লোডস্টোন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
লোডস্টোন কিছু লোহার পেরেক আকর্ষণ করেছে
লোডস্টোন ছোট ছোট লোহা আকর্ষণ করেছে

লোডস্টোন হল একটি প্রাকৃতিক চৌম্বকীয় খনিজ ম্যাগনেটাইট[১][২] এগুলি প্রকৃতিতে প্রাপ্ত চুম্বক এবং লোহাকে আকর্ষণ করতে পারে। বস্তুর চুম্বকত্ব ধর্ম প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল প্রাচীনকালে লোডস্টোনের মাধ্যমে।[৩] ঝুলন্ত লোডস্টোনের টুকরো হল পৃথিবীর প্রথম কম্পাস,[৩][৪][৫][৬] এবং প্রারম্ভিক দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব থেকে লোডস্টোন নামটি এসেছে। মধ্য ইংরেজিতে এর অর্থ "গতিপথ প্রস্তর" বা "পরিচালক প্রস্তর"।[৭] এখন-অপ্রচলিত লোড অর্থ হল "পর্যটন, পথ"।[৮]

লোডস্টোন সেই সব খুব অল্প পরিমাণে প্রাপ্ত খনিজের মধ্যে পড়ে যেগুলি প্রাকৃতিকভাবে চুম্বক।[১] ম্যাগনেটাইট কালো বা বাদামী-কালো রঙের হয়। এর একটি ধাতব ঔজ্বল্য আছে। এর মোজ কাঠিন্য মাত্রা ৫.৫ থেকে ৬.৫। এই পাথর মাটিতে ঘষলে কালো রেখা পড়ে।

উৎস[সম্পাদনা]

কি প্রক্রিয়ায় লোডস্টোন তৈরি হল সেটি ভূতত্ত্বে দীর্ঘকাল থেকেই একটি প্রশ্ন। পৃথিবীতে কেবলমাত্র অল্প পরিমাণে ম্যাগনেটাইটই চুম্বক লোডস্টোন হিসাবে পাওয়া যায়। সাধারণ ম্যাগনেটাইটগুলি লোহা এবং ইস্পাতের মতোই চৌম্বক ক্ষেত্রে আকৃষ্ট হয়, কিন্তু নিজেই চুম্বক হয়ে উঠেনা; এটিতে খুব কম চৌম্বকীয় জড়তা (বিচুম্বকায়ন প্রতিরোধ) রয়েছে, তাই দীর্ঘদিন চৌম্বকীয় থাকতে পারেনা।[৯] লোডস্টোনগুলির আণুবীক্ষণিক পরীক্ষায় দেখা গেছে সেগুলি ম্যাগনেটাইট (Fe3O4) দিয়ে তৈরি, এর সাথে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ম্যাগেমাইট (ঘনকাকৃতির Fe2O3), প্রায়ই এর সাথে টাইটানিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজের মত ধাতুর অপদ্রব্য আয়ন মিশ্রিত থাকে।[৯][১০][১১] অসমসত্ত্ব মিশ্রণের স্ফটিক কাঠামোর এই ধরণের ম্যাগনেটাইটের যথেষ্ট পরিমান চৌম্বকীয় জড়তা থাকে, যার ফলে এটি চৌম্বকীয় থাকতে পারে এবং এইগুলি স্থায়ী চুম্বক হয়।[৯][১০][১১]


অন্য প্রশ্নটি হল লোডস্টোনগুলি কীভাবে চুম্বকত্ব পায়। পৃথিবীর দুর্বল ০.৫ গাউস ভূচৌম্বকত্ব দিয়ে লোডস্টোনকে চুম্বকে পরিণত করা যায়না।[৯][১০] শীর্ষস্থানীয় তত্ত্বটি হল বজ্রপাতের ঝলকের চারপাশের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা লোডস্টোনগুলি চৌম্বকীয় হয়।[৯][১০][১১] পর্যবেক্ষণ থেকে এই মত সমর্থিত হয়েছে, কারণ, এগুলি বেশিরভাগই পৃথিবীর পৃষ্ঠে পাওয়া যায়, গভীরে প্রোথিত অবস্থায় পাওয়া যায়না।[১০]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

