বিষয়বস্তুতে চলুন

কমন্স

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ক্যাসলমর্টনে সাধারণ চারণভূমিতে ভেড়া চরানো, একটি গতানুগতিক পরিবেশগত কমনস

'''কমন্স''' (ইংরেজি: Commons) বলতে এমন সব সম্পদ, স্থান ও জ্ঞানকে বোঝায়, যা একক ব্যক্তি বা কেবল রাষ্ট্রের ব্যক্তিগত মালিকানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা বৃহত্তর সমাজের যৌথ ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকে। [] এই ধরনের সম্পদে প্রবেশাধিকার সাধারণত একাধিক ব্যবহারকারীর মধ্যে ভাগাভাগি হয় এবং সেগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য সমষ্টিগত নিয়ম ও প্রথা গড়ে ওঠে। প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে শুরু করে সংস্কৃতি, ভাষা, জ্ঞান ও ডিজিটাল তথ্য—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কমন্স ধারণা ব্যবহার করা হয়।

সংজ্ঞা ও ধারণাগত বিভাজন

[সম্পাদনা]


কমন্স ধারণা প্রায়ই দুটি সম্পর্কিত পদগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হয়—'''কমন–পুল রিসোর্স''' (common-pool resources) এবং '''পাবলিক গুডস''' (public goods)। কমন–পুল রিসোর্স সাধারণত এমন প্রাকৃতিক বা উপকরণমূলক সম্পদ, যেখানে অন্যদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা কঠিন, কিন্তু ব্যবহারকারীরা অতিরিক্ত ব্যবহার করলে সম্পদের মজুদ কমে যেতে পারে (যেমন নদীর মাছ, সেচের পানি ইত্যাদি)। অপরদিকে, ভাষা বা গণজ্ঞানভাণ্ডারের মতো কিছু সম্পদে একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করলেও তা সরাসরি কমে যায় না, এগুলোকে প্রায়ই অদৃশ্য সাংস্কৃতিক বা জ্ঞানভিত্তিক কমন্স হিসেবে দেখা হয়। []

গ্যারেট হার্ডিনের আলোচিত “ট্র্যাজেডি অব দ্য কমন্স” ধারণা কমন্সকে প্রাকৃতিকভাবে অকার্যকর ও অপব্যবহার–প্রবণ বলে চিহ্নিত করলেও, পরবর্তী গবেষণা দেখিয়েছে যে উপযুক্ত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও নিয়ম থাকলে কমন্স দীর্ঘ সময় ধরে টেকসইভাবে ব্যবস্থাপিত হতে পারে। []

প্রাকৃতিক কমন্স

[সম্পাদনা]

অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয় সম্প্রদায়ের কমন্স হিসেবে ব্যবস্থাপিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়—

  • বন ও চরাঞ্চল, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা কাঠ, জ্বালানি বা পশুচারণের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ব্যবহার করে;
  • মৎস্যসম্পদভিত্তিক নদী ও জলাশয়, যা একাধিক জেলে সম্প্রদায় যৌথভাবে ব্যবহার করে;
  • সেচব্যবস্থা ও সেচনালা, যা কৃষকগোষ্ঠী সমন্বিত নিয়মের মাধ্যমে ভাগাভাগি করে।

এলিনর অস্ট্রমের গবেষণায় বিভিন্ন দেশের সেচব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ ও বনব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এমন বহু উদাহরণ পাওয়া যায়, যেখানে রাষ্ট্র বা ব্যক্তিগত মালিকানার বাইরে স্থানীয় ব্যবহারকারীরা নিজেরাই কমন–পুল রিসোর্স সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষা করেছে। []

সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানভিত্তিক কমন্স

[সম্পাদনা]

কমন্স কেবল ভৌত বা প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভাষা, লোকসংস্কৃতি, স্থানীয় জ্ঞান, লোকঐতিহ্য, সঙ্গীত, নৃত্য, স্থাপত্য ঐতিহ্যসহ নানা সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানভিত্তিক সম্পদও কমন্স আকারে গড়ে ওঠে। []

অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের সাংস্কৃতিক কমন্স আইনি সুরক্ষার (যেমন ঐতিহ্য সংরক্ষণ আইন, স্বত্বাধিকার ব্যতিক্রম, লোকগীতি ও মৌখিক ইতিহাসের সংরক্ষণ) মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় সম্প্রদায়ের অলিখিত প্রথা, নৈতিকতা ও সামাজিক নিয়ম এই কমন্সের ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। []

ডিজিটাল ও জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল কমন্স

[সম্পাদনা]

ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশের ফলে “ডিজিটাল কমন্স” ধারণা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ডিজিটাল কমন্স বলতে সাধারণত সেইসব তথ্য, জ্ঞান, সফটওয়্যার, ডেটা, নকশা ও সাংস্কৃতিক সামগ্রীকে বোঝানো হয়, যা উন্মুক্ত লাইসেন্সের মাধ্যমে সবার জন্য অবাধ বা শর্তসাপেক্ষে বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকে। []উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়—

  • মুক্ত ও মুক্ত–উৎস সফটওয়্যার প্রকল্প;
  • অনলাইন বিশ্বকোষ ও মুক্ত জ্ঞানভাণ্ডার;
  • মুক্ত শিক্ষাসামগ্রী ও উন্মুক্ত শিক্ষাবস্তু;
  • ওপেন ডেটা বা উন্মুক্ত সরকারি তথ্যভান্ডার।

ইওহাই বেঙ্কলার ডিজিটাল যুগে কমন্সের ভূমিকা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে নেটওয়ার্কভিত্তিক সহযোগিতামূলক উৎপাদন নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিন্যাস তৈরি করছে, যেখানে জ্ঞানভিত্তিক পণ্য তৈরি ও ভাগাভাগি করার ক্ষেত্রে একক মালিকানার বদলে শেয়ারড কমন্স–ভিত্তিক ব্যবস্থাই অনেক সময় বেশি কার্যকর হতে পারে। []

এলিনর অস্ট্রমের তাত্ত্বিক অবদান

[সম্পাদনা]

রাজনীতিবিজ্ঞানী এলিনর অস্ট্রম কমন্স গবেষণায় অন্যতম প্রধান নাম। তাঁর বই '''''Governing the Commons: The Evolution of Institutions for Collective Action''''' (১৯৯০)–এ তিনি দেখান যে কমন–পুল রিসোর্স ব্যবস্থাপনায় কেবল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণ বা ব্যক্তিগত মালিকানাই একমাত্র সমাধান নয়; স্থানীয় ব্যবহারকারীরা প্রায়ই নিজেরাই টেকসই ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। []

অস্ট্রম দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োগমূলক গবেষণার মাধ্যমে সফল কমন্স ব্যবস্থাপনার কিছু বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেন, যেমন—

  • স্পষ্টভাবে নির্ধারিত সীমানা ও সদস্যত্ব;
  • স্থানীয় পরিবেশ ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়ম;
  • ব্যবহারকারীদের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত–গ্রহণ প্রক্রিয়া;
  • নিয়ম–মানা পর্যবেক্ষণের জন্য স্বীকৃত মনিটরিং ব্যবস্থা;
  • নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে আরোপিত শাস্তি;
  • সহজলভ্য, স্বল্প–ব্যয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া;
  • স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের সংগঠিত হওয়ার অধিকারকে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতি;
  • বৃহত্তর ব্যবস্থার ক্ষেত্রে উপ–ইউনিট ভিত্তিক “নেস্টেড” বা ধাপে ধাপে স্তরভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো। [১০]

এ সব বৈশিষ্ট্য—যা প্রায়ই অস্ট্রমের “ডিজাইন প্রিন্সিপল” হিসেবে আলোচিত—কমন্সকে কেবল সমস্যার উৎস হিসেবে নয়, বরং সমষ্টিগত ক্রিয়া ও সহযোগিতা বোঝার একটি ইতিবাচক ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরে। তাঁর কাজ পরবর্তী সময়ে পরিবেশনীতি, উন্নয়ন অধ্যয়ন, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান ও ডিজিটাল কমন্স গবেষণায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। [১১]

উদাহরণ

[সম্পাদনা]

ভিলেজ কমন ফরেস্ট

[সম্পাদনা]

কমলছড়ি গ্রামের পাহাড়ি বনকে ঘিরে গড়ে উঠা ‘‘ভিলেজ কমন ফরেস্ট’’–এর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে প্রাকৃতিক কমন্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস অঞ্চলের বহু গ্রামে যেমন সামষ্টিকভাবে ব্যবস্থাপিত বন রয়েছে, কমলছড়িতেও একসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কাঠ, বাঁশ ও জ্বালানি সংগ্রহ, এবং জুম চাষের কারণে বনভূমি ক্ষয় হতে থাকে ও কাছের পানির উৎসগুলো শুষ্ক হয়ে পড়ে। এই সংকটের প্রেক্ষিতে গ্রামবাসীরা নিজেরাই একটি কমিটি গঠন করে বন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়; বন ধ্বংসে জড়িত পরিবারগুলোকে বিকল্প জীবিকার জন্য সুদমুক্ত ঋণ ও সহায়তা দেওয়া হয়, বন প্রান্তে বসবাসকারী কয়েকটি পরিবারকে প্রহরীর দায়িত্ব দেওয়া হয়, এবং শিকার ও স্ল্যাশ–অ্যান্ড–বার্ন পদ্ধতির চাষ যথাসম্ভব নিষিদ্ধ করা হয়।


সমষ্টিগত এই নিয়ম, নজরদারি ও সহযোগিতামূলক ব্যবস্থাপনার ফলে ধীরে ধীরে বন আচ্ছাদন বৃদ্ধি পায় এবং শুকিয়ে যাওয়া জলাধারগুলোতে আবারও পানি ফিরে আসে। এভাবে কামালছড়ির ভিলেজ কমন ফরেস্ট দেখায়, কীভাবে স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেদের উদ্যোগে বন ও পানিসম্পদকে কমন্স হিসেবে রক্ষা ও পুনরুদ্ধার করতে পারে, একই সঙ্গে বিকল্প জীবিকার মাধ্যমে বন–নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। [১২]



 

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Smith, E. T. (২৩ জানুয়ারি ২০২৪)। "Practising Commoning"The Commons Social Change Library (অস্ট্রেলীয় ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
  2. Ostrom, Elinor (৩০ নভেম্বর ১৯৯০)। Governing the Commons: The Evolution of Institutions for Collective Action (ইংরেজি ভাষায়)। Cambridge University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-৪০৫৯৯-৭
  3. "Tragedy of the Commons: Examples & Solutions | HBS Online"Business Insights Blog (ইংরেজি ভাষায়)। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  4. Ostrom, Elinor (৩০ নভেম্বর ১৯৯০)। Governing the Commons: The Evolution of Institutions for Collective Action (ইংরেজি ভাষায়)। Cambridge University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-৪০৫৯৯-৭
  5. Boelens, Rutgerd; Escobar, Arturo; Bakker, Karen; Hommes, Lena; Swyngedouw, Erik; Hogenboom, Barbara; Huijbens, Edward H.; Jackson, Sue; Vos, Jeroen (১৬ এপ্রিল ২০২৩)। "Riverhood: political ecologies of socionature commoning and translocal struggles for water justice"The Journal of Peasant Studies৫০ (3): ১১২৫–১১৫৬। ডিওআই:10.1080/03066150.2022.2120810আইএসএসএন 0306-6150পিএমসি 11332406পিএমআইডি 39165309
  6. Svarstad, Hanne; Benjaminsen, Tor A. (১ জানুয়ারি ২০২০)। "Reading radical environmental justice through a political ecology lens"Geoforum১০৮: ১–১১। ডিওআই:10.1016/j.geoforum.2019.11.007আইএসএসএন 0016-7185
  7. "Commons-based peer production"Wikipedia (ইংরেজি ভাষায়)। ২১ অক্টোবর ২০২৫।
  8. Benkler, Yochai (১ মে ২০১৭)। "Peer production, the commons, and the future of the firm"Strategic Organization (ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ (2): ২৬৪–২৭৪। ডিওআই:10.1177/1476127016652606আইএসএসএন 1476-1270
  9. "Summary of "Governing the Commons: The Evolution of Institutions for Collective Action" | Beyond Intractability"www.beyondintractability.org। সংগ্রহের তারিখ ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  10. Williams, Jeremy (১৫ জানুয়ারি ২০১৮)। "Elinor Ostrom's 8 rules for managing the commons"The Earthbound Report (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  11. Ostrom, Elinor (৩০ নভেম্বর ১৯৯০)। Governing the Commons: The Evolution of Institutions for Collective Action (ইংরেজি ভাষায়)। Cambridge University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-৪০৫৯৯-৭
  12. Several tribal settlements are spread across Bangladesh’s Chittagong Hill Tracts (CHT) region, each with its own communally managed forest that residents can use; But the unchecked exploitation of the once-rich forests, a consequence of population growth; In one village, however; The initiative in the village of Kamalchhori, which includes prohibitions on hunting and slash-and-burn farming (১৯ মে ২০২২)। "In Bangladesh, a community comes together to save a life-giving forest"Mongabay Environmental News (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  1. Rose, Carol M. (১৯৮৬)। "The Comedy of the Commons: Commerce, Custom, and Inherently Public Property"Faculty Scholarship Series: Paper ১৮২৮। সংগ্রহের তারিখ ২৮ ডিসেম্বর ২০১১
  2. Rifkin, Jeremy। "10 – Comedy of the Commons"The Zero Marginal Cost Society: The Internet of Things, the Collaborative। সংগ্রহের তারিখ ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