প্যারাশুট

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
প্যারাশ্যুট খোলার দৃশ্য

প্যারাশ্যুট বায়ূমন্ডলের মধ্য দিয়ে বাধাহীন ভাবে পতনের সময় বাতাসের বাধাকে কাজে লাগিয়ে বস্তুর পতনের গতি কমাতে পারে। প্যারাশ্যুটকে সাধারণত বাতাসেই বস্তুর গতি ৭৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হয়। সাধারনভাবে প্যারাশ্যুট রেশম অথবা নাইলন দিয়ে তৈরী হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের প্যারাশ্যুটে বিভিন্ন প্রকারের ভার দেওয়া যায় যেমন মানুষ, খাদ্য সামগ্রী, যন্ত্রপাতি, অস্ত্র ইত্যাদি।

উড়োজাহাজ কিংবা অতি দ্রুতগতির গাড়ির গতি কমাতে এবং এবং খেয়া যানকে স্থিতিশীল অবস্থায় আনতে ড্রাগ শ্যুট ব্যাবহার করা হয়[১][২]

প্যারাশ্যুট শব্দটি ফেঞ্চ শব্দ “প্যারাসিট” থেকে এসেছে যা আবার গ্রীক শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। প্যারা একটি গ্রীক শব্দ যার অর্থ দাঁড়ায় রক্ষা করা আর চ্যুট ফরাশি শব্দ যার অর্থ পতন। পরবর্তীতে এটি একটি ফরাশি শংকর শব্দরূপে প্রকাশ পায় যার অর্থ “পতন থেকে রক্ষা করা”।

রেঁনেসা যুগের প্যারাশ্যুট[সম্পাদনা]

একজন অজ্ঞাত শিল্পির আঁকা সবচেয়ে প্রাচীন প্যারাশ্যুটের ছবি (ইতালি- ১৪৭০ সাল)
"উড়ন্ত মানব", ১৫৯৫ সালের ভিরানজিওর প্যারাশ্যুটে ডিজাইন

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন প্যারাশ্যুট তৈরীর চিন্তাভাবনার নিদর্শন পাওয়া যায় রেঁনেসা যুগে। প্যারাশ্যুটের সবচেয়ে প্রাচীন নকশা পাওয়া যায় ১৪৭০ সালের রেঁনেসা যুগের ইতালি থেকে প্রাপ্ত একটি হস্তলিপিতে। সেই নকশাতে দেখা যায় একজন মানুষ একটি কোনক আকৃতির যন্ত্রের সাহায্যে ঝুলে পতনের গতি কমাবার চেষ্টা করছে। একই জিনিষের উন্নততর নকশা পাওয়া যায় আরেকটি ছবিতে, যাতে দেখা যায় যে একজন মানুষ দুটি লাঠির সাহায্যে কাপড় বেঁধে বাতাসের বাধার সাহায্যে পতনের গতি কমানোর চেষ্টা করছে। যদিও সেই প্যারাশ্যুটের সারফেস বাতাসে বাধার সৃষ্টি করে তার ভরের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত গতি কমাতে পারার মত অত বড় ছিল না তবুও এই ছবিটি বলে দেয় তৎকালীন এই উন্নতিই প্যাশ্যুটের উন্নয়নে অবদান রেখেছিলো।

