বিয়ের গান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

যেকোনো জনজাতির সংস্কৃতির সঙ্গে বিবাহ নামক সামাজিক রীতি অঙ্গাঙ্গিভাব যুক্ত তার সঙ্গে বিয়ের গান ও।[১] অতুল সুর, এ দেশীয় বিয়ের ইতিহাস বর্ণণায় বলেছেন কিভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের রীতি-নীতি ভৌগলিক অবস্থান এবং সংস্কৃতি অনুযায়ী পাল্টেছে। বিয়ের আচারের মধ্যেই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গানের ব্যবহারে বদল এসেছে। আবার অর্থ বদলেছে বিয়ের গানেরও। কিন্তু বিয়ের গান বলতে মূলত বোঝায় বিবাহ আচার, কন্যাপক্ষ, বরপক্ষকে নিয়ে বাঁধা গান। বিয়ের গানের সঙ্গে সেই জাতির সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য, সম্পর্কিত লোকের পরিচয় সম্পূর্ণ উঠে আসত। আশীর্বাদ থেকে শুরু করে দ্বিরাগমন অবধি প্রতিটি আচার নিয়েই বিয়ের গান বাঁধা হয়। [২] গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে নাপিতের মুখ থেকে পাওয়া খবর থেকে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে নিয়ে মজাদার চটুল গান বাধে। বাঙালি বিয়ের গানে আবার হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে আচারের ভিন্নতা অনুযায়ী গান বাঁধা হয় আলাদা ভাবে।

সেই প্রাচীনকাল থেকেই এই উপমহাদেশের বিয়েতে নাচ-গানের প্রচলন ছিল। [৩] আর এটা করত অন্তপুরের মহিলারাই। বিয়েতে বিশেষ করে হিন্দু বিয়েতে মেয়েলি আচার-অনুষ্ঠানের একটা প্রধান অঙ্গ ছিল মঙ্গল গান। পরবর্তীকালে ঐতিহ্যিক ধারাবাহিকতায় মুসলমান বিয়েতেও যুক্ত হয় এই অনুষঙ্গ। আজ থেকে দশ-পনের বছর আগেও দেখা গেছে গ্রামের বিয়েতে বিশেষ করে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য ‘গীত গাওনি’ মহিলাদের ডাক পড়ত। এখন যদিও এই গানের ধারাটি ক্ষীণ হয়ে এসেছে, তবুও প্রত্যন্ত গ্রামে কোথাও কোথাও এখনো বিয়েতে গান গাওয়ার প্রচলন আছে। এসব গান আঞ্চলিক ভাষায় রচিত এবং প্রজন্ম পরম্পরায় মুখে মুখে প্রচলিত, স্মৃতি ও স্বতঃস্ফূর্ততায় বিকশিত। বয়স্করা অর্থাৎ শিশুদের মা-কাকি-মাসিরা যখন বিয়ের অনুষ্ঠানে গান করেন তখন তাদের ঘিরে থাকে শিশুরা। শিশুরা এসব গান শোনে এবং মনের ভেতর গেঁথে নেয়। এরপর যখন তারা বড় হয় তখন নিজেরাই সেসব গান গাইতে শুরু করে। এতে মূল গানের সঙ্গে হয়ত সময় পরিক্রমায় আরো কিছু সংযোজন-বিয়োজন চলে, তবে তাতে মূল গানের রস আস্বাদনে কোনো অসুবিধা হয় না। [৪] বিয়ের গীতের রচয়িতা নারী, এই গানে পরিবেশনও করেন মহিলারা। এর শ্রোতাও সাধারণত মহিলা। নারী মনের আবেগ-উৎকণ্ঠা-আনন্দ-বেদনা-হাসি-কান্না-সুখ-আনন্দের প্রকাশ ঘটে বিয়ের গানে। আবার পাশাপাশি, নতুন দাম্পত্য জীবনের হাসি-ঠাট্টা, পরস্পরকে চেনার আনন্দ মিশে থাকে গানের কথায়, প্রচলিত সুরে।

