অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম০৬ নভেম্বর ১৯৩০
ঢাকা, বাংলাদেশ
মৃত্যু (বয়স ৮৫)
জাতীয়তাভারতীয়
পেশালেখক
উল্লেখযোগ্য কর্ম
নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে
পুরস্কারবঙ্কিম পুরস্কার(১৯৯৮)
সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার(২০০১)

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় ( ৬ ই নভেম্বর, ১৯৩০ (২২ শে কার্তিক,১৩৩৭ বঙ্গাব্দ) - ১৯ শে জানুয়ারি, ২০১৯) ছিলেন এক প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি লেখক।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন[সম্পাদনা]

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৬ ই নভেম্বর,(২২ শে কার্তিক ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ) বৃটিশ ভারতের অধুনা বাংলাদেশের ঢাকা জেলার আড়াই হাজার থানার রাইনাদি গ্রামে। (কিন্তু সার্টিফিকেট অনুসারে জন্ম তারিখ - ১লা মার্চ,১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ। এটি সঠিক ছিল না। তাঁর সাক্ষাৎকার দ্রষ্টব্য) তাঁর পিতা অভিমন্যু বন্দ্যোপাধ্যায় মুড়াগাছা জমিদারের অধীনে কাজ করতেন। মাতার নাম লাবণ্যপ্রভা দেবী। [১][২] [৩] তাঁর শৈশব কৈশোর কেটেছে গ্রামের বাড়িতে যৌথ পরিবারে। স্কুলের পড়াশোনা সোনারগাঁও এর পানাম স্কুলে। কিন্তু দেশভাগের পর ছিন্নমূল হয়ে তাঁরা চলে আসেন ভারতে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের বানজেটিয়া গ্রামে গড়ে ওঠা মণীন্দ্র কলোনিতে পিতার বাড়িতে কিছুকাল থিতু হয়ে থাকেন। এখান থেকেই প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন। তারপর যাযাবরের ন্যায় কেটেছে তাঁর যৌবন। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধীনস্থ কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.কম.পাশ করেন ও পরে বি.টি. পাশ করেন। বি.টি.পড়ার সময়ই আলাপ হয় সহপাঠী 'মমতা'র সাথে। পরে তাকে বিবাহ করেন।

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

এরপর কাজের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়লেন। কখনো নাবিকরূপে সারা পৃথিবী পর্যটন, আবার কখনো বা ট্রাক-ক্লিনারের কাজ লেগে পড়া। পরে এক প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অল্প কিছু দিন মুর্শিদাবাদ জেলার চৌরীগাছা স্টেশন নিকটস্থ সাটুই সিনিয়ার বেসিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। তিন-চার বৎসর সাটুইয়ে থাকার পর ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি পাকাপাকি ভাবে চলে আসেন কলকাতায়। কখনো হলেন কারখানার ম্যানেজার, কখনো বা প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা। পরে অমিতাভ চৌধুরীর আহ্বানে যোগ দেন কলকাতার 'যুগান্তর' পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজে এবং সেখান থেকেই কর্মে অবসর নেন।

সাহিত্যকর্ম[সম্পাদনা]

বিভিন্ন পেশার মধ্যে থেকেও লেখালেখি করে গেছেন তিনি। তবে কলেজে পড়ার সময় থেকেই তাঁর সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মে যায়। আর পেশার তাগিদে ঘুরে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন তাই স্থান পেয়েছে তাঁর সাহিত্যকর্মে। তাঁর প্রথম গল্প ওয়েলসের বন্দর শহর নিয়ে লেখা 'কার্ডিফের রাজপথ' প্রকাশিত হয় বহরমপুরের "অবসর" পত্রিকায়। তাঁর এর পরের গল্প ছিল 'বাদশা মিঞা'। বহরমপুরের কলেজের বন্ধুদের আগ্রহে'উল্টোরথ'পত্রিকায় উপন্যাস প্রতিযোগিতায় জাহাজের জীবন নিয়ে প্রথম উপন্যাস "সমুদ্র মানুষ" লিখেই ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে 'মানিক-স্মৃতি পুরস্কার' লাভ করেন তিনি। এরপর তিনি তাঁর অর্থসঙ্কট মেটাতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে লিখে গেছেন বহু উপন্যাস। ছোট-কিশোর ও বড়দের সবার জন্যই তিনি লিখেছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাসটি হল 'নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে'। এটি মূলতঃ চারটি সিরিজে বিন্যস্ত। প্রথম পর্ব 'নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে',দ্বিতীয় পর্ব 'মানুষের ঘরবাড়ি',তৃতীয় পর্ব 'অলৌকিক জলযান' এবং চতুর্থ পর্ব হল 'ঈশ্বরের বাগান'। দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে লেখা এই উপন্যাসে ছিন্নমূল মানুষের জীবন,তাদের সংগ্রামী বিষয় এবং পটভূমিসহ জীবনের রোমাঞ্চকর অভিযানের লৌকিক অলৌকিক উপলব্ধি সুন্দরভাবে পরিস্ফুট হয়েছে। তাঁর এই রচনা কেবল বাংলা সাহিত্যকে নয়,ভারতীয় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট-এর উদ্যোগে ক্লাসিক পর্যায়ে বারোটি মূল ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে গ্রাম বাংলার জীবনও অনেক বেশি করে ধরা দিয়েছে। তাই তাঁর মধ্যে অনেকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরাধিকার খুঁজে পান।

গ্রন্থ তালিকা[সম্পাদনা]

  • অতীন্দ্রিয় অলৌকিকের অন্তরালে
  • অন্তর্গত খেলা (১৯৮৬)
  • অন্নভোগ (১৯৯০)
  • অপহরণ
  • অমৃতা
  • অমৃত্যু
  • অরণ্য
  • অলৌকিক জলযান (১৩৯৩ ব)
  • আজব দেশে বুমবাই
  • আবাদ (১৯৮৭)
  • ঈশ্বরের বাগান (১৯৯৫)
  • উত্তাপ
  • উপেক্ষা
  • ঋতু-সংহার
  • একজন দৈত্য একটি লাল গোলাপ (১৯৭৪)
  • একটি জলের রেখা (১৩৭২ ব)
  • এ কালের বাংলা গল্প (১৩৮১ ব)
  • কবির স্ত্রী
  • কাপালি
  • কালো ভ্রমর
  • খাদান
  • গম্বুজে হাতের স্পর্শ(১৩৭৯ ব)
  • চারু ইন্দ্র এবং কলকাতা(১৩৮২ ব)
  • জনগণ(২০০৬)
  • জীবন বড় ভারবাহী জন্তু
  • জীবন মহিমা (১৯৮৫)
  • ঝিনুকের নৌকা
  • টুকুনের অসুখ
  • তখন হেমন্তকাল(১৩৭৯ ব)
  • তুষার কুমারী
  • দুই ভারতবর্ষ (১৯৯৫)
  • দুঃখিনী বর্ণমালা মা আমার
  • দুঃস্বপ্ন (১৩৮০ ব)
  • দেবী মহিমা(১৯৮৪)
  • দ্বিতীয় পুরুষ (১৯৯৪)
  • ধ্বনি-প্রতিধ্বনি
  • নগ্ন ঈশ্বর (১৩৭৪ ব)
  • নদীর সঙ্গে দেখা(১৯৯৪)
  • নারী ও পুরুষ
  • নারী ও নদীর পাড়ে বাড়ী
  • নায়কের মত
  • নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে (১৯৭১)
  • পঞ্চযোগিনী
  • পাগলিনী রাধা
  • পালকের টুপি
  • পিপাসা (১৩৭৯ ব)
  • পুতুল
  • প্রেস
  • প্রেসে-অপ্রেসে
  • পৃথিবীর এক কোণে(১৩৮৫ ব)
  • ফোটা পদ্মের গভীরে
  • বলিদান (১৩৮৭ ব)
  • বিদেশিনী (১৩৭৬ ব )
  • বিভ্রম(১৩৮৫ ব )
  • মধ্য যামিনী
  • মনোরম বনভূমি
  • মানগানু উপত্যকার বেড়াল (১৯৭৭)
  • মানুষের ঘরবাড়ি (১৩৯০ ব)
  • মানুষের মামুলি কেচ্ছা( ১৩৮২ ব)
  • মানুষের হাহাকার (১৩৮৮ ব)
  • মামার বাড়ি ভূতের বাড়ি (১৯৮৪)
  • মৃত্যুপথের যাত্রী
  • মৃন্ময়ী
  • যদি রাধা না হতে' '
  • যুবতী পরম রূপবতী (১৯৭৬)
  • রাজা যায় বনবাসে
  • রূপকথার আংটি
  • রোদ্দুরে জ্যোৎস্নায়
  • লাঞ্ছিতা (২০০০)
  • শঙ্খচিলের ডানা
  • শামুকখোল
  • শূণ্যের মাঝখানে বানাইল
  • শেষ দৃশ্য (১৯৭৮)
  • শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯৪)
  • সবুজ শ্যাওলার নিচে
  • সমুদ্র মানুষ (১৯৬০)
  • সমুদ্রে বুনোফুলের গন্ধ( ১৩৯৯ ব )
  • সাগর জলে (২০০৮)
  • সাগরে মহাসাগরে
  • সাদা জ্যোৎস্না (১৩৭৮ ব)
  • সুখী রাজপুত্র
  • সুন্দর অপমান
  • সোহাগপুর
  • স্বর্গ খেলনা

