চেরনোবিলের বিপর্যয়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
চেরনোবিলের বিপর্যয়
চেরনোবিল বিপর্যয়.jpeg
বিপর্যয়ের পর নিউক্লিয়ার পারমাণবিক চুল্লী। পারমাণবিক চুল্লী ৪(কেন্দ্রে)। টারবাইন ভবন (নীচদিকে বামে)। পারমাণবিক চুল্লী ৩ (কেন্দ্রে ডানে)।
তারিখ২৬ এপ্রিল ১৯৮৬ (১৯৮৬-০৪-২৬)
সময়০১:২৩ (মস্কো সময় ইউটিসি+৩)
অবস্থানপৃপিয়াত, ইউক্রেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন
কারণএকটি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে পারমাণবিক চুল্লীতে জরুরী বন্ধ করার কালে অসতর্ক বিস্ফোরণ
মৃত্যু৩১ (সরাসরি)
জেনেভায় নিউক্লিয়ার-বিরোধী পাওয়ারের প্রতিবাদে মৃত অবসায়কদের প্রতিমূর্তি

তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২৬শে এপ্রিল, ১৯৮৬ তারিখে সংঘটিত ভয়াবহ পারমানবিক দুর্ঘটনাটি চেরনোবিলের বিপর্যয় হিসাবে পরিচিত। চেরনোবিল বর্তমারন ইউক্রেনের অন্তর্ভূত। এই পারমাণবিক দুর্ঘটনাকে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করা হয়।

অবস্থান

দুর্ঘটনা[সম্পাদনা]

চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট পারমাণবিক চুল্লীর সংখ্যা ছিল ৪টি। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাত ১টা ২৩ মিনিটে ইউক্রেন ও বেলারুশ সীমান্তে অবস্থিত পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির [১] চতুর্থ পারমাণবিক চুল্লী থেকেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়। দুর্ঘটনাটি মূলত ঘটেছিলো নিরাপদ শীতলীকরণের ওপর একটি পরীক্ষা চালানোর সময়। রাতের শিফটে দায়িত্বরত কর্মীরা ভুল করে পারমাণবিক চুল্লীটির টার্বাইনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শীতল পানি প্রবাহিত করে। ফলে সেখানে বাষ্প কম উৎপাদিত হয়। এতে করে পারমাণবিক চুল্লীটি উত্তপ্ত হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে।
পরপর প্রায় একই সঙ্গে সংঘটিত দুটি বিস্ফোরণে বিদ্যৎ কেন্দ্রের চতুর্থ পারমাণবিক চুল্লীর ওপরের প্রায় এক হাজার টন ওজনের কংক্রীটের ঢাকনা সরে যায় এবং ছাদ ভেঙে যাওয়ার ফলে এক বিশাল গহ্বরের সৃষ্টি হয়। দুর্ঘটনার ২০ ঘণ্টা পর [২] বাইরের বাতাস ঢুকে পড়লে পারমাণবিক চুল্লীর দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে সেখানে বিরাট অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এ আগুন ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এতে করে পারমাণবিক বিক্রিয়ায় তৈরী পদার্থ পরিবেশে প্রায় ১ কিলোমিটার উঁচু অবধি ছড়িয়ে পড়েছিল এবং প্রচুর পারমাণবিক ধুলো পরিবেশের ব্যাপক দূষণ ঘটিয়েছিল।[৩] পরিবেশে যে পরিমাণে পারমাণবিক পদার্থ নিক্ষিপ্ত হয়েছিল তা ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিক্ষিপ্ত প্রায় পাঁচশটি পারমাণবিক বোমার সমান। এই দুর্ঘটনার ফলে উদ্ভূত পারমাণবিক ভাবে সক্রিয় মেঘটি ইউক্রেন, বেলোরাশিয়া, রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়াতে, গ্রেট ব্রিটেনে এমন কি পূর্ব আমেরিকার ওপর পর্যওন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল।[৪]