লোডস্টোনের চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রাচীনতম উল্লেখগুলির মধ্যে একটি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রীক দার্শনিক মিলিটাসের থেলিসের করা।[১২] প্রাচীন গ্রিকরা তাঁকে লোডস্টোনের লোহা এবং অন্যান্য লডস্টোনগুলিকে আকর্ষণ করার আবিষ্কারের জন্য কৃতিত্ব দেয়।[১৩] চুম্বক বা ম্যাগনেট নামটি আনাতুলিয়ার ম্যাগনেসিয়াতে পাওয়া লোডস্টোন থেকে আসতে পারে।[১৪]

চৌম্বকবাদের প্রথমতম চীনা সাহিত্যের উল্লেখ খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর বুক অফ দ্য ডেভিল ভ্যালি মাস্টার য়ে (গিগুজি) পাওয়া যায়।[১৫]

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর লুশি চুনকিউ ঘটনাপঞ্জিতে, এটি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে "লোডস্টোন লোহাকে টানে বা লোহাকে আকর্ষণ করে।"[১৬][১৭] ২০ থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লিখিত একটি রচনা লুনহেংয়ে (ভারসাম্যের অনুসন্ধান) সর্বপ্রথম সূঁচের আকর্ষণের উল্লেখটি প্রকাশিত হয়: "লোডস্টোন একটি সূঁচকে আকর্ষণ করে।"[১৮] খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে, চীনা ভবিষ্যদ্বক্তারা লোডস্টনের চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার করার জন্য "দক্ষিণ-নির্দেশক চামচ" তৈরি করছিল। সেটি একটি মসৃণ ব্রোঞ্জের থালায় স্থাপন করা হলে, চামচটি প্রতিবারই উত্তর-দক্ষিণ অক্ষে ঘুরে যাচ্ছিল।[১৯][২০][২১] এটি কাজ করেছে দেখানো হলেও, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা কিন্তু এখনও হান সমাধিতে ম্যাগনেটাইট দিয়ে তৈরি একটি আসল চামচ আবিষ্কার করতে পারেনি।[২২]


উত্তর আমেরিকার একটি ওলমেক শিল্পকলা (একটি খাঁজকাটা চৌম্বক দণ্ড) আবিষ্কারের ভিত্তিতে, জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন কার্লসন ধারণা করেছেন যে চীনা আবিষ্কারের এক হাজার বছরেরও বেশি আগে ওলমেকরা লোডস্টোন ব্যবহার করেছিল।[২৩] কার্লসন অনুমান করেন যে ওলমেকরা জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বা ভবিষ্যদ্বাণীর উদ্দেশ্যে অনুরূপ নিদর্শনগুলিকে একটি নির্দেশক যন্ত্র হিসাবে তাদের মন্দিরগুলিকে বিশেষদিকে মুখ করে স্থাপনা করতে বা জীবিতদের আবাস ঠিক করতে বা মৃতদের সমাধিস্থল নির্ণয় করতে ব্যবহার করেছিল।[২৩] ওলমেক নিদর্শনটির বিশদ বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে "দণ্ড"টি হেমাটাইট দিয়ে তৈরি হয়েছিল এবং তার সাথে টাইটানিয়ামের পাতলা স্তর (Fe2–xTixO3) ছিল যা নিদর্শনটির ব্যতিক্রমী অবশেষ চুম্বকত্বের জন্য দায়ী।[২৪]

"এক শতাব্দী গবেষণার পর ইউরোপের চৌম্বকীয় কাঁটার প্রথম উল্লেখ প্রায় ১১৯০ সালের দিকে আলেকজান্ডার নেকামের থেকে পাওয়া গিয়েছিল, এর পরেই ১২০৫ সালের দিকে গায় দ্য প্রোভিনস এবং ১২৬৯ দালের দিকে জ্যাক দ্য ভিট্রি এর উল্লেখ করেছিলেন। অন্যান্য সমস্ত ইউরোপীয় দাবি বিশদ গবেষণার পর বাদ দেওয়া হয়েছে...."[২৫]


