সত্যেন্দ্রনাথ মৈত্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সত্যেন্দ্রনাথ মৈত্র
জন্ম১৫ আগস্ট , ১৯১৫
মৃত্যু৫ জুন, ১৯৯৬ (বয়স ৮১)
মাতৃশিক্ষায়তনপ্রেসিডেন্সি কলেজ,কলকাতা
লণ্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স
পেশাশিক্ষাব্রতী,সমাজসেবী
দাম্পত্য সঙ্গীসুনন্দা মৈত্র
পিতা-মাতাদ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্র (পিতা)
পুরস্কারনেহরু পুরস্কার
ক্রুপস্কায়া পুরস্কার (UNESCO)

সত্যেন্দ্রনাথ মৈত্র সংক্ষেপে সত্যেন মৈত্র (ইংরেজি: Satyendranath Maitra or Satyen Maitra in short) ( জন্ম : ১৫ আগস্ট, ১৯১৫ - মৃত্যু: ৫ জুন,১৯৯৬) এক বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী ও সারা ভারতে আধুনিক রীতিতে সাক্ষরতা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ । [১]

জন্ম ও শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

সত্যেন মৈত্র ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ই আগস্ট কলকাতায় জন্ম গ্রহণ করেন এক ঐতিহ্যমণ্ডিত ব্রাহ্ম পরিবারে । পিতার নাম দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্র । আদি বাসস্থান ছিল বাংলাদেশের বরিশালে । পিতামহ লোকনাথ মৈত্র ছিলেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বন্ধু । বিদ্যাসাগরের আহ্বানে লোকনাথ এক বিধবা মহিলা জগতারিণী দেবীকে বিবাহ করেন। সত্যেন মৈত্র কলকাতার ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশন হতে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ ( বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) হতে অর্থনীতিতে সাম্মানিক সহ স্নাতক হন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডন যান এবং লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সে ভর্তি হলেন, অন্য দিকে নিতে লাগলেন ব্যারিস্টারির পাঠ নিষ্ঠার সাথে। কিন্তু সেই সময় তার পিতা অসুস্থতায় শয্যাশায়ী হলেন, ফলে লন্ডনের পাঠ অসমাপ্ত রেখে তাকে দেশে ফিরে আসতে হয়।

সামাজিক ক্রিয়াকলাপ[সম্পাদনা]

দেশে ফেরার পর তার কাছে সমাজে ধন-সম্পদে লব্ধপ্রতিষ্ঠ হওয়ার অনেক সুযোগ ছিল, কিন্তু তিনি চাকরি বা অন্যভাবে বিত্তশালী হওয়ার পথে গেলেন না, বরং গান্ধীবাদী আন্দোলন বা সাম্যবাদী আন্দোলনের জন্য সম-মতাবলম্বী বন্ধুদের সহায়তায় খুললেন একটি মুদ্রণ ও প্রকাশনা সংস্থা । প্রকাশিত হতে থাকল 'আগন্তুক' নামের মাসিক পত্রিকা । সরকারি প্রকাশনা নিয়ন্ত্রণ অর্ডিন্যান্সের কোপে এটি বন্ধ হলে ত্রিপুরার 'চুন্টা প্রকাশ' এর প্রকাশনা শুরু করেন। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সুনন্দা চট্টোপাধ্যায়কে বিবাহ করেন।

সত্যেন মৈত্রর জন্মের সময়ই তার পিতা ডাঃ মৈত্র বর্ধমান মহারাজের সভাপতিত্বে গঠিত Bengal Social Service League এর সম্পাদক নিযুক্ত হন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের শিবনাথ শাস্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র রায় সহ বহুগুণীজন যুক্ত ছিলেন। এ সংস্থার মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল শ্রমজীবী নরনারী, বস্তিবাসী, দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ এবং সমাজের অবহেলিত নারীদের কল্যাণের জন্য বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা। বাল্যে ও শৈশবে পিতার এই কাজ বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। আর এরই সুবাদে তিনি কালিদাস নাগ, ডাঃ নীলরতন সরকার, ডাঃ হারাধন দত্ত, ডাঃ চুনিলাল বসু, এন্ডুজ, পিয়ারর্সন, অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, শরৎচন্দ্র, প্রশান্ত মহলানবীশ, কুমার অতুলচন্দ্র সিংহ, রাজা প্রফুল্লনাথ ঠাকুর, সত্যেন বসু প্রমুখের সান্নিধ্যে এসেছেন। তাদের স্নেহস্পর্শে বড়ো হয়েছেন।

সমাজে ও জনশিক্ষায় অবদান[সম্পাদনা]

পিতার মৃত্যুর পর ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে সত্যেন মৈত্র বয়স্কদের জন্য জনশিক্ষায় ও সমাজের অন্যান্য জনহিতকর কাজে নিজেকে আরো নিবিড় ভাবে যুক্ত করলেন। সমাজের অবহেলিত মহিলাদের জন্য 'শ্রীনন্দা' নামে শাখা প্রতিষ্ঠান গড়েন এবং নিজে শিক্ষকতা করেন। আজীবন সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে বয়স্ক শিক্ষার কাজ করে গেছেন বেঙ্গল সোশ্যাল সার্ভিস লিগের মাধ্যমে । মানুষের জীবন ও কর্মের উন্নতির জন্য তাদের সাক্ষরতা ও দক্ষতা বিকাশের কাজে নিয়োজিত করলেন নিজেকে । বয়স্ক সাক্ষরদের জন্য বত্রিশ বছর ধরে 'চলতি জগৎ'নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। সাক্ষরতা কর্মীদের জন্য 'জনশিক্ষা প্রসঙ্গে' নামক একটি পত্রিকার তিনি সম্পাদক ছিলেন । বয়স্ক সাক্ষরতার প্রয়োজনে একাধিক প্রাইমারি লিখেছেন। তার লেখা 'শিক্ষাসেবক নির্দেশিকা'এশিয়াতে স্বীকৃতিলাভ করেছে। ভিডিও ক্যাসেটের মাধ্যমে নিরক্ষরদের সাক্ষর করার জন্য তার একটি উদ্যোগ ভারতে প্রথম স্বীকৃতি লাভ করে। তার দৃষ্টিতে একটাই লক্ষ্য ছিল জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা আর মহিলাদের স্বয়ম্ভর করে তোলা । বয়স্ক শিক্ষা নিয়ে তার অভিমত ছিল - " It should be viewed as a core programme for the core people"