দুর্ঘটনা সময়রেখা[সম্পাদনা]

২৫শে এপ্রিল - ২৬শে এপ্রিল, ১৯৮৬

রাত ১১ ঘটিকাঃ রাতের শিফটের কর্মীরা চার নম্বর চুল্লীতে একটা রুটিন পরীক্ষা "যদি ব্যাকআপ বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে অল্প শক্তিতে শীতলীকরণ পাম্প ঠিকভাবে কাজ করবে কিনা" শুরু করে।

রাত ১১টার সময় অনেকগুলো নিয়ন্ত্রঙ্কারি কলাম চুল্লীতে প্রবেশ করানো হয় যেন স্বাভাবিক উৎপাদিত বিদ্যুতের ২০% উৎপাদন হয়। এই কলাম পারমাণবিক চুল্লীতে ফিসন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন নিউট্রন শোষণ করে তাপমাত্রা কমিয়ে রাখে।

কিন্তু নিয়ন্ত্রণকারী কলাম অনেক বেশি প্রবেশ করানো হয়, ফলে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ দ্রুত কমে যায় এবং চুল্লী প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়।

এই সময় "স্বয়ংক্রিয় চুল্লী বন্ধ" সিস্টেম সহ সব ধরনের নিরাপত্তা সিস্টেম সব অকেজো করে দেয়া হয় যেন পরীক্ষা চালানোর সময় কোন সমস্যা না হয়।

রাত ১ ঘটিকাঃ উৎপাদিত বিদ্যুৎ মাত্র ৭% হওয়াও অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণকারী কলাম উঠিয়ে ফেলানো হয় যেন বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসে।

রাত ১ ঘটিকা ২৩ মিনিটঃ বিদ্যুৎ উৎপাদন ১২% এ আসে এবং পরীক্ষা শুরু হয়। কিন্তু পরীক্ষা শুরু হবার সাথে সাথে চুল্লীর শক্তি উৎপাদন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বেড়ে যায় এবং মোট শক্তির পরিমাণ বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে আসে এবং সব অ্যালার্ম বাজতে শুরু হয়। এই সময় চুল্লীতে মাত্র ৬টি নিয়ন্ত্রঙ্কারী কলাম ছিল যেখানে স্বাভাবিক নিয়মে ৩০টি থাকার কথা।

কর্মীরা অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করে শেষ করে দেবার জন্যে প্রচুর পানি প্রবেশ করায় টার্বাইনে যেন বেশি পানি বাস্পে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু বেশি পানি সরবরাহ করতে গিয়ে ঠাণ্ডা পানি সরবরাহ করা হয়েছিল এবং পানি বাস্প হতে না পারায় চুল্লীতে উৎপাদিত শক্তির পরিমাণ বাড়তেই থাকে।

রাত ১ ঘটিকা ২৪ মিনিটঃ উৎপাদিত শক্তির পরিমাণ স্বাভাবিক পর্যায়ের ১০০ গুণ হয়ে যায় এবং দুটো বড় আকারের বিস্ফোরণ ঘটে। উৎপাদিত শক্তি প্রশমিত হয়। এই বিস্ফোরণের ফলে চুল্লীর তেজস্ক্রিয় রক্ষাকারী ডোম আকারের ছাদ ধ্বংস হয়ে যায় এবং চুল্লীর মধ্যের তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো বাইরে বেরিয়ে যায়।

[৫]

দুর্ঘটনার কারণ[সম্পাদনা]

