ব্যবহারকারী:Nokib Sarkar/এসো হে বৈশাখ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

এসো হে বৈশাখ এসো এসো[সম্পাদনা]

বৈশাখ কেবল একটা মাস নয়, বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। পহেলা বৈশাখ বাঙালির নববর্ষ। বৈশাখ যখন আসি আসি করে, বাঙালি তখন মেতে ওঠে বৈশাখ উদযাপনে। বৈশাখ উদযাপনের জন্য কত অনুষঙ্গ আছে বাঙালির—নতুন জামা-কাপড়, মজাদার খাবার, মঙ্গল শোভাযাত্রা, নাচ-গান-নাটক, আছে আনন্দ আয়োজন—আছেন রবীন্দ্রনাথও। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাঙালির বৈশাখ-বন্দনা কল্পনা করাই যায় না।

"এসো হে বৈশাখ এসো এসো"
প্রকৃতি পর্যায়ের গান
ভাষাবাংলা
প্রকাশিত১৯৩৫
ধারারবীন্দ্র সংগীত
গান লেখকদীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুরকাররবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেছেন বৈশাখ মাসে। তাই নতুন বছরের মতো নিজের জন্মমাসটার প্রতিও বুঝি তার ভালোবাসার শেষ নেই। বৈশাখ নিয়ে তিনি অনেক গান লিখেছেন, লিখেছেন অনেক কবিতা। কিন্তু এত সব অনেকের ভিড়ে একটা গান বাঙালির চিত্তলোকে অবিনাশী আসন পেতে বসেছে। ওই গানটি ছাড়া বাঙালির নববর্ষ উদযাপন ভাবাই যায় না। পাঠক, আপনারা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন আমি কোন গানটার কথা বলছি! হ্যাঁ, ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ...’—এই গানটার কথাই আমি বলছি।

বাঙালির চিরকালের এক প্রিয়গান ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ’। এ গান এখন বাঙালির বৈশাখ-বন্দনার উল্লেখযোগ্য উত্স। নববর্ষের প্রভাতে বাঙালির মুখে-মুখে উচ্চারিত হয় এ গান—আকাশে বাতাসে বাজে এ গানের বাণী আর সুর। এ গান ছাড়া নববর্ষের কোনো অনুষ্ঠানের কথা বাঙালি ভাবতেই পারে না। সুর এবং বাণীর এমন নিপুণ মিলন বাঙালিচিত্তকে না টেনে পারে না।

কী আছে রবীন্দ্রনাথের ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ’ গানে? কেন বাঙালিমন আকৃষ্ট হয় এ গানের বাণী ও সুর শুনে? কোথায় এর আকর্ষণী শক্তি! এই গানটি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিভাবনার নিপুণ এক নির্মাণ। মিশ্র সুর (রাগ, লোক) ও কাহারবা তালের এই গানে বাংলার বৈশাখীচেতনা স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ২০ ফাল্গুন রবীন্দ্রনাথ এ গানটি রচনা করেন। গানটি প্রথম প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের ‘নটরাজ’ (১৩৩৫) গ্রন্থে। ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ’ গানের স্বরলিপিকার ছিলেন দ্বিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বৈশাখ আসে পুরোনোকে বর্জন করে নতুনকে আবাহনের অনন্য এক আহ্বান নিয়ে। বছরের যত আবর্জন সব দূর করার আহ্বান জানায় বৈশাখ—যা কিছু মৃত, জরা, প্রচল, সবকিছু বৈশাখী-বাতাসে উড়িয়ে দিতে চান কবি।

অগ্নিস্নানে কবি সবকিছু শুদ্ধ ও সুচিস্নিগ্ধ করতে চেয়েছেন। এজন্য কবি প্রত্যাশা করেছেন বৈশাখের কাছে মহাপ্রলয়। প্রলয়ের শেষে কবি মেতে উঠতে চেয়েছেন সৃষ্টির আনন্দে, নতুনের আবাহনে। প্রলয়ের পর শাঁখ শব্দ ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথ একই সঙ্গে ধ্বংস ও সৃষ্টির যুগলভাব নিয়ে এসেছেন। শাঁখের ধ্বনি মঙ্গল ও পূণ্যের প্রতীক। প্রলয়ের পর শাঁখ ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের সৃষ্টিসত্তার পাশাপাশি একই সঙ্গে কল্পনা করেছেন মাঙ্গলিকতা। এ কারণেই গানটি পেয়েছে, বাঙালির কাছে অনন্য মর্যাদা।

বাঙালির কোনো উত্সব কি আয়োজনে রবীন্দ্রনাথ সবসময় বিস্তার করেন সহযোগ। বৈশাখ বন্দনার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ বন্দনার গান বাঙালির কাছে আপন সম্পদ। এক্ষেত্রে ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ’ গানটির কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৪২২-এর নববর্ষের প্রথম দিনেও আমরা সর্বত্র শুনব এই গান—রমনার বটমূল থেকে, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে, প্রত্যন্ত প্রান্ত থেকে আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হবে বৈশাখের রাবীন্দ্রিক আবাহন-গীত ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ’। এ গান বাঙালিকে নতুন স্বপ্নে জাগিয়ে তোলে, বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করে সঙ্গচেতনায়। এ কারণেই রবীন্দ্রনাথের এ গান বাঙালির চিরায়ত সম্পদ, আমাদের বাত্সরিক চলার পাথেয়।