সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড

স্থানাঙ্ক: ২৩°১৩′৫৭″ উত্তর ৮৭°৫১′৪১″ পূর্ব / ২৩.২৩২৪° উত্তর ৮৭.৮৬১৫° পূর্ব / 23.2324; 87.8615
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড
সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড পশ্চিমবঙ্গ-এ অবস্থিত
সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড
স্থানবর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ
স্থানাংক২৩°১৩′৫৭″ উত্তর ৮৭°৫১′৪১″ পূর্ব / ২৩.২৩২৪° উত্তর ৮৭.৮৬১৫° পূর্ব / 23.2324; 87.8615
তারিখ১৭ই মার্চ, ১৯৭০ (ইউটিসি+৬:০০)
লক্ষ্যসাঁই-পরিবার
হামলার ধরনরাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড
হামলাকারী দলসিপিআই(এম)

সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড ছিলো বর্ধমানে ঘটে যাওয়া একটি অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক ঘটনা। বিরোধী-দল সমর্থনের দায়ে ১৯৭০ সালে সাঁইপরিবারের ৩ ভাই ও তাদের গৃহশিক্ষককে সিপিআই(এম)-এর সদস্যবৃন্দদের হাতে নিজগৃহে নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের শিকার হতে হয়।[১][২][৩]

পটভূমি[সম্পাদনা]

৫১ বছর আগে ঘটা সাঁইবাড়ি হত্যাকান্ড-কে আজো ইতিহাসে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পার্টির দৃঢ় সমর্থক হিসেবে সাঁইপরিবারের ৩ ভাইয়েরা সুপরিচিত ছিলো। ৭০ এর দশকে কংগ্রেস-বামদলের সম্মিলিত জোট ইউনাইটেড ফ্রন্টের ভাঙনের প্রাক্কালে সাঁইপরিবারের ভাইয়েরা দল-বদলের জন্য সিপিআই(এম) এর পক্ষ থেকে চাপ পেতে থাকে। কিন্তু দল-বদলের পরিবর্তে উল্টো রাজনৈতিক বাঁধা সৃষ্টি করার প্রতিশোধে ১৯৭০ সালের ১৭ই মার্চ সিপিআই(এম) সমর্থিত কিছু উন্মত্ত দলবদ্ধ লোক সাঁইপরিবারের ঘরে ঢুকে সবাইকে অন্যায়ভাবে নিপীড়ন করতে আরম্ভ করে।

ঘটনার দিন সাঁই-পরিবারের মেজো ভাই প্রণব সাঁইকে সকালের জলখাবার খাওয়ারত অবস্থাতেই পেছন থেকে আক্রমণ করে হত্যা করা হয়। সাঁই-পরিবারের ছোট ভাই মলয় সাঁই প্রাণে বাঁচার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়ে প্রতিবেশীদের ঘরে আশ্রয় নিতে চাইলে, তাকে ধরে এনে সিপিআই(এম) সমর্থিত লোকরা হত্যা করে।

ছেলেদের মারার সময় বাঁধা দিতে গেলে সাঁইভাইদের মা মৃগনয়না দেবীকেও মাথায় আঘাত করে। পরে আক্রমণকারীদের দু’জন প্রণব-মলয় ভার্তৃদ্বয়-কে হত্যার পর তাদের রক্ত দিয়ে ভাত মিশিয়ে তাদের মা মৃগনয়না দেবীকে সেই রক্তমাখা ভাত খেতে বাধ্য করে।[১]

সাঁই-পরিবারের বড়ভাই নবকুমার সাঁইও এই ঘটনা থেকে নিস্তার পান নি।পরবর্তী বছরে তাকেও একই পরিণতি বরণ করতে হয়। হত্যার পূর্বে সিপিআই(এম) ক্যাডার-রা অ্যাসিড দিয়ে চোখ ঝলসানোর পর তার চোখ উপড়ে ফেলে।[১]

সেদিনকার ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাঁইবাড়ির বড়ছেলে নবকুমার সাঁইয়ের স্ত্রী বর্তমানে ৭২ বছর বয়সী রেখারাণী দেবী ভারতের প্রথমসারির দৈনিক দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন -

আমার দেবর প্রণব আর মলয় এবং আমার মেয়েদের গৃহশিক্ষক জিতেন্দ্রনাথ রায়, যিনি সেদিন বাড়িতে পড়াতে এসেছিলেন, এই ৩ জনকে নিজ চোখের সামনেই খুন হতে দেখেছি। আমার বয়স ছিলো তখন ২৬। সকাল ৭ঃ৩০ টায় সিপিআই(এম)-এর লোকেরা আক্রমণ চালাতে শুরু করে। আক্রমণের প্রথম দিকে তারা পাথর ছুঁড়ে মারলেও, পরে পুরো বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

[৪]

তিনি আরো জানান -

প্রাণপণে চেষ্টা করছিলাম আমার শ্বাশুড়ি মৃগনয়না দেবীকে আগলে রাখতে। কিন্তু তিনি তাঁর ছেলেদের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে গেলে আক্রমণকারীরা তার মাথায় আঘাত করে বসে। পরে আক্রমণকারীদের দু’জন ভাতের সাথে তার ছেলেদের রক্ত মিশিয়ে তা খেতে বাধ্য করে। ঘটনার পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে বাঁচানো হয়।

[৪]

সাঁই-পরিবারের মেয়ে স্বর্ণলতা যশও সেদিনকার নৃশংস ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। স্বর্ণলতার একমাস বছর বয়সী ছেলে অমৃতকুমার যশের ষষ্ঠীর অনুষ্ঠানের আয়োজনের দিনই এই আক্রমণ চালানো হয়। সিপিআই(এম) এর উন্মত্ত আক্রমণকারীরা নবযাতক শিশুকেও আগুনে ছুঁড়ে দিতে চেয়েছিলো। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় নবযাতক বেঁচে যায়।

সেদিনকার সেই নবযাতক, বর্তমানে ৫১ বছর বয়সী অমৃতকুমার যশ ভারতের আরেক প্রথমসারির দৈনিক দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-কে দেওয়া ২০১১ সালের এক সাক্ষাৎকারে বলেন -

আমি সেদিনই মারা যেতে পারতাম। কিন্তু পরিবারের বাকি সদস্যদের মতো আমিও সেই একই মানসিক-ক্ষত আজও বয়ে বেড়ায়। এটি সত্যি দূর্ভাগ্যজনক যে আমরা আজও সেই একই পার্টি দ্বারা শাসিত হচ্ছি, যাদের শাসন-ক্ষমতার মূলমন্ত্রই হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ!

[১]

প্রতিক্রিয়া[সম্পাদনা]

সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম একটি ক্ষত-স্বরূপ। আজও পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের কাছে এটি বিব্রতকর একটি ঘটনা। এই ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী শোকাহতদের স্বান্তনা জানাতে বর্ধমানে ছুটে যান।[৫]

এই ঘটনার পর থেকে সাঁই-ভাইদের মা মৃগনয়না দেবী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, যা থেকে মৃত্যুর আগেও তিনি সেড়ে উঠতে পারেন নি। সাঁই-ভাইদের মৃত্যুর এক দশক পর তাদের মা পরলোক গমন করেন। যেসব কমিউনিস্ট-ক্যাডার-রা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলো, তাদের অনেকেই বামফ্রন্ট সরকারের আমলে মন্ত্রী হয়েছেন কিংবা পার্টির উঁচু পদে আসীন হয়েছিলেন। জড়িতদের কাউকেই আইনের আওয়াতায় আনা হয় নি।[৬] কমিউনিস্ট রাজনীতিবিদ বিনয়কৃষ্ণ কোনার, অনীল বসু ও পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী নিরুপম সেন এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত।[১][৭] তৃণমূল সরকার কমিশন গঠন করে এই ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে চাইলে সিপিআই(এম) এর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তৃণমূল সরকারের এই প্রচেষ্টাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে অ্যাখ্যা দেন।[৮]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Victims recall Sainbari horror by Times of India
  2. Avantika (১৭ মার্চ ২০১৯)। "Almost 50 years ago, this day, a mother was fed rice smeared with her sons' blood – Sainbari Killings"in.news.yahoo.com। Yahoo India। সংগ্রহের তারিখ ১৮ আগস্ট ২০২০ 
  3. "The Statesman"। ২০০৭-১২-২৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-০১-১০ 
  4. 46 years after Sainbai massacre by The Indian Express
  5. "Sainbari survivors despair of getting justice"। The Statesman, 5 May 2009। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৮-১০ [অকার্যকর সংযোগ]
  6. http://www.anirbanganguly.in/2015/08/12/five-massacres-that-every-indian-communist-must-be-reminded-of/
  7. https://wikieducator.org/Burdwan_Sainbari_Case
  8. https://www.thehindu.com/news/national/other-states/its-politics-of-vendetta-buddhadeb/article2351526.ece