ফেলানী হত্যাকাণ্ড
| বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মৃত্যুর অংশ | |
ভারতীয় সীমান্তরক্ষীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ ফেলানী খাতুনের মৃতদেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকে। | |
| তারিখ | ৭ জানুয়ারি ২০১১ |
|---|---|
| সময় | আনু. ভোর ৫:৩০ (UTC+6) |
| অবস্থান | বাগুয়া অনন্তপুর, ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ |
| স্থানাঙ্ক | ২৬°০১′২৮″ উত্তর ৮৯°৩৫′০০″ পূর্ব / ২৬.০২৪৩৩৪° উত্তর ৮৯.৫৮৩৩৩৮° পূর্ব |
| অংশগ্রহণকারী | ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) |
| নিহত | ১ (ফেলানী খাতুন) |
| অভিযুক্ত | কনস্টেবল অমিয় ঘোষ |
| রায় | নির্দোষ |
৭ই জানুয়ারি ২০১১ সালে, বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর-দিনহাটা সীমান্তের খিতাবেরকুঠি[১] এলাকায় মই বেয়ে কাঁটাতার পার হওয়ার সময় বিএসএফ এর সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে[২] ১৫ বছর বয়সী বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানী খাতুন (জন্ম:১৯৯৬ সাল)[১] হত্যাকান্ডের শিকার হন।[৩] বিএসএফ ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের জওয়ানদের এই ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়। ফেলানীর লাশ পাঁচ ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে ছিল। বিএসএফ নিজস্ব আদালতে এ ঘটনার জন্য দায়ী সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। কুড়িগ্রামের কলোনীটারী গ্রামের ফেলানী বাবার সঙ্গে নয়াদিল্লিতে গৃহকর্মীর কাজ করত। বিয়ের উদ্দেশে তিনি দেশে ফিরছিলেন। [৪]
ঘটনাটির একটি ছবিতে দেখা যায় যে, তার মৃতদেহ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে আছে। ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এই ছবিটি সীমান্ত সুরক্ষা কার্যক্রম এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়টিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে।[৫]
হত্যার কারণ
[সম্পাদনা]সীমান্ত অনুপ্রবেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে একটা বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ নানা কারণে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপার করে। এছাড়া চোরাচালান ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ক্রমশঃ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চোরাকারবার ও সীমান্ত পারাপার রুখতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর গুলি করার ফলে সীমান্তে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে।
নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলনিটারী গ্রামের নুর ইসলাম ও জাহানারা দম্পতির ৮ সন্তানের মধ্যে ফেলানী ছিল সবার বড়। পরিবারের অভাব অনটনে কাজের সন্ধানে সপরিবারে ভারতে চলে যান তারা।[৬] নুরুল ইসলাম নূরু/নজরুল ইসলাম নূর ১০ বছর ধরে নতুন দিল্লিতে কাজ করতেন। তার সঙ্গে সেখানেই থাকতো ফেলানী। [১] তিনি ২০১১ সালে বাংলাদেশে ফেলানি খাতুনের বিয়ে ঠিক করেন এবং মেয়েকে বিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যেই ৭ই জানুয়ারি বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
৭ জানুয়ারি ভোরে দালালের মাধ্যমে অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে পার হওয়ার সময় হঠাৎ গুলির শব্দ শুনে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার চেষ্টা করেন বাবা নুরু। এক পর্যায়ে কাঁটাতারের বেড়া থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে পড়ে গিয়ে নুরু আহত হন।কাঁটাতারের ওপর মই বেয়ে নামার সময় বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে আহত হয় ফেলানী ৷ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় মারা যায় ফেলানি।[৭] [৮] মেয়ের লাশ কাঁটাতারের ওপরে ফেলে রেখে পালিয়ে আসেন তার বাবা। এরপর পাঁচ ঘণ্টা ফেলানীর লাশ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল।[৯] কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়।[১০]
হত্যার বিচার
[সম্পাদনা]পরবর্তীতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির পক্ষ থেকেও বিএসএফের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে ফেলানী হত্যার বিচারের জন্য চাপ দেয়া হয়। বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০১২ সালের মার্চে নয়াদিল্লীতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে ফেলানী হত্যার বিচার দ্রুত শুরু করা হবে বলে আশ্বাস দেন বিএসএফের মহাপরিচালক।[১১]
মামলার কার্যক্রম
