তাণ্ডব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

তাণ্ডব (আরো একটা বানান হল তাণ্ডবম্‌) অথবা তাণ্ডব নাট্যম হল একটা পরিচিত স্বর্গীয় নাচ যা হিন্দু দেবতারা প্রদর্শন করতেন। হিন্দু ধর্মগ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী দেবতারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাণ্ডবের প্রদর্শন করতেন। ভাগবত পুরাণে কালীয় নাগের মাথায় কৃষ্ণের তাণ্ডব নাচের কথা বলা হয়েছে।[১] শিব তাঁর শোক এবং রাগ জাহির করতে রুদ্র তাণ্ডব প্রদর্শন করেছিলেন বলে বলা হয়, সতী (শিবের প্রথমা স্ত্রী, যিনি পার্বতী রূপে পুনর্জন্ম পেয়েছিলেন) যখন দক্ষ যজ্ঞের অগ্নি কুণ্ডে (বলি সংক্রান্ত আগুন) ঝাঁপ দিয়ে তাঁর জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন, তখন শিব তাঁর শোক এবং রাগ জাহির করতে রুদ্র তাণ্ডব নৃত্য প্রদর্শন করেছিলেন বলে বলা হয়। শিবের পুত্র গণেশকে মন্দির ভাস্কর্যে অষ্টভুজ তাণ্ডব নৃত্য মূর্তি (আট হাতওয়ালা তাণ্ডব নৃত্যরত গণেশের চেহারা) হিসেবে দেখানো হয়েছে। [১]

জৈন ঐতিহ্য অনুযায়ী বলা হয় যে, ইন্দ্র ঋষভের (জৈন তীর্থঙ্কর) জন্মের সময় তাঁর সম্মানে তাণ্ডব নৃত্য প্রদর্শন করেছিলেন। [১]

হিন্দু ধর্ম[সম্পাদনা]

তাণ্ডব হল ভারতের এক পবিত্র নৃত্য-নাট্য প্রদর্শন, যাতে বলিষ্ঠ, প্রাণবন্ত অঙ্গ সঞ্চালন আছে। খুশিতে প্রদর্শন করা নাচ হল আনন্দ তাণ্ডবরৌদ্র বা রুদ্র তাণ্ডব হল হিংস্র মনের ভাবের প্রদর্শন। হিন্দু গ্রন্থাদিতে যে ধরনের তাণ্ডবের উল্লেখ আছে সেগুলো হল: আনন্দ তাণ্ডব, ত্রিপুরা তাণ্ডব, সান্ধ্য তাণ্ডব, সমাহার তাণ্ডব, কালী (কালিকা) তাণ্ডব, উমা তাণ্ডব, শিব তাণ্ডব, কৃষ্ণ তাণ্ডব এবং গৌরী তাণ্ডব।[১]

কৃষ্ণ তাণ্ডব[সম্পাদনা]

কৃষ্ণ[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ] পদানত কালীয় নাগের ওপর নৃত্যরত এবং তাঁর নাগিনী স্ত্রীগণ কৃষ্ণের করুণা ভিক্ষা করছেন। ভাগবত পুরাণের একটি পাণ্ডুলিপি থেকে গৃহীত। ১৬৪০।

ভাগবত পুরাণ বলছে, কালীয় নামক এক নাগকে দমন করে কৃষ্ণ তার ফণার ওপর নেচেছিলেন এবং অশুদ্ধ যমুনা নদীকে শুদ্ধ করেছিলেন। এই পর্বটা ব্রজের মানুষদের আতঙ্ক দূর করে বিষাক্ত নাগ কালীয়কে দমন করার বর্ণনা দেয়; এই প্রসঙ্গে কৃষ্ণ তাণ্ডব বা কৃষ্ণের তাণ্ডব নৃত্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। [২]

