বিষয়বস্তুতে চলুন

প্যারাডাইস লস্ট

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

প্যারাডাইস লস্ট (ইংরেজি: Paradise Lost, বাংলায় প্রচলিত অর্থ "হারানো স্বর্গ") ইংরেজ কবি জন মিল্টন (১৬০৮-১৬৭৪) রচিত ব্ল্যাংক ভার্স তথা মিলহীন ছন্দে লেখা একটি মহাকাব্য। কাব্যটির মূল বিষয়বস্তু বাইবেলে বর্ণিত মানবজাতির পতনের কাহিনি, অর্থাৎ পতিত দেবদূত শয়তানের প্ররোচনায় আদমইভের প্রলুব্ধ হওয়া এবং তাদের ইডেন উদ্যান থেকে বিতাড়িত হওয়া। ১৬৬৭ সালে প্রকাশিত প্রথম সংস্করণে কাব্যটি দশটি খণ্ডে এবং দশ হাজারেরও বেশি পঙক্তিতে বিভক্ত ছিল। ১৬৭৪ সালে দ্বিতীয় সংস্করণে এটি রোমান কবি ভার্জিলের ঈনিদ মহাকাব্যের অনুকরণে বারোটি খণ্ডে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়, সাথে যুক্ত হয় কিছু সংশোধনী।[] এই কাব্যকে মিল্টনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ইংরেজি ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে তার খ্যাতি প্রতিষ্ঠায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।[]

প্যারাডাইস লস্ট
জন মিল্টন রচিত
প্রথম সংস্করণের (১৬৬৭) শিরোনাম পৃষ্ঠা
দেশইংল্যান্ড
ভাষাইংরেজি
ধরনমহাকাব্য, খ্রিস্টীয় পুরাণ
বিন্যাসব্ল্যাংক ভার্সেরচিত মহাকাব্য
ছন্দআইয়াম্বিক পেন্টামিটার
প্রকাশকস্যামুয়েল সিমন্স
প্রকাশের তারিখ১৬৬৭

কাব্যটির কেন্দ্রীয় বিষয় স্বাধীন ইচ্ছা এবং অবাধ্যতার নৈতিক পরিণতি। মিল্টন এই কাব্যের মাধ্যমে মানুষের প্রতি ঈশ্বরের কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, যাতে নিয়তি, মানুষের কর্তৃত্ব এবং ভালো-মন্দের প্রকৃতি সম্পর্কিত প্রশ্নের সমাধান খোঁজা হয়। কাহিনি শুরু হয় মধ্যপথ থেকে (ইন মিডিয়াস রেস রীতিতে), যেখানে শয়তান ও তার অনুসারী পতিত দেবদূতেরা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের পর নরকে নিক্ষিপ্ত হয়। মিল্টনের চিত্রিত শয়তান চরিত্রটি একইসাথে মহিমান্বিত ও করুণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী, এবং সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম জটিল ও বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।[]

আদম ও ইভের চিত্রায়নে তাদের মানবিকতা তুলে ধরা হয়েছে, পতনের আগের নিষ্পাপতা এবং পাপ সম্পর্কে পরবর্তী সচেতনতার মধ্য দিয়ে। তাদের কাহিনির মাধ্যমে মিল্টন মানব সম্পর্কের জটিলতা, ব্যক্তিস্বাধীনতাঐশ্বরিক আইনের প্রতি আনুগত্যের মধ্যকার টানাপোড়েন এবং মুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। পাপ সত্ত্বেও কাব্যটি আশাবাদী সুরে শেষ হয়, কারণ আদম ও ইভ স্বর্গ ত্যাগ করলেও তাদের সামনে খ্রিস্টের মাধ্যমে পরিত্রাণের প্রতিশ্রুতি থাকে।

কাব্যটি এর ভাষাগত সমৃদ্ধি, ধর্মতাত্ত্বিক গভীরতা এবং দার্শনিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য প্রশংসিত হয়েছে। তবে শয়তানের চিত্রায়ন নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি, কারণ অনেক পাঠক তাকে বীরোচিত বা সহানুভূতিশীল চরিত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

কাহিনি সংক্ষেপ

[সম্পাদনা]

কাব্যটি মহাকাব্যের প্রথাগত রীতি অনুসরণ করে ইন মিডিয়াস রেস, অর্থাৎ ঘটনার মাঝখান থেকে শুরু হয়, পটভূমির কাহিনি পরে বর্ণিত হয়।

