিন্তু কাউকে বলে না, এবং যার সাথে তার একটি প্রিয় ছেলে আছে, বালডর। বালডর নিজের মৃত্যু সম্পর্কে একগাথা স্বপ্ন দেখার পর, তার মৃত্যু লোকি ব্যবস্থা করেছিল, এবং মৃত্যুর পর বালডর হেল নামক জায়গায় বসবাস করতে থাকে, যা একই নামের দেবী শাসন করে।[১২]

ওডিনকেও মৃত লোকদের থেকে তার অংশের অর্ধেক ভাগ করে নিতে হয় শক্তিশালী দেবী; ফ্রাইয়া এর সাথে।তিনি সুন্দর, ইন্দ্রি়পরায়ণ, একটি পালকের আলখাল্লা পরেন, এবং সিধ (জাদুবিদ্যা) চর্চা করেন। তিনি যুদ্ধে গমন করেন নিহতদের মধ্যথেকে নির্বাচিত করার জন্য যাদের তিনি নিজের পরকাল ক্ষেত্র ফোকভ্যাঙে নিয়ে আসেন। ফ্রাইয়া তার হারিয়ে যাওয়া স্বামী ওড এর জন্য কাঁদেন যাকে তিনি খুঁজতে দূরে কোন স্থানে চলে যান।[১৩] ফ্রাইয়ার ভাই, দেবতা ফ্রেইকে গন্থসমূহে অনেকবার উল্লেখ করা হেয়েছে , এবং তাকে আবহাওয়া, রাজকীয়তা, মানব যৌনতা এবং কৃষির সাথে সম্পর্কিত করা হয় যা মানবকুলে শান্তি ও আনন্দ বয়ে আনে।সুন্দরী জটুন গের্ডকে একনজর দেখে তার প্রেমে পরে যান এবং তাকে কামনা করেন ও তার প্রেমকে জয় করেন, কিন্তু তার ভবিষ্যৎ দুর্ভাগ্যের মূল্যে।[১৪] তাদের পিতা হচ্ছেন শক্তিশালী দেবতা এনজোর্ড। এনজোর্ডকে জোরালোভাবে জাহাজ এবং সমুদ্রে ভ্রমণ সঙ্গে যুক্ত করা হয়, এবং তাই সম্পদ ও সমৃদ্ধির সাথেও। ফ্রেইয়া এবং ফ্রেই এর মা হচ্ছেন এনজোর্ডের বোন (উৎস গ্রন্থে তার নাম দেয়া নেই)। যাইহোক, স্কিং এবং শিকারের দেবী স্কাদীর সাথে তার প্রণয় সম্পর্কে আরও তথ্য রয়েছে। তাদের সম্পর্ক অসুখী ছিল কারণ স্কাদী তার প্রিয় পাহাড়গুলো থেকে না পারতো দূরে থাকতে না এনজোর্ড থাওতে পারতো সমুদ্রতীর থেকে।[১৫] একসাথে, ফ্রেইয়া, ফ্রেই এবং এনজোর্ডকে দেবতাদের একটি অংশ তৈরি করা যা ভানির নামে পরিচিত।যেখানে এইসার এবং ভানির তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখে, তারা একসাথে হয়েছিল এইসার-ভানির যুদ্ধের ফলে।[১৬]

যদিও তাদের কম উল্লেখ করা হয়েছে, উৎস গ্রন্থে অনেক অন্যান্য দেব ও দেবীর কথা পাওয়া যায় (এই দেবতাদের তালিকার জন্য, দেখুন জার্মানিয় দেবতাদের তালিকা)। যেসব দেবতাদের সম্পর্কে আমরা কম জানি তাদের মধ্যে আছে আপেল বহনকারী দেবী ইদুনা এবং তার স্বামী, স্কাল্ডিক দেবতা ব্রাগী; স্বর্ণের দাঁতওয়ালা, শুভ্র রঙের দেবতা হাইমডাল, নয় জন মার দ্বারা যার জন্ম; প্রাচীন দেবতা টিয়াস, যে মহান নেকড়ে ফেনরিরকে বাধার সময় একহাত হারান;এবং দেবী গেফজন, এই সময়ের জিল্যান্ড ও ডেনমার্ককে যিনি সৃষ্টি করেছেন।[১৭]

দেবতাদের বাইরে অন্যান্য সত্তারও উল্লেখ পাওয়া যায়।পরী এবং বামনদের সচরাচর উল্লেখ পাওয়া যায় এবং সংযুক্ত বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু তাদের বৈশিষ্ট্যাবলী অস্পষ্ট এবং এই দুটির মধ্যে সম্পর্ক অনির্দিষ্ট।যেখানে পরীদের সুন্দর ও উজ্জ্বল বলে বর্ণনা করা হয়, সেখানে বামনরা পার্থিব নির্মাতা হিসেবে কাজ কর।[১৮] কিছু সত্তার দলকে যাদের বিভিন্ন ভাবে বর্ণনা করা হয় যেমন যোটনার, থারসার, এবং ট্রোলস (অনেক সময় ইংরেজিতে এদের ব্যাখ্যা করা হয় "দৈত্য" হিসেবে) তাদের বারংবার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই সত্তারা দেবতাদের হয় সাহায্য বা বাধা দেয় অথবা তদের মাঝে স্থান গ্রহণ করে নেয়।[১৯] নর্ন, ডিজির এবং উপর্যুক্ত ভ্যালকেরি দের ঘন ঘন উল্লেখ পাওয়া গেছে।যদিও তাদের কার্যাবলী ও ভূমিকা একে উপরে জড়ানো এবং ভিন্ন হতে পারে ,এইগুলো সব সমষ্টিগত মহিলা সত্তা যা ভাগ্যের সাথে জড়িত।[২০]

