হৃৎপিন্ড

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

হৃৎপিন্ড ও ফুসফুস, গ্রে'স এনাটমী-র পুরাতন সংস্করন হতে নেওয়া।

‌হৃৎপিন্ড একটি পেশীবহুল অঙ্গ। এটি পৌনপৌনিক ছান্দিক সংকোচনের মাধ্যমে রক্তনালীর ভেতর দিয়ে রক্ত সারা দেহে প্রবাহিত করে। এনালাইড, মলাস্কা এবং আর্থোপোডাতেও অনুরূপ অঙ্গ বিদ্যমান।[১] কার্ডিয়াক প্রতিশব্দটির (কার্ডিওলোজি পরিভাষায়) অর্থ “হৃৎপিন্ড সংক্রান্ত” যা গ্রীক (καρδία), কার্ডিয়া হতে এসেছে। হৃৎপিন্ড এক ধরনের অনৈচ্ছিক পেশী - হৃৎপেশী দ্বারা গঠিত, যা কেবলমাত্র এই অঙ্গেই পাওয়া যায়।[২] গড়পারতায় একটি মানব হৃৎপিন্ড প্রতি মিনিটে ৭২ বার স্পন্দিত হয়, সে হিসাবে ৬৬ বছরের জীবনে এটি প্রায় ২.৫ বিলিয়ন বার স্পন্দিত হয়।

সূচিপত্র

[সম্পাদনা] গর্ভস্থ বিকাশ

মূল নিবন্ধ : হৃৎপিন্ডের বিকাশ
গর্ভধারণের ২১ দিন পরে, মানব হৃৎপিন্ড প্রতি মিনিটে ৭০ থেকে ৮০ বার স্পন্দিত হওয়া শুরু করে এবং প্রথম মাসে স্পন্ধন রৈখিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ভ্রুণাবস্থার প্রথম ২১ দিন কার্যকর হৃৎপিন্ড না থাকলেও কিভাবে রক্ত পরিবাহিত হয় তা অজানা, যদিও কেউ কেউ প্রস্তাব করেন যে, হৃৎপিন্ড প্রকৃত পক্ষে হাইড্রলিক র‌্যামের মত কোন পাম্প নয়- বরং চারপাশের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তার ফলে সৃষ্ট একটি অঙ্গ। [১]

মানব ভ্রুণীয় (embryonic) হৃৎপিন্ড স্পন্দন শুরু করে-- গর্ভধারণের প্রায় ২১ দিন পরে, আথবা স্বাভাবিক ঋতুস্রাবের (menestrual period) পাঁচ সপ্তাহ পরে (LMP), যা স্বাধারণত গর্ভধারণের সময় কাল নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়। মানব হৃৎপিন্ড মায়ের হৃৎ-স্পন্দন হারের কাছাকাছি হারে প্রথমে স্পন্দিত হতে থাকে, যা প্রায় ৭৫-৮০ বীট্/মিনিট (BPM)।

ভ্রুনীয় স্পন্দন হার (EHR) প্রথম মাসে রৈখিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা ৭ম সপ্তাহের শুরুতে (অর্থাৎ LMP-র পরে ৯ম সপ্তাহের শুরুতে) ১৬৫-১৮৫ BMP-তে পৌছায়। এই বৃদ্ধির হার প্রতি দিন প্রায় ৩.৩ BMP বা প্রতি তিন দিনে ১০ BMP, যা প্রথম মাসে ১০০ BMP পর্যন্ত বাড়ে।[৩]

LMP-র পরে ৯.২ সপ্তাহ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবার পর, এই হার কমতে শুরু করে যা ১৫ সপ্তাহে প্রায় ১৫২ BMP (+/-২৫ BMP) -তে নেমে আসে। ১৫ সপ্তাহ পরে এই ক্রমহ্রাসের হর কমতে থাকে এবং গর্ভকাল শেষে গড়ে ১৪৫ BMP (+/-২৫BMP)-তে দাঁড়ায়। ভ্রুণ ২৫ মিমি দৈর্ঘ্যে পৌছানোর আগে বা ৯.২ LMP সপ্তাহে ক্রমহ্রাস সূত্রকে প্রকাশ করা হয় এভাবে- বয়স (দিন হিসেবে)= ভ্রুণীয় স্পন্দন হার(০.৩)+৬। (Age in days=HER(0.3)+6)

জন্মের আগে নারী ও পুরুষের হৃদ-স্পন্দন হারে কোন পার্থক্য থাকে না।[৪]