[সম্পাদনা]এরই ধারাবাহিকতায় বিএসএফ সদর দপ্তর ‘জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্স কোর্ট’ গঠন করে এবং আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য বাংলাদেশের দুইজন সাক্ষী, একজন আইনজীবী এবং বিজিবির একজন প্রতিনিধিকে ভারতে যেতে বলা হয়।[১] সে অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কুড়িগ্রামের ৪৫ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোফাজ্জল হোসেন আকন্দ, কুড়িগ্রাম আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আব্রাহাম লিংকন এবং ফেলানীর বাবা মো. নুরুল ইসলাম ও মামা মো. আব্দুল হানিফকে ভারতে গিয়ে সাক্ষ্য দেয়ার অনুমতি দেয়। [১]
২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস আদালতে ফেলানী হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু করে ভারত সরকার। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় অনিচ্ছাকৃত খুন এবং বি এস এফ আইনের ১৪৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।[১২]ওই আদালতে সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম এবং মামা হানিফ। তবে একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় বিএসএফ এর বিশেষ আদালত।রায় প্রত্যাখ্যান করে পুনর্বিচারের দাবি জানান ফেলানীর বাবা। এর প্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আবারও বিচারকাজ শুরু হলে ১৭ নভেম্বর আদালতে সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা। কিন্তু ২০১৫ সালের ২ জুলাই আসামি অমিয় ঘোষকে পুনরায় খালাস দেন আদালত। এই রায়ের পর একই বছরের ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ- ‘মাসুম’ ফেলানীর বাবার পক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট পিটিশন করে। ওই বছর ৬ অক্টোবর রিট শুনানি শুরু হয়। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে কয়েক দফায় পিছিয়ে সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি শুনানির দিন ধার্য হলেও তা আজ পর্যন্ত হয়নি। এর ফলে থমকে গেছে ফেলানী খাতুন হত্যার বিচার প্রক্রিয়া।[১৩]
কিংবদন্তী
[সম্পাদনা]
২০২১ সালে, ফেলানীর দশম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মাহবুবুল এ খালিদ ও সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল যৌথভাবে 'ফেলানী' শিরোনামে একটি গান প্রকাশ করেন।[১৪] ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে, গুলশান-২ থেকে প্রগতি সরণি পর্যন্ত সড়কটির নাম পরিবর্তন করে ফেলানী এভিনিউ রাখা হয়।[১৫]
আরো দেখুন
[সম্পাদনা]- বাংলাদেশ-ভারত সাইবার-যুদ্ধ ২০১২ - বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যার প্রতিবাদে ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত সাইবার-যুদ্ধ
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 4 5 আড়াই বছর পরে শুরু হল বিচার ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১০ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে।
- ↑ "ফেলানী হত্যার ১০ বছর আজ, এখনো বিচার পায়নি পরিবার"। ntvbd.com। ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০২৬।
- ↑ UNB (৭ জানুয়ারি ২০২২)। "11 years of Felani Killing: Wait for justice gets longer"। Prothom Alo (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০২৫।
- ↑ শুরু হচ্ছে ফেলানী হত্যার বিচার ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৪ মে ২০২৩ তারিখে।
- ↑ "Indian verdict disrespect to int'l law: NHRC"। The Daily Star। ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০২৫।
- ↑ "ফেলানী হত্যার ১৫ বছর, ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় মা-বাবা"। সারাবাংলা.নেট। ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০২৬।
- ↑ "ফেলানী হত্যা: ন্যায়বিচার মেলেনি, থামেনি সীমান্ত হত্যাও"। ডিডাব্লিউ। ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০২৬।
- ↑ "ফেলানি হত্যার ঘটনার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার পায়নি পরিবার"। বিবিসি। ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০২৬।
- ↑ "মেয়ে হত্যার বিচার না দেখে আমি মরেও শান্তি পাব না"। প্রথম আলো। ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০২৬।
- ↑ ভারতে ফেলানী হত্যার বিচার শুরু হচ্ছে আজ।
- ↑ বিশেষ আদালতে আজ বিচার শুরু ।। ফাঁসির দাবি নিয়ে ভারতে যাচ্ছেন ফেলানীর বাবা ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১৬-০৩-০৪ তারিখে।
- ↑ "ফেলানি হত্যা: বিএসএফের বিচারে অমিয় এবারও 'খালাস"। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০২৬।
- ↑ "ফেলানী হত্যার ৯ বছর, থেমে আছে বিচার প্রক্রিয়া"। thedailystar.net। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০২৬।
- ↑ "ফেলানী খাতুনের স্মরণে মাহবুবুল এ খালিদের গান"। risingbd.com (ইংরেজি ভাষায়)। ৭ জানুয়ারি ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০২৫।
- ↑ "সীমান্ত হত্যা বন্ধের বার্তা দিতেই বিজয় দিবসে 'ফেলানী এভিনিউ' উদ্বোধন : আদিলুর রহমান খান"। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ৬ জানুয়ারি ২০২৬।