সৃষ্টিতত্ব

[সম্পাদনা]
কেন্দ্রীয় মহাজাগতিক বৃক্ষ ইগড্রাজেল যা  ফ্রেইড্রিক উইলহেইম হেইন (১৮৮৬) দ্বারা অঙ্কিত " দ্যা এশ ইগড্রাজেল" চিত্রতে দেখানো হয়েছে।
সল (সূর্য), এবং ম্যানি (চাঁদ),যাদের নেকড়ে স্কোল এবং হ্যাঁটি ধাওয়া করছে। যে.সি. ডলম্যান (১৯০৯০ দ্বারা চিত্রনে "দ্যা ওল্ভোস পারসুইং সল অ্যান্ড মানি"।

পৃথিবী সমূহের -সর্বমোট নয়টি- সৃষ্টিতত্ব, যেখানে সকল সত্তারা বসবাস করে, একটি কেন্দ্রীয় মহাজাগতিক বৃক্ষকে, ইগড্রাজেলকে, ঘিরে আবর্তিত হয়েছে।দেবতাদের অধিষ্ঠান হচ্ছে স্বর্গীয় আ্যসগার্ডে, যেখানে মানবরা মিডগার্ডে, বিশ্বব্রহ্মান্ডের কেন্দ্রে একটি অঞ্চল,বসবাস করে। দেবতা, মানব এবং যোটনারদের বাহিরে, এই নয় বিশ্বে অন্যান্য সত্তারা বসবাস করে , যেমন পরী এবং বামন। পুরাণে এই বিশ্ব সমূহের মধ্যে যাতায়াত ঘন ঘন বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে দেবতা ও অন্যান্য সত্তারা মানুষদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে। ইগড্রাসেলে অনেক জীবজন্তু বসবাস করে, যেমন বার্তাবাহক অপমানকারি কাঠবিড়ালি রাতাতস্কর  এবং উচ্চাসনে বসা বাজপাখি ভেডফলনির। গাছটির নিজেরই তিনটি প্রধান মূল আছে, এই মূলগুলোর একটির ভিত্তিতে ত্রয়ী নর্ন বাস করে।[২১] এই ব্রহ্মাণ্ডের উপদানগুলকে বিভিন্ন ব্যক্তিরূপে প্রকাশ করা হয় যেমন সূর্য (সল, একজন দেবী), চাঁদ (মানি, একজন দেবতা),এবং পৃথিবী (জর্ড, একুজন দেবী), এছাড়া সময়ের এককগুলোকেও, যেমন দিন (ডেগ, একজন দেবতা) এবং রাত (নট, একজন যোটান)।[২২]

নর্স পুরাণে মৃত্যুপরবর্তী জীবন অনেক জটিল। মৃতরা কাদাময় রাজ্য হেলে যেতে পারে—যেখানে একই নামের এক মহিলা সত্তা রাজত্ব করে, ভ্যালকেরিদের দ্বারা পরিবাহিত হয়ে ওডিনের সামরিক হলঘর ভালহালাতে যেতে পারে,অথবা ফ্রেইয়া দ্বারা নিজের পরকাল ক্ষেত্র ফোকভ্যাঙে বাস করার জন্য নির্বাচিত হতে পারে।[২৩] দেবতা র্যান সমুদ্রে মৃতদের দাবী করতে পারেন, এবং দেবী গেফজন মৃত কুমারীদের দাবী করেন।[২৪] পুরাণে পুনর্জন্মেরও উল্লেখ করা হয়েছে।[২৫] সময়কে চক্রাকার ও সরলরেখা উভয় দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে, এবং কিছু পণ্ডিত দাবী করেন যে চক্রাকার সময় হচ্ছে পুরাণের সময়ের আসল বিন্যাস।[২৬] আইসল্যান্ডিয় উৎসে মহাজাগতিক সৃষ্টির অনেক গল্প বলা হয়েছে, এবং কিছু গ্রন্থে র্যাগনারোকের ভবিষ্যৎ ধ্বংস ও পুনর্জন্মের অনেক উল্লেখ করা হয়েছে।[27]][২৭]

মানবজাতি

[সম্পাদনা]

পোয়েটিক এড্ডার  কবিতা ভলাস্পা এবং প্রোস এড্ডার মতে, প্রথম মানব যুগল হচ্ছে আস্ক ও এম্ব্ল্যা; ত্রয়ী দেবতা জলে ভাসমান একটি কাঠ আবিষ্কার এবং তিনটি উপহাররূপে তাতে জীবন দান করেন।র্যাগনারোকের প্লাবনের পর, এই ঘটনাটি একটি কাঠ থেকে দুইজন মানুষের লড়াই রূপে প্রতিফলিত হয়;লিফ এবংলিফ্থাসির । বলা হয়ে থাকে যে এই দুই মানুষ থেকে নতুন সবুজ পৃথিবী আবার জনপূর্ণ হয়।[২৮]

নর্স পুরাণে অনেক বীরের লেখা পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন গান, কবিতা এবং বর্ণনায় তাদের স্মরণ করা হয়।

জনপ্রিয় সংস্কৃতির উপর প্রভাব

[সম্পাদনা]

এই সময়ে নর্স পৌরাণিক কথা ও কিংবদন্তীর ব্যাপক প্রকাশের ফলে, নর্স দেবতা ও বীরদের প্রসঙ্গ ইউরোপের বিভিন্ন সাহিত্য সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পরে, বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়া, জার্মানি, এবং ব্রিটেনে। বিংশ শতাব্দির শেষের দিকে, নর্স পুরাণের প্রসঙ্গ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও কল্পনামূলক সাহিত্য, রোল প্লেইং ভিডিও গেমস, এবং পরবর্তীতে অন্যান্য সংস্কৃতি যেমন জাপানী অ্যানিমেশনে ছড়িয়ে পরে।

আরও পড়ুন

[সম্পাদনা]

সাধারণ দ্বিতীয় কাজ

[সম্পাদনা]

আধুনিক পুনঃকথন

[সম্পাদনা]
  • Bradish, Sarah Powers (১৯০০)। Old Norse stories। New York: American Book Company / Internet Archive
  • Colum, Padraic (1920). The Children of Odin: The Book of Northern Myths, illustrated by Willy Pogány. New York, Macmillan. Reprinted 2004 by Aladdin, আইএসবিএন ০-৬৮৯-৮৬৮৮৫-৫.
  • Crossley-Holland, Kevin (1981). The Norse Myths. New York: Pantheon Books. আইএসবিএন ০-৩৯৪-৭৪৮৪৬-৮. Also released as The Penguin Book of Norse Myths: Gods of the Vikings. Harmondsworth: Penguin. আইএসবিএন ০-১৪-০২৫৮৬৯-৮.
  • d'Aulaire, Ingri and Edgar (1967). "d'Aulaire's Book of Norse Myths". New York, New York Review of Books.
  • Munch, Peter Andreas (1927). Norse Mythology: Legends of Gods and Heroes, Scandinavian Classics. Trans. Sigurd Bernhard Hustvedt (1963). New York: American-Scandinavian Foundation. আইএসবিএন ০-৪০৪-০৪৫৩৮-৩.
  1. Faulkes (1995), পৃ. vixxi, and Turville-Petre (1964), পৃ. 134.
  2. Faulkes (1995), পৃ. xvixviii।
  3. Turville-Petre (1964), পৃ. 2734।
  4. Lindow (2001), পৃ. 1112, Turville-Petre (1964), পৃ. 1721, and MacLeod & Mees (2006), পৃ. 2728, 216.
  5. Regarding the dísir, valkyries, and figurines (with images), see Lindow (2001), পৃ. 9597.
  6. Lindow (2001), পৃ. 2930, 227228, and Simek (2007), পৃ. 84, 278.
  7. Puhvel (1989), পৃ. 189221, and Mallory (2005), পৃ. 128142.
  8. Turville-Petre (1964), পৃ. 13।
  9. Regarding Ragnhild Tregagås, see MacLeod & Mees (2006), পৃ. 37.
  10. Turville-Petre (1964), পৃ. 23, 178।
  11. Lindow (2001), পৃ. 287291।
  12. Lindow (2001), পৃ. 128129, 247252।
  13. Lindow (2001), পৃ. 118, 126128।
  14. Lindow (2001), পৃ. 121122।
  15. Lindow (2001), পৃ. 241243।
  16. Lindow (2001), পৃ. 311312।
  17. Lindow (2001), পৃ. 8688, 135137, 168172, 198199, 297299।
  18. Lindow (2001), পৃ. 99102, 109110, and Simek (2007), পৃ. 6769, 7374.
  19. Simek (2007), পৃ. 108109, 180, 333, 335।
  20. Lindow (2001), পৃ. 9597, 243246.
  21. Lindow (2001), পৃ. 319332.
  22. Lindow (2001), পৃ. 9192, 205206, 222223, 278280।
  23. For Hel, see Lindow (2001), পৃ. 172, and Orchard (1997), পৃ. 79.
  24. For Rán, see Lindow (2001), পৃ. 258259, and Orchard (1997), পৃ. 129.
  25. Orchard (1997), পৃ. 131।
  26. Lindow (2001), পৃ. 4243।
  27. Lindow (2001), পৃ. 12, 40, 254258।
  28. Simek (2007), পৃ. 189।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]

উইকিমিডিয়া কমন্সে নর্স পুরাণ সম্পর্কিত মিডিয়া দেখুন।