প্যালিনড্রোম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
ঐতিহাসিক একটি প্যালিনড্রোম

প্যালিনড্রোম (ইংরেজি: Palindrome) হল এমন কিছু বিশেষ শব্দ আর সংখ্যা যার আরম্ভ বা শেষ দুদিক থেকেই পড়লে শব্দের উচ্চারণ আর অর্থের কোন বদল হয় না; বা সংখ্যার মান একই থাকে (সংখ্যার ক্ষেত্রে)। মূল গ্রীক শব্দ প্যালিনড্রোমাস(অর্থ: Running back again) থেকে ইংরেজি প্যালিনড্রোম শব্দটি এসেছে।καρκινικός,[১] বাংলা ভাষায় একে দ্বিমুখী শব্দ বা সংখ্যা বলা যায়। এধরণের দ্বিমুখী শব্দ বা বাক্য সাজাতে যারা দক্ষ তাঁদের ‘পেলিনড্রোমিস্ট’ বলা হয়। প্যালিনড্রোমিক লেখা প্রাচীন ‘কিরাতার্জুনীয়’ কাব্যের বহু অনুচ্ছেদে দেখা যায়। এমনই একটি অনুচ্ছেদ হল- সারস নয়না ঘন অঘ নারচিত রতার কলিক হর সার রসা সার রসাহর কলিকর তারত চিরনাঘ অনঘ নায়ন সরসা চতুর্দশ শতকে দৈবজ্ঞ সূর্য পণ্ডিতের লেখা ‘রামকৃষ্ণ বিলোম কাব্যম’ নামে ৪০টি শ্লোকের যে বিখ্যাত কবিতা রয়েছে তার রচনাশৈলীও ভারি অদ্ভুত। প্রতিটি শ্লোকই এক-একটি প্যালিনড্রোম। আবার কবিতাটি সামনে থেকে পড়লে রাম ও রামায়ণের কাহিনি আর পেছন থেকে পড়লে কৃষ্ণ ও মহাভারতের কাহিনি। যেমন ৩ নং শ্লোকে রয়েছে “তামসীত্যসতি সত্যসীমতা মায়য়াক্ষমসমক্ষয়ায়মা। মায়য়াক্ষমসমক্ষয়ায়মা তামসীত্যসতি সত্যসীমতা।।”

বাংলা প্যালিনড্রোম[সম্পাদনা]

বাংলায় প্যালিনড্রোমিক শব্দ অনেক থাকলেও প্যালিনড্রোমিক বাক্য খুব বিরল। কারণ বাংলায় যুক্তবর্ণ ও যুক্তাক্ষরের ব্যবহার প্রচুর। প্যালিনড্রোমিক শব্দের মধ্যে বহুশ্রুত দুই অক্ষরের শব্দ হল- বাবা, দাদা, মামা, কাকা, চাচা, নানা, লালা, চিঁচিঁ, হিহি, জুজু ইত্যাদি।
তিন অক্ষরের প্যালিনড্রোমিক শব্দের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি, যেমন- মরম, মলম, দরদ, জলজ, যমজ, তফাত, মধ্যম, বাহবা, চামচা, সন্ন্যাস, সন্ত্রাস, সরেস, সমাস, সহিস, নতুন, নরুন, নরেন, নন্দন, নবীন, কালিকা ইত্যাদি।
একটু বড় প্যালিনড্রোমিক শব্দ হল বনমানব, নবজীবন। প্যালিনড্রোমিক নামও বাংলায় আছে বেশ কিছু – মহিম, নরেন, নটেন, কনক, কটক ইত্যাদি। তবে রমাকান্ত কামার ছাড়াও সুবললাল বসু, সদানন দাস, রায়মনি ময়রা, হারান রাহা, নিধুরাম রাধুনি, দেবী দে ইত্যাদি পদবিসহ প্যালিনড্রোমিক নাম বিরল হলেও বাস্তবে থাকা অসম্ভব নয়।

বাংলায় অর্থপূর্ণ প্যালিনড্রোমিক বাক্য গঠন করা বেশ কষ্টসাধ্য। তবুও সরল কিছু শব্দ সহযোগে ছোট ছোটো প্যালিনড্রোমিক বাক্য গঠন করা যায়। বই চাইব, তুমি কি মিতু, বিকল্প কবি, ঘুরবে রঘু, সীমার মাসী, ইভার ভাই, নাম লেখালেম না ইত্যাদি হলো প্রচলিত প্যালিনড্রোমিক ছোট্টো বাক্য।

বাংলা প্যালিনড্রোমিস্ট[সম্পাদনা]

বাংলায় উভমুখীসম শব্দ তৈরির অগ্রদূত দাদাঠাকুর খ্যাত শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। তিনিই সম্ভবত প্রথম বাঙালি যিনি বাংলায় প্যালিনড্রোম নিয়ে গভীরভাবে চর্চা করেছেন। তার জন্মসাল ১৮৮১৷ সালটা কিন্তু একটা প্যালিনড্রোমিক বছর। আর জন্ম তারিখ বাংলায় ১৩ বৈশাখ (১২৮৮ বঙ্গাব্দ)। ১৩ বৈশাখ সংখ্যায় লিখলে এভাবে লেখা হয় – ১৩/১। এটাও একটা প্যালিনড্রোম। আর দাদাঠাকুরের প্রয়াণ তারিখও জন্ম তারিখেই – ১৩ বৈশাখ। জীবন শুরু যে তারিখ দিয়ে, মৃত্যুও সেই তারিখে। দাদাঠাকুরের জীবৎকালও একটা প্যালিনড্রোম! তিনি নিজেও তাঁর ‘বিদুষক’ পত্রিকায় বহু প্যালিনড্রোম সৃষ্টি করে বাংলাভাষায় প্যালিনড্রোমকে সমৃদ্ধ করেছেন। কাক কাঁদে কাক কাঁ; চেনা সে ছেলে বলেছে সে নাচে; তাল বনে নেব লতা; মার কথা থাক রমা; রমা তো মামা তোমার; চার সের চা; বেনে তেল সলতে নেবে; ক্ষীর রস সর রক্ষী; কেবল ভুল বকে; দাস কোথা থাকো সদা? নিমাই খসে সেখ ইমানি; থাক রবি কবির কথা, বিরহে রাধা নয়ন ধারা হেরবি – ইত্যাদি হল দাদাঠাকুর সৃষ্ট অমর প্যালিনড্রোম। তাঁর সৃষ্ট ‘কীর্তন মঞ্চ পরে পঞ্চম নর্তকী’ বাংলাভাষায় সর্বাধিক জটিল ও সর্বাধিক শব্দ সমন্বিত প্যালিনড্রোম। [২]
তার লেখা একটি প্যালিনড্রোম কবিতা-
রাধা নাচে অচেনা ধারা
রাজন্যগণ তরঙ্গরত, নগণ্য জরা
কীলক-সঙ্গ নয়নঙ্গ সকল কী?
কীর্তন মঞ্চ ‘পরে পঞ্চম নর্তকী
দাদাঠাকুরের লেখা এই কবিতার প্রতিটি লাইনই এক একটি প্যালিনড্রোম।

গণিতে প্যালিনড্রোম[সম্পাদনা]

আশ্চর্যের বিষয় হল গণিতে প্যালিনড্রোমিক সংখ্যার অভাব নেই। সাধারণভাবে যে কেউ হাজার হাজার প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা তৈরি করতে পারবে, যেমন ১১, ২২, ১২১, ২৩২, ২৪৪২, ১২৩২১ ইত্যাদি। তবে সহজ অ্যালগোরিদম পদ্ধতিতে (নির্দেশমত সুনির্দিষ্ট ধাপে) যে কোনও অ-প্যালিনড্রোমিক সংখ্যাকে প্যালিনড্রোমিক সংখ্যায় পরিণত করা যায়। যেমন ধরা যাক, একটি সংখ্যা হল ৫৭ (দুই, তিন, চার বা তার বেশি অঙ্কের সংখ্যা ধরা যেতে পারে)। এবার সংখ্যাটিকে উল্টে দেওয়া হল। তাহলে সংখ্যাটি হল ৭৫। এবার এই দুটি সংখ্যা যোগ করা হল। তাহলে এবার সংখ্যাটি হল (৫৭+৭৫)=১৩২। একেও উল্টে দেওয়া হল। তাহলে সংখ্যাটি হল ২৩১। আবার এই দুটো সংখ্যা যোগ করা হল। যোগফল হল (১৩২+২৩১)=৩৬৩। এটি একটি প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা। তিন অঙ্কের সংখ্যা নিয়ে দেখা যাক। ধরা যাক সংখ্যাটি ২৫৫। একই নিয়মে ২৫৫+৫৫২=৮০৭, ৮০৭+৭০৮=১৫১৫, ১৫১৫+৫১৫১=৬৬৬৬। তিন ধাপেই পাওয়া গেল প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা। এভাবেই যে কোনও সংখ্যাকেই এই নিয়মে পর পর যোগ করে গেলে একসময় প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা চলে আসবে। তবে এ যাবৎ সবচেয়ে দেরিতে যে সংখ্যাটির প্যালিনড্রোম তৈরি করা গেছে এই নিয়মে তা হল ১,১৮৬,০৬০,৩০৭,৮৯১,৯২৯,৯৯০ । ২৬১ ধাপের পর এটি প্যালিনড্রোমে পরিণত হয়। পাশাপাশি অঙ্কে প্যালিনড্রোমিক-মজার দৃষ্টান্তও প্রচুর। যেমন- ৯ সংখ্যাটির প্যালিনড্রোম জাদু। ৯-এর সব গুণিতককে (যেমন ০,৯,১৮,২৭,.... ৯০) পর পর পাশাপাশি লিখলে তা কিন্তু লম্বা একটা প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা হয়ে যাবে। সংখ্যাটি হল- ০৯১৮২৭৩৬৪৫৫৪৬৩৭২৮১৯০ । আবার ১ সংখ্যাটিরও আছে প্যালিনড্রোমিক ম্যাজিক। ১ দিয়ে তৈরি সমসংখ্যক অঙ্কের দুটি সংখ্যার গুণফল সবসময় প্যালিনড্রোমিক হবে। যেমন- ১১x১১=১২১, ১১১x১১১=১২৩২১, ১১১১x১১১১=১২৩৪৩২১, ১১১১১x১১১১১=১২৩৪৫৪৩২১ ইত্যাদি। আবার প্যালিনড্রোমিক গুণফলগুলোর মধ্যে একটা সামঞ্জস্যও লক্ষণীয়। দুই অঙ্কের সংখ্যার গুণফলের মাঝের সংখ্যা ২, তিন অঙ্কের সংখ্যার গুণফলের মাঝের সংখ্যা ৩, চার অঙ্কের সংখ্যার গুণফলের মাঝের সংখ্যা ৪ ইত্যাদি। প্যালিনড্রম নয় এমন একটিই সংখ্যা পাওয়া গেছে যার ঘনফল হল একটি প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা। সংখ্যাটি হল ২২০১। অনেক সংখ্যা আছে যেগুলোর বর্গ হল প্যালিনড্রোম। যেমন- ১১-এর বর্গ ১২১, ২২-এর বর্গ ৪৮৪, ২৬-এর বর্গ ৬৭৬, ১০১-এর বর্গ ১০২০১, ১২১-এর বর্গ ১৪৬৪১ ইত্যাদি। একইভাবে ৭, ১১, ১০১ ও ১১১ সংখ্যাগুলির ঘনফল (Cube) যথাক্রমে ৩৪৩, ১৩৩১, ১০৩০৩০১ ও ১৩৬৭৬৩১ হল প্যালিনড্রোম। চতুর্থ পাওয়ারের প্যালিনড্রোমিক সংখ্যাও আছে, যেমন ১৪৬৪১, ১০৪০৬০৪০১, ১০০৪০০৬০০৪০০১ ইত্যাদি। কিন্তু পাঁচ পাওয়ারের প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। বেশ কিছু মৌলিক সংখ্যা আছে যেগুলো প্যালিনড্রোম। তিন অঙ্কের সংখ্যার মধ্যে রয়েছে ১৫টি সংখ্যা, যেমন ১০১, ১৩১, ১৫১, ১৮১, ১৯১, ৩১৩, ৩৫৩, ৩৭৩, ৩৮৩, ৭২৭, ৭৫৭, ৭৮৭, ৭৯৭, ৯১৯, ৯২৯। আবার পাঁচ অঙ্কের সংখ্যার মধ্যে রয়েছে ৯৩টি মৌলিক সংখ্যা। সাত অঙ্কের সংখ্যার মধ্যে রয়েছে ৬৬৮টি। দুটি ক্রমিক সংখ্যার গুণফলের ক্ষেত্রে প্যালিনড্রোম সংখ্যা তৈরি হয় পাঁচটি ক্ষেত্রে। যেমন ১৬x১৭=২৭২, ৭৭x৭৮=৬০০৬, ৫৩৮x৫৩৯=২৮৯৯৮২, ১৬২১x১৬২২=২৬২৯২৬২, ২৪৫৭x২৪৫৮=৬০৩৯৩০৬। তিনটি ক্রমিক সংখ্যার গুণফলের ক্ষেত্রে প্যালিনড্রোম হয় মাত্র একটি ক্ষেত্রে, ৭৭x৭৮x৭৯=৪৭৪৪৭৪ । আবার প্যালিনড্রোমে বিন্যস্ত দুটি সংখ্যার গুণফল হয় প্যালিনড্রোমে বিন্যস্ত অপর দুটি সংখ্যার গুণফল- এমন মজাদার সংখ্যাও নেহাত কম নেই। দু’চারটে নমুনা দেওয়া যাক- ১৪৪x৪৪১=২৫২x২৫২, ১২২৪x৪২২১=২১৪২x২৪১২, ১৩৩৪৪x৪৪৩৩১=২৩৩৫২x২৫৩৩২ ইত্যাদি। গত শতাব্দীর একমাত্র প্যালিনড্রোমিক বছর ছিল ১৯৯১ সাল। একবিংশ শতাব্দীতে ফেলে আসা ২০০২ সালটিই হল একমাত্র প্যালিনড্রোমিক সাল। আর পরের শতাব্দীতে ২১১২ হবে প্যালিনড্রোমিক বছর। আবার দিন, মাস ও সাল ধরে আট সংখ্যার তারিখ খুঁজে দেখলে বর্তমান শতাব্দীতে কুড়িটি প্যালিনড্রোমিক তারিখ পাওয়া যাবে, যেমন প্রথমটি ছিল ১০.০২.২০০১। তারপর চলে গেছে ২০.০২.২০০২, ১১.০২.২০১১ ও ২১.০২.২০১২। আর আসতে বাকি আছে ১২.০২.২০২১, ২২.০২.২০২২, ১৩.০২.২০৩১, ২৩.০২.২০৩২, ১৪.০২.২০৪১, ২৪.০২.২০৪২, ১৫.০২.২০৫১, ২৫.০২.২০৫২, ১৬.০২.২০৬১, ২৬.০২.২০৬২, ১৭.০২.২০৭১, ২৭.০২.২০৭২, ১৮.০২.২০৮১, ২৮.০২.২০৮২, ১৯.০২.২০৯১ এবং ২৯.০২.২০৯২। সুতরাং বলা যায় এই শতাব্দি হল আট সংখ্যার তারিখের ভিত্তিতে প্যালিনড্রোম সমৃদ্ধ। বিগত সহস্রাব্দে শেষ যে আট সংখ্যার তারিখটি আমরা প্যালিনড্রোম হিসেবে পেয়েছি তা দ্বাদশ শতাব্দীতে - ২৯.১১.১১৯২।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Triantaphylides Dictionary, Portal for the Greek Language। "Combined word search for καρκινικός"www.greek-language.gr। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৫-০৬ 
  2. শান্তনু কৌশিক বরুয়া, সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং:১৮১