ইঞ্জিন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

‘ইঞ্জিন’ শব্দটির সাথে পরিচিত নয় এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ইঞ্জিনের ব্যবহার আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে। বাসা বাড়ি থেকে শুরু করে জলে, স্থলে,আকাশে, অফিস আদালত কল কারখানা সব জায়গাতে ইঞ্জিনের ব্যবহার। আকাশের সেই বিশাল বড় বিমান, সমুদ্রের জাহাজ থেকে শুরু করে রাস্তায় চলা মোটরসাইকেল, সবই সম্ভব হয়েছে ইঞ্জিনের কারনে। ইঞ্জিন আবিস্কারের ফলে সভ্যতা পেয়েছে গতি, বেড়েছে কাজের পরিধি, কমেছে কাজের সময়। আগে যে কাজটি করতে শত শত মানুষ প্রয়োজন হত সঙ্গে প্রচুর সময় লাগত, আর এখন ইঞ্জিনের মাধ্যমে একটি সুইচ টিপে দিলেই মুহূর্তেই সেই কাজটি হয়ে যাচ্ছে। ইঞ্জিন (Engine) শব্দটি এসেছে প্রাচীন ফ্রেঞ্চ “engin” এবং ল্যাটিন “ingenium” শব্দ থেকে। আমরা জানি শক্তির সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই, এক রুপ থেকে অন্য রুপে নেয়া যায় মাত্র। যে যন্ত্রটি শক্তিকে কার্যকর যান্ত্রিক শক্তিতে রুপান্তর করে তাকে ইঞ্জিন বলে। সহজ ভাষায় ইঞ্জিনের সাহায্যে আমরা গতি (Motion) পাই। ইঞ্জিন আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ গতি তৈরি করতো হতো, নিজের পেশী শক্তি দিয়ে না হয় কোন প্রাণী দিয়ে। এখনও আমরা এমন যন্ত্র দেখিনা তা কিন্তু নয়। যেমন রিক্সা, ভ্যান, গরুর গাড়ি ইত্যাদি। ১৭৭২ সালে ইংলিশ বিজ্ঞানী থমাস নিউকমেন বাষ্প চালিত পাম্প আবিষ্কার করে, যে টি খনি থেকে পানি তুলতে ব্যবহার করা হত। এর পূর্বে যে কোন প্রচেষ্টা হয়নি তা কিন্তু নয়। তবে শিল্প বিপ্লবের শুরু যার হাত ধরে তার নাম হল জেমস ওয়াট (১৭৩৬-১৮১৯)। তাঁর ওপর দায়িত্ব ছিল থমাস নিউকমেন এর আবিষ্কৃত বাষ্প ইঞ্জিনকে আরো উন্নত করা। তাঁর ফলশ্রুতিতে যে বাষ্প ইঞ্জিন আবিষ্কৃত হয় তার মাধ্যমে মুলত শিল্প বিপ্লবের সূচনা। বাষ্পের যে চাপ তৈরী হয় তার মাধ্যমে একটি পিস্টন* কে ধাক্কা দেয় এবং পিস্টনটি যুক্ত থাকে একটি কানেকটিং রড এর সাহায্যে Crank Shaft* এর সাথে। এভাবেই Motion পাওয়া যায়। বাষ্প ইঞ্জিন দিয়ে চলত বাষ্প চালিত ট্রেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাষ্প ইঞ্জিনের সাহায্যে শিল্প বিপ্লব হয়। মানুষের জীবনে আসে গতি। উৎপাদন বেড়ে যায় বহুগুণে। বাষ্প ইঞ্জিনে কয়লা দিয়ে পানিকে বাষ্প করা হত। আরেকটি নতুন একটা শব্দ জানা প্রয়োজন তা হল দহন (Combustion)। যে কোন জ্বালানীকে আগুনে পোড়ালে তাপ উৎপন্ন হয়। এই প্রক্রিয়াকে দহন বলে। দহন কোথায় হচ্ছে তার ওপর ভিত্তি করে ইঞ্জিনকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়। যেমনঃ অন্তঃ দহন (Internal Combustion) ইঞ্জিন অর্থাৎ এই ইঞ্জিনের ভেতরেই দহন হয়। এবং বহিঃ দহন (External combustion) ইঞ্জিন অর্থাৎ দহন ইঞ্জিনের বাহিরে সম্পন্ন হয়। যেমনঃ বাষ্প ইঞ্জিন। বাষ্প ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর অনেক সময় চলে যায়। বিভিন্ন প্রচেষ্টা চলে আরো উন্নত, এবং কম জ্বালানী দিয়ে কিভাবে ভাল ইঞ্জিন তৈরি করা যায়। আচ্ছা আরেকটু চিন্তা করা যাক, আমরা যে গাড়িগুলো ব্যবহার করি সচারচর যেমন মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক, কার ইত্যাদি। এগুলোর ইঞ্জিন কেমন? External combustion ইঞ্জিন দিয়ে কি এগুলো চালানো সম্ভব? অবশ্যই না। যদি তাই হত তাহলে বাসের পিছনে একটি চুল্লি থাকত আর সেখানে কয়েকজন কয়লা দিয়ে আগুন জ্বালাতো। বিশাল বড় একটা পানি গরম করার পাত্র থাকতে হত। আরো কত কি। তাহলে মানুষ বসত কোথায়? তাই না। এই সমস্যার সমাধান হয়েছে Internal Combustion ইঞ্জিন এর সাহায্যে। এই ইঞ্জিনের সুন্দর মডেল প্রথম যিনি দিয়েছিলেন তাঁর নাম নিকোলাস অটো (Nicolaus otto)। জার্মান এই নাগরিক ১৬ বছর বয়সেই স্কুল ছেড়ে দেন। প্রথমে মুদির দোকানে কাজ করেন তারপর ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা হিসাবে কাজে যোগদান করেন। কাজের জন্য তাঁকে বিভিন্ন যায়গায় যেতে হত। ফলে যাতায়াতের অসুবিধা তাঁকে খুব ভোগাত। তখন সে সপ্ন দেখত এমন একটি যানবাহনের যেটি শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাবে কিন্তু সময় নিবে কম। ১৮৬২ সালে সে একজনের সঙ্গে কাজ শুরু করে কয়েকটি ডিজাইন করেন। কিন্তু সফল হন ১৮৭৬ সালে। এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই বর্তমানে অটোমোবাইল এর ইঞ্জিন তৈরি হচ্ছে , যদিও ডিজাইনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে এটা মানতে হবে। এই ইঞ্জিনকে গ্যাসোলিন ইঞ্জিনও বলা হয়। গ্যাসোলিন হল একধরনের জ্বালানী শ্রেণী। যার মধ্যে বহুল ব্যবহৃত হল পেট্রোল, অকটেন ইত্যাদি। এই জন্য এদেরকে পেট্রোল ইঞ্জিন (Petrol Engine) ও বলে। আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার এর কথা না বললেই নয়। তিনি হলেন রুডলফ ডিজেল (Rudlof Diesel). প্যারিস এই বিজ্ঞানী ১৮৯২ সালে আরেক ধরনের ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন তাঁর নাম ডিজেল ইঞ্জিন (Diesel Engine)। এই ইঞ্জিনের জ্বালানী হল অন্য শ্রেণীর। বাস, ট্রাক সহ বড় বড় যানবাহন যেগুলোকে অনেক লোড নিতে হয় সেগুলোতে ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে অনেক গাড়ির ইঞ্জিনে জ্বালানী হিসেবে তেলের পরিবর্তে CNG ব্যবহার করা হয়। ইঞ্জিন ডিজাইন, ইঞ্জিন এর জ্বালানী, ইঞ্জিনের তৈরি ধোঁয়া থেকে যে দূষণ ইত্যাদি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজ ও প্রচুর কাজ হচ্ছে, গবেষনা চলছে। .ইঞ্জিনঃ