[সম্পাদনা] গঠন

চিত্র:3DScience Human Heart.jpg
ব্যবচ্ছেদকৃত হৃৎপিন্ডের সম্মুখবর্তী চিত্র। তীরচিহ্ন স্বাভাবিক রক্ত প্রবাহকে নির্দেশ করছে। ছবিটি www.3dscience.com এর সৌজন্য প্রাপ্ত।

মানবদেহে হৃৎপিন্ড বক্ষগহ্বরের (Thorax) মাঝ বরাবর অবস্থিত যার একটি বড় অংশ কিছুটা বাম দিকে স্ফীত (যদিও কখনও কখনও তা ডান পাশেও হতে পারে, ডেক্সটোকার্ডিয়া দেখুন) এবং এটি ঠিক বুক্কাস্থির(Sternum) নিচে থাকে। (দেখুন ডায়াগ্রাম)। হৃৎপিন্ড সাধারনত বাম দিকে অনুভূত হয় কারণ বাম নিলয় (left ventricle) অন্যান্য প্রকোষ্ঠ হতে শক্তিশালী (এটি সারাদেহে রক্ত পাম্প করে পাঠায়)। বাম ফুসফুস ডান হতে আকারে ছোট কারণ হৃৎপিন্ড বাম হেমিথোরাক্সের বেশী জায়গা জুড়ে থাকে। হৃৎপিন্ড হৃদাবরণ (pericardium) দ্বারা আবৃত থাকে এবং ফুসফুস একে পরিবেষ্টন করে থাকে। হৃদাবরণ দুটি অংশ নিয়ে গঠিত:
১। ফাইব্রাস হৃদাবরণ, ঘণ যোযক কলা (dense connective tissue) দ্বারা তৈরী: এবং
২। সেরাস হৃদাবরণ, যা একটি দ্বি-স্তর বিশিষ্ট আবরণ এবং এর ভেতরে সেরাস রস থাকার কারণে হৃদ সংকোচনের সময় সৃষ্ট ঘর্ষণ কমায়।
হৃদ গহ্বরকে মেডিয়েসটিনাম বলে যা বক্ষ গহ্ববরের একটি অংশ।

হৃৎপিন্ডের সর্ববামের নিম্নগামী ভোঁতা অংশকে এ্যাপেক্স বলে। হৃৎ স্পন্দন শোনার জন্য একটি স্টেথোস্কোপ সরাসরি এ্যাপেক্সের উপর স্থাপন করা যায়। এটি বাম মধ্য-ক্ল্যাভিকুলার রেখায় ৫ম ইন্টারকস্টাল স্থানের পেছনে অবস্থিত। স্বাভাবিক পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির হৃৎপিন্ডের ওজন ২৫০-৩৫০ গ্রাম (৯-১২ আউন্স)। কিন্তু একটি অসুস্থ হৃৎপিন্ড বিবৃদ্ধির (organ hypertrophy) কারণে ১০০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এটি চারটি প্রকষ্ঠ নিয়ে গঠিত: উপরে দুটি অলিন্দ (atrium) এবং নিচে দুটি নিলয় (ventricle)। নিম্নের বামের ছবিটি ৬৪ বছর বয়স্ক পুরুষ হতে সদ্য বিচ্ছিন্নকৃত একটি হৃৎপিন্ডের।

[সম্পাদনা] কর্মকান্ড

মানব হৃৎপিন্ড

হৃৎপিন্ডের ডান অংশের কাজ হল পুরো দেহ হতে ডান অলিন্দে অক্সিজেন-শূন্য রক্ত সংগ্রহ করা এবং ডান নিলয়ের মাধ্যমে তা পাম্প করে ফুসফুসে (পালমোনারী সংবহন) প্রেরণ করা, যাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড রক্ত হতে নিষ্কাশিত এবং অক্সিজেন যুক্ত হতে পারে (বায়ু বিনিময়)। এই বায়ু আদান-প্রদান অক্রিয় ব্যাপনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। হৃৎপিন্ডের বাম অংশ অক্সিজেনেনাইত রক্ত ফুসফুস হতে বাম অলিন্দে গ্রহণ করে। বাম অলিন্দ হতে রক্ত বাম নিলয়ে স্থানান্তরিত হয় এবং সারা দেহে সঞ্চারিত হয়। দুই দিকেই, উপরের অলিন্দগুলো হতে নিচের নিলয়গুলোর দেয়াল পুরু ও শক্তিশালী। আবার ডান নিলয়ের দেয়াল হতে বাম নিলয়ের দেয়াল বেশী পুরু, কারণ সিস্টেমিক সংবহনে রক্ত সরবরাহ করতে আরও বেশী শক্তির প্রয়োজন হয়।

