মডিগিলানি-মিলার তত্ত্ব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মডিগিলানি-মিলার তত্ত্ব বর্তমান যুগের ব্যাবসার মূলধন গঠনের আধুনিক চিন্তাভাবনার একটি ভিত্তি দাড় করেছে। এই তত্ত্বটি মূলত একটি ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের মূলধন কি কি উপায়ে গঠিত হতে পারে এবং এই গঠনের ফলে শেয়ারের দামের উপর কি ধরনের প্রভাব পরবে তা আলোচনা করে। একটি নির্দিষ্ট বাজারে আয়কর, দেউনলিয়ত্ব খরচ, ব্যাংক সুদ এবং প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত অসামঞ্জস্য তথ্য যদি সহজলভ্য না থাকত তাহলে প্রতিষ্ঠানটি যেভাবেই এর মূলধন সংগ্রহ করুক না কেন (যেমন- ব্যাংক ঋন, শেয়ারহোল্ডার মূলধন, বন্ড ইত্যাদি), শেয়ারের দামের উপর এর কোন প্রভাব পরবে না।[১] এছাড়াও প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ প্রদান নিতীর কারনেও এর শেয়ারের দামের উপর কোন প্রভব পরবে না। মডিগিলানি ও মিলারের এই তত্ত্বকে অসংলগ্ন মূলধন সংগঠন নিতীও বলা হয়।

ফ্রাংকো মডিগিলানি ও মার্টন মিলার এই তত্ত্ব আবিষ্কারের জন্য ১৯৮৫ সালে অর্থনিতীতে নোবেল পুরস্কার পান।

মিলার যখন ১৯৯০ সালে অর্থনিতীতে নোবেল পুরস্কার পান তখন তিনি হেনরি মার্কোইজ এবং উইলিয়াম সার্পের সাথে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। এবং তারা একত্রে আর্থিক অর্থনিতীর কিছু তত্ত্ব নিয়ে গবেষনা করছিলেন। মিলার এই তত্ত্বটিকে পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের মৌলিক অবদান নামে অবিহিত করেন।

পটভূমি[সম্পাদনা]

মিলার এবং মডিগিলানি যখন কার্নেগি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট স্কুল অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এডমিনেস্ট্রেশনে অধ্যাপনা করতেন তখন এই যুগান্তকারি তত্ত্বটির ব্যাক্ষা করেন। গল্প মতে মিলার ও মডিগিলানিকে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের উপর পড়ানোর জন্য বলা হয়েছিল কিন্তু আদতে তাদের এই বিষয়ে অধ্যাপনা করার কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা যখন পড়াতে যান তখন কিছু বিষয় তাদের কাছে সামঞ্জস্যপূর্ন মনে হয় নি যা তারা পরবর্তীতে বসে সমাধান করার চেষ্টা করেন। এই সমাধানগুলোই পরে আমেরিকান ইকনমিক রিভিউতে প্রকাশিত হয় এবং এম এন্ড এম তত্ত্ব নামে পরিচীতি পায়।

তত্ত্ব[সম্পাদনা]

দুটি ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান কল্পনা করা যাক যার প্রতিষ্ঠান-১ একটি আনগিয়ার্ড (গিয়ারের আরেক নাম লিভারেজ।[২]) প্রতিষ্ঠান (শুধুমাত্র বিনিয়োগকৃত মূলধন দ্বারা গঠিত) এবং অপরটি প্রতিষ্ঠান-২ একটি গিয়ার্ড প্রতিষ্ঠন (বিনিয়োগকৃত মূলধন, ব্যাংক ঋন এবং অন্যান্য দেনার সমন্বয়ে গঠিত)। মডিগিলানি-মিলার তত্ত্ব মতে দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামই সমান হবে।

আয়কর ছাড়া[সম্পাদনা]

প্রতিজ্ঞা-১: , যেখানে প্রতিষ্ঠান ১ এর মূল্য= এবং প্রতিষ্ঠান ২ এর মূল্য=

যদি একজন বিনিয়োগকারী, প্রতিষ্ঠান ১ এবং ২ এর মধ্যে যেকোন একটি প্রতিষ্ঠান কিনতে চায়, তাহলে তিনি প্রতিষ্ঠান-২ এর সমান মূলধন এবং ব্যাক্তিগত দেনার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠান-১ কিনতে পারেন অপরদিকে প্রতিষ্ঠান-২ কেনার সময় ১ এর মত ব্যাক্তিগত মূলধন দিয়েও কিনতে পারেন। এতে করে উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠান দুটির বিনিয়োগকৃ মূলধন এবং দেনার অনুপাত সমান থাকবে এবং এর প্রেক্ষিতে দামও সমান থাকবে।