লোডস্টোনগুলি প্রায়ই মূল্যবান বা মর্যাদাপূর্ণ বস্তু হিসাবে প্রদর্শিত হয়েছে। অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান যাদুঘরে স্বর্ণমণ্ডিত শিরোভূষণ শোভিত একটি লোডস্টোন রয়েছে, যেটি ১৭৫৬ সালে মেরি ক্যাভেনডিশ দান করেছিলেন। সম্ভবত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসাবে তাঁর স্বামীর নিয়োগটি সুরক্ষিত করার জন্য তিনি এটি করেছিলেন।[২৬]আইজাক নিউটনের নামাঙ্কিত আংটিটিতে একটি লোডস্টোন ছিল যেটি নিজের ওজনের চেয়ে ২০০ গুণ বেশি ওজন তুলতে সক্ষম ছিল।[২৭] ১৭শ শতকের লন্ডনে, রয়েল সোসাইটি একটি ছয় ইঞ্চি গোলকাকার লোডস্টোন (একটি টেরেলা বা 'ক্ষুদ্র পৃথিবী') প্রদর্শন করেছিল, যা পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র এবং নাবিকদের কম্পাসগুলির কার্যকারিতা চিত্রিত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল।[২৮] একজন সমসাময়িক লেখক, ব্যঙ্গ- রচয়িতা নেড ওয়ার্ড, উল্লেখ্য করেছিলেন টেরেলা কিভাবে "কাগজের ওপর ইস্পাতের কাঁটাগুলিকে একজনের পেছনে অন্যকে তুলে নিয়েছিল, তাদের দেখে শজারুর খাড়া হওয়া শলাকার মতো লাগছিল; কাঁটার দলটিকে এমন জীবন ও আনন্দ দিয়েছিল, যে তারা নৃত্য করছিল [...] যেন তাদের মধ্যে শয়তান রয়েছে। "[২৯]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Hurlbut, Cornelius Searle; W. Edwin Sharp; Edward Salisbury Dana (১৯৯৮)। Dana's minerals and how to study themবিনামূল্যে নিবন্ধন প্রয়োজন। John Wiley and Sons। পৃষ্ঠা 96আইএসবিএন 0-471-15677-9 
  2. Bowles, J. F. W.; R. A. Howie; D. J. Vaughan; J. Zussman (২০১১)। Rock-forming Minerals: Non-silicates: oxides, hydroxides and sulphides, Volume 5A, 2nd Ed.। UK: Geological Society of London। পৃষ্ঠা 403। আইএসবিএন 186239315X 
  3. Du Trémolet de Lacheisserie, Étienne; Damien Gignoux; Michel Schlenker (২০০৫)। Magnetism: Fundamentals। Springer। পৃষ্ঠা 3–6। আইএসবিএন 0-387-22967-1 
  4. Dill, J. Gregory (জানু–ফেব্রু ২০০৩)। "Lodestone and Needle: The rise of the magnetic compass"Ocean Navigator online। Navigator Publishing। সংগ্রহের তারিখ ২০১১-১০-০১ 
  5. Merrill, Ronald T.; Michael W. McElhinny; Phillip L. McFadden (১৯৯৮)। The Magnetic Field of the Earth। Academic Press। পৃষ্ঠা 3। আইএসবিএন 0-12-491246-X 
  6. Needham, Joseph; Colin A. Ronan (১৯৮৬)। The Shorter Science and Civilization in China। UK: Cambridge Univ. Press। পৃষ্ঠা 6, 18। আইএসবিএন 0-521-31560-3 
  7. "Lodestone"Merriam-Webster online dictionary। Merriam-Webster, Inc.। ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৬-১২ 
  8. টেমপ্লেট:OED: 'Literally 'way-stone', from the use of the magnet in guiding mariners.'
  9. Livingston, James D. (১৯৯৬)। Driving Force: The Natural Magic of Magnets। Harvard University Press। পৃষ্ঠা 14–20। আইএসবিএন 0674216458 
  10. Wasilewski, Peter; Günther Kletetschka (১৯৯৯)। "Lodestone: Nature's only permanent magnet - What it is and how it gets charged"। Geophysical Research Letters26 (15): 2275–78। ডিওআই:10.1029/1999GL900496বিবকোড:1999GeoRL..26.2275W 
  11. Warner, Terence E. (২০১২)। Synthesis, Properties and Mineralogy of Important Inorganic Materials। John Wiley and Sons। পৃষ্ঠা 114–115। আইএসবিএন 0470976020 
  12. Brand, Mike; Sharon Neaves; Emily Smith (১৯৯৫)। "Lodestone"Museum of Electricity and Magnetism, Mag Lab U। US National High Magnetic Field Laboratory। ২০০৯-০৫-০১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৬-২১ 
  13. Keithley, Joseph F. (১৯৯৯)। The Story of Electrical and Magnetic Measurements: From 500 B.C. to the 1940s। John Wiley and Sons। পৃষ্ঠা 2। আইএসবিএন 0-7803-1193-0 
  14. The Greek term μαγνῆτις λίθος magnētis lithos (see Platonis Opera, Meyer and Zeller, 1839, p. 989) means "Magnesian stone". It is uncertain whether the adjective μαγνῆτις "of Magnesia" should be taken to refer to the city Magnesia ad Sipylum in Lydia (modern-day Manisa, Turkey) or after the Greek region of Magnesia itself (whence came the colonist who founded the Lydian city); see, for example, "Magnet"Language Hat blog। ২৮ মে ২০০৫। সংগ্রহের তারিখ ২২ মার্চ ২০১৩  See also: Paul Hewitt, Conceptual Physics. 10th ed. (2006), p. 458.
  15. The section "Fanying 2" (反應第二) of The Guiguzi: "其察言也,不失若磁石之取鍼,舌之取燔骨".
  16. Dillon, Michael (২০১৭)। Encyclopedia of Chinese History। Routledge। পৃষ্ঠা 98। আইএসবিএন 978-0415426992 
  17. Li, Shu-hua (১৯৫৪)। "Origine de la Boussole II. Aimant et Boussole"। Isis (ফরাসি ভাষায়)। 45 (2): 175–196। জেস্টোর 227361ডিওআই:10.1086/348315un passage dans le Liu-che-tch'ouen-ts'ieou [...]: “La pierre d'aimant fait venir le fer ou elle l'attire.” 
    From the section "Jingtong" (精通) of the "Almanac of the Last Autumn Month" (季秋紀): "慈石召鐵,或引之也]"
  18. In the section "A Last Word on Dragons" (亂龍篇 Luanlong) of the Lunheng: "Amber takes up straws, and a load-stone attracts needles" (頓牟掇芥,磁石引針).
  19. Tom, K. S. (১৯৮৯)। Echoes from Old China: Life, Legends, and Lore of the Middle Kingdom। University of Hawaii Press। পৃষ্ঠা 108। 
  20. Qian, Gonglin (২০০০)। Chinese Fans: Artistry and Aesthetics। Long River Press। পৃষ্ঠা 98। আইএসবিএন 978-1592650200 
  21. Curtis Wright, David (২০০১)। The History of China: (The Greenwood Histories of the Modern Nations)। Greenwood Publishing Group। পৃষ্ঠা 42। 
  22. Joseph Needham, Clerks and Craftsmen in China and the West: Lectures and Addresses on the History of Science and Technology. Cambridge: University Press, 1970, p. 241.
  23. Carlson, J. B. (১৯৭৫)। "Lodestone Compass: Chinese or Olmec Primacy?: Multidisciplinary analysis of an Olmec hematite artifact from San Lorenzo, Veracruz, Mexico"। Science189 (4205): 753–760। আইএসএসএন 0036-8075ডিওআই:10.1126/science.189.4205.753পিএমআইডি 17777565বিবকোড:1975Sci...189..753C 
  24. Evans, B. J., Magnetism and Archaeology: Magnetic Oxides in the First American Civilization, p. 1097, Elsevier, Physica B+C 86-88 (1977), S. 1091-1099
  25. Needham, Clerks and Craftsmen, p. 240.
  26. Kell, Patricia (১৯৯৬)। "Inv. 47759 - Sphaera article" 
  27. Thompson, Sylvanus (১৮৯১)। The Electromagnet, and Electromagnetic Mechanism (PDF)। London: E. & F. N. Spon। পৃষ্ঠা 128। 
  28. "A terella"The Royal Society Picture Library 
  29. Fara, Patricia (১৯৯৬)। Sympathetic Attractions: Magnetic Practices, Beliefs, and Symbolism in Eighteenth-Century England। Princeton University। পৃষ্ঠা 23। আইএসবিএন 9780691634913 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]