সামন্ততন্ত্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সমাজতন্ত্রের রুপক৷ চার্ট

সামন্ততন্ত্র বা সামন্তবাদ মধ্যযুগের ইউরোপের ইতিহাসে একটি গুরত্ত্বপুর্ন প্রতিষ্ঠান বা প্রথা। মধ্য যুগে ইউরোপে যে তিনটি স্তম্ভ ( জার্মান জাতিগোষ্ঠীর রাজ্য শাসন পদ্ধতি, খ্রিষ্ট ধর্ম ও সামন্ত্রতন্ত্র ) এর উপর ভিত্তি করে তাদের সমাজ ও সভ্যতার সৌধ নির্মিত হয়েছিল বলে স্বীকৃত, সেই তিনটি স্তম্ভের মধ্যে নিঃসন্দেহে সামন্ত্রতন্ত্র বিশেষভাবে আলোচিত। কারণ সামন্ত্রতন্ত্র ইউরোপের ইতিহাসে এতো বেশি আলোচিত যে, মধ্যযুগকে অনেক সময় সামন্ত্রতন্ত্রের যুগ বলেও চিহ্নিত করা হয়।

সামন্ততন্ত্র মুলত এক প্রকার ভূমি ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থা সমগ্র মধ্যযুগব্যাপী অর্থাৎ, নবম শতক হতে পনের শতক পর্যন্ত ইউরোপবাসীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন এবং তাদের আচার-আচরণ ও ভাবধারার উপর বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। উৎপত্তিগতভাবে দেখতে গেলে দেখা যায় সামন্ত্রতন্ত্র একটি ল্যাটিন শব্দ Feudam থেকে এসেছে। এখানে Feudam অর্থ Fief বা ক্ষুদ্র জমি। অন্যদিকে হস্তান্তরিত ক্ষুদ্র জমিকে অথবা শর্তাধীনে জমি দানকে বলা হতো Feif বা Feud । আর এই Feud থেকে Feudal(সামন্ত্র) এবং Feudal শব্দ থেকেই সামন্ত্রতন্ত্র বা Feudalism শব্দের উৎপত্তি ঘটেছে।

সামন্ততন্ত্র বিকশিত হয়েছিল তখন যখন সম্পদ ও ক্ষমতার উৎস ছিল একমাত্র জমি। জার্মান অভিবাসনের সময় শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং এ সময় মুলত জমি কেন্দ্রিক উৎপাদন গুরত্ব লাভ করায় জমির মালিকের নিকট ক্ষমতা কেন্দ্রীভুত হয়েছিল। সামন্ত প্রথার উৎপাদনের কাজে সামন্ত প্রভূদের কোন ভূমিকা থাকতোনা। উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত থাকতো কৃষক ও ভূমিদাসগন অথচ উৎপাদিত ফসলের এক বিরাট অংশ পেত সামন্ত প্রভূরা।

সামন্ততন্ত্র মূলত ভূমিকেন্দ্রীক একটি সরকার ব্যবস্থা। যেখানে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পরিবর্তে স্থানীয় ভূস্বামীদের মধ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রিভূত হয়েছিল। তবে যথাযথভাবে সামন্ত্রতন্ত্রের সংজ্ঞা দেওয়া অত্যন্ত দুরহ ব্যাপার। কেননা একক কোন সংজ্ঞায় কেউ কেউ বলেন যে , দশ ও এগার শতকে ইউরোপে যে বিশেষ সমাজ ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল তাই সামন্ত্র ব্যবস্থা।

এছাড়া জার্মান ইতিহাসবেত্তা Ganshop বলেন, মধ্যযুগে ইউরোপে কতগুলো অদ্ভুত ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল যা বিকাশ লাভ করেছিল একখন্ড জমিকে কেন্দ্র করে। এর অর্থ একজন আর একজনকে জমি দান করবে এবং জমি দান কারী হচ্ছেন লর্ড আর যিনি গ্রহণ করছেন তিনি হলেন ভেসাল। এ লর্ড ও ভেসালের মধ্যে যে সম্পর্ক এবং তার ফলে যে ব্যাবস্থার উদ্ভব হয়েছিল তাই হলো সামন্ততন্ত্র বা সামন্ত ব্যবস্থা।

সুতরাং সামন্ততন্ত্র বলতে আমরা বুঝি এমন কতগুলো প্রথা, বিধি ও ব্যবস্থার সমষ্টি যেখানে শক্তিশালি মানুষ দুর্বল মানুষকে সাহায্য করবে এবং এর বিনিময়ে দুর্বল মানুষ শক্তিশালি মানুষকে।

