এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড
তারিখ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ (2021-12-24)
সময়আনুমানিক রাত ৩ টায় (বিএসটি)
অবস্থানঝালকাঠির কাছে সুগন্ধা নদীতে, ঝালকাঠি জেলা, বাংলাদেশ
কারণঅগ্নিকাণ্ড
মৃত৪১
আহত>১০০
যাত্রী৫০০+

২০২১ সালে ২৪ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার রাত ৩ টার দিকে সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে দগ্ধ হয়ে নারী-শিশুসহ ৪০ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে ও শতাধিক আহত হন।[১] সপ্তাহের শেষ দিন হওয়ায় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে দক্ষিণ জনপদের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন অনেকে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে প্রায় চারশ যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি সদরঘাট থেকে ছেড়ে যায়। পরে রাত ৩টার দিকে সুগন্ধা নদীর গাবখান ধানসিঁড়ি এলাকায় পৌছলে লঞ্চটির তিন তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।[২]

লঞ্চ[সম্পাদনা]

এমভি অভিযান-১০–এর ফিটনেস সনদে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, লঞ্চটি ২০১৯ সালে নির্মাণ করা হয়। এটির দৈর্ঘ্য ৬৪ মিটার ও গভীরতা ২.৮০ মিটার। এতে ২০টি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ছিল। বাংলাদেশ নৌপরিবহন অধিদপ্তরে লঞ্চটির নিবন্ধন নম্বর ০১-২৩৩৯।[৩] লঞ্চের মালিক হামজালাল শেখ জানান, আগের ইঞ্জিন দুটিতে ত্রুটি থাকায় ২০২১ সালের অক্টোবরে লঞ্চের ইঞ্জিন বদলানো হয়। ডকইয়ার্ডে উঠিয়ে ৭২০ অশ্বক্ষমতার দুটি ইঞ্জিন লাগানো হয়।[৩]

অগ্নিকাণ্ড[সম্পাদনা]

লঞ্চের অভ্যন্তরে আটকা পরা এক যাত্রীর করা ভিডিও।

২০২১ সালে ২৪ ডিসেম্বর, এমভি অভিযান-১০ নামের তিন তলা লঞ্চটি ঢাকা থেকে বরগুনা যাচ্ছিল। এটির ধারণক্ষমতা ৩১০ আসন থাকলেও লঞ্চটি তার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করছিল, যাদের অনেকেই সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছিল।[৪]

রাত পৌনে একটায় বরিশাল নদীবন্দর ত্যাগ করার পর লঞ্চটির পুরো ডেক উত্তপ্ত হয়ে যায়। শীত ও কুয়াশার কারণে ডেকের চারপাশ ত্রিপল দিয়ে আটকানো ছিল। রাত আড়াইটার দিকে লঞ্চটি ঝালকাঠি স্টেশন থেকে দেউরী এলাকায় আসতেই হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ শোনা যায় এবং রাত দুইটার পর থেকে রাত তিনটার মধ্যে সম্পূর্ণ লঞ্চটিতে আগুন ধরে যায়। এক পর্যায়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলেও গতির কারণে লঞ্চটি বেশ কিছুটা সময় ধরে চলমান ছিল। এ সময়ে বাতাসে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে। লঞ্চের যাত্রীদের প্রচুর পরিমাণ কাপড় আর ভেতরে ফ্লোরে কার্পেট থাকায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে।[৫]

রাত ৩টা ২৮ মিনিটে দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়ে ৩টা ৫০ মিনিটের মধ্যে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে দমকল বাহিনী ও উদ্ধার অভিযান শুরু করে। দমকল বাহিনীর ১৫টি ইউনিট এতে অংশ নেয়। দমকল বাহিনীর বরিশাল বিভাগের উপপরিচালক কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। দগ্ধ লঞ্চটি পরে সুগন্ধা নদীর দিয়াকুল পাড়ে ভেড়ানো হয়।[৬]

বরিশাল বিভাগ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, ইঞ্জিন কক্ষে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন যাত্রী জানান যে, আগুন লাগার আগে ফেরিটির ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেয় এবং পরে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। কিছু যাত্রী আগুন থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপ দেন।

হতাহত[সম্পাদনা]

স্থানীয় পুলিশ প্রধান মইনুল ইসলাম জানান, ৩৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লঞ্চের বেশিরভাগ যাত্রীই আগুনে পুড়ে এবং কয়েকজন নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পরে ডুবে মারা যান। বরিশালের হাসপাতালে প্রায় ১০০ জনকে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় পাঠানো হয়েছে।[৭] দুর্ঘটনার পরের দিন মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ জনে।

২৫শে ডিসেম্বরের মধ্যে, কর্তৃপক্ষ কমপক্ষে ২৩টি দাবিহীন মৃতদেহ দাফন করে।

প্রতিক্রিয়া[সম্পাদনা]

এই ঘটনায় ঝালকাঠি থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। লঞ্চটি পরিদর্শন করতে আসেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান এবং বরিশাল বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক কামাল উদ্দিন।[৮]

তদন্ত[সম্পাদনা]

ঘটনার কারণ তদন্ত করার জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি করে।[৩]

২০২১ সালের নভেম্বরে জাহাজটির দুই মালিকের একজন হামজালাল শেখ আগের জ্বালানী সমস্যার কারণে লঞ্চের দুটি ইঞ্জিন পরিবর্ত করেন ও এই জন্য তিনি নৌপরিবহন বিভাগ থেকে কোন অনুমতি নেন নি বা এই পরিবর্তনের কথা নৌপরিবহন বিভাগকে জানান নি। মালিক বলেন যে তিনি জানতেন না যে অনুমতির প্রয়োজন ছিল। ইঞ্জিনের ত্রুটিটিকে একটি ছোটখাট সমস্যা হিসাবে ধরা হয়েছিল।

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের পরিদর্শক মাহবুবুর রশিদ জানান, “লঞ্চের কাঠামোগত পরিবর্তন বা ইঞ্জিন পরিবর্তন করতে হলে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। অভিযান-১০ লঞ্চের ইঞ্জিন পরিবর্তনের আগে আমাদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি”। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে ফিটনেসহীন ইঞ্জিন যা মূলত সমুদ্রগামী জাহাজের পুরনো ইঞ্জিন তা সংযোজন করে জাহাজটি চলছিল। এটিতে ক্রটি ছিল যার কারণে এটি অধিক উত্তাপ হচ্ছিলো আর একপর্যায়ে আগুন ধরে যায়‌ এবং আশেপাশে রাখা জ্বালানি ও ডেকের কার্পেটের মাধ্যমে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।[৩] ২৭ ডিসেম্বর র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন হামজালাল শেখকে গ্রেপ্তার করে।[৯]

বোটমাস্টার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর লঞ্চটি সঠিকভাবে তীরে ভেড়াতে ব্যর্থ হন এবং নোঙ্গর না ফেলে লঞ্চটি ত্যাগ করেন। পরে লঞ্চটি দিয়াকুলের কাছে এসে থামার আগে ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে চলছিল। লঞ্চের প্রধান ফটকেও তালা লাগিয়ে দেয়া হয়, যাতে লোকজন বের হতে না পারে। এছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের বরিশাল কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, লঞ্চটিতে প্রথম শ্রেণির মাস্টার থাকার কথা থাকলেও এর পরিবর্তে দুই জন দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার ছিল।[১০]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "সুগন্ধা নদীতে লঞ্চে আগুন"bdnews24.com। ডিসেম্বর ২৪, ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ডিসেম্বর ২৪, ২০২১ 
  2. "বরিশাল মেডিকেলে দগ্ধ ৭০ জন ভর্তি"দৈনিক প্রথম আলো। ডিসেম্বর ২৪, ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ডিসেম্বর ২৪, ২০২১ 
  3. রহমান, মিজানুর। "অনুমতি না নিয়েই বদলে ফেলা হয় লঞ্চের ইঞ্জিন"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১২-২৫ 
  4. "দু'দিন ছুটি থাকায় অতিরিক্ত যাত্রী ছিল লঞ্চে, যাত্রীদের অভিযোগ"সমকাল। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ 
  5. "সুগন্ধা নদীতে মধ্যরাতে পুড়ে যাওয়া লঞ্চটিতে কী ঘটেছিলো"বিবিসি বাংলা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ 
  6. "ঝালকাঠিতে চলন্ত লঞ্চে আগুন, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪০"দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। ২৪ ডিসেম্বর ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ 
  7. "মাঝনদীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, যাত্রীবাহী জাহাজে আগুন লেগে মৃত কমপক্ষে ৩৬"bengali.indianexpress.com। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মার্চ ২০২২ 
  8. "নিখোঁজদের সঠিক তথ্য নেই, দিশেহারা স্বজন"বণিক বার্তা। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মার্চ ২০২২ 
  9. "এমভি অভিযান-১০ লঞ্চের মালিক গ্রেফতার"যুগান্তর। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মার্চ ২০২২ 
  10. উদ্দীন, মিজানুর রহমান,এম জসীম। "লঞ্চে ত্রুটি পেয়েছে তদন্ত কমিটি"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মার্চ ২০২২