রিকশা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

রিকশা বা রিক্সা বা সাইকেল রিকশা একপ্রকার মানবচালিত মনুষ্যবাহী ত্রিচক্রযান, যা এশিয়ার, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে প্রচলিত একটি ঐহিহ্যবাহী বাহন। যদিও দেশভেদে এর গঠন ও আকারে বিভিন্ন পার্থক্য দেখা যায়। জাপানী রিকশাগুলো অবশ্য তিনচাকার ছিল না, সেগুলো দুই চাকায় ভর করে চলতো, আর একজন মানুষ ঠেলাগাড়ির মতো করে টেনে নিয়ে যেতেন, এধরণের রিকশাকে 'হাতেটানা রিকশা'ও বলা হয়। সাধারণত 'রিকশা' বলতে এজাতীয় হাতেটানা রিকশাকেই বোঝানো হয়ে থাকে। সম্প্রতিককালে (২০১১) সাইকেল রিকশায় বৈদ্যুতিক মোটর সংযোজন করার মাধ্যমে যন্ত্রচালিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এজাতীয় রিকশার প্রচলন দেখা যায়।

শব্দগত ব্যুৎপত্তি[সম্পাদনা]

বাংলা 'রিকশা' শব্দটি এসেছে জাপানী[১] 'জিন্‌রিকিশা' (人力車, জিন্ = মানুষ, রিকি = শক্তি, শা = বাহন) শব্দটি থেকে, যার আভিধানিক অর্থ হলো 'মনুষ্যবাহিত বাহন'।

বিস্তৃতি[সম্পাদনা]

রিকশা তার উৎপত্তিক্ষেত্র জাপান থেকে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। তবুও রিকশার বিস্তৃতি মূলত এশীয় ও পূর্ব-এশীয় দেশগুলোতে বেশি লক্ষ করা যায়।

জাপান[সম্পাদনা]

ভারত[সম্পাদনা]

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারতেও রিকশা দেখতে পাওয়া যায়। কলকাতা শহরে হাতেটানা রিকশা এখনও দেখা যায়। ২০০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই ধরণের পরিবহণ ব্যবস্থাকে "অমানবিক" আখ্যা দিয়ে হাতেটানা রিকশা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব আনে।[২] এই সংক্রান্ত 'ক্যালকাটা হ্যাকনি ক্যারেজ বিল'টি ২০০৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাস হলেও অদ্যাবধি কার্যকর করা হয়নি।[৩] হ্যান্ড-পুলড রিকশা ওনার অ্যাসোসিয়েশন এই বিলের বিরুদ্ধে একটি পিটিশন দাখিল করলে বিলের কতকগুলি দিকের দ্ব্যর্থতা প্রকট হয়ে পড়ে। বর্তমানে সরকার বিলটি সংশোধন করছেন।[৩]

১৯২০-এর দশকে সুদূর পূর্বের আদলে ভারতেও 'সাইকেল রিকশা' প্রবর্তিত হয়।[৪] এগুলি আকারে ট্রাইসাইকেলের তুলনায় বড়। পিছনে উঁচু সিটে দুজন আরোহীর বসার জায়গা থাকে এবং সামনের প্যাডেলে একজন বসে রিকশা টানে। ২০০০-এর দশকে কোনো কোনো শহরে যানজট সৃষ্টির জন্য সাইকেল রিকশা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।[৫][৬][৭] যদিও দূষণহীন যান হিসেবে সাইকেল রিকশা রেখে দেওয়ার পক্ষেই মত প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা।[৪][৮]

বাংলাদেশ[সম্পাদনা]

সুইডেনে প্রদর্শিত বাংলাদেশের রিকশা

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে রিকশা একটি বহুল ব্যবহৃত পুরোন যানবাহন। এদেশের আনাচে কানাচে রয়েছে রিকশা। দেশটির রাজধানী ঢাকা বিশ্বের রিকশা রাজধানী নামেও পরিচিত বলা যায়। এই শহরে রোজ প্রায় ৪,০০,০০০টি সাইকেল রিকশা চলাচল করে।[৯] শহরটিতে রিকশা একদিকে যেমন পুরোন বাহন, তেমনি এই রিকশার কারণে সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড যানজট। বাংলাদেশে রিকশার ঐতিহ্য থাকলেও তাই বড় বড় সড়কগুলোতে রিকশা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। তবে কলকাতা থেকে আমদানিকৃত ভিন্ন ধরনের সাইকেল রিকশা বাংলাদেশে ১৯৩০ (মতান্তরে ১৯৩১) সাল থেকে প্রথম চলতে শুরু করে।[১০]

রিকশাচিত্র[সম্পাদনা]

রিকশাচিত্র, চিত্রকলার আলাদা একটি মাত্রা বলা যায়। যেকোনো চিত্রই রিকশার পিছনে আঁকলেই তা রিকশাচিত্র হলেও, মূলত রিকশাচিত্র বলতে উজ্জ্বল রঙে আঁকা কিছু চিত্রকে বোঝায়, যা খুব সাবলিল ভঙিতে বিষয়বস্তুকে উপস্থাপন করতে সক্ষম। সাধারণত ভারত এবং বাংলাদেশের রিকশার পিছনে, হুডে এবং ছোট ছোট অনুষঙ্গে এই বিশেষ চিত্রকলা লক্ষ করা যায়। বিশেষজ্ঞগণ এধরণের চিত্রকলাকে ফোক আর্ট, পপ আর্ট কিংবা ক্র্যাফট সব দিক দিয়েই আলোচনা করতে পছন্দ করেন। তাঁদের মতে, যেকোনো বস্তুরই 'ফর্ম' আর 'ডেকোরেশন' নামে দুটি দিক থাকলেও রিকশাচিত্র কেবলই একপ্রকার 'ডেকোরেশন', এর ব্যবহারিক কোনো দিক নেই। চিত্রকরদের মতে, রিকশাচিত্রের টান বা আঁচড়গুলো খুবই সাবলিল, প্রাণবন্ত এবং স্পষ্ট, এবং টানগুলো হয় ছোট ছোট ও নিখুঁত। অথচ এই বিশেষ চিত্রকলার জন্য নেই কোনো আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, একেবারে দেশজ কুটিরশিল্পের মতই শিল্পীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে শিখে থাকেন এই চিত্রশিল্প এবং নিজের কল্পনা থেকেই এঁকে থাকেন এসব চিত্র।[১১] যদিও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর লোকজন রিকশাচিত্রের মর্যাদা সম্পর্কে অতোটা ওয়াকিবহাল নন এবং কিছুটা হেয় করেই দেখে থাকেন[১২]

বাংলাদেশে রিকশাচিত্র ১৯৫০-এর দশক থেকে প্রচলিত, এবং রিকশার প্রায় সম্ভাব্য সবগুলো অংশই চিত্রিত করার একটা প্রয়াস লক্ষ করা যেত। জ্যামিতিক নকশার পাশাপাশি ফুল, পাখি এমনকি জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের ছবি আঁকারও প্রচলন ছিল। কখনও রিকশাচিত্রে রিকশাওয়ালার ধর্মীয় বিশ্বাস প্রতিফলিত হতো, আবার কখনও হয়তো নিছক কোনো বক্তব্য কিংবা সামাজিক কোনো বিষয় দেখা যেত।[১২] তবে আধুনিক জগতে বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি সহজলভ্য হওয়ায় হাতে আঁকা সেসব চিত্রকর্ম এখন আর সচরাচর দেখা যায় না, বরং বিভিন্ন জায়গা থেকে ছবি কম্পিউটারে কাটছাট করে সাজিয়ে টিনের ধাতব প্লেটে সেগুলো ছাপ দিয়ে খুব সহজেই তৈরি করা হয় এখনকার রিকশাচিত্রগুলো, সেখানে থাকেনা দেশজ কোনো ঐতিহ্য, থাকেনা কোনো চিত্রকলার মোটিফ, বরং থাকে চলচ্চিত্রের পোস্টার কিংবা নায়ক-নায়িকার ছবি।

ভারতে হায়েদ্রাবাদী পথচিত্রই একসময় রিকশাচিত্রে রূপলাভ করেছিল। এখন সেখানেও আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রভাবে হাতে আঁকা রিকশাচিত্র অতীত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

গবেষণা ও গবেষক[সম্পাদনা]

রিকশা নিয়ে খুব যে বেশি গবেষণা হয়েছে এমনটি নয়, গুটিকতক গবেষক নিজ নিজ ক্ষেত্রে রিকশা নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে গবেষণা করেছেন। বাংলাদেশে রিকশা নিয়ে গবেষণা করেছেন এরকম উল্লেখযোগ্য একজন হলেন প্রকৌশলী বোরহান। তিনি স্বীয় প্রচেষ্টায় রিকশার জন্য সুবিধাজনক বিভিন্ন সরঞ্জামাদির উদ্ভাবন করেছেন। তাঁর উদ্ভাবিত সামগ্রির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: শক অ্যাবজর্বিং বাম্পার, যা পেছন থেকে পাওয়া ধাক্কাকে হজম করে যাত্রীকে রাখে নিরাপদ; হুইল ক্যাপ, যা পাশাপাশি চলাচলরত দুটো রিকশাকে রাখে নিরাপদ এবং নিকটবর্তি পথচারীদের রাখে আঘাতমুক্ত। এছাড়া ভিআইপি রাস্তায় রিকশার চলাচল আটকাতে তাঁর উদ্ভাবিত রিকশা ফাঁদ ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ডের মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এরকম একটি ফাঁদ রয়েছে বাংলামোটর মোড়ে। এই রিকশা ফাঁদগুলো সাধারণত লোহার পাইপ ৩৫ ডিগ্রি বাঁকা করে বসানো আয়তাকার বস্তু, যা পাকা রাস্তার মধ্যে বসানো থাকে, উপর দিয়ে অন্যান্য সকল যান চলাচল করতে পারলেও রিকশা এই ফাঁদের উপর দিয়ে চলাচল করতে গেলে আটকা পড়ে।[১৩]

জনপ্রিয় মাধ্যমে উপস্থাপনা[সম্পাদনা]

রিকশার জনপ্রিয়তা কিংবা ঐতিহ্য তুলে ধরা হয় বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে আয়োজিত বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১-এর বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, যেখানে বাংলাদেশের রিকশায় করে মাঠে উপস্থিত হন অংশগ্রহণকারী দলগুলোর দলপতিরা। পাশাপাশি বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্যোগে বিশ্বকাপে আগত অতিথিদের বরণে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে রাস্তার পাশে ৭টি রিকশা পাশাপাশি বসিয়ে পিছনে WELCOME-এর প্রতিটি হরফ আলাদা আলাদাভাবে লিখে স্বাগত জানানো হয়। এছাড়া ঐবছর বিশ্বকাপকে উপলক্ষ করে সিএনএনগো ওয়েবসাইট প্রকাশ করে ঢাকার দশটি বিষয়ের বর্ণনামূলক প্রতিবেদন, যে দশটি বিষয় দিয়ে চেনা যাবে ঢাকাকে, যার তৃতীয়টিই ছিল রিকশাচিত্র। সেখানে তুলে ধরা হয় রিকশাচিত্রের ব্যবসা ঢাকায় খুব জমজমাট। ঢাকায় রিকশার সংখ্যা অনেক এবং প্রায় প্রতিটি রিকশার পেছনেই রিকশাচিত্র রয়েছে। রিকশাচিত্রগুলোয় স্থানীয় চলচ্চিত্র তারকা, মসজিদ, দেব-দেবী কিংবা প্রকৃতি-পরিবেশের চিত্র রয়েছে।[১৪]

