হরেকৃষ্ণ কোঙার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
হরেকৃষ্ণ কোঙার
Hare Krishna Konar cropped.jpg
বিধায়ক
কাজের মেয়াদ
১৯৫৭ - ১৯৭২
সংসদীয় এলাকাকালনা বিধানসভা কেন্দ্র
ভূমিমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার
কাজের মেয়াদ
১৯৬৭, ১৯৬৯-১৯৭০
সাধারণ সম্পাদক, সারাভারত কৃষক সভা
কাজের মেয়াদ
১৯৬৮ - ১৯৭৪
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম(১৯১৫-০৮-০৫)৫ আগস্ট ১৯১৫
কমড়গড়িয়া গ্রাম, রায়না,বর্ধমান জেলা, বাংলা প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু২৩ জুলাই ১৯৭৪(1974-07-23) (বয়স ৫৮)
কলকাতা
জাতীয়তাভারতীয়
রাজনৈতিক দলভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) (১৯৬৪ - ১৯৭৪) ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (১৯৩৮- ১৯৬৪)
বাসস্থানমেমারি

হরেকৃষ্ণ কোঙার (৫ আগস্ট ১৯১৫- ২৩ জুলাই ১৯৭৪) সিপিআই(এম) দলের একজন ভারতীয় বাঙালি নেতা। পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কারে হরেকৃষ্ণ কোঙারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

হরেকৃষ্ণ কোঙার তার পরিবারের প্রথম সন্তান ছিলেন। তিনি বর্ধমান জেলার কোমড়গড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সেই পড়াশোনার জন্য বর্ধমানের মেমারি শহরে চলে আসেন।

রাজনৈতিক জীবন[সম্পাদনা]

১৯৩০ সালেই হরেকৃষ্ণ কোঙার আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেন এবং তাঁর জন্য ৬ মাস কারাবন্দীও ছিলেন। ১৯৩২ সালে বঙ্গবাসী কলেজ এ পড়াকালীন তিনি বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৯৩৩ সালেমাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ৬ বছরের জন্য আন্দামানের সেলুলোর জেলে পাঠিয়ে দেয়।[১][২]

গ্রেফতার হওয়ার আগে থেকেই হরেকৃষ্ণ কোঙারের সাথে ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বঙ্কিম মুখার্জী, আবদুল হালিমদের মতো কমিউনিস্ট নেতাদের যোগাযোগ ছিল।[১][২] জেলে তার সাথে নারায়ণ রায়, সতীশ পাকড়াশী, নিরঞ্জন সেনগুপ্ত এবং অন্যান্য বিপ্লবীদের সাথে পরিচয় হয়। সেখানেই অন্যান্য জেলবন্দিদের সাথে কমিউনিস্ট সংহতি গড়ে তোলেন।

জেল থেকে মুক্তি পাবার পর তার সাথে কমিউনিস্ট নেতা মুজাফফর আহমেদএর সাথে পরিচয় হয়। তখনই তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন।[১][২]

ব্রিটিশ ভারতে কর্মকাণ্ড[সম্পাদনা]

হরেকৃষ্ণ কোঙার প্রথমে হাওড়া ও কলকাতায় শ্রমিকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন। কিছুমাস পর বিনয় চৌধুরী তাঁকে বর্ধমান জেলায় নিয়ে আসেন এবং সেখানে তিনি কৃষকদের মাঝে কাজ শুরু করেন। ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সরকার হরেকৃষ্ণ কোঙারের আসানসোল এবং বার্নপুরে ঢোকার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং পরে সমগ্র বর্ধমান জেলায় ঢোকার উপরই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। তবুও তিনি আত্মগোপন করে বর্ধমান জেলায় কাজ চালিয়ে যান।[২] ১৯৪৪ সালে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন। এবং এবারে তার বর্ধমান জেলা ছেড়ে বেরোনোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। দ্বিতীয় ক্যানেল ট্যাক্স আন্দোলন ১৯৪৬-৪৭ এবং অজয় নদ ড্যাম আন্দোলন ১৯৪৩-৪৪ এ তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

স্বাধীন ভারতে কর্মকাণ্ড[সম্পাদনা]