এর অল্প কিছুকাল পর বহু বিদ্যায় পান্ডিত্য অর্জনকারী ব্যাক্তি লিওনার্দো দা ভিঞ্চি তার বই কোডেক্স এটল্যান্টিকাসে প্যারাশ্যুটের একটি জটিল নকশা প্রনয়ন করেন। এই প্যারাশ্যুটটি বহনকারী ব্যাক্তির ভর নিখুতভাবে বহন করতে সক্ষম ছিল। লিওনার্দোর আঁকা প্যারাশ্যুটটি একটি বর্গাকার কাঠের কাঠামোর উপর বসানো ছিলো যা প্যারাশ্যুটের কোনক আকৃতিকে পীরামিড আকৃতি দান করে। কিন্তু এটা জানা যায় না যে এই ইতালিয় আবিষ্কারক তার পূর্ববর্তী নকশাগুলি দেখে অনুপ্রানিত হয়েছিলেন কি না, তবে সম্ভবত তিনি তৎকালীন চিত্রকর ও উদ্ভাবকদের কাছ থেকে ধারনাটি পেয়েছিলেন। লিওনার্দোর পিরামিড নকশার কার্যকারিতা ২০০০ সালে একজন ব্রিটিশ, আড্রিয়ান নিকোলাস এবং ২০০৮ সালে আরো একজন ব্যাক্তি সফলভাবে পরীক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন[৩]। প্রযুক্তি ইতিহাসবিদ লিন হোয়াইট এর মতে এই কোনক ও পিরামিড আকৃতির নকশাগুলো পূর্ব এশিইয়ায় ব্যাবহৃত নকশাগুলোর চেয়ে অধিক সুন্দর ছিল।
লিয়োনার্দো দা ভিঞ্চির প্যারাশ্যুটের নকশাটি ক্রোয়েশিয়ান উদ্ভাবক ফুসটো ভারনাজিয়ো নিরিক্ষন করেন এবং নিজের একটি স্বতন্ত্র নকশা প্রণয়ন করেন। সেই ডিজাইনে তিনি ভিঞ্চির কোনক আকৃতিটি পরিবর্তন করে বর্গাকার আকৃতিটি রেখে দেন এবং সেই ফ্রেমের মধ্যে নৌকার পালের মত কাপড় জুড়ে দেন যেটা পড়ন্ত বস্তুর গতিবেগ কার্যকর ভাবে কমাতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে তার বই “মেশিন নোভা” তে অন্যান্য যন্ত্রের সাথে বর্তমান ডিজাইনের প্যারাশ্যুটের একটি নকশাও সংযুক্ত করেন। ধারণা করা হয় যে ১৬১৭ সালে ফুসটো ভারনাজিয়ো ভেনিসের সেন্ট মার্কস ক্যাম্পান্যাইল থেকে লাফ দিয়ে তার নিজের নকশার প্যারাশ্যুটটি পরীক্ষা করেন। এবং এই পরীক্ষনটির প্রায় তিরিশ বছর পরে ব্রিটিশ রয়েল সোসাইটির স্বচিব জন উইলকিন্স তার বই “Mathematical Magick or, the Wonders that may be Performed by Mechanical Geometry” এ ১৬১৭ সালের এই পরীক্ষনের কথা লিপিবদ্ধ করেন। যদিও জন উইলকিন্স তার বইয়ে তিনি প্যারাশ্যুটের কথা উল্লেখ না করে ওড়ার কথা উল্লেখ করেন। ফুসটো ভারনাজিয়ো এই পরীক্ষনে উলম্বভাবে অবতরন করতে সক্ষম হয়েছিলেন কি না কিংবা তার প্যারাশ্যুট নিয়ে এই জাতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা আর কেউ করেছে কি না তা জানা যায় না।

আধুনিক প্যারাশ্যুট[সম্পাদনা]

আঠারো এবং উনিশ শতক[সম্পাদনা]

উনিশ শতকে আঁকা একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে লুইস সুবাস্টিয়ান লেনোরমান্ড ১৭৮৩ সালে জনসম্মুখে প্যারাশ্যুটের সাহায্যে লাফ দিচ্ছেন
১৭৯৭ সালে প্রথম কাঠামোবিহীন প্যারাশ্যুটের ব্যাবহার হয়
প্যারাশ্যুটের ক্রমান্বয়ে উন্নতির বিভিন্ন অবস্থা।
১৯১১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারীতে একটি ডাচ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্যারাশ্যুটের ছবি।[৪]

আঠারোশ শতকের শেষের দিকে ফরাসি উদ্ভাবক লুইস সুবাস্টিয়ান লেনোরমান্ড প্যারাশ্যুটের আধুনিক নকশা প্রণয়ন করেন। তিনিই ১৭৮৩ সালে সর্বপ্রথম জনসম্মুক্ষে প্যারাশ্যুট নিয়ে লাফ দেন। এর আগে লেনোরমান্ড এর স্কেচ প্রনয়ন করেছিলেন।

এর দুই বছন পরেই ১৭৮৫ সালে লেনোরমান্ড “প্যারা” এবং “শ্যুট” শব্দদুটি যুক্ত করে “প্যারাশ্যুট” শব্দটির উদ্ভাবন করেন। ফরাসি শব্দ “প্যারা” মানে “প্রতিরক্ষা” এবং “শ্যুট” শব্দের আর্থ পতন। শংকর শব্দ প্যারাশ্যুট এর পূর্ন অর্থ হল “পতনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা”

