বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি ১৯৭২

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি ১৯৭২ একটি ২৫ বছর মেয়াদী চুক্তি যা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন মাসের মধ্যে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে মার্চ তারিখে ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ইংজেী ভাষায় প্রণীত এই চুক্তির শিরোনাম "The Indo-Bangladeshi Treaty of Friendship, Cooperation and Peace"। বাংলাদেশের পক্ষে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবর রহমান এবং ভারতের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। এই চুক্তিতে ছিল ১২টি দফা। চুক্তিটি ২৫ বৎর মেয়াদী হলেও নবায়নযোগ্য ছিল। [১]

চুক্তির প্রয়োজনীয়তা[সম্পাদনা]

ছুক্তির ভূমিকাংশে চুক্তি প্রণয়ন এবং সম্পাদনার প্রয়োজনীয়তার ককথা বর্ণনা করা হয়েছে। শান্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদেও একই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই আদর্শের বাস্তব রূপায়ণের লক্ষ্যে একযোগে সংগ্রাম , রক্তদান এবং আতœত্যাগের মধ্য দিয়ে বন্ধুত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার নিয়ে মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের বিজয় অভ্যূদয় ঘটিয়ে, সৌভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক রক্ষা করতে এবং উভয় রাষ্ট্রের সীমান্তকে চিরস্থায়ী শান্তি ও বন্ধুত্বেও সীমান্ত হিসেবে রূপান্তরের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে; নিরপেক্ষতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পারিক সহযোগীতা, অপরের আভ্যান্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থেকে এবং আঞ্চলিক অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে সম্মান প্রদর্শনের মূলনীতিসমূহের প্রতি দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল থেকে; শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এবং সম্ভব্য সকল প্রকারের পারস্পারিক সহযোগীতার মাধ্যমে স্ব স্ব দেশের অগ্রগতির জন্য; উভয় দেশের মধ্যকার বর্তমান মৈত্রীপূর্ণ সম্পর্ক আরো স¤প্রসারণ ও জোরদার করার জন্য দৃঢ় সংকল্প নিয়ে; এশিয়া তথা বিশ্বের স্থায়ী শান্তির স্বার্থে এবং উভয় রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে পারস্পরিক মৈত্রী ও সহযোগীতা আরো স¤প্রসারিতকরণে বিশ্বাসী হয়ে; বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা প্রশমনে এবং উপনিবেশবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ ও সামন্তবাদের শেষ চিহ্নটুকৃ চৃড়ান্তভাবে নির্মুল করার লক্ষ্যে প্রয়াস চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে; আজকের বিশ্বের আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলোর সমাধান যে শুধুমাত্র সহযোগীতার মাধ্যমে সম্ভব, বৈরিতা ও সংঘাতের মাধ্যমে নয় – এ ব্যাপাওে দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে; রাষ্ট্রসংঘের সনদের নীতিমালা ও লক্ষ্যসমূহ অনুসরণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা পূনর্ব্যক্ত করে এক পক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ও অন্য পক্ষে প্রজাতন্ত্রী ভারত বর্তমান চুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চুক্তির বর্ণনা[সম্পাদনা]

অনুচ্ছেদ ১[সম্পাদনা]

চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উভয় পক্ষ স্ব স্ব দেশের জনগণ যে আদর্শের জন্য একযোগে সংগ্রাম এবং স্বার্থত্যাগ করেছেন, সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছে যে, উভয় দেশ এবং তথাকার জনগণের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও মৈত্রী বজায় থাকবে। একে অপরের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং অপরের অভ্যান্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে অবিচল থাকবে। চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উভয়পক্ষ উল্লেখিত নীতিমালা এবং সমতা ও পারস্পরিক উপকারিতার নীতিসমূহের ভিত্তিতে উভয় দেশের মধ্যেকার বর্তমান বন্ধুত্বপূর্ণ সুপ্রতিবেশীসুলভ সার্বিক সহযোগীতা ও সম্পর্কের উন্নয়ন আরও জোরদার করবে।

অনুচ্ছেদ ২[সম্পাদনা]

জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি সমতার নীতিতে আস্থাশীল থাকার আদর্শে পরিচালিত হয়ে চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উভয়পক্ষ সর্ব প্রকারের উপনিবেশবাদ ও বর্ণ বৈষম্যবাদের নিন্দা করছে এবং তাকে চুড়ান্তভাবে ও সম্পূর্ণরূপে নির্মুল করার জন্য প্রচেষ্টা চালানোর ব্যাপারে তাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কথা পুনরুল্লেখ করছে। চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উভয়পক্ষ উপরোক্ত অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগীতা করবে এবং উপনিবেশবাদ ও বর্ণ বৈশম্যবিরোধী এবং জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে জনগণের ন্যায়সঙ্গত আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দান করবে।

অনুচ্ছেদ ৩[সম্পাদনা]

চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উভয়পক্ষ বিশ্বের উত্তেজনা প্রশমন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা মজবুত করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে জোটনিরপেক্ষতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতির প্রতি তাদের অবিচল আস্থা পূনরুল্লেখ করছে।

অনুচ্ছেদ ৪[সম্পাদনা]

উভয় দেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রধন প্রধান আন্তর্জাতিক সমস্যাবলী নিয়ে চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পক্ষদ্বয় সকল স্তরে বৈঠক ও মত বিনিময়ের জন্য নিয়মিত যোগাযোগ করবে।

অনুচ্ছেদ ৫[সম্পাদনা]

চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উভয়পক্ষ অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ক্ষেত্রে পারস্পরিক সুবিধা এবং সর্বাতœক সহযোগীতা শক্তিশালী ও স¤প্রসারিত করে যাবে। উভয় দেশ সমতা, পারস্পরিক সুবিধা এবং সর্বোচ্চ আনুকুল্যপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের বেলায় প্রযোজ্য নীতির ভিত্তিতে বাণিজ্য, পরিবহন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহযোগীতা স¤প্রসারিত করবে।

অনুচ্ছেদ ৬[সম্পাদনা]

চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উভয়পক্ষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী অববাহিকার উন্নয়ন এবং জল বিদ্যুৎ শক্তি ও সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে যৌথ সমীক্ষা পরিচলনা ও যৌথ কার্যক্রম গ্রহণে অভিন্ন মত পোষণ করে।

অনুচ্ছেদ ৭[সম্পাদনা]

চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উভয়পক্ষ শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার ক্ষেত্রে সম্পর্ক উন্নয়নে সচেষ্ট হবে।

অনুচ্ছেদ ৮[সম্পাদনা]

দুই দেশের মধ্যেকার বর্তমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অনুযায়ী চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পক্ষদ্বয়ের প্রত্যেকে ন্যায় ও নিষ্টার সাথে ঘোষণা করছে যে, তারা একে অপরের বিরুদ্ধে পরিচলিত কোন সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হবে না ব অংশ গ্রহণ করবে না। চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পক্ষদ্বয় একে অন্যের উপর আক্রমন থেকে ও বিরত থাকবে এবং তাদের ভূখন্ডে এমন কোন কাজ করতে দিবে না যাতে চুক্তি সম্পাদনকারী কোন পক্ষের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কোন ক্ষতি হতে পারে অথবা কোন পক্ষেও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

অনুচ্ছেদ ৯[সম্পাদনা]

কোন এক পক্ষের বিরুদ্ধে তৃতীয় পক্ষ সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হলে চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পক্ষদ্বয়ের প্রত্যেকে এতদুল্লেখিত তৃতীয় পক্ষকে যে কোন প্রকার সাহায্য দানে বিরত থাকবে। এতদ্ব্যতীত যে কোন পক্ষ আক্রান্ত হলে অথবা আক্রান্ত হওয়ার আশংকা দেখা দিলে সেই আশংকা দুরীভূত এবং নিজের দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে যথাযথ সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উভয়পক্ষ জরুরী ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনায় মিলিত হবে।

অনুচ্ছেদ ১০[সম্পাদনা]

চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উভয়পক্ষ নিষ্ঠার সাথে ঘোষণা করছে যে, এই চুক্তির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ও অহিতকর হতে পারে এমন কোন গোপন বা প্রকাশ্য এক বা একাধিক রাষ্ট্রের সঙ্গে উভয়ের কেউই কোন প্রতিশ্রে“তিতে আবদ্ধ হবে না।

অনুচ্ছেদ ১১[সম্পাদনা]

এই চুক্তি পঁচিশ বছর মেয়াদের জন্য স্বাক্ষরিত হলো। চুক্তি সম্পাদনকারী উভয়পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিতে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। অত্র চুক্তি স্বক্ষর করার দিন থেকে কার্যকরী হবে।

অনুচ্ছেদ ১২[সম্পাদনা]

এই চুক্তির কোন এক বা একাধিক অনুচ্ছেদের বাস্তব অর্থ নিয়ে চুক্তি সম্পাদনকারী উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পক্ষদ্বয়ের মধ্যে কোন মত পার্থক্য দেখা দিলে তা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে।

তাৎপর্য[সম্পাদনা]

পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে শর্ত থাকার কারণে এই ছুক্তিটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে। অনুচ্ছেদ ৮-এ বলা হয়, “কোন দেশ অপর দেশের বিরুদ্ধে কোনরূপ সামরিক জোটে যোগ দিতে পারবে না এবং অপর দেশের বিরুদ্ধে কোন রকম সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারবে না এবং তার সীমানাধীন স্থল, জল এবং আকাশ অপর রাষ্ট্রের সামরিক ক্ষতি অথবা অপর রাষ্ট্রের সংহতির প্রতি হুমকিস্বরূপ কোন কাজে ব্যবহার করতে দিতে পারবে না।”অন্য দিকে অনুচ্ছেদ ৯-এ বর্ণিত রয়েছে, “প্রত্যেক পার্টিই অন্য পার্টির বিপক্ষে কোন তৃতীয় পার্টিকে যে কোন সামরিক সংঘর্ষে কোন প্রকার সাহায্য দিতে পারবে না। যদি কোন পার্টি আক্রমণের শিকার হয় কিংবা আগ্রাসনের হুমকির মুখাপেক্ষি হয়, তবে অনতিবিলম্বে দুই পার্টিই পারষ্পরিক আলোচনার মাধ্যমে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সেই আক্রমণ কিংবা আগ্রাসনের হুমকির মোকাবেলা করার জন্য। এভাবেই দুই দেশের শান্তি ও সংহতি বজিয়ে রাখা হবে।” অনুচ্ছেদ ১০-এ বর্ণিত আছে, “এই চুক্তির পরিপন্থী কোন প্রকার অঙ্গীকার কোন পার্টিই অন্য কোন দেশ বা একাধিক দেশের সাথে খোলাভাবে কিংবা গোপনে করতে পারবে না।”

সমালোচনা[সম্পাদনা]

এই চুক্তিটি প্রধানত ভারত-বিরোধীদের দ্বারা কঠোর ভাষায় সমালোচিত হয়েছে। এটিকে একটি "অসম" চুক্তি হিসাবে নিন্দা করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. [www.bdiusa.org/Publications/JBS/Volumes/Volume3/jbs3.1-1.pdf THE BANGLADESH-INDIA FRIENDSHIP TREATY: A CRITICAL ANALYSIS]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]