লেখিকা অঙ্গনা ঝাবেরি রাসলীলা কৃষ্ণ তাণ্ডবের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন যে, এটা খুব দ্রুততা এবং আনন্দপূর্ণ নাচের অঙ্গ সঞ্চালন। এতে সংশ্লিষ্ট আছে ছোটো ছোটো দ্রুত অঙ্গ সঞ্চালন, হালকা ঘুরন্ত লাফ, দ্রুত পদসঞ্চালন, চঞ্চলগতিতে দ্রুত ঘূর্ণন এবং কিছু শারীরিক কসরত। কিন্তু এই নাচে সর্বোপরি মাধুর্য এবং মার্জিত রূপে মানানসই কৃষ্ণের রোমান্টিক ও যৌবনোদ্দীপ্ত চরিত্র ফুটে উঠেছে।[৩]

ষোড়শ শতকের পূর্ব পর্যন্তও 'নাচের দেবতা' হিসেবে কৃষ্ণের উপাসনা প্রচলিত ছিল। লেখক এবং অধ্যাপক ক্যালেব সাইমন্স তাঁর ডিভোশনাল সভারেন্টি: কিনসিপ অ্যান্ড রিলিজিয়ন ইন ইন্ডিয়া বইতে বলেছেন যে, রাজা চিক্কা দেবরাজা (মহীশূর রাজ্যের চতুর্দশ মহারাজা) নিজের রাজ্যাভিষেককে স্মরণীয় করার জন্যে 'দেবরাজা (সঙ্গে) নৃত্যরত কৃষ্ণের প্রতিকৃতি' (তাণ্ডব কৃষ্ণমূর্তি দেবরাজা) নামে এক ধারাবাহিক স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেন।[৪]

লেখক সহদেব কুমার তাঁর আ থাউস্যান্ড পেটাল্‌ড লোটাস: জৈন টেম্পল অব রাজস্থান: আর্কিটেকচার অ্যান্ড আইকনোগ্রাফি বইতে বলেছেন যে, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের আগে, চোল রাজত্বের সময়ে, নটরাজা নাচ এবং কালিয়া নাগের একশো ফণার ওপরে কৃষ্ণ তাণ্ডব নাচ শিল্পীদের সমাদৃত বিষয় ছিল। [৫]

বিদুষী লাবণ্য ভেমসানি বলেছেন, "ভরতনাট্যম এবং কুচিপুড়ি তাণ্ডব নামে একটা নৃত্যশৈলীর উন্নয়ন ঘটায়, প্রাণবন্ত পদসঞ্চালনের সঙ্গে প্রধানত জোরালো নাচ হিসেবে প্রচলিত হয় যেটা একসময় শিশু কৃষ্ণ বৃন্দাবনে কালিন্দী হ্রদে কালীয় নাগকে দমন করে এই নাচ প্রদর্শন করেছিলেন।"[৬]

কৃষ্ণ নৃত্যের (নাচ) অনেকগুলো রচনা সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে। পুরন্দর দাস 'নৃত্য কৃষ্ণ'কে 'তাণ্ডব কৃষ্ণ' হিসেবে নামকরণ করেছেন। পুরন্দর দাস তাঁর একটা রচনায় বলেছেন, 'তাণ্ডব কৃষ্ণনা ভজিসি' ('তাণ্ডব কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা')। এই সূত্র ধরে আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, 'তাণ্ডব' হল কৃষ্ণ এবং অন্যান্যদের চর্চিত একটা নৃত্য (নাচ)।[৭]

শিব তাণ্ডব ও শৈববাদ[সম্পাদনা]