জনশিক্ষায় নূতন পদ্ধতির উদ্ভাবন[সম্পাদনা]

বয়স্ক ও প্রথা বর্হিভূত শিক্ষার জন্য সত্যেন মৈত্র এক নূতন শিক্ষাপদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। এটি Eclectic বা সারগ্রাহী পদ্ধতি নামে পরিচিত । এই পদ্ধতি ভারতের জাতীয় সাক্ষরতা মিশনের "সার্বিক সাক্ষরতা অভিযান" তথা Total Literacy Campaign (TLC), সাক্ষরোত্তর কর্মসূচি বা Post Literacy Programme ( PLP) এবং বর্তমানে "সাক্ষর ভারত "বা Continuing Education Programme (CEP) সারা দেশ জুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে । বয়স্ক শিক্ষার ও প্রথা বর্হিভূত শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন । ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় শিক্ষা পর্ষদের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ভারতের বয়স্ক শিক্ষা সমিতির পশ্চিমবঙ্গ শাখার সদস্য নিযুক্ত হন ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জীবৎকালের ৪৩ বৎসর সাক্ষরতায় নিয়োজিত থাকার সুবাদে ।

পুরস্কার ও সম্মাননা[সম্পাদনা]

সত্যেন মৈত্র তার কাজের জন্য বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন । ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় বয়স্ক শিক্ষা সমিতি (IAEA) "নেহেরু পুরস্কার " এ সম্মানিত করে। তার নেতৃত্বে অসামান্য কাজের জন্য Bengal Social Service League এই বছরেই ইউনেস্কোর ( UNESCO) 'ক্রুপস্কায়া পুরস্কার' লাভ করে এবং পুনরায় ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কোর 'ইরাক' আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত হন । ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে জনশিক্ষায় অসামান্য কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় শ্রী মৈত্রকে সাম্মানিক ডি.লিট. প্রদান করে। সাক্ষরতা প্রকল্পে যারা দেশে নিযুক্ত আছেন তাদের কাজে উৎসাহ প্রদানে ভারত সরকারও প্রতি বৎসর তাদের সম্মান জানায় 'সত্যেন মৈত্র জাতীয় সাক্ষরতা পুরস্কারের' প্রবর্তন করে। সত্যেন মৈত্র-র প্রয়াণের প্রথম বর্ষ পূর্তি দিবসে (৫ জুন,১৯৯৭) অধ্যাপক নির্মল দাশের সভাপতিত্বে সাক্ষরতা আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী শক্তি মণ্ডলের উদ্যোগে কলকাতায় 'সত্যেন মৈত্র জনশিক্ষা সমিতি' গঠিত হয়।[২]

পুস্তক সমূহ[সম্পাদনা]

সাক্ষরতা উপর রচিত সত্যেন মৈত্রর গুরুত্বপূর্ণ বইগুলি হল _

  • সাক্ষরতার প্রথম পাঠ
  • আমরা কেন লেখাপড়া শিখব
  • নগরবাসীর লেখাপড়া
  • শহরবাসীর পাঠ
  • মেয়েদের সাক্ষরতা
  • আমাদের পড়া
  • আমাদের পাঠ
  • আসুন শেখান
  • বয়স্ক শিক্ষার শিক্ষণ সহায়ক
  • আমাদের ভাবনা
  • আমরা ও পৃথিবী
  • রাজু কেন মত বদলানো
  • জনসমাজের ইতিকথা
  • Adult & Non-formal Education - A few observation
  • Adult & Non-formal Education - Further observation
  • Preparation & Evaluation of Learning

(Materials for the Neo-literates)

  • Why should we be literate?

মৃত্যু[সম্পাদনা]

সত্যেন মৈত্র ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ ই জুন তারিখে কলকাতায় প্রয়াত হন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, দ্বিতীয় খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, জানুয়ারি ২০১৯, পৃষ্ঠা ৪১২, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৯৫৫-২৯২-৬
  2. আদর্শ মানুষ নির্মল দাশ,জনশিক্ষা ভাবনা,এপ্রিল-জুন,২০১৬ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৯০ আইএসএসএন 2319-6610
  • ১ ) জনশিক্ষার মহান পথিকৃৎ সত্যেন মৈত্র- শক্তি মণ্ডল ও ডঃ সায়ন্তন মণ্ডল

ISBN 978-871-81-925972-2-5

  • ২ ) সংসদ বাংলা চরিতাভিধান সাহিত্য সংসদ কলকাতা
  • ৩ ) State Resource Centre for Adult Education, West Bengal.
  • ৪ ) সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত সংসদ বাংলা চরিতাভিধান (২য় খণ্ড) চতুর্থ সংস্করণ ৩য় মুদ্রণ পৃষ্ঠা ৪১১ ISBN 978-81-7955-292-6(Vol.II)