মিল্টনের কাহিনির দুটি ধারা রয়েছে, একটি শয়তান (লুসিফার) সংক্রান্ত, অপরটি আদম ও ইভ সংক্রান্ত। শয়তান ও অন্যান্য পতিত দেবদূতেরা পরাজিত হয়ে নরকে বিতাড়িত হওয়ার পর কাহিনি শুরু হয়। নরকের রাজধানী প্যানডিমোনিয়ামে শয়তান তার বাগ্মিতার মাধ্যমে অনুসারীদের সংগঠিত করে, যাতে তাকে সাহায্য করে বীলজেবাব; মোলক, বেলিয়াল ও ম্যামনও উপস্থিত থাকে। বিতর্কের শেষে শয়তান স্বেচ্ছায় নতুন সৃষ্ট পৃথিবী ও ঈশ্বরের সর্বাধিক প্রিয় সৃষ্টি মানবজাতিকে কলুষিত করার দায়িত্ব নেয়।[] নরকের বাইরের বিশৃঙ্খলা অতিক্রম করে সে ঈশ্বরের নতুন জাগতিক জগতে এবং পরবর্তীতে ইডেন উদ্যানে প্রবেশ করে।

স্বর্গের যুদ্ধ সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা দেন প্রধান দেবদূত রাফায়েল। বিশ্বস্ত দেবদূত ও শয়তানের বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ তিন দিন ধরে চলে। শেষ যুদ্ধে ঈশ্বরপুত্র একাই বিদ্রোহী দেবদূতদের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করেন। এরপর ঈশ্বর সমগ্র জগৎ সৃষ্টি করেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি আদম ও ইভের সৃষ্টি। ঈশ্বর তাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও সমস্ত সৃষ্টির উপর কর্তৃত্ব দিলেও একটি স্পষ্ট আদেশ দেন, যেন তারা ভালো-মন্দ জ্ঞানের বৃক্ষের ফল না খায়, নইলে মৃত্যুদণ্ড হবে।

আদম ও ইভকে নিষ্পাপ অবস্থাতেও প্রণয় ও যৌন সম্পর্কযুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে। শয়তান সাপের রূপ ধরে ইভের অহংবোধকে কাজে লাগিয়ে এবং বাগ্মিতার মাধ্যমে প্রতারিত করে তাকে বৃক্ষের ফল খাওয়াতে সফল হয়। আদম, ইভের পাপের কথা জেনে সচেতনভাবেই একই পাপ করেন। তিনি ইভকে বলেন, যেহেতু সে তার নিজের মাংস থেকে সৃষ্ট, তাই তারা একে অপরের সাথে বাঁধা— ইভ মারা গেলে তাকেও মরতে হবে। এভাবে মিল্টন আদমকে একদিকে বীরোচিত চরিত্র হিসেবে, অন্যদিকে ইভের চেয়ে বড় পাপী হিসেবে চিত্রিত করেন, কারণ তিনি জেনেশুনে ভুল কাজ করেন।

ফল খাওয়ার পর আদম ও ইভ প্রথমবারের মতো কামনা অনুভব করেন, যা তাদের পরবর্তী মিলনকে আরও তীব্র করে তোলে। প্রথমে আদম বিশ্বাস করেন যে ফল খাওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু শীঘ্রই তারা ঘুমিয়ে পড়েন এবং ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখেন, জেগে ওঠার পর প্রথমবারের মতো অপরাধবোধ ও লজ্জা অনুভব করেন। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে ভয়ংকর অপরাধ করেছেন বুঝতে পেরে তারা একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকেন।

এদিকে শয়তান বিজয়ীর বেশে নরকে ফিরে আসে এবং তার সহযোগী পতিত দেবদূতদের প্রশংসা কুড়ায়। সে তাদের জানায় কীভাবে তাদের পরিকল্পনা সফল হয়েছে এবং মানবজাতি পতিত হয়েছে, ফলে তারা পৃথিবীর উপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব পেয়েছে। কিন্তু বক্তৃতা শেষ হতে না হতেই তার চারপাশের পতিত দেবদূতেরা সাপে পরিণত হয়, এবং শয়তান নিজেও অঙ্গহীন, কথা বলতে অক্ষম সাপে রূপান্তরিত হয়। এভাবে তারা একই অপরাধ ভাগাভাগি করার মতোই একই শাস্তি ভোগ করে।

ইভ আদমের কাছে পুনর্মিলনের আকুতি জানায়। তার উৎসাহে তারা ঈশ্বরের কাছে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে। প্রধান দেবদূত মাইকেলের দেখানো দর্শনে আদম মহাপ্লাবন পর্যন্ত মানবজাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবগত হন। এই দর্শন দেখে আদম অত্যন্ত ব্যথিত হন, তাই মাইকেল তাকে যিশু খ্রিস্টের (যাকে মাইকেল "রাজা মশীহ" বলে অভিহিত করেন) মাধ্যমে আদি পাপ থেকে মানবজাতির সম্ভাব্য মুক্তির কথাও জানান। আদম ও ইভকে ইডেন থেকে বিতাড়িত করা হয়, আর মাইকেল বলেন যে আদম হয়তো "নিজের মধ্যেই আরও সুখী এক স্বর্গ" খুঁজে পাবেন। এখন থেকে আদম ও ইভের সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক আরও দূরবর্তী, কারণ ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান হলেও অদৃশ্য, যা ইডেন উদ্যানে থাকা তার সাক্ষাৎ রূপের বিপরীত।[]

মিল্টন কখন প্যারাডাইস লস্ট রচনা করেছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। ১৬৫২ সালে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর মিল্টন সম্পূর্ণ কাব্যটি অন্যের সাহায্যে মৌখিকভাবে বলে লিখিয়েছিলেন। তিনি প্রায়শই অসুস্থ থাকতেন এবং ১৬৫৮ সালে দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যাথরিন উডকক ও তাদের শিশুকন্যার মৃত্যুর পর মানসিকভাবেও কষ্ট পেয়েছিলেন। কাব্যটি লেখার সময় তিনি অন্ধ ছিলেন এই বিষয়টি পরবর্তীকালে, বিশেষত রোমান্টিক যুগে, বহু চিত্রশিল্পীর কাজের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।

প্রকাশনা

[সম্পাদনা]

১৬৬৭ সালের সংস্করণে প্যারাডাইস লস্ট দশটি খণ্ডে বিভক্ত ছিল। তবে ১৬৭৪ সালের সংস্করণে এটি বারোটি খণ্ডে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়।[] পরবর্তী মুদ্রণগুলোতে প্রতিটি খণ্ডের শুরুতে সংক্ষিপ্ত সারাংশ ("আর্গুমেন্টস") যুক্ত করা হয়। কাব্যটির প্রথম প্রকাশক ছিলেন স্যামুয়েল সিমন্স।

রচনাশৈলী

[সম্পাদনা]

বাইবেলীয় মহাকাব্য

[সম্পাদনা]

প্যারাডাইস লস্ট রচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল এক নতুন ধরনের মহাকাব্য সৃষ্টি করা, যা বহুঈশ্বরবাদী গ্রিক বা রোমান পুরাণের পরিবর্তে ইংরেজি খ্রিস্টীয় নৈতিকতার উপযোগী। এই লক্ষ্য কাব্যের শুরু থেকেই স্পষ্ট, যেখানে মিল্টন কাব্যিক প্রেরণার জন্য আহ্বান জানানোর ধ্রুপদী রীতি ব্যবহার করেন, তবে গ্রিক মিউজদের পরিবর্তে খ্রিস্টীয় ঈশ্বরকে "স্বর্গীয় মিউজ" বলে সম্বোধন করেন। অন্যান্য ধ্রুপদী মহাকাব্যিক উপাদানের মধ্যে রয়েছে ইন মিডিয়াস রেস শুরু, পাতালে যাত্রা, বৃহৎ পরিসরের যুদ্ধ এবং উচ্চমার্গীয় কাব্যভাষা। ধ্রুপদী মহাকাব্যের নায়ক আকিলিস, ওডিসিউস বা ঈনিয়াসকে সামরিক শক্তি ও কূটকৌশলের জন্য বীর হিসেবে দেখানো হতো, যা প্রায়ই ক্রোধ, অহংকার বা লালসার সাথে সম্পর্কিত। মিল্টন এসব বৈশিষ্ট্য শয়তানের মধ্যে আরোপ করেন এবং প্রেম, করুণা, বিনয় ও আত্মত্যাগের জন্য ঈশ্বরপুত্রকে বীর হিসেবে চিত্রিত করেন।

ব্ল্যাংক ভার্স

[সম্পাদনা]

কাব্যটি ব্ল্যাংক ভার্সে রচিত, অর্থাৎ পঙক্তিগুলো ছন্দোবদ্ধ আইয়াম্বিক পেন্টামিটার হলেও তাতে অন্তমিল নেই। মিল্টন প্রথম ব্ল্যাংক ভার্স ব্যবহারকারী না হলেও তার ব্যবহার পরবর্তীকালে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং তিনি এই রীতির জন্যই খ্যাত হয়ে ওঠেন। মিল্টন তার ভূমিকায় ব্যাখ্যা করেছেন কেন তিনি হোমার ও ভার্জিলের অনুকরণে অন্তমিলহীন ইংরেজি বীরত্বপূর্ণ ছন্দে কাব্যটি রচনা করেছেন।[]

চরিত্রসমূহ

[সম্পাদনা]

শয়তান

[সম্পাদনা]

শয়তান, পূর্বনাম লুসিফার, কাব্যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়। সে একজন করুণ চরিত্র যে বিখ্যাতভাবে ঘোষণা করে: "স্বর্গে দাসত্ব করার চেয়ে নরকে রাজত্ব করা উত্তম"। সে ঈশ্বরকে স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে দেখত এবং তার শাসনের অধীন হতে অস্বীকার করে। শয়তান নিজের চারপাশে অনুগত দেবদূতদের এক বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। তার এই বিদ্রোহের মূলে রয়েছে অহংকার ও ঈর্ষা, কারণ ঈশ্বর যখন ঈশ্বরপুত্রকে "অভিষিক্ত" ত্রাণকর্তা হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন শয়তান নিজেকে হেয় মনে করে।

শয়তানকে একজন প্ররোচক ও ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে, যার বাগ্মিতা অন্যদের প্রভাবিত করতে এবং পতিত দেবদূতদের সংগঠিত করতে সক্ষম। কিছু গবেষক মন্তব্য করেছেন যে মিল্টনের ব্যবহৃত বীরত্বপূর্ণ ভাষা, যেমন শয়তানের "দৃঢ় মন", "অজেয় ইচ্ছাশক্তি" এবং "কখনো নতি স্বীকার না করার সাহস"— এসব তার চরিত্রে মানবিক জটিলতা যোগ করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো একজন মহাকাব্যিক নায়কের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও তার নৈতিক অবক্ষয় ও বিদ্রোহ এই আদর্শকে খর্ব করে।

শয়তান সম্পর্কে মতামত প্রায়ই তীব্রভাবে বিভক্ত। মিল্টন শয়তানকে সমস্ত মন্দের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করলেও, কিছু পাঠক তাকে সূক্ষ্ম বা সহানুভূতিশীল চরিত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বিশেষত রোমান্টিক যুগের সমালোচক, যেমন উইলিয়াম ব্লেক, লর্ড বায়রন, পার্সি বিশি শেলি এবং উইলিয়াম হ্যাজলিট, শয়তানকে প্যারাডাইস লস্ট-এর নায়ক হিসেবে ব্যাখ্যা করার জন্য পরিচিত। এর বিপরীতে সি. এস. লুইস ও চার্লস উইলিয়ামসের মতো ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান সমালোচকেরা শয়তানকে সহানুভূতিশীল বা বীরোচিত চরিত্র হিসেবে পড়ার বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছেন।

আদম ঈশ্বরের সৃষ্ট প্রথম মানুষ। আদম ঈশ্বরের কাছে একজন সঙ্গী প্রার্থনা করেন, যাকে সে যুক্তিসম্পন্ন আনন্দে অংশগ্রহণ করাতে পারবে, যা কোনো পশুর পক্ষে সম্ভব নয়। ঈশ্বর তার অনুরোধ মঞ্জুর করে ইভকে সৃষ্টি করেন। আদম ইভের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত এবং তার সঙ্গলাভের জন্য ব্যাকুল থাকেন। প্রধান দেবদূত রাফায়েল তাকে সতর্ক করেন যেন আবেগ তার বিচারবুদ্ধিকে প্রভাবিত না করে। কিন্তু ইভের প্রতি আদমