সমসংস্থা (জীববিজ্ঞান)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
সমসংস্থার মূলনীতি: চিত্রে (রঙ দ্বারা প্রদর্শিত) মেরুদন্ডী প্রাণীদের সম্মুখবাহুর হাড়ের জীববিজ্ঞানীয় সম্পর্ক বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন তার বিবর্তন ধারণা প্রমানে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

জীববিজ্ঞানের ভাষায়, সমসংস্থা দ্বারা ভিন্ন শ্রেণীর প্রাণীর মধ্যে  পূর্বপুরুষের মাধ্যমে পাওয়া একজোড়া সমধরণার গঠন অথবা জিনগত সামঞ্জস্যকে বোঝায়। একটি সাধারণ উদাহরণ হিসেবে মেরুদন্ডী প্রানীদেয় সম্মুখবাহুর কথা তুলে ধরা যায়। বাঁদুরের ডানা, প্রাইমেট বর্গীয় দের সামনের হাত, তিমির সম্মুখ তাড়নী, কুকুর বা ঘোড়ার সম্মুখ পায়ের গঠন একই পূর্বপুরুষ  টেট্রাপড কর্তৃক বিবর্তিত রূপ। বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে সমসংস্থাকে সাধারণ পূর্বপুুুুরুষ থেকে বিভিন্ন কারণে ভিন্নভাবে গঠনগত পরিবর্তনের রূপ বলে ব্যাখ্যা করা হয়। ১৮৫৯ সালে বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন তার বিবর্তনতত্ত্ব দ্বারা সমসংস্থান ব্যাখ্যা করেন। অবশ্য এরও আগে এরিস্টটলের সময় থেকে সমসংস্থান পর্যবেক্ষিত হওয়ার প্রমান পাওয়া যায়। ১৫৫৫ সালে পিয়েরে বেলন সমসংস্থা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন।[১] সমসংস্থা বা হোমোলজি শব্দটি জীববিজ্ঞানে ১৮৪৩ সাল থেকে প্রথম ব্যবহার শুরু করেন রিচার্ড ওয়েন। 

বিকাশগত জীববিজ্ঞানে, যেসমস্ত অঙ্গ ভ্রুণ অবস্থা থেকেই উৎপত্তিগত ও আচরণগতভাবে একই ধরপণের তাদেরকে অনুক্রমীয় সমসংস্থা বলে উল্লেখ করা হয়। এক্ষেত্রে বহুপদীর পা, পতঙ্গের ম্যাক্সিলারি ও ল্যাবিয়াল পাল্প, মেরুদণ্ডী প্রাণীর মেরুদণ্ডীয় কর্ম ইত্যাদিকে উদাহরণ হিসেবে নেয়া যায়। পুরুষ ও নারীর জননাঙ্গ সমসংস্থানীয়, কেননা এই অঙ্গগুলো একই ভ্রুণীয় কলা থেকে উৎপন্ন হয়। মানুষসহ অন্যান্য স্তন্যপায়ীর ডিম্বাশয়শুক্রাশয় এইদিক থেকে সমসংস্থানীয়। প্রাণীর আচরণগত দিক দিয়ে সমসংস্থান এখনও বিতর্কিত অবশ্য প্রাইমেট বর্গীয় প্রাণীর আচরণে সমসংস্থানের প্রমান উল্লেখযোগ্য পাওয়া যায়। [২]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

পিয়েরে বেলন তার রচিতপাখিদের বইতে মানুষ ও পাখির কঙ্কালের সমসংস্থান চিহ্নিত করেছেন। (১৫৫৫)[১]

৩৫০ খ্রিস্টপূর্ব সময়ে এরিস্টটল সমসংস্থান পর্যবেক্ষণ করেন। ১৫৫৫ সালে পিএরে বেলন এ ব্যাপারে বিস্তর বর্ননা দেন। তিনি মানুষ ও পাখির হাড়ের গঠনের একটি তুলনামূলক চিত্র অঙ্কণ করে সমসংস্থানকে ব্যাখ্যা করেন। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগের প্রথম দিক অব্দি এই মিলকে প্রাণীকূল একটি মহা চেইনের অঙ্শ বলে দেখা হত। সেই সময়ে অবশ্য এই মিলকে বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার প্রবণতা ছিল না। জার্মান প্রকৃতিকদর্শন  ঐতিহ্য অনুসারে এই  সমসংস্থান মূলত প্রকৃতির মধ্যকার একতাকে তুলে ধরে। . ১৭৯০ সালে গয়েথে তার রচনায় "পুষ্পকে পত্রক থেকে আসা ভিন্নরূপ" বলে অভিহিত করেন।[১] ফ্রান্সের প্রাণীবিজ্ঞানী এতিয়েন জফ্রোয়া সাঁ-হিলের ১৮১৮ সালে  "ইউনিটি অফ কম্পোজিশন" (theorie d'analogue) তথা "গঠনের ঐক্য" দ্বারা মৎস্য, সরীসৃপ, পক্ষী ও স্তন্যপায়ীর মধ্যকার সমসংস্থান প্রদর্শন করেন। ১৮৫৯ সালে বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন সমসংস্থানীয় মিলকে একই পূর্বপুরুষ থেকে প্রাপ্ত ও বিভিন্ন প্রাণী একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থাকার যৌক্তিক প্রমান হিসেবে প্রদর্শোন করেন। [১][৩]

সংজ্ঞা[সম্পাদনা]

গুবরে পোকার সম্মুখ ডানার সাথে অন্যান্য পতঙ্গের সম্মুখ ডানার সমসংস্থানীয় মিল রয়েছে।

১৬৫৬ সালের দিকে সর্বপ্রথম হোমোলজি তথা সমসংস্থান শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। এটি গ্রীক শব্দ ὁμόλογος ,হোমোলোগোস থেকে গৃহীত হয়েছে। ὁμός , হোমোস অর্থ  "একই" এবং  λόγος, লোগোস অর্থ "সম্পর্ক".[৪][৫][ক]

জীববৈজ্ঞানিক গঠন ও সিকুয়েন্সের দিক থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর প্রাণীরা যদি সমসংস্থানীয় হয়, তারা একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে আগত। এতদ্বারা সমসংস্থান বিবর্তনের বৈচিত্র্যতাকে প্রমান করে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন পতঙ্গ (যেমনঃ ফড়িং) দুই জোড়া ডানার অধিকারী। অপরদিকে, গুবড়েপোকার প্রথম জোড়াডানা এলিট্রনে রূপান্তরিত হয়েছে।[৮] অপরদিকে মাছির দ্বিতীয় জোড়া ডানা ছোট আকৃতিতে বিবর্তিত হয়েছে, যা ভারসাম্য রক্ষায় কাজে লাগে। [খ][৯]

বিকাশগত জীববিজ্ঞানে[সম্পাদনা]

ক্রেটাকেউস সাপের (Pachyrhachis problematicus) পেছনের দিকে পা (বৃত্তাকারে চিহ্নিত) ছিল।

বিকাশগত জীববিজ্ঞান ভ্রূণীয় দশাতেই সমস্ংস্থাকে চিহ্নিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাপের কোন পা নেই কিন্তু ভ্রূণাবস্থায় সাপের পেছনের পায়ের মত অঙ্গের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করা যায়। যা ভ্রুণ বড় হওয়ার সাথে সাথে লুপ্তি পায়। এই ঘটনা থেকে এই ধারণা করা যায় যে, সাপের পূর্বপুরুষদের পেছনের পা ছিলো এবং ফসিল রেকর্ড এই ধারণাকে সমর্থন করে প্রমান দেয়। ক্রেটাকেউস সাপের (Pachyrhachis problematicus) পেছনের দিকে পা ছিল। এই পেছনের বর্তমানকালের অন্যান্য টেট্রাপডের ন্যায় কোমড়ের অস্থি (ইলিয়াম, পিউবিস, ইশ্চিয়াম), ঊড়ুর অস্থি (ফিমার), পায়ের অস্থি (টিবিয়া ও ফিবুলা) এবং পায়ের পাতার অস্থি (ক্যালকেনিয়াম, এস্ট্রাগালুস) দ্বারা সুগঠিত ছিল। [১০]

আচরণগত সমসংস্থা[সম্পাদনা]

আচরণও সমসংস্থানীয় হতে পারে একাধিক সময়ে বলা হলেও এখন অব্দি এটি বিতর্কিত রয়ে গেছে।[১] এক্ষেত্রে ডি ডব্লিউ রাজেকি এবং রান্ডাল সি ফ্লানেরির একটি গবেষণা প্রবন্ধ উল্লকেহ করা যায়। তারা প্রাইমেট বর্গীয় মানুষ ও মানুষ নয় এমন প্রাণীদের আচরণগত প্যাটার্ন দেখিয়ে প্রাইমেট বর্গীয় প্রাণীদের মধ্যকার আচরণগত সমসংস্থানীয়তার দিকে আলোকপাত করেছেন।[২]

 টীকা[সম্পাদনা]

  1. The alternative terms "homogeny" and "homogenous" were also used in the late 1800s and early 1900s. However, these terms are now archaic in biology, and the term "homogenous" is now generally found as a misspelling of the term "homogeneous" which refers to the uniformity of a mixture.[৬][৭]
  2. If the two pairs of wings are considered as interchangeable, homologous structures, this may be described as a parallel reduction in the number of wings, but otherwise the two changes are each divergent changes in one pair of wings.

তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]

  1.   |শিরোনাম= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য)|শিরোনাম= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য)
  2. Rajecki, D. W.; Flanery, Randall C. (২০১৩)। Social Conflict and Dominance in Children: a Case for a Primate HomologyAdvances in Developmental Psychology। Taylor and Francis। পৃষ্ঠা 125। আইএসবিএন 978-1-135-83123-3 উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: একাধিক নাম: লেখকগণের তালিকা (link)
  3. Brigandt, Ingo (২৩ নভেম্বর ২০১১)। "Essay: Homology"The Embryo Project Encyclopedia 
  4. Bower, Frederick Orpen (১৯০৬)। "Plant Morphology"। Congress of Arts and Science: Universal Exposition, St. Louis, 1904। Houghton, Mifflin। পৃষ্ঠা 64। 
  5. Williams, David Malcolm; Forey, Peter L. (২০০৪)। Milestones in Systematics। CRC Press। পৃষ্ঠা 198। আইএসবিএন 0-415-28032-X 
  6. "homogeneous, adj.". OED Online. March 2016. Oxford University Press. http://www.oed.com/view/Entry/88045? (accessed April 09, 2016).
  7. "homogenous, adj.". OED Online. March 2016. Oxford University Press. http://www.oed.com/view/Entry/88055? (accessed April 09, 2016).
  8. Wagner, Günter P. (২০১৪)। Homology, Genes, and Evolutionary Innovation। Princeton University Press। পৃষ্ঠা 53–54। আইএসবিএন 978-1-4008-5146-1 
  9. Lipshitz, Howard D. (২০১২)। Genes, Development and Cancer: The Life and Work of Edward B. Lewis। Springer। পৃষ্ঠা 240। আইএসবিএন 978-1-4419-8981-9 
  10. "Homologies: developmental biology"। UC Berkeley। সংগ্রহের তারিখ ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬ 

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

বহিঃসূত্র[সম্পাদনা]