খ্রিস্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতকে ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের চূড়ান্ত বিকাশ লক্ষ করা যায়। কিন্তু চতুৰ্দশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিভিন্ন কারণে পশ্চিম ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় অবক্ষয় শুরু হয় এবং ক্রমে তা পতনের দিকে এগিয়ে যায়।

সামন্ততন্ত্রের পতনের কারণ

[1] রক্ষণশীল উৎপাদন ব্যবস্থা: অধ্যাপক মরিস ডব মনে করেন যে, ক্রমশ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামন্ততন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ ম্যানরগুলি উন্নত হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছিল। সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার এই চরিত্রগত রক্ষণশীলতার ফলে কৃষকের পরিশ্রম যেমন বেড়েছিল, কৃষি উৎপাদনের পরিমাণও তেমনি ব্যাহত হয়েছিল। কৃষি উৎপাদনের এই রক্ষণশীলতা সামন্ততন্ত্রের পতনের অন্যতম কারণ হয়েছিল।

[2] কৃষক বিদ্রোহ: সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় কৃষক সম্প্রদায় সামন্তপ্রভু, গির্জা প্রভৃতির আরোপিত বিভিন্ন প্রকার করের চাপে জর্জরিত হয়ে পড়েছিল। তদুপরি প্রভুর জমিতে বিনা পারিশ্রমিকে বেগার খেটে তাদের জীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। এজন্য তারা মাঝেমধ্যেই সামন্তপ্রভুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করত এবং তাতে শামিল হত দিনমজুর, কারিগর প্রমুখ সমস্ত নির্যাতিত শ্রেণিই।

[3] ভূমিদাস বিদ্রোহ: ভূমিদাসদের ওপর সামন্তপ্রভুদের সীমাহীন শোষণ ও নির্যাতনকে সামন্ততন্ত্রের পতনের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভূমিদাসদের স্বাধীনতা প্রায় ছিল না বললেই চলে। তীব্র অত্যাচার ও শোষণের ফলে বিভিন্ন স্থানে ভূমিদাস বিদ্রোহ সংঘটিত হতে থাকে যা সামন্ততন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করে দেয় ।

[4] জনসংখ্যা হ্রাস: ১৩৪৮ খ্রিস্টাব্দ ইউরোপে প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথ নামে মহামারি ছড়িয়ে পড়লে কয়েক দশকের মধ্যে ইউরোপের অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় জনসংখ্যা হ্রাস পেলে মানুষের তুলনায় জমির অনুপাত বেড়ে যায়। কৃষক ও ভূমিদাসের স্বল্পতায় শ্রমশক্তির অপ্রতুলতার কারণে সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং সামন্তপ্রভুর আয় কমে যায়। সামন্তপ্রভুর আয় বৃদ্ধির বিকল্প কোনো পথ না থাকায় সামন্ততন্ত্ৰ ক্ৰমে দুর্বল হয়ে পড়ে।

[5] বাণিজ্যের প্রসার: ইতিহাসবিদ হেনরি পিরেন উল্লেখ করেছেন যে, ইউরোপে নগরসভ্যতা ও বাণিজ্যের প্রসারের ফলে ম্যানরগুলিতে নির্যাতিত বহু কৃষক ও ভূমিদাস মুক্ত জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ম্যানরের বহু ভূমিদাস এখানে পালিয়ে এসে শ্রমিকের কাজে যোগ দেয়। ফলে ম্যানরগুলির অবক্ষয় শুরু হয়ে যায় ।

[6] বাণিজ্য পণ্য উৎপাদন: অর্থনীতিবিদ পল সুইজির মতে, দশম শতক থেকে বাণিজ্য ও রপ্তানি পণ্য উৎপাদন জনপ্রিয় হয়ে উঠলে ম্যানরগুলিতে প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতিতে তা সম্ভব হয়নি। অথচ পরিবর্তিত পরিস্থিতির চাহিদা অনুসারে ম্যানরগুলিতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনাও সম্ভব হয়নি। ফলে সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতি ভেঙে পড়তে থাকে।

উপসংহার: উপরিউক্ত বিভিন্ন কারণে পশ্চিম ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয় ও পতন শুরু হয়। সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশ ঘটতে থাকে। অবশ্য তখন আশ্চর্যজনকভাবে পূর্ব ইউরোপ ও রাশিয়ায় এর উত্থান শুরু হয় যা দীর্ঘদিন অস্তিত্বশীল থাকে। SUBHAJIT DEY

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]