১৯৪৮ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি যখন নিষিদ্ধ করা হয় তখন তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। ছাড়া পাবার পর তিনি আবার আত্মগোপন করেন এবং ১৯৫২ পর্যন্ত আত্মগোপন করেই কাজ চালিয়ে যান। ১৯৫৩ এর খাদ্য আন্দোলন এবং ১৯৫৭এর আইন অমান্য আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এবং দুবারই তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় সুরক্ষা আইনে হরেকৃষ্ণ কোঙারকে আবার গ্রেফতার করা হয় এবং ঐ আইনে তাকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তাঁকে জেলে রাখা হয়।[৩]

নতুন দল গঠন[সম্পাদনা]

১৯৬৪ সালে মতপার্থক্যের জেরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে নতুন দল সিপিআই(এম) তৈরি হয়। হরেকৃষ্ণ কোঙার এই নতুন তৈরি সিপিআই(এম) দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৫৭ থেকেই তিনি সিপিআই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পরিষদের সদস্য ছিলেন। ১৯৬৪ থেকে আমৃত্যু হরেকৃষ্ণ কোঙার নতুন তৈরি হওয়া সিপিআই(এম) দলের রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।[৩][৪]

কৃষক আন্দোলনে ভূমিকা[সম্পাদনা]

স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই হরেকৃষ্ণ কোঙার কৃষক আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত বিনয় কোঙার সর্বভারতীয় কৃষক সভার পশ্চিমবঙ্গ শাখা বাংলা প্রাদেশিক কৃষক সভার সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৬৮ থেকে আমৃত্যু হরেকৃষ্ণ কোঙার সর্বভারতীয় কৃষক সভার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।[৪][৫][৬]

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে[সম্পাদনা]

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬০ সালে হরেকৃষ্ণ কোঙার ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির পার্টি কংগ্রেসে যোগ দেন। এই বছরেই তিনি কমিউনিস্ট শাসিত দেশ,চীন যান।

কৃষি, বন্য এবং প্ল্যানটেশন ওয়ার্কারদের আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনের সম্মেলনে যোগ দিতে হরেকৃষ্ণ কোঙার ১৯৭০ সালে সাইপ্রাসএর নিকোসিয়াতে, ১৯৭১ সালে ইতালির রোম, ১৯৭২ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগ, এবং ১৯৭৩ সালে পূর্ব জার্মানির বার্লিন শহরে যান।[৫]

পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কারে ভূমিকা[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কারে হরেকৃষ্ণ কোঙারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বর্গদারদের দখলে থাকা বেনামি জমি ভূমিহীন গরিব কৃষকদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়। সারাবাংলায় বর্গদারদের দখলে থাকা ১০ লক্ষ একর (৪০০০ বর্গকিমি) কৃষিজমি চিহ্নিত করা হয় এবং তা প্রায় ২৪লক্ষ ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিলি করা হয়। গোটা প্রক্রিয়া সাফল্যের সাথে সম্পাদন করার ক্ষেত্রে হরেকৃষ্ণ কোঙার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।[৫]

নির্বাচন[সম্পাদনা]

হরেকৃষ্ণ কোঙার ১৯৫৭, ১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৭১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বর্ধমানের কালনা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৯৭৪ সালের ২৩শে জুলাই হরেকৃষ্ণ কোঙার ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান।[৫] তাঁর ভাই বিনয় কৃষ্ণ কোঙারও একজন সিপিআই(এম) নেতা।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Sansad Bangla Charitbhidhan, p. 622, আইএসবিএন ৮১-৮৫৬২৬-৬৫-০
  2. Nirbachito Rochona Sonkolon Harekrishna Konar। Kolkata: National Book Agency। ১৯৭৮। পৃষ্ঠা 7। 
  3. Nirbachito Rochona Sonkolon Harekrishna Konar। Kolkata: National Book Agency। ১৯৭৮। পৃষ্ঠা 8। 
  4. "Present Stage of Peasant Movement"Communist Party of India (Marxist) (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৫-০৮-১১। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৩-৩১ 
  5. Nirbachito Rochona Sonkolon Harekrishna Konar। Kolkata: National Book Agency। ১৯৭৮। পৃষ্ঠা 9। 
  6. দাশ, সুস্নাত (জানুয়ারি ২০০২)। "সংযোজন ২"। অবিভক্ত বাঙলার কৃষক সংগ্রাম: তেভাগা আন্দলোলনের আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত-পর্যালোচনা-পুনর্বিচার (প্রথম প্রকাশ সংস্করণ)। কলকাতা: নক্ষত্র প্রকাশন। পৃষ্ঠা ২৮৯।