গাড়িতে বিভিন্ন ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়। যেমনঃ

অ.গ্যাসোলিন ইঞ্জিন

আ.ডিজেল  ইঞ্জিন

ই. হাইব্রিড ইঞ্জিন

ঈ.ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিন

উ.ফুয়েলসেল ইঞ্জিন

 

আমরা সধারনত গ্যাসোলিন ও ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করি,তাই এই দুই প্রকার ইঞ্জিন নিয়েই লিখলাম।

 

অ. গ্যাসোলিন   ইঞ্জিনঃ

এই প্রকারের ইঞ্জিনে ফুয়েল হিসেবে গ্যাসোলিন ব্যবহৃত হয়। গ্যাসোলিন ইঞ্জিন সাধারনত প্যাসেঞ্জার কার অথবা প্রাইভেট কার এ ব্যবহৃত হয়।  এর কারণ এই ইঞ্জিন আকারে ছোট এবং সেই সাথে শক্তিও বেশি পাওয়া যায়। আজকাল ফুয়েল হিসেবে সি.এন.জি, এল.পি.জি, এলকোহল ও ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্যাসোলিন ইঞ্জিনকে এস.আই (spark ignition)ইঞ্জিনও বলে।

 

গ্যাসোলিন ইঞ্জিনে বায়ু-ফুয়েল এর মিশ্রণকে বিস্ফোরিত করা হয় এবং এই বিস্ফোরণে উৎপন্ন  শক্তিকে ঘূর্ণন শক্তিতে

রূপান্তরিত করে গাড়ি চলে।

 

গাড়ি চলবার জন্য ইঞ্জিন নীচের চারটি স্ট্রোক পুনরাবৃত্তি করতে থাকে

ক.অন্তর্গ্রহণ স্ট্রোক(Intake stroke)

খ.সংকোচন স্ট্রোক(Compression stroke)

গ.দহন স্ট্রোক(Combustion stroke)

ঘ.বহির্গমন স্ট্রোক(Exhaust stroke)

 

 

 

 

 

 

 

 


 

ক.অন্তর্গ্রহণ  স্ট্রোক (Intake stroke)

 

 

 

 

 

 

 

এই স্ট্রোকে অন্তগ্রহণ র্ভাল্ভ খোলে এবংবহির্গমন ভাল্ভ বন্ধ থাকে। পিস্টনের নিম্নগামী ভ্রমণের ফলে বায়ু-ফুয়েল মিশ্রণ অন্তর্গ্রহণ ভাল্ভ দিয়ে সিলিন্ডারে প্রবেশ করে।

খ.সংকোচন   স্ট্রোক  (Compression stroke)

 

 

 

 

 

 

 


পিস্টন  নিম্নগামী ভ্রমন শেষ করে এবং অন্তর্গ্রহণ ভাল্ভ বন্ধ হয়। এবার পিস্টন তার উর্ধ্বগামী ভ্রমণ শুরু করে এবং সিলিন্ডারের বায়ু-ফুয়েল মিশ্রণকে উচ্চ-চাপে সংকোচিত করে।  

গ.দহন  স্ট্রোক  (Combustion stroke)

 

 

 

 

 

 

 

পিস্টন যখন ঊর্ধ্বগামী স্ট্রোক সম্পূর্ণ করে তখন স্পার্ক প্লাগে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করা হয় ফলে স্পার্ক উৎপন্ন হয়। এই স্পার্ক সংকোচিত বায়ু-ফুয়েল মিশ্রণকে প্রজ্জ্বলিত করে এবং বিস্ফোরণ ঘটায়। এই বিস্ফোরণ পিস্টনকে ধাক্কা দেয় এবং পিস্টনের নিম্নগামী ভ্রমণ ক্র্যাঙ্কশ্যাফট কে ঘোরায়।

 

ঘ.বহির্গমন  স্ট্রোক (Exhaust stroke)

 

 

 

 

 

 

 

পিস্টন যখন তার নিম্নগামী ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে থাকে তখন বহির্গমন ভাল্ভ খুলে যায়। এরপর পিস্টন আবার ঊর্ধ্বগামী ভ্রমণ শুরু করে এবং দহন ও বিস্ফোরণের ফলে  উৎপন্ন গ্যাস গুলোকে সিলিন্ডারের বাইরে নিক্ষেপ করে দেয়।

 

আ. ডিজেল  ইঞ্জিন

ডিজেল ইঞ্জিনে ফুয়েল হিসেবে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ডিজেল ইঞ্জিন কম গতিতেও উচ্চ শক্তি  উৎপন্ন করে। ডিজেল  ইঞ্জিনকে কম্প্রেশন ইগনিশন(compression ignition) ইঞ্জিনও বলে।

 

 

 

 

 

 

 

 


 

গতি শক্তি উৎপন্ন করার জন্য ডিজেল ইঞ্জিন নিম্নোক্ত চারটি স্ট্রোক পুনরাবৃত্তি করতে থাকে।

ক.অন্তর্গ্রহণ স্ট্রোক(Intake stroke)

খ.সংকোচন স্ট্রোক(Compression stroke)

গ.দহন স্ট্রোক(Combustion stroke)

ঘ.বহির্গমন স্ট্রোক(Exhaust stroke)

ডিজেল ইঞ্জিনে কোন স্পার্কপ্লাগ নাই। তার পরিবর্তে উচ্চ-চাপযুক্ত ফুয়েল সিলিন্ডারে ইঞ্জেক্ট করা হয়  এবং তা সিলিন্ডারে রাখা উচ্চ-চাপ-তাপ যুক্ত বায়ুর সংস্পর্শে এসে স্ব-প্রজ্জ্বলিত হয়।

 

ক.অন্তর্গ্রহণ   স্ট্রোক  (Intake stroke)

 

 

 

 

 

 

 

 

বহির্গমন ভাল্ভ বন্ধ থাকে এবং অন্তর্গ্রহন ভাল্ভ খোলে। পিস্টনের নিম্নগামী ভ্রমণের ফলে অন্তর্গ্রহন ভাল্ভ দিয়ে শুধুমাত্র বায়ু সিলিন্ডারে প্রবেশ করে।

 

খ.সংকোচন   স্ট্রোক  (Compression stroke)

 

 

 

 

 

 

 

পিস্টনের ঊর্ধ্বগামী ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে ইঞ্জেক্টর নল দিয়ে উচ্চ-চাপযুক্ত  ফুয়েল দহন কক্ষে প্রবেশ করানো হয়,যা উচ্চ-চাপ-তাপ যুক্ত বায়ুর সংস্পর্শে এসে স্ব-প্রজ্জ্বলিত হয়।ফলে দহন সম্পূর্ণ হয় এবং বিস্ফোরণ  ঘটে। এই বিস্ফোরণ পিস্টনকে নিম্নমুখী ধাক্কা দেয় এবং তা ক্র্যাঙ্কশ্যাফট কে ঘোরায়।

 

গ.দহন স্ট্রোক (Combustion stroke)

পিস্টনের ঊর্ধ্বগামী ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে ইঞ্জেক্টর নল দিয়ে উচ্চ-চাপযুক্ত ফুয়েল দহন কক্ষে প্রবেশ করানো হয়,যা উচ্চ-চাপ-তাপ যুক্ত বায়ুর সংস্পর্শে এসে স্ব-প্রজ্জ্বলিত হয়।ফলে দহন সম্পূর্ণ হয় এবং বিস্ফোরণ ঘটে। এই বিস্ফোরণ পিস্টনকে নিম্নমুখী ধাক্কা দেয় এবং তা ক্র্যাঙ্কশ্যাফট কে ঘোরায়।

 

 

ঘ.বহির্গমন   স্ট্রোক  (Exhaust stroke)

 

 

 

 

 

 

 

 

পিস্টনের নিম্নগামী ভ্রমণের শেষপর্যায়ে বহির্গমন ভাল্ভ খুলে যায় এবং পরবর্তীতে পিস্টনের উর্ধ্বগামী ভ্রমণের ফলে পরিত্যক্ত গ্যাস কে বাইরে নিক্ষেপ করে দেয়।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র- WWW.BIGGANI.ORG.COM