শৈববাদ মতে শিবের তাণ্ডবকে সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয় চক্রের উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। যখন রুদ্র তাণ্ডব তাঁর হিংস্র রূপ চিত্রিত করে, প্রথমটা সৃষ্টি এবং পরবর্তীটা বিশ্বের ধ্বংস, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত দেখায়, তখন আনন্দ তাণ্ডব তাঁকে আনন্দপূর্ণ দেখায়। শিব সিদ্ধান্ত ঐতিহ্য অনুযায়ী, নটরাজরূপী শিবকে (আক্ষরিক অর্থে 'নৃত্যের রাজা' [৮]) নৃত্যের সর্বোচ্চ দেবতা বলে মান্য করা হয়।[৯] তাণ্ডবম্‌ নামটা এসেছে শিবের অনুচর তাণ্ডু (তণ্ডু) থেকে, যিনি শিবের তাণ্ডব নাচের বিন্যাস অনুযায়ী অঙ্গহারকরণ গুলোর[১০] আঙ্গিকে ভরতকে (নাট্যশাস্ত্র রচয়িতা) নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিছু পণ্ডিতের ভাবনা ছিল যে, তাণ্ডু নিজে গোড়ায় নাটকীয় শিল্প রচনার লেখক অবশ্যই ছিলেন, যেগুলো নাট্যশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল।[১১] প্রকৃতপক্ষে, শিব ঐতিহ্যের মুদ্রাসমূহ এবং আচার-অনুষ্ঠান থেকেই সম্ভবত উচ্চাঙ্গের নৃত্য, নাট্য ও সংগীত এসেছে।

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে একটা শিব নটরাজনের মূর্তি

ভরত রচিত নাট্যশাস্ত্রে তাণ্ডব লক্ষণম[১২] নামে চতুর্থ অধ্যায়ে ৩২টা অঙ্গহার এবং ১০৮টা কারণের বর্ণনা দেওয়া আছে। কারণ হল পায়ের সঙ্গে যুগ্ম হাতের ভঙ্গী এবং নাচের একটা অঙ্গবিন্যাস। অঙ্গহার হচ্ছে সাত অথবা ততোধিক কারণের সমাহার।[১৩]

শিবের উপাসনায় কতগুলো বিভিন্ন নাচ আছে তা আমি বলতে পারিনা। এই সমস্ত নাচের পিছনে কমবেশি এক এবং অদ্বিতীয় মূল ধারণা ছিল নিঃসন্দেহে আদিম ছন্দোবদ্ধ শক্তির অভিব্যক্তি। শিবের নাচের উৎস হিসেবে যেটা ছিল, এটা কালক্রমে দেবতার কার্যকরতার পরিষ্কার চিত্র হয়েছিল, যা নিয়ে যেকোনো শিল্প অথবা ধর্ম অহংকার করতে পারে।" - আনন্দ কুমারস্বামী[১৪]

শিবের তাণ্ডব নাচের প্রত্যুত্তরে তাঁর সহধর্মিনী পার্বতী যে নাচ প্রদর্শন করেন তাকে লাস্য বলা হয়, যে নাচের অঙ্গসঞ্চালনগুলো নম্র, মাধুর্যপূর্ণ এবং অনেক সময় কামদ। কিছু পণ্ডিতের মতে লাস্য হল তাণ্ডবের নারীত্বপূর্ণ রূপ। লাস্য দুরকমের, জারিতা লাস্য এবং যৌবক লাস্য।

শিব তাণ্ডব স্তোত্রম্‌ হল একটা স্তোত্র (হিন্দু স্তব) যেটা শিবের শক্তি ও সৌন্দর্য বর্ণনা করে।

ভারতীয় উচ্চাঙ্গ নৃত্য[সম্পাদনা]

কত্থক নাচে কৃষ্ণ তাণ্ডব, শিব তাণ্ডব এবং রাবণ তাণ্ডব, এই তিন প্রকারভেদ আছে, তবে কখনো কখনো কালিকা তাণ্ডব নামে চতুর্থ ধরনও ব্যবহার করা হয়।[১৫][১৬] মণিপুরি নৃত্য 'তাণ্ডব' (সাধারণত শিব, শক্তি অথবা কৃষ্ণকে যোদ্ধা-ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখিয়ে জোরালো বিষয় ভাব রাখা হয়) অথবা লাস্য (রাধা ও কৃষ্ণের সূক্ষ্ম[১৭] প্রেম উপাখ্যানকে সাধারণত ভাবার্থ করা