বাংলাদেশের বিয়ের গান[সম্পাদনা]

সিলেট অঞ্চলের বিয়েতে , বিয়ের দিন কিংবা বিয়ের আগে ধামাইল নামের একটি মেয়েলি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। এ অনুষ্ঠানে সাধারণত মহিলারা গীত গেয়ে থাকেন। সিলেটের বেশ কিছু জনপ্রিয় আঞ্চলিক বিয়ের গান রয়েছে, যেগুলো প্রায় সব বাড়ির নারীরাই জানেন। তাই গীতের সঙ্গে প্রায় সবাই গলা মেলাতে পারে। গীতের তালে তালে নারীরা তুলে ধরেন বরের মেজাজ, কনের চালচলন। সিলেটি বিয়ের গানের একটি নমুনা উল্লেখ করা হলো:

দেখছি কইন্যার মাথা ভালা ডাব নারিকেল জুড়ারে
দেখছি কইন্যার দাঁত ভালা আনারের দানারে
দামান্দেরও সাত ভাই সাত ঘুড়া ছুয়ারী
একেলা দামান রাজা চৌদল চুয়ারী
চৌদলের কিনারে পড়ে হীরা লাল মতিরে
চল যাই চল যাই দামান দেখিবারে। [৫]

আবার এই গীতের পাশাপাশি, কখনও কনেকে ঘিরে, কখনও আলাদাভাবে নারীরা একত্রিত হয়ে কোমরে শাড়ি প্যাঁচিয়ে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে হাততালি দিয়ে মাটিতে পা দিয়ে তাল ঠুকে ঠুকে নাচতে থাকেন। নাচের তাল কেবল একটিই- একটু সামনে, সকলে একত্রে এগিয়ে গিয়ে একবার হাততালি, আবার পিছিয়ে এসে পরবর্তি হাততালির প্রস্তুতি। আবার যে ধরণের গানে নাচের প্রভাব বেশি দেখা যায়, এমন একটি গানের নমুনা:

একটু ঠিকর করে লাচরে ভাবের মার‌্যানী,
একটু গিদার করে লাচরে ভাবের মাল্যানী।
তোকে আম বাগানের আম খাওয়াবো এখুনী
তোকে জাম বাগানের জাম খাওয়াবো এখুনী।। [৬]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. অতুল সুর, ভারতের বিবাহের ইতিহাস. কলকাতা, ১৯৯৫(?)
  2. সানাই (সিলেটের বিয়ের গান) - মো: দেলোয়ার হোসেন রাসেল; পার্ল পাবলিকেশনস
  3. শাকিল ফারুক, এবং গৌরাঙ্গ নন্দী (খুলনা), আনু মোস্তফা (রাজশাহী), আবদুর রহমান (সিলেট), রফিকুল ইসলাম (বরিশাল), রাজীব নন্দী (চট্টগ্রাম); দৈনিক কালের কণ্ঠ, পৃষ্ঠা ১ (২৪), ঢাকা থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখে প্রকাশিত; পরিদর্শনের তারিখ: ৬ জানুয়ারি ২০১২ খ্রিস্টাব্দ।
  4. ফুলের সাজে গায়ে হলুদ, শারমিন নাহার; ক্রোড়পত্র নকশা পৃ. ২০, দৈনিক প্রথম আলো; প্রকাশকাল: ২৫ অক্টোবর ২০১১; সংগ্রহের তারিখ: ৬ জানুয়ারি ২০১২ খ্রিস্টাব্দ।
  5. "জেলা পরিক্রমা সিলেট", এ. টি. এম. জিল্লুর রহমান খান, সিলেটের লোকসাহিত্য, জেলা তথ্য অফিস, সিলেট; পৃ. ২৩২; ১৯৯১-১৯৯২।
  6. Cultural Survey of Bangladesh: পরিবেশনা শিল্পকলা: লোক নৃত্য (ই-বুক ভার্সন), শেখ মেহেদী হাসান; প্রকাশকাল: ২০০৯; বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা। পরিদর্শনের তারিখ: ১৮ এপ্রিল, ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।