ডান অলিন্দ হতে রক্ত ট্রাইকাস্পিড ভাল্বের ভেতর দিয়ে ডান নিলয়ে প্রবেশ করে। এখান থেকে রক্ত পালমোনারী সেমিলুনার ভাল্বের ভেতর দিয়ে বেড়িয়ে পালমোনারী ধমনী দিয়ে ফুসফুসে পৌছে। ফুসফুস হতে রক্ত পালমোনারী শিরা দিয়ে বাম অলিন্দে যায়। সেখান থেকে রক্ত বাইকাস্পিড ভাল্বের ভেতর দিয়ে বাম নিলয়ে প্রবেশ করে। বাম নিলয় এই রক্তকে এ্যাওটিক সেমিলুনার ভাল্বের ভেতর দিয়ে এ্যাওর্টায় পাম্প করে পাঠায়। এ্যাওর্টা কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয় এবং এইসব প্রধান শাখা ধমনী দিয়ে রক্ত সারা দেহে সঞ্চালিত হয়। রক্ত ধমনী হতে তার চেয়ে সরু ছোট ধমনীতে (arterioles) প্রবেশ করে এবং শেষ পর্যায়ে আরও ক্ষুদ্র কৈশিকনালীর মাধ্যমে কোষে পৌছায়। এরপরে অক্সিজেন-শূণ্য রক্ত ছোট শিরার (venules) ভেতর দিয়ে গিয়ে শিরায় পৌছায়। এইসব শিরা পরে সুপিরিয়র ও ইনফিরিয়র ভেনাকেভা তৈরী করে শেষ পর্যন্ত ডান অলিন্দে পৌছায় এবং আবার উপরোক্ত পদ্ধতি পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে।

হৃৎপিন্ড কার্যত একটি সিনশাইসিয়াম, অর্থাৎ হৃৎপেশীর একটি বুনানি যারা পরস্পর সাইটোপ্লাজমিয় সংযুক্তি দিয়ে সংযুক্ত। ফলে বৈদ্যুতিক সংকেত একটি কোষে পৌছালে তা সাথে সাথে সকল কোষে পৌছে যায় একং হৃৎপিন্ড তখন একটি কোষের ন্যায় সংকুচিত হয়।

[সম্পাদনা] প্রাথমিক চিকিৎসা

হৃৎপিন্ড

হৃৎপিন্ড সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা বিষয়ে দেখুন কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট

যদি কোন ব্যক্তির কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট (হৃদ রোধ/হৃদ-স্পন্দন বন্ধ হওয়া)হয় তবে কার্ডিওপালমোনারী রিসাসিটেশন (CPR) শুরু করতে হবে। যদি একটি স্বয়ংক্রিয় এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর যন্ত্র পাওয়া যায় তবে এটি ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিফিব্রিলেশনের কাজ করা যায়। সাধারনত পর্যাপ্ত সময় পাওয়া গেলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে এসে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সাহায্য করা উচিত।

[সম্পাদনা] অ্যাজটেক হৃৎপিন্ড উৎপাটণ

আ্যাজটেক সভ্যতায় মানব বলিতে, হৃৎপিন্ড উৎসর্গীকৃত প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হত। পুরোহিত একটি পাথড়ের ছুরি দিয়ে বক্ষগহ্বর উন্মুক্ত করত এবং হৃৎপিন্ড বের করে নিয়ে আসতো। যা পরে দেবতার উদ্দেশ্যে পাথড়ের বেদিতে রাখা হতো। সবচেয়ে বৃহৎ উৎসর্গের ঘটনা সংঘটিত হয় মনটাজুমার আমলে, যেখানে প্রায় ১২,০০০ এর উপরে শত্রু সৈন্যদের হৃৎপিন্ড উৎপাটন করা হয়েছিল।

[সম্পাদনা] আরও দেখুন

[সম্পাদনা] সূত্র

[সম্পাদনা] বাইরের উৎস

Wiktionary-logo-en.png
উইকিঅভিধানে
হৃৎপিন্ড শব্দটি খুঁজুন
Commons logo
উইকিমিডিয়া কমন্সে নিম্নের বিষয় সংক্রান্ত ছবি, অডিও বা ভিডিও রয়েছে: