বিষয়বস্তুতে চলুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা বলতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কিত ছবিসমূহকে বোঝায়। ঠাকুর তার সাহিত্যকর্ম এবং গানের জন্যই খ্যাতিমান ; চিত্রশিল্পী হিসাবে তার পরিচয়টি গৌণ। কিন্তু তার আঁকা ছবির ভাণ্ডার বিশাল যদিও তা একজন সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী একজন মহৎ কবির শেষ বয়সের ক্রীড়া হিসেবে সৃষ্টিকর্মের সীমানার বাইরে পড়ে থাকে। তার আঁকা ছবির সংখ্যা আড়াই হাজরের বেশি। তার চিত্রকলার প্রধান বৈশিষ্ট্য তার বর্ণিত স্বকীয় পদ্ধতি। এ পদ্ধতি অদ্ভুত, অস্বাভাবিক ; ফলে এক্ষেত্রে তার অনুসারী কেউ নেই। তার ছবি ভারতীয় ঐতিহ্যগত চিত্রকলার কোন কাঠামোতেই শ্রেণিবিন্যাস করা যায় না।

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

শিল্পকলা ঠাকুরকে আশৈশব খুব টানতো। তাকে আকৃষ্ট করেছিল রেখা ও রঙের সমবায়ে যে ছবি নির্মিত হয় তার মধ্যে প্রাণ ও বাণী সঞ্চারণের ব্যাপারটি । কিন্তু তিনি জীবনের প্রথমভাগে মেনে নিয়েছিলেন যে ছবি আঁকার ব্যাপারটি তার আদৌ নয়। শৈশবেই পেন্সিল বা তুলির আঁচড়ে বা¯বের প্রতিমূর্তি ফুটিয়ে তোলার যে সহজাত ক্ষমতার স্ফূরণ অনেককে চিত্রাংকণে উৎসাহী করে তোলে তা-ও তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না।

খেলার ছলেই তিনি আঁকতে শুরু করেছিলেন, তারপর একসময় তা নেশা হয়ে দাঁড়ায়। কার্যত তা কার্যত রেখা ও রং থেকে ছবি ফুটিয়ে তোলার স্বীয় শক্তির দৈনিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। চিত্রকলায় ঠাকুরের কোন প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। আঁকতে আঁকতে এক ধরনের দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। আর ছবির সংখ্যা যখন আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যায় তখন তা’ আর নিছক খেলা থাকে না, তাকে চিত্রসাধনা ব’লেই স্বীকার ক’রে নিতে হয়।

ঠাকুর ছবির নামাকরণের বিরোধী ছিলেন, কেননা তিনি বা¯বের প্রতিচ্ছবি রূপায়ণের লক্ষ্য নিয়ে ছবি আঁকেন নি। তার মতে : ছবি প্রকৃতপক্ষে তাই ছবিটি দেখে যা মনে হয়। কার্যত: কী আঁকবেন স্থির না ক’রেই তিনি কলম-কাগজ নিয়ে বসেছেন। আর এই ভাবেই এক সময় কাগজে ছবির আভাস ফুটে উঠেছে।

ছবির বিষয়-আশয়

[সম্পাদনা]

ঠাকুরের ছবিগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত: মুখমণ্ডল বা মুখাবয়বের ছবি ; দ্বিতীয়ত:অদ্ভুত কাল্পনিক প্রাণীর ছবি এবং তৃতীয়ত: প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি। এর বাইরেও ছবি আছে। কিন্তু অধিকাংশ ছবি এর যে কোন একটি ভাগে পড়ে যায়। ঠাকুরের আঁকা অতিপ্রতিকৃতি ছবিও একাধিক ; এমন-কী ন্যুডও তিনি এঁকেছেন। ছবির বিষয় নির্বাচন প্রসঙ্গে আরো বলা যেতে পারে যে, মুখাবয়ব বা মুখমণ্ডল আঁকার প্রতি তার বিশেষ পক্ষপাত ছিল।

অঙ্কন শৈলী

[সম্পাদনা]

কী আঁকবেন স্থির না ক’রেই ঠাকুর কলম-কাগজ নিয়ে আঁকতে বসতেন। শুরু করতেন কলমের টানে –রেখার পর রেখা, বিন্দুর পর বিন্দু, তুলিতে ছোপের পরে ছোপ দিয়ে গেছেন একের পর এক। প্রথমে একটি আকৃতির আভাস ফুটে উঠেছে, কলমের পরের খোঁচায় ভিন্ন আরেকটি আকৃতি পরিস্ফুট হয়েছে। আর এ ভাবেই এক-একটি অস্তিত্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এ রকম একটি অনিশ্চিত পদ্ধতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই পরিচিত আদলের পরিবর্তে অচেনা অবয়ব ফুঠে উঠেছে, চেনা মুখ ফুটে উঠেছে অদ্ভুত আকৃতি নিয়ে, আর তাকেই ঠাকুর সাদরে গ্রহণ করেছেন। কেবল রেখাকে ঘুরিয়ে-বাঁকিয়ে তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চারের এই প্রচেষ্টা আর কারো মধ্যে দেখা যায় না।

