মালির ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মালি আফ্রিকাতে অবস্থিত। আধুনিক মালির অধিকৃত অঞ্চলগুলির ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে, ইতিহাসকে কয়েকটি পর্যায়েভাগ করা যেতে পারে:

  • প্রাক-ইম্পেরিয়াল মালি, ত্রয়োদশ শতকের আগে
  • মালি সাম্রাজ্যের এবং সোনাহাই সাম্রাজ্যের ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতকের মালি
  • ফরাসী উপনিবেশ ফরাসী সুদানের অংশ হিসেবে ১৯৬০ অবধি মালি
  • স্বাধীনতোত্তর মালি

মালির সীমানা হ'ল ফরাসী সুদানের, ১৮৯১ সালে আঁকা মানচিত্র অনুযায়ী নির্ধারিত। এটি একটি মনুষ্যসৃষ্ট এবং কৃত্রিম সীমানা ফলস্বরূপ এটি সাহারার কিছু অংশ এবং বৃহত্তর সুদান অঞ্চল নিয়ে গঠিত। তাই মালি একটি বহুজাতিক দেশ, যদিও মান্ডে জাতির লোকজন এখানে সংখ্যাগুরু। পশ্চিম আফ্রিকা এবং মাগরেবকে সংযুক্ত করে ট্রান্স-সাহারান বাণিজ্যে মালির ভূমিকার মালির ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট অংশ। মালির শহর টিম্বুক্টু এই বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রাচীন কাল থেকেই গড়ে উঠেছিল। শহরটি সাহারার দক্ষিণ প্রান্তে এবং নাইজার নদীর নিকটে অবস্থিত, এটি ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে মালি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে ট্রান্স-সাহারান বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।


মালি সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

উনিশ শতক অবধি, মুসলিম বিশ্বের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে এবং আরব দাস ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে টিম্বক্টু গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

মালি সাম্রাজ্যটি সুন্দিয়া কেইতা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এর শাসকদের ধন্দৌলতের সুবাদে, বিশেষত প্রথম মানসা মূসার জন্য সুপরিচিত হয়ে ওঠে। মালি সাম্রাজ্যের পশ্চিম আফ্রিকায় অনেক গভীর সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল, যার ফলে নাইজার নদীর তীরে এর ভাষা, আইন এবং রীতিনীতি ছড়িয়ে পড়ে। । এটি একটি বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং অসংখ্য ভাসাল রাজ্য এবং প্রদেশগুলি সমন্বিত ছিল।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে মালি সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করে, তবে তখনও এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রভাব ধরে রেখেছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে টিকে থাকলেও ততদিনে সাম্রাজ্য তার পূর্ব শক্তি এবং গুরুত্ব অনেকটাই হারিয়ে ফেলে।

সোংহাই সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

মালি সাম্রাজ্য চতুর্দশ শতকের শেষ সময়ে দুর্বল হতে শুরু করে। সোনহাই সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিল এবং তাদের স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন শুরু করে। সোনহাইরা গাওকে তাদের রাজধানী বানিয়েছিল এবং পশ্চিম সাহেল জুড়ে তাদের নিজস্ব সাম্রাজ্যিক প্রসার শুরু করেছিল। ১৪২০ সালে, সোনহাই সাম্রাজ্য এতটাই শক্তিশালী হয়ে যায় যে তারা মাসিনা থেকে কর আদায় করতে শুরু করে। উদীয়মান সোনাহাই সাম্রাজ্য এবং পতনশীল মালি সাম্রাজ্য পরবর্তী চতুর্দশ এবং পঞ্চদশ শতকের বেশিরভাগ সময় পাশাপাশি মালি শাসন করেছে। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষদিকে, টিম্বকটুর নিয়ন্ত্রণ সোনাহাই সাম্রাজ্যের হাতে চলে যায়।

সাম্রাজ্যের পরে (১৫৯১–১৮৯২)[সম্পাদনা]

শেষ পর্যন্ত মরোক্কান সাদি রাজবংশের চাপে সোনহাই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ১৩ই মার্চ ১৫৯১ সালের টনডিবির যুদ্ধে সোনহাই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। পরবর্তীকালে মরোক্কো সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ অবধি গাও, টিম্বকটু, জেনেনি (জেনি হিসাবেও দেখা যায়) এবং সম্পর্কিত বাণিজ্য পথগুলি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।

সোনহাই সাম্রাজ্যের পতনের পরে, অঞ্চলটি কোনও একক রাষ্ট্রদ্বারা পরিচালিত হয়নি। মরোক্কানরা কেবলমাত্র দেশের কয়েকটি অংশ দখল করতে সক্ষম হয়েছিল এবং এমনকি যে জায়গাগুলিতে তারা শাসন করার চেষ্টা করেছিল, তাদের হোল্ড দুর্বল ছিল এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা চ্যালেঞ্জ ছিল। বেশ কয়েকটি ছোট্ট উত্তরসূরি রাজত্ব উঠেছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল:

বাম্বারা সাম্রাজ্য বা সেগৌয়ের রাজত্ব[সম্পাদনা]

১৭১২ থেকে ১৮৬১ সাল পর্যন্ত বামবারা সাম্রাজ্য একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল; সাম্রাজ্যের মূলকেন্দ্র ছিল সেগৌ, এছাড়া টিম্বকটু ছাড়া মধ্য ও দক্ষিণ মালি অংশগুলি বাম্বারা সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। টুচলির বিজয়ী এল হাডজ উমর টাল সমগ্র পশ্চিম আফ্রিকা জুড়ে অভিযান চালানো অবধি এই সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল । উমার টালের মুজাহিদীনরা সহজেই ১৮৬১ সালের ১৮ই মার্চ সেগৌকে দখল করে বাম্বারা সাম্রাজ্যের অবসান ঘটান।

কর্তা রাজ্য[সম্পাদনা]

সেগৌতে কুলিবালি রাজবংশের বিভক্তির ফলে ১৭৫৩ সালে দ্বিতীয় বাম্বারা রাজ্য, বা কর্তার রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা পশ্চিম মালি শাসন করত। ১৮৫৪ সালে উমার টাল এই সাম্রাজ্য দখল করে নেন।

মাসিনা[সম্পাদনা]

মূলত ফুলা ইনার নাইজার ডেল্টা অঞ্চলে একটি ইসলাম অনুপ্রেরিত পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৮১৮র সময়ে। পরে এটি উমর টালের অভিযানের সময় বাম্বারা সাম্রাজ্যের সাথে এক হয়ে উমর টালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কিন্তু ১৮৬২ সালে উমর টালের দ্বারা পরাজিত হয় ও সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।

টাকচলিউর সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

১৮৬৪ সালে টাকচলিউর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়; বর্তমান মালির প্রায় পুরোটাই এই সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ছিল; ১৮৯০ সালে ফরাসিদের উপনিবেশে পরিণত হওয়া অবধি এই সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। রাজত্ব করেছিল।

ওয়াসোলৌ সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

ওয়াসৌলৌ বা ওয়াসুলু সাম্রাজ্য ছিল সামোরী তুরের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বল্পকালীন (১৮৭৮-১৮৯৮) সাম্রাজ্য, এটি প্রধানত মালিঙ্কা অঞ্চলে যা বর্তমানে উচ্চ গিনি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মালি অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। মালি ফরাসী উপনিবেশে পরিণত হওয়ার পরে এটি আইভরি কোস্ট অঞ্চলে সরে যায়।

ফ্রান্সের উপনিবেশ ফরাসি সুদানের অংশ রূপে মালি (১৮৯২–১৯৬০)[সম্পাদনা]

মালি ১৮৯২ সালে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে আসে। [১] ১৮৯৩ সালে, ফরাসিরা সুদান সহ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে এবং এই অঞ্চলটির সৌদান ফ্রান্সেস ( ফরাসী সুদান ) নামকরণ করে একজন অসামরিক গভর্নর নিযুক্ত করেছিল। যদিও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত ছিল, তবুও ১৯০৫ সালের মধ্যে বেশিরভাগ অঞ্চল পুরোপুরি ফরাসী নিয়ন্ত্রণে ছিল।

ফরাসী সুদান, ফরাসী পশ্চিম আফ্রিকার অংশ হিসাবে পরিচালিত হত এবং পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে ফ্রান্সের উপনিবেশগুলিতে সস্তা শ্রমিক সরবরাহ করত। ১৯৫৮ সালে সুদানী প্রজাতন্ত্র সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন লাভ করে এবং ফরাসী সম্প্রদায়ের সাথে যোগ দেয়। ১৯৫৯ এর প্রথম দিকে, সুদানী প্রজাতন্ত্র সেনেগাল ও মালির ফেডারেশন গঠন করে। ১৯৬০ সালের ৩১ শে মার্চ ফ্রান্স মালির ফেডারেশনকে পুরোপুরি স্বাধীন হওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায়। [২] ১৯৬০ সালের ২০শে জুন মালি ফেডারেশন একটি স্বাধীন দেশে পরিণত হয় এবং মোদিবো কেতা এর প্রথম রাষ্ট্রপতি হন।

স্বাধীনতা (১৯৬০-বর্তমান)[সম্পাদনা]

১৯৬০ সালের আগস্টে ফেডারেশন থেকে সেনেগাল বেরিয়ে যাওয়ার পরে, প্রাক্তন সুদানী প্রজাতন্ত্র মালি প্রজাতন্ত্র রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ১৯৬০ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর, মোদিবো কেতা রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন।

২০০০[সম্পাদনা]

কনারি তার সাংবিধানিকভাবে দুই মেয়াদে বাধ্যতামূলক সীমাবদ্ধতার ফলে ২০০২এর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেননি এবং তৃতীয়বার রাষ্ট্রপতি হতে পারেননি। ২০০২ সালের নির্বাচনটি একটি মাইলফলক ছিল, নির্বাচনী অনিয়ম ও ভোটারদের স্বল্প ভোটদানের ধারা থাকা সত্ত্বেও মালির ইতিহাসে প্রথমবার এক গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে অন্য গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। ২০০২ এর আইনসভা নির্বাচনে কোনও দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেনি; ত্যুরে তারপরে একটি সমস্ত রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার নিয়োগ করেন এবং মালির সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমস্যাগুলি মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দেন। [৩]

২০১০[সম্পাদনা]

২০১২ সালের জানুয়ারিতে আজওয়াদের মুক্তির জাতীয় আন্দোলনের (এমএনএলএ) নেতৃত্বে একটি বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। [৪] ২০১৩র ১৮ই জুন, সরকার এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ২৮ শে জুলাই ২০১৩ তারিখে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। [৫] ইব্রাহিম বাববাকার কেতা সৌতে সৌমালা সিসিকে পরাজিত করে মালির নতুন রাষ্ট্রপতি হন । যদিও বিদ্রোহী ও মালিয়ান সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তিটি ২০১৩ সালের নভেম্বরের শেষদিকে উত্তরের শহর কিদালে লড়াইয়ের কারণে ভেঙে গেছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Encyclopedia of Africa South of the Sahara 
  2. "MALI GAINS PACT ON SOVEREIGNTY; Senegal-Sudan Federation Will Remain Closely Tied to France"The New York Times। এপ্রিল ১, ১৯৬০। 
  3. Mali country profile, p. 4.
  4. Mali clashes force 120 000 from homes ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১০ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে.
  5. Mali sets date for presidential election Al Jazeera, 28 May 2013