১৭৮৫ সালে জিয়েন পিয়েরি ব্লানচার্ড উষ্ণ বায়ূর বেলুনের বিকল্প হিসেবে এই প্যারাশ্যুটকে উপস্থাপন করেন। এই সময় পরীক্ষামূলক লাফের সময় ভর বা যাত্রী হিসেবে একটি কুকুরকে ব্যাবহার করা হলেও ১৯৯৩ সালের পরে তিনি দাবি করেন যে তিনি নিজেও এই প্যারাশ্যুটটি পরীক্ষা করেছিলেন যদিও এই পরীক্ষা কেউ প্রত্যক্ষদর্শন করেন নি।
উন্নতির ক্রমে প্যারাশ্যুট প্রতিনিয়ত আরো উন্নত হতে থাকে। প্রথম দিককার প্যারাশ্যুটগুলো মূলত কাঠের ফ্রেমে লিলেন দিয়ে বেঁধে তৈরী করা হত তবে পরবর্তীতে ওজন ও শক্তির কথা বিবেচনা করে রেশম দিয়ে তৈরী করা হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে[সম্পাদনা]

চার্লস ব্রডউইক ১৯০৬ সালে উষ্ম বায়ূর বেলুন থেকে ঝাপিয়ে পড়ে আধুনিক প্যারাশ্যুটের উন্নতি পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দেন। তার ওই প্রদর্শনের মূল আকর্ষন ছিল এই যে তিনি তার প্যারাশ্যুটটি একটি ছোট্ট ব্যাগের মধ্যে ভরে পিঠে চাপিয়েছিলেন। এবং প্যারাশ্যুটটি একটি স্থির লাইনের মাধ্যমে খোলা হয়েছিলো যা উষ্ম বায়ূর বেলুনের সাথে বাধা ছিল। ব্রডউইক যখন বেলুন থেকে লাফ দেন তখন স্থির লাইনে টান পরায় তার প্যারাশ্যুটটি খুলে যায় এবং তিনি সফলভাবে মাটিতে অবতরন করেন।

১৯১১ সালে একটি মানব আকৃতির ডামি পুতুলের সাহায্যে ফ্রান্সের প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের উপর থেকে একটি আধুনিক প্যারাশ্যুটের এরেকটি সফল পরীক্ষন করা হয়। সেখানে ডামি পুতুলটির ওজন ছিল ৭৫ কেজি এবং প্যারাশ্যুটের ওজন ছিল ২১ কেজি। পুতুল এবং প্যারাশ্যুট সংযোগকারী তারের দৈর্ঘ ছিল প্রায় ৯ মিটার। পরিধানযোগ্য প্যারাশ্যুটের প্রথম সংস্করন পরীক্ষা করতে গিয়ে ১৯১২ সালের ৪ ফেব্রুরারী ফ্রেঞ্জ রেইচেল্ট মৃত্যুবরন করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ[সম্পাদনা]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী[সম্পাদনা]

প্যারাশ্যুটের প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

সুরক্ষা[সম্পাদনা]

প্যারাশুট অনেক যত্নসহকারে ভাঁজ এবং ব্যাগে ভরানো হয় যাতে এটি বিশ্বস্থতার সাথে খুলে যায়। যদি প্যারাশুট সঠিকভাবে ব্যাগে ভরানো না হয়, তখন এটি অকার্যকর হতে পারে যার ফলে প্যারাশুট সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে খুলতে ব্যার্থ হতে পারে। আমেরিকা বা অন্যান্য উন্নতদেশে জরুরী বা সংরক্ষিত প্যারাশুট রাখা হয় যা প্যারাশুট রিগারদের মাধ্যমে ব্যাগে ভরানো হয়। প্যারাশুট রিগাররা হল যথাযথ মানের উন্নত প্রশিক্ষন এবং প্রশংসাপত্র প্রাপ্ত ব্যাক্তি। যেসব খেলোয়ার স্ক্যাইড্রাইভ করেন তারা প্রত্যেকেই নিজের প্যারাশুট প্রাথমিক প্রধান প্যারাশুট ব্যাগে ভরানোর জন্য প্রশিক্ষন নিয়ে থাকেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Ballistic recovery systems US 4607814 A, Boris Popov, Aug 26, 1986
  2. http://www.airspacemag.com/flight-today/How-Things-Work-Whole-Airplane-Parachute.html
  3. BBC: Da Vinci's Parachute Flies (2000); FoxNews: Swiss Man Safely Uses Leonardo da Vinci Parachute (2008)
  4. De Prins der Geillustreerde Bladen, February 18, 1911, p. 88-89.