কিশোর উপন্যাস -

  • অরণ্যরাজ্যে ম্যান্ডেলা
  • উড়ন্ত তরবারি
  • একটি জলের রেখা ও ওরা তিন জন
  • গিনি রহস্য
  • ফেনতুর সাদা ঘোড়া (১৩৮৭ ব)
  • দুষ্টু হাতিটি
  • নীল তিমি (১৯৯৪)
  • বিন্নির খই লাল বাতাসা
  • রাজার বাড়ি
  • হীরের চেয়েও দামি

[৪]

পুরস্কার তালিকা[সম্পাদনা]

  • মানিক স্মৃতি পুরস্কার - ১৯৫৮ সালে 'সমুদ্র মানুষ' এর জন্য।
  • বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কার - ১৯৯১ সালে।
  • ভুয়াল্কা পুরস্কার - ১৯৯৩ সালে পঞ্চযোগিনী এর জন্য।
  • বঙ্কিম পুরস্কার - ১৯৯৮ সালে দুই ভারতবর্ষ এর জন্য।
  • মতিলাল পুরস্কার
  • তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার
  • নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও সুধা পুরস্কার - কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার - ২০০১ সালে পঞ্চাশটি গল্প-এর জন্য
  • শরৎ পুরস্কার- ২০০৫ সালে
  • সুরমা চৌধুরী আন্তর্জাতিক স্মৃতি পুরস্কার (আই.আই.পি.এম প্রবর্তিত) - ২০০৮ সালে

সাম্মানিক মূল্য দশ লক্ষ টাকা 'নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে'-র জন্য

জীবনাবসান[সম্পাদনা]

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘ দিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ই জানুয়ারি শুক্রবার বাথরুমে পড়ে যাওয়ার কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। কলকাতার পোর্ট ট্রাস্টের সেন্টিনারি হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু পরদিন শনিবার ১৯ শে জানুয়ারি বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে ৮৫ বৎসর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার : আমার গোটা জীবনটাই তো ভুলে ভরা"বণিক বার্তা। সংগ্রহের তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০২০ 
  2. "Atin Bandyopadhyay, 1934"। LOC। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুলাই ২০১২ 
  3. "চলে গেলেন সাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়"mzamin.com। সংগ্রহের তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০২০ 
  4. "অনলাইন ক্যাটালগ"। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-০৬