রিকশাচিত্র নিয়ে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে রিকশার বাইরেও কাজ করা হয়েছে। যেমনঃ বিভিন্ন ফ্যাশন অনুষঙ্গে: জুতায়, পোষাকে, দেয়ালচিত্রে, গামছায়, ঘর সাজানোর উপাদানে, ঘরোয়া আসবাবে, কিংবা সৌখিন শোপিসে রিকশাচিত্রের প্রয়োগ করা হয়েছে বিভিন্ন সময়। বাংলাদেশে ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল কাঠের চুড়ি, ব্যাগ, ঝুড়ি, ফতুয়া ইত্যাদিতে রিকশাচিত্রের মোটিফ কাজে লাগিয়েছেন। চিত্রকলায় বাংলাদেশের নাজলী লায়লা মনসুর-সহ বিভিন্ন চিত্রকরগণ এই রিকশাচিত্রের আদলে ছবি এঁকেছেন।[১১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "রিকশা" ভুক্তি, বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। নভেম্বর ১৯৯২ সংস্করণ। পরিদর্শনের তারিখ: ৬ জুলাই ২০১১।
  2. "Hand-pulled rickshaws to go off Kolkata roads"Online edition of The Indian Express, dated 2005-08-15। সংগৃহীত 2009-04-23 
  3. ৩.০ ৩.১ "Rule review for rickshaw ban"Online edition of The Telegraph, dated 2008-10-31। সংগৃহীত 2009-04-23 
  4. ৪.০ ৪.১ Anil K. Rajvanshi। "Electric and improved cycle rickshaw as a sustainable transport system for India"Current Science, Vol. 83, No. 6, 25 September 2002। সংগৃহীত 2009-06-18 
  5. "Rickshaw ban from today"Online edition of The Times of India, dated 2007-06-09। সংগৃহীত 2009-06-18 
  6. "Ban on slow vehicles in select areas likely"Online edition of The Telegraph, dated 2006-09-29। সংগৃহীত 2009-06-18 
  7. "Ban on fish-carts extended"Online edition of The Hindu, dated 2002-10-15। সংগৃহীত 2009-06-18 
  8. "Cycle rickshaws: Victims of car mania"Centre for Science and Environment। সংগৃহীত 2009-06-18 
  9. Lawson, Alastair (2002-10-05)। "Dhaka's beleaguered rickshaw wallahs"। BBC News। সংগৃহীত 2009-09-19 
  10. "Wheel Tax"। ঢাকা সিটি করপোরেশন। সংগৃহীত ২০১২-০২-০২ 
  11. ১১.০ ১১.১ [archive.prothom-alo.com/detail/news/140386 জীবনযাত্রায় রিকশা], রুহিনা তাসকিন, নকশা, দৈনিক প্রথম আলো, ঢাকা থেকে প্রকাশিত; ২২ মার্চ ২০১১; পরিদর্শনের তারিখ: ৬ জুলাই ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।
  12. ১২.০ ১২.১ Marshall Cavendish Corporation (2007)। World and Its Peoples: Eastern and Southern Asia। Marshall Cavendish। পৃ: 479। আইএসবিএন 0761476318। সংগৃহীত March 6, 2010 
  13. প্রকৌশলী বোরহানের উদ্ভাবন: রিকশা চলবে অনিয়মের বালাই ছাড়া, বাংলাদেশের সেরা বিজ্ঞানী, হিটলার এ. হালিম; পৃষ্ঠা ৭২; শিকড়, ঢাকা বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০০৪; সংগ্রহের তারিখ: ৩০ ডিসেম্বর ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।
  14. উপসম্পাদকীয়: ঢাকার দশ, একরামুল হক শামীম, দৈনিক সমকাল। পরিদর্শনের তারিখ: ৬ জুলাই ২০১১।

বাড়তি পঠন[সম্পাদনা]

  • কনটেম্পরারি আর্ট এ্যান্ড আর্টিস্টস : বাংলাদেশ এ্যান্ড বিয়ন্ড, নজরুল ইসলাম; বাংলাদেশ থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত।

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

রিকশাচিত্র[সম্পাদনা]