ম্যামথ
| ম্যামথ সময়গত পরিসীমা: পরবর্তী মায়োসিন থেকে পরবর্তী হলোসিন, ৬.২–০.০০৪কোটি | |
|---|---|
| কলম্বিয়ান ম্যামথ (M. columbi) | |
| বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস | |
| জগৎ/রাজ্য: | অ্যানিম্যালিয়া (Animalia) |
| পর্ব: | কর্ডাটা (Chordata) |
| শ্রেণি: | ম্যামালিয়া (Mammalia) |
| বর্গ: | Proboscidea |
| পরিবার: | হাতি (Elephantidae) |
| উপপরিবার: | Elephantinae |
| গোত্র: | Elephantini |
| গণ: | †Mammuthus ব্রুকস, ১৮২৮ |
| আদর্শ প্রজাতি | |
| †Elephas primigenius (=Mammuthus primigenius)[১][২] ব্লুমেনবাখ, ১৭৯৯ | |
| প্রজাতি | |
| প্রতিশব্দ | |
| |
ম্যামথ (ইংরেজি: mammoth) বলতে হাতি পরিবারের বিলুপ্ত Mammuthus গণের যে কোনো প্রজাতিকে বোঝায়। সাধারণত ম্যামথেরা লম্বা, বাঁকানো শুঁড়বিশিষ্ট, এবং উত্তর গোলার্ধের প্রজাতিগুলো লম্বা লোমবিশিষ্ট হয়ে থাকত।
ম্যামথ আফ্রিকান হাতির তুলনায় এশীয় হাতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। প্রায় ৬০ লাখ বছর আগে মায়োসিনের শেষে বর্তমান দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকায় ম্যামথের প্রাচীনতম প্রজাতি Mammuthus subplanifrons আবির্ভূত হয়।[৩] পরে প্রায় ৩০ লাখ বছর আগে প্লায়োসিনে ম্যামথ ইউরেশিয়ায় ছড়িয়া পড়ে, ফলে সে ভূখণ্ডটির বেশিরভাগ অংশ দখল করে। প্রায় ১৫-১৩ লাখ বছর আগে ম্যামথ উত্তর আমেরিকায় পাড়ি দেয় ও কলম্বিয়ান ম্যামথের (M. columbi) জন্ম দেয়। প্রায় ৭-৪ লাখ বছর আগে সাইবেরিয়ায় লোমশ ম্যামথ (M. primigenius) আবির্ভূত হয়, যা মিশর ও মেসোপটেমিয়ার মতো প্রাচীন সভ্যতার সময়ও টিঁকে ছিল। তবে প্রায় ৪,০০০ বছর আগে উত্তর মহাসাগরের র্যাঙ্গেল দ্বীপে লোমশ ম্যামথ বিলুপ্ত হয়।
ব্যুৎপত্তি ও আবিষ্কার
[সম্পাদনা]দি আমেরিকান হেরিটেজ ডিকশনারি অনুসারে ইংরেজি "ম্যামথ" (mammoth) শব্দটি সম্ভবত পশ্চিম সাইবেরিয়ার মানসি ভাষার *mān-oŋt শব্দ থেকে এসেছে। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ "ভূ-শৃঙ্গ", যা ম্যামথের গজদন্ত দুটিকে চিহ্নিত করে।[৪] সাইবেরিয়ার আদিবাসী লোকগাথায় ম্যামথ পাওয়া যায়, আর ম্যামথের অবশেষের বৃহদাকার আদিবাসীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এভেঙ্ক জনগোষ্ঠীর লোকপুরাণে ম্যামথ বিশ্বসৃষ্টির জন্য দায়বদ্ধ, আর সে তার গজদন্ত দুটি দিয়ে সমুদ্রগর্ভ থেকে স্থলভাগ খুঁড়ে বার করে। সেলকুপ জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস যে ম্যামথ ভূগর্ভে বসবাস করে ও পাতালকে রক্ষা করে। অন্যদিকে, নেনেত ও মানসি জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস যে ম্যামথ পর্বত ও হ্রদ সৃষ্টির জন্য দায়বদ্ধ। আবার, ইয়াকুত জনগোষ্ঠী ম্যামথকে "জল-আত্মা" বলে বিবেচনা করে।[৫]
সপ্তাদশ শতাব্দীর শুরুতে সাইবেরিয়া থেকে আবিষ্কৃত গজদন্তকে বোঝানোর জন্য ইউরোপে "ম্যামথ" শব্দ প্রথম ব্যবহৃত হয়।[৬] ১৭২৫ সালে ভাসিলি তাতিশ্চেভ ম্যামথের উপর প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।[৫]
১৭২৫ সালে উত্তর আমেরিকার ব্রিটিশ উপনিবেশে আফ্রিকান কৃতদাসরা দক্ষিণ ক্যারোলাইনার স্টোনো নদীর নিকট খোদাই করে একাধিক পেষণ দাঁত বার করেছিল, যা বর্তমানে কলম্বিয়ান ম্যামথের পেষণ দাঁত বলে বিবেচিত। পরে ব্রিটিশ প্রকৃতিবিজ্ঞানী মার্ক কেটসবি ওখানে গিয়ে দাঁতগুলো নিরীক্ষা করেন, আর ১৭৪৩ সালে তার ভ্রমণ-বৃত্তান্ত প্রকাশ করেন। কেটসবির বর্ণনা অনুসারে, কৃতদাসদের মালিকরা দাঁতগুলো দেখে হতভম্ব হয়েছিল আর ভেবেছিল যে এটা বাইবেলের মহাপ্লাবন থেকে উদ্ভূত, কিন্তু কৃতদাসরা সর্বসম্মত যে ওগুলো আফ্রিকান হাতির মতোই একপ্রকার হাতির পেষণ দাঁত। এটা প্রথমবার উত্তর আমেরিকার কোনো প্রাণীর জীবাশ্ম চিহ্নিত করা হয়েছে।[৭][৮]
১৭৯৬ সালে ফরাসি জীববিজ্ঞানী জর্জ কুভিয়ে প্রথম এক পৃথক প্রজাতি হিসাবে লোমশ ম্যামথের অবশেষ চিহ্নিত করেন। তিনি দাবি করেন যে প্রজাতিটি বিলুপ্ত আর এর কোনো জীবিত অস্তিত্ব নেই, যা তখন অনেকেই বিশ্বাস করত না।[৯][১০] কুভিয়ের চিহ্নিতকরণের পর ১৭৯৯ সালে জার্মান প্রকৃতিবিজ্ঞানী ইয়োহান ফ্রিডরিখ ব্লুমেনবাখ লোমশ ম্যামথের বৈজ্ঞানিক নাম Elephas primigenius দেন। তখন আফ্রিকান হাতি, এশীয় হাতি ও আমেরিকান ম্যাস্টোডন এই তিন প্রজাতিকে এলিফাস (Elephas) গণের অন্তর্গত করা হতো। কয়েক মাস পর কুভিয়ে এর বৈজ্ঞানিক নাম Elephas mammonteus দেন। কিন্তু প্রজাতির Elephas primigenius নামটাই বহুল ব্যবহৃত হয়, এমনকি কুভিয়ে নিজেও এর ব্যবহার করেছেন।[১১] ১৮২৮ সালে ব্রিটিশ শারীরবিদ জোশুয়া ব্রুকস তার জাদুঘরের সংগ্রহ সমীক্ষা করে Mammuthus নামক এক নতুন গণের সৃষ্টি করেন।[১২]
বিবর্তন
[সম্পাদনা]প্রায় ৫.৫ কোটি বছর আগে আফ্রো-আরব ভূখণ্ডে প্রবোসিডিয়া বর্গের প্রাণীর আবির্ভাব হয়। প্রায় ১০ লাখ বছর আগে আফ্রিকায় প্রাচীনতম হাতির আবির্ভাব হয়, যার মধ্যে আফ্রিকান হাতি, এশীয় হাতি, ম্যামথ ও সোজা দাঁতওয়ালা হাতি উল্লেখযোগ্য। ম্যাস্টোডন ম্যামথের দূরসম্পর্কীয়, আর এটি পৃথক মামুটিডি পরিবারের অন্তর্গত। ম্যামথের আবির্ভাবের ২.৫ কোটি বছর আগে ম্যাস্টোডন আবির্ভূত হয়।[১৩]
১৯৯৭ সালে লোমশ ম্যামথের মাইটোকন্ড্রিয়াল বংশাণুসমগ্রের অনুক্রম প্রকাশিত হওয়ার পর জানা যায় যে ম্যামথ আফ্রিকান হাতির তুলনায় এশীয় হাতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত।[১৪][১৫]
নিচের ক্ল্যাডোগ্রামটি ম্যামথ গণের অবস্থান দেখাচ্ছে:[১৬]
| ||||||||||||||||||||||||||||||||||
বিস্তার
[সম্পাদনা]এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকায় পাওয়া যেত।
আকার
[সম্পাদনা]এটি আকারে হাতির চেয়ে বড় ছিল। এর দাঁত ছিল বিশাল।
বিলুপ্তি
[সম্পাদনা]ম্যামথ হল প্রাচীন সময়ের একধরনের হোলস্টাইন জাতীয় জন্তু। এই জাতীয় জন্তু একসময় এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বৃহত্তর অংশে বিস্তার পাওয়া যেত। কিন্তু এর বিলুপ্তি ঘটেছে প্রায় ১২০০০ বছরের কিছু সময় আগে।
ম্যামথের বিলুপ্তির কারণ এখনও নিশ্চিত নয়, তবে সম্ভবত এর বিলুপ্তির মূল কারণ হল পরিবেশের পরিবর্তন। একটি সাধারণ ধারণা হল ম্যামথ বিলুপ্তির পেছনের মূল কারণ পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট তাপমাত্রার পরিবর্তন। পৃথিবীর তাপমাত্রা ও পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারায় এরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। আরও একটি সম্ভব কারণ হল ম্যামথের মাংস। আদি মানুষেরা খাবারের জন্য ম্যামথ শিকার করে এদের বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে ।
গবেষকদের একটি দল মনে করেন, বরফযুগের শেষে বিশাল তৃণভূমি ক্রমশ বনে ঢেকে যেতে থাকলে এরা খাদ্যাভাবে বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এমন বিচ্ছিন্নতা তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, পৃথিবীর তাপমাত্রা তখন ক্রমশ বাড়ছিল। সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে ও বিশাল বিশাল তৃণভূমি বনে পরিণত হয়ে যাওয়ায় তাদের খাবারের অভাব ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছিল। ম্যামথরা যেহেতু ছিল বরফযুগের প্রাণী, তাই সে সময়ের হিমশীতল পরিবেশে গায়ে লোম ও চর্বির আধিক্য থাকায় তারা খুব সহজেই মানিয়ে নিয়েছিল নিজেদের। কিন্তু বরফযুগের অবসান হওয়ায় ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে তাদের অবসানও নিশ্চিত হয়ে যায়। তারা পরিবর্তিত তাপমাত্রায় টিকে থাকতে পারেনি। পর্যাপ্ত খাবার কিংবা সুপেয় পানির অভাব, সেই সাথে ক্রমাগত শিকার হয়তো তাদের বিলুপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
এই বিশালাকার প্রাণীর বিলুপ্তির পেছনে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আরো কিছু সম্ভাবনার কথা বলা যেতে পারে। যেমন, হঠাৎই নতুন কোনো রোগজীবাণুর আক্রমণ, মহামারি বা বড় কোনো দুর্যোগে তারা প্রাণ হারিয়েছে। এমনও হতে পারে, ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা অনেক কমে যাওয়ায় জিনবৈচিত্র্য হ্রাস পেয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে তারা। কিন্তু, এসবই শুধু অনুমান। বাস্তবে কোনোটারই পক্ষে তেমন কোনো প্রমাণ নেই। [১৭]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Garutt, W.E.; Gentry, Anthea; Lister, A.M. (১৯৯০)। "Case 2726: Mammuthus Brookes 1828 (Mammalia Proboscidea) proposed conservation and Elephas primigenius Blumenbach, 1799 (currently Mammuthus primigenius) proposed designation as the type species of Mammuthus, and designation of a neotype"। Bulletin of Zoological Nomenclature। ৪৭ (1): ৩৮–৪৪। ডিওআই:10.5962/bhl.part.2651।
- ↑ "Opinion 1661: Mammuthus Brookes, 1828 (Mammalia, Proboscidea): conserved, and Elephas primigenius Blumenbach, 1799 designated as the type species"। Bulletin of Zoological Nomenclature। ৪৮ (3): ২৭৯–২৮০। ১৯৯১।
- ↑ Sanders, William J. (৭ জুলাই ২০২৩)। Evolution and Fossil Record of African Proboscidea (1 সংস্করণ)। Boca Raton: CRC Press। পৃ. ১৫৫, ২০৮–২১২। ডিওআই:10.1201/b20016। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৩১৫-১১৮৯১-৮। এস২সিআইডি 259625811।
- ↑ “mammoth”, in The American Heritage Dictionary of the English Language, 5th edition, Boston, Mass.: Houghton Mifflin Harcourt, 2016, →ISBN.
- 1 2 Serikov, Iu.B.; Serikova, A.Iu. (এপ্রিল ২০০৫)। "The Mammoth in the Myths, Ethnography, and Archeology of Northern Eurasia"। Anthropology & Archeology of Eurasia (ইংরেজি ভাষায়)। ৪৩ (4): ৮–১৮। ডিওআই:10.1080/10611959.2005.11029015। আইএসএসএন 1061-1959।
- ↑ Lister, A.; Bahn, P. (২০০৭)। Mammoths – Giants of the Ice Age (3rd সংস্করণ)। London: Frances Lincoln। পৃ. ৪৯। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২০-২৬১৬০-০।
- ↑ Elliott, Christian (২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)। "The First Fossil Finders in North America Were Enslaved and Indigenous People"। Smithsonian Magazine (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৪ অক্টোবর ২০২৪।
- ↑ Simpson, George Gaylord (১৯৪২)। "The Beginnings of Vertebrate Paleontology in North America"। Proceedings of the American Philosophical Society। ৮৬ (1): ১৩৪। আইএসএসএন 0003-049X। জেস্টোর 985085।
- ↑ Switek, B. (২০১০)। Written in Stone: Evolution, the Fossil Record, and Our Place in Nature। Bellevue Literary Press। পৃ. ১৭৪–১৮০। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৯৩৪১৩৭-২৯-১।
- ↑ Cuvier, G. (১৭৯৬)। "Mémoire sur les épèces d'elephans tant vivantes que fossils, lu à la séance publique de l'Institut National le 15 germinal, an IV"। Magasin Encyclopédique, 2e Anée (ফরাসি ভাষায়): ৪৪০–৪৪৫।
- ↑ Reich, M.; Gehler, A.; Mohl, D.; van der Plicht, H.; Lister, A. M. (২০০৭)। "The rediscovery of type material of Mammuthus primigenius (Mammalia: Proboscidea)"। International Mammoth Conference IV (Poster): ২৯৫।
- ↑ BROOKES, J., 1828. A catalogue of the anatomical and zoological museum of Jeshua Brookes, Esq., F.R.S. etc. Part 1. R.Taylor, London. 76 pp.
- ↑ Lister, A.; Bahn, P. (২০০৭)। Mammoths – Giants of the Ice Age (3rd সংস্করণ)। London: Frances Lincoln। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২০-২৬১৬০-০।
- ↑ Ozawa, Tomowo; Hayashi, Seiji; Mikhelson, Victor M. (এপ্রিল ১৯৯৭)। "Phylogenetic Position of Mammoth and Steller's Sea Cow Within Tethytheria Demonstrated by Mitochondrial DNA Sequences"। Journal of Molecular Evolution (ইংরেজি ভাষায়)। ৪৪ (4): ৪০৬–৪১৩। বিবকোড:1997JMolE..44..406O। ডিওআই:10.1007/PL00006160। আইএসএসএন 0022-2844। পিএমআইডি 9089080।
- ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;:52নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ দৃষ্টি আকর্ষণ: এই টেমপ্লেটি ({{cite doi}}) অবচিত। doi দ্বারা চিহ্নিত প্রকাশনা উদ্ধৃত করার জন্য:10.1016/j.quaint.2004.04.011 , এর পরিবর্তে দয়া করে
|doi=10.1016/j.quaint.2004.04.011সহ {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}} ব্যবহার করুন। - ↑ "ম্যামথ'রা বিলুপ্ত হল কি করে? – DW – 31.03.2010"। dw.com। সংগ্রহের তারিখ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩।
গ্যালারি
[সম্পাদনা]