হয়)।[১৮][১৯]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Manohar Laxman Varadpande 1987
  2. Shovana Narayan (১ জানুয়ারি ২০০৪)। Indian Theatre And Dance Traditions। Harman Publishing House। পৃষ্ঠা 14। আইএসবিএন 978-8186622612 
  3. Angana Jhaveri (১৯৮৬)। The Raslila Performance Tradition of Manipur in Northeast India। Michigan State University. Department of Theater। পৃষ্ঠা 105। Krishna tandava as used in the raslila has very spritely and joyful dance movements. It involves small quick movements, light springy jumps, fast footwork, spinning at a dizzy speed and some acrobatic movements. But the overall effect of the form is that of grace and delicacy suitable to the romantic and youthful character of Krishna. 
  4. Caleb Simmons (২ ডিসেম্বর ২০১৯)। Devotional Sovereignty: Kingship and Religion in India। Oxford University Press। পৃষ্ঠা 8। আইএসবিএন 978-0190088910 
  5. Sehdev Kumar (২০০১)। A Thousand Petalled Lotus: Jain Temples of Rajasthan : Architecture & Iconography। Abhinav Publications। পৃষ্ঠা 184। আইএসবিএন 978-8170173489 
  6. Lavanya Vemsani (১৩ জুন ২০১৬)। Krishna in History, Thought, and Culture: An Encyclopedia of the Hindu Lord of Many Names: An Encyclopedia of the Hindu Lord of Many Names। ABC-CLIO। পৃষ্ঠা 220। আইএসবিএন 9781610692113Bharatanatyam and Kuchipudi developed a style of dance known as Tandava, a set of vigorous dance moves mainly performed with brisk movements of the feet, which was once said to have been performed by the child Krishna while he deafeated the sepant Kaliya in Kalind lake in Brindavan. 
  7. Tumuluri Seetharama Lakshmi (১৯৯৪)। A study of the compositions of Purandaradāsa and Tyāgarāja। Veda Sruti Publications। পৃষ্ঠা 116। 
  8. Joyce Burkhalter Flueckiger (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। Everyday Hinduism। John Wiley & Sons। পৃষ্ঠা 74। আইএসবিএন 978-1118528181 
  9. "Nataraja", Manas, UCLA
  10. Natya-shastra IV.263-264
  11. Quarterly Journal of the Andhra Historical Research Society, part III, pp. 25-26, as cited in Manohar Laxman Varadpande 1987, পৃ. 154
  12. Ragini Devi, Dance Dialects of India, pp.29-30. Motilal Banarsidass (1990) আইএসবিএন ৮১-২০৮-০৬৭৪-৩
  13. Manohar Laxman Varadpande 1987, পৃ. 154।
  14. Ananda K. Coomaraswamy, "The Dance of Shiva", in The Dance of Shiva: Fourteen Indian Essays, rev. ed. (New York: Noonday Press, (1957) আইএসবিএন ৮১-২১৫-০১৫৩-৯. Cited, "Nataraja", Manas, UCLA
  15. Classical and Folk Dances of India। Marg Publications। ১৯৬৩। পৃষ্ঠা 43। There are three types of Tandavas generally used in Kathak, namely, Krishna Tandava, Shiva Tandava and Ravana Tandava, but sometimes a fourth variety - Kalika Tandava, is also recognised . 
  16. Marie Joy Curtiss (১৯৭০)। Kathak, Classical Dance of India। University of the State of New York। পৃষ্ঠা 12। 
  17. Vimalakānta Rôya Caudhurī (২০০০)। The Dictionary of Hindustani Classical Musicবিনামূল্যে নিবন্ধন প্রয়োজন। Motilal Banarsidass। পৃষ্ঠা 80আইএসবিএন 978-81-208-1708-1 
  18. Reginald Massey 2004, পৃ. 193-194।
  19. Saryu Doshi 1989, পৃ. xvi-xviii, 44-45।