দুর্ঘটনার জন্য কর্তব্যরত কর্মীদেরই দায়ী করা হয়ে থাকে। কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা বন্ধ করা ছিলো এবং পারমাণবিক চুল্লীটি অনুপযুক্ত অবস্থায় চালানো হচ্ছিলো, যার ফলে শক্তি নির্গমন অতিরিক্ত গিয়েছিল।[৬] আবার, একটি গবেষণায় বলা হযয়েছে কর্মীদের রাতের শিফটে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ দৃষ্টিকোণ থেকে সার্বিক ব্যবস্থাপনাও দায়ী। একারণে ৩ জনকে ১০ বছরের শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল। তবে বিস্ফোরণের পূর্বে কর্তব্যরত কর্মীরা উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারতো। তারা চুল্লীটি বন্ধ করে দিতে পারতো। কিন্তু পারমাণবিক চুল্লী বন্ধের এখতিয়ার তাদের ছিল না। যে ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ চুল্লী বন্ধের নির্দেশ দিতে পারতেন এত রাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার সাহসও নিযুক্ত কর্মীদের ছিল না। ফলে তাদের চোখের সামনেই দুর্ঘটনটি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

১৯৯৬ সালে চেরনোবিলের চারপাশে পারমাণবিক বিকিরণের মানচিত্র

পরিণতি[সম্পাদনা]

ঘটনার সময় চেরনোবিলে প্রায় ১৪ হাজার বসতি ছিল। দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ৪ জন কর্মী মারা যান। পরবর্তীতে ২৩৭ জন মানুষ পারমাণবিক বিকিরণের ফলে অসুস্থ হয়ে পরে এবং প্রথম তিন মাসে ৩১ জন মৃত্যুবরণ করে, যাদের অধিকাংশই উদ্ধারকর্মী[৭][৮]। সরকারি তথ্যমতে, দুর্ঘটনার কারণে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ লোক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ছিল ছয় লক্ষ শিশু। [৩] এই দুর্ঘটনার ফলে ক্ষতির পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন ডলারের সমান বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।[৯]
বর্তমানে চেরনোবিল শহরটি পরিত্যক্ত এবং প্রায় ৫০ মাইল এলাকা জুড়ে বলতে গেলে কেউ বাস করে না।

দুঘর্টনাপরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

পারমাণবিক দূষণ থেকে পরিবেশকে সংরক্ষণ করতে একটি বিশাল কংক্রীটের খোলসের মধ্যে দুর্ঘটনাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া চতুর্থ পারমাণবিক চুল্লীটিকে ছয় মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ ভাবে ঢেকে ফেলা হয়। ওই অস্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থাই এখন পর্যন্ত পারমাণবিক কেন্দ্রটির ধ্বংসাবশেষকে আটকে রাখার জন্য নির্মিত একমাত্র স্থাপনা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চেরনোবিলের ধ্বংসাবশেষে থাকা গলিত প্রায় ২০০ টন পরমাণু জ্বালানি থেকে যে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়েছে তা হাজার বছরেও সম্পূর্ণ দূর হবে না। তাই এ পরমাণু জ্বালানি বাইরের পরিবেশের আওতামুক্ত রাখতে নতুন একটি নিরাপত্তা স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। উচ্চাভিলাষী স্থাপনাটির নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে ১৬০ কোটি ইউরো বা ২২১ কোটি ডলার [৯]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. দৈনিক কালের কন্ঠ
  2. গ্রীন ফ্যাক্টস
  3. www.bengali.ruvr.ru
  4. www.bengali.ruvr.ru
  5. <http://news.bbc.co.uk/2/shared/spl/hi/guides/456900/456957/html/nn2page1.stm>
  6. গ্রীন ফ্যাক্টস
  7. Hallenbeck, William H (১৯৯৪)। Radiation Protection। CRC Press। পৃষ্ঠা 15। আইএসবিএন 0-873-719-964Reported thus far are 237 cases of acute radiation sickness and 31 deaths. 
  8. Mould 2000, p. 29. "The number of deaths in the first three months were 31[.]"
  9. দৈনিক প্রথম আলো

স্থানাঙ্ক: ৫১°২৩′২২″ উত্তর ৩০°০৫′৫৬″ পূর্ব / ৫১.৩৮৯৪৪° উত্তর ৩০.০৯৮৮৯° পূর্ব / 51.38944; 30.09889 (Chernobyl disaster)