মুজাফফরাবাদ গণহত্যা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মুজাফফরাবাদ গণহত্যা
মুজাফফরাবাদ গণহত্যা বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
মুজাফফরাবাদ গণহত্যা
স্থানপটিয়া উপজেলা, চট্টগ্রাম জেলা, পূর্ব পাকিস্তান
তারিখ৩ মে ১৯৭১ (UTC+6:00)
লক্ষ্যবাঙ্গালী হিন্দু
হামলার ধরনগণহত্যা, হত্যাকাণ্ড
ব্যবহৃত অস্ত্ররাইফেল
নিহত৩০০ এর অধিক[১]
হামলাকারী দলপাকিস্তান সেনাবাহিনী, রাজাকার

মুজাফফরাবাদ গণহত্যা ১৯৭১ সালের ৩ মে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী স্থানীয় সহযোগীদের সহায়তায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার খারনা ইউনিয়নের অধীনে মুজফফারাবাদের মূলত হিন্দু গ্রামের বাসিন্দাদের উপরে সংগঠিত হয়। [২][৩][৪] আনুমানিক ৩০০ বাঙালি হিন্দু[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] হত্যার শিকার হয়। এই গণহত্যায় ৫ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বয়সী নারী-পুরুষ নিহত হয়েছিল। ৫ শতাধিক ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, খারনা ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান রমিজ আহমেদ চৌধুরী এবং তার সহযোগীরা এই গণহত্যার জন্য দায়ী ছিলেন। [৫]

পটভূমি[সম্পাদনা]

মুজাফফারাবাদ গ্রামটি চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার দক্ষিণ পূর্ব সীমান্তে, খারনা ইউনিয়নে অধীন অবস্থিত। ১৯৭১ সালে পটিয়া থানার অধীনে মুজফফারাবাদ অন্যতম প্রধান হিন্দু গ্রাম ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুজাফফরাবাদের ৯৫% ভোটার আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। [৫] ২৫ শে মার্চ সেনাবাহিনী দমন শুরু হলে চট্টগ্রামের বহু লোক মোজাফফারাবাদে তাদের আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। [৬] ১ এপ্রিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী পটিয়ায় বোমা মেরে এবং পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিণাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেয়। তারা দোহাজারী ও পটিয়ায় শিবির স্থাপন করে। পটিয়ায় পাকিস্তানি দখলদার সেনা প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে শিবির স্থাপন করেছিল। নিরস্ত্র গ্রামবাসীদের গ্রেপ্তার এবং শিবিরে তাদের জ্বালিয়ে দিত। পিটিআই মাঠের নিচে অনেককে মেরে কবর দেওয়া হয়েছিল। [৭]

এপ্রিলের শেষের দিকে, খারনা এবং এলাহাবাদ গ্রাম থেকে রাজাকাররা হিন্দু গ্রামে নির্যাতন ও লুটপাটের জন্য টার্গেট করেছিল। তাদের গ্রামে ঘন ঘন দেখা যেতে শুরু করার সাথে সাথে বয়োজ্যৈষ্ঠ সবাই একটি গ্রাম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। গ্রামের সীমান্তে বিশ টি শিবির স্থাপন করা হয়েছিল, প্রত্যেকের জন্য চৌকোশ বিশ পুরুষ ছিল। কোনও আক্রমণ হলে শিবিরের পুরুষরা আতঙ্ক তৈরি করে যাতে অন্যান্য শিবিরের পুরুষরা একত্র হয়ে আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করে। শিবিরগুলির সর্বাত্মক নজরদারির জন্য গ্রামবাসী রাজাকারদের আক্রমণকে অনেকবার ব্যর্থ করতে পেরেছিল। ব্যর্থ হয়ে, রাজাকাররা দোহাজারী শিবিরে পাকিস্তানী দখলদার সেনাদেরকে মুজাফফারাবাদ আক্রমণ করার জন্য রাজি করায়।

ঘটনাবলী[সম্পাদনা]

৩ মে, ভোর ৫ টা ২০ মিনিটের দিকে মুজাফফারাবাদের লোকেরা যখন ঘুমিয়ে ছিল, তখন পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী এবং রাজাকাররা তিন দিক থেকে গ্রামটিকে ঘিরে ফেলে। সকালে হালকা বৃষ্টি হয়। [৫] সকাল ৭ টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সামরিক ট্রাকে করে গ্রামে প্রবেশ করে। সকাল আটটার দিকে তারা ঘরে ঘরে গিয়ে গ্রামবাসীদের হত্যা শুরু করে।

সত্তর বছর বয়সী রজনী সেন সে সময় দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য রামায়ণ পাঠ করছিলেন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং রাজাকাররা সে জায়গায় উপস্থিত হলে, তিনি তাদের অতিথি হিসাবে বসেন। রাজাকারদের একজন সেনকে জয় বাংলা বলতে বললেন। তিনি জয় বাংলা উচ্চারণ করার সাথে সাথেই একজন পাকিস্তানী সৈনিক তার রাইফেলের পিপা রজনী সেনের গলায় ঢুকিয়ে গুলি করে হত্যা করে। [৫] গীতা থেকে আবৃত্তি করছিলেন ৭৫ বছর বয়সী নবীন সাধু, একইভাবে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। আক্রমণকারীরা গ্রামের পুরোহিতকে ঘিরে ফেলে এবং তাদের পূজা করার মূর্তিগুলো ভাঙতে বাধ্য করে। এরপরে পুরোহিতদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

সমাজ সেবক নির্মল সেনকে তার বাবা উপেন্দ্রলাল সেনের সাথে কাছের ধান ক্ষেতে টেনে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের গামছা দিয়ে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়। গ্রামের পুকুরে মাছ ধরতে শুরু করা মোজাফফারাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রায়মোহানকে তার ছেলের সাথে মাছের জালে বেঁধে এবং পরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

যে গ্রামবাসীরা আত্মগোপনে ছিল, যখন পাকিস্তানী দখলদার সেনা হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছিল তখন রাজাকারদের একেকটি দলে ভাগ করে দেয়া হয়। তারা হিন্দু বা মুসলমান কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য গ্রামবাসীদের কালেমা তেলাওয়াত করতে বলে। যখন তারা ব্যর্থ হয়েছিল, তাদের জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল। [৫]

ভবিষ্যৎ ফল[সম্পাদনা]

দুপুর ২ টা অবধি এই হত্যাকাণ্ড চলছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পরে স্থানীয় রাজাকাররা বাকী বাড়িগুলি লুট করে। ৩ মে গণহত্যার পরেও লক্ষ্যবস্তু হত্যা অব্যাহত ছিল। ৭ই বা ৮ই মে, নাটুন চন্দ্র চৌধুরীকে এলাহাবাদ থেকে কয়েকজন রাজাকার নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। এর কিছুদিন পর মুজাফফরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বারেন রায় চৌধুরীকে হত্যা করা হয়। তিনি তার অসুস্থ মায়ের ওষুধ কিনতে জোয়ারা মুনসিরহাটে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে মোহাম্মদপুরের নিকটে রাজাকাররা তাকে হত্যা করে।

স্মারক[সম্পাদনা]

প্রতি বছর মুজফফারাবাদের লোকেরা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ৩মে উদযাপন করে। শহীদদের স্মরণে সারা দিন বক্তৃতা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে একটি নতুন স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। গণ সমাধিস্থল সংরক্ষণের জন্য কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। [৫]

নিহত ব্যক্তিদের তালিকা[সম্পাদনা]

  • রায়মোহন বিশ্বাস (৫০)
  • প্রাণহরি বিশ্বাস (৫২)
  • রাজবিহারী বিশ্বাস (৪৪)
  • সুরবালা চৌধুরী (৫৫)
  • দুলাল চৌধুরী
  • নির্মল সেন (৪৫)
  • উপেন্দ্র সেন (৭০)
  • নিরঞ্জন বিশ্বাস (৪৫)
  • নাটুন চন্দ্র ঘোষ (৬০)
  • রোহিনী দত্ত (৪৫)
  • অনিল চক্রবর্তী
  • রজনী সেন (৫৫)
  • নবীন সাধু (৭৫)
  • ধীরেন্দ্র দত্ত (৬০)
  • শঙ্কর প্রসাদ সেন (৫০)
  • উপেন্দ্র কর (৪৫)
  • মহেন্দ্র চৌধুরী (৬৫)
  • যতীন্দ্র দাস (৪০)
  • সুরেন্দ্র সেন
  • দীপক সেন
  • নিকুঞ্জ দাশ
  • অশ্বিনী দাস
  • বনমালী দাস
  • উপেন্দ্রলাল চৌধুরী

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "মুক্তিযুদ্ধে পটিয়া" [Patiya during the Liberation War]। চট্টগ্রাম জেলা তথ্য বাতায়ন। Government of Bangladesh। নভেম্বর ৩০, ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ৭, ২০১২ 
  2. "আজ মুজাফফরাবাদ গণহত্যা দিবস"Samakal। মে ৩, ২০১২। ডিসেম্বর ৩১, ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ মে ১২, ২০১২ 
  3. "মুজাফফরাবাদ গণহত্যা দিবস বৃহস্পতিবার"Kaler Kantho। মে ১, ২০১২। সংগ্রহের তারিখ মে ১২, ২০১২ 
  4. Haque, Muhammad Shamsul (মে ৩, ২০১০)। "মুজাফফরাবাদ হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি"Prothom Alo। জুন ২৯, ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ জুলাই ৭, ২০১২ 
  5. Rashid Siddique, Haroon ur (মে ১০, ২০১২)। "৩ মে পটিয়া মুজাফরাবাদ গণহত্যা দিবস: সেদিনের বিভীষিকার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে অনেকে"Dainik Purbokone। সংগ্রহের তারিখ জুন ১২, ২০১২ 
  6. "মুজাফফরাবাদ গণহত্যা দিবস উপলক্ষে সভা"Prothom Alo। জানুয়ারি ৩, ২০১২। জানুয়ারি ৩১, ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ মে ১২, ২০১২ 
  7. Rubel, Abdur Rahman (মার্চ ১৫, ২০১২)। "পটিয়ায় একাত্তরের গণহত্যা: বধ্যভূমির কোনো চিহ্ন নেই"Dainik Purbokone। ডিসেম্বর ৪, ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ জুন ১২, ২০১২