প্রতিজ্ঞা-২:

প্রতিজ্ঞা-২ এ ঋনের পরিমাণ যত বেশি বাড়বে, ঝুকির পরিমাণ তত বাড়বে, তবে মূলধন সংগ্রহের গড় খরচ একই থাকবে।

যেখানে

  • হল বিনিয়োগকৃত মূলধনের উপর প্রত্যাশিত লাভ
  • হল আনগিয়ার্ড কোম্পানির মূলধন সংগ্রহের খরচ
  • হল ব্যাংক ঋন বা বন্ডের প্রদেয় সূদ
  • হল বিনিয়োগকৃ মূলধন এবং দেনার অনুপাত

বিনিয়োগকৃত মূলধন এবং দেনার অনুপাত যত বেশি হবে বিনিয়োগকারীদের ঝুকির পরিমাণ তত বেড়ে যাবে, এবং এতে করে প্রত্যাশিত লাভের পরিমাণ বেশি হবে।

উপরিউক্ত প্রতিজ্ঞার জন্য কয়েকটি ধারনার প্রয়োজন যেমন-

  • লেনদেনের সমস্ত খরচ অগ্রাহ্য করতে হবে, এবং
  • ঋনের ক্ষেত্রে ব্যাক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋনের সুদের পরিমাণ একই হবে।

তত্ত্বটি অসংলগ্ন মনে হলেও এটি মূলধন সংগঠন ব্যক্ষা করার জন্য গুরুত্বপূর্ন তাই এটি ব্যাবসা, অর্থনিতী এবং অর্থায়ন সহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বের সাথে পড়ানো এবং চর্চা করা হয়।

আয়কর সহ[সম্পাদনা]

প্রতিজ্ঞা-১:

যেখানে

  • হল গিয়ার্ড প্রতিষ্ঠানের মূল্য।
  • হল আনগিয়ার্ড প্রতিষ্ঠানের মূল্য
  • হল করের হার () x হল দেনার(D) পরিমান
  • দ্বারা ধরে নেওয়া হয় যে দেনাগুলো চিরস্থায়ী

উপরিউক্ত সূত্র থেকে বোঝা যাচ্ছে যে প্রাতিষ্ঠানিক আয়করের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ঋন গ্রহণ করে সুবিধাভোগী হচ্ছে, তার কারন হল ঋনের প্রদেয় সুদ লাভের অংশ থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং এর উপর কোনো কর আরোপিত হয় না। অপরদিকে ল্যভ্যাংশ করমুক্ত নয়।

প্রিতিজ্ঞা-২:

যেখানে

  • হল মূলধনের উপর প্রত্যাশিত আয় অথবা গিয়ার্ড মূলধন সংগ্রহের খরচ।
  • হল লিভারেজ ছাড়া কোম্পানির মূলধন সংগ্রহের খরচ।
  • হল ঋনের প্রত্যাশিত সূদ।
  • হল মূলধন ও দেনার অনুপাত।
  • হল আয়করের হার।

এই সমীকরন থেকে দেখা যাচ্ছে যে দেনার পরিমাণ যত বেশি হচ্ছে মূলধনের খরচ ততই বেড়ে যাচ্ছে কারন দেনা বাড়ার সাথে সাথে শেয়ারহোল্ডারদের ঝুকিও বেড়ে যায়। তবে এখানে ওয়েটেড এভারেজ কস্ট অফ ক্যাপিটাল বা মূলধন সংগ্রহের গড় খরচের তত্ত্বের সাথে এর কিছুটা পার্থক্য আছে, যেখানে বলা হয়েছে যে মূলধন এবং দেনার অনুপাত ১:১ পর্যন্ত ঋন নিলে মূলধনের মোট খরচ কমতে থাকে, তবে ঋন যখন মূলধনের ১০০% পার হয়ে যায় তখন তা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

উপরিউক্ত প্রতিজ্ঞার জন্য কয়েকটি জিনিষ বিবেচনায় আনতে হয় যেমন-

  • প্রতিষ্ঠানগুলো হারে কর দেয়,
  • লেনদেনে কোন ধরনের খরচ হয় না, এবং
  • ঋনের ক্ষেত্রে ব্যাক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋনের সুদের পরিমাণ একই হবে।

মডিগিলানি এবং মিলার এই তত্ত্ব প্রদানের পরবর্তীকালে এর ব্যক্ষামূলক আরো আনেক তত্ত্ব প্রকাশ করেন। এই তত্ত্বটি প্রথম ১৯৫৮ সালে প্রস্তাবিত হয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. MIT Sloan Lecture Notes, Finance Theory II, Dirk Jenter, 2003
  2. Arnold G. (2007)