তিনি এঁকেছেন অদ্ভুতভাবে ; তাঁর কাগজের মাপ ঠিক ছিল না ; ঠিক ছিল না রংয়ের। ভালো মানের সামগ্রী না-হওয়ায় বেশ কিছু ছবি অপুনরাদ্ধরণীয়ভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। কখনো কলম, কখনো পেন্সিল, কখনো তুলি এমন-কী ওভারকোটের হাতায় রং মাখিয়ে পর্যন্ত এঁকেছেন। মহৎ ছবি সৃষ্টির চেয়ে অংকনটি আদৌ ছবি হয়েছে কি-না তাই নিয়ে তিনি সদা ভাবিতে ছিলেন। ছবিটা ছবি হলো কি-না সেটাই দেখতে বলেছিলেন ঠাকুর।

রেখা ও বিন্দুপুঞ্জের এই যে সুপ্ত শক্তি তা’ ঠাকুরের বোধে গভীরভাবে ধরা পড়েছিল ;– আর সে কারণেই তিনি রেখাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অস্তিত্বের প্রতিরূপ গড়েছেন। রংয়ের ছোঁয়ায় তাকে করেছেন বৈচিত্র্যময়। রেখার প্রতি এই যে অভিনিবেশ তার প্রমাণ পাওয়া যায় তুলির পরিবর্তে কলমের ব্যবহারে তার প্রবণতার মধ্যে।

বিশ্লেষণ

[সম্পাদনা]

নিজের আঁকা ছবি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন সময়ে নানা মন্তব্য করেছেন। ‘ঐগুলি কেবল রেখাই নয়, ঐগুলি তার থেকেও কিছু বেশি, আমার চিত্রাঙ্কিত স্বপ্ন এক কাব্যিক কল্পনার দর্শন। আমার চিত্র রেখার ছন্দে আবদ্ধ কবিতা।’ [১] আরো বলেছেন, আমি বিশ্ব সংসারকে কল্পনা করতে পারি রেখার জগৎ সংসার হিসেবে যেগুলো তাদেরকে মূর্ত প্রবাহের অন্তহীন শৃঙ্খলে পর্বতশ্রেণী ও মেঘমালা, বৃক্ষরাজি, ঝর্ণাধারা, অগ্নিগর্ভ জ্যোতিষ্কমণ্ডল, নিরন্তর জীবনস্রোত; নিশ্চুপ মহাকাল নিরবধি মহাশূন্য পেরিয়ে ভঙ্গিমারাজির মহাসংগীত মিলিত হয়ে যায় রেখাপুঞ্জের আর্তনাদে; যেন তারা আকস্মিক ইচ্ছাপূরণের আকাঙ্ক্ষায় সংগীহীনা বেদেনীর লক্ষ্যহীন ঘুরে বেড়ানো।’[২]

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

[সম্পাদনা]

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে প্যারিস শহরের পিগ্যাল আর্ট গ্যালারীতে তাঁর প্রথম শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এ ব্যাপারে সবচেয়ে উদ্যোগী ভূমিকা যিনি নিয়েছিলেন তিনি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। এর পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঠাকুরের ছবির প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রদশর্নী সমসাময়িক চিত্র সমালোকদের আকৃষ্ট করেছে। ইয়োরোপীয় চিত্রামোদীরা ঠাকুরের ছবিতে ভারতীয় নয় বরং আধুনিক ইয়োরোপিয় অঙ্কনরীতির সাযুজ্য পরিলক্ষ করে বিস্মিত হয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রভাবনা

[সম্পাদনা]

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা বিষয়ে গ্রন্থাবলী

[সম্পাদনা]
  • রঙের রবীন্দ্রনাথ, সুশোভন অধিকারী ও কেতকী কুশারী ডাইসন, ১৯৯৮, করকাতা।
  • টেগোর্স পেন্টিংস- ভার্সিফিকেশন ইন লাইন, শোভন সোম (ভূমিকা: পবিত্র সরকার), প্রকাশতঃ নিয়োগী বুকস, মূল্যঃ১২৫০.০০।
  • রবীন্দ্র-চিত্রকলা—ভূমিকা: আবুল হাসনাত, প্রকাশকঃ ছায়ানট , প্রকাশকালঃ জানুয়ারি ২০১১, মূল্য: ৩৫০ টাকা। — এটি কবি রবীন্দ্রনাথের ৪৪টি ছবির অ্যালবাম।

গ্রন্থসূত্র

[সম্পাদনা]
  • ফয়জুল লতিফ চৌধুরীঃ ‘রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম − রং ও রেখার কাব্য’, শিল্পতরু (সম্পাদকঃআবিদ আাজদ), ১৯৮৭, কাঁঠাল বাগান, ঢাকা।

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা

[সম্পাদনা]
  1. আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্নিবন্ধ[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  2. দৈনিক প্রথম আলো, এপ্রিল ০১, ২০১১

বহি:সংযোগ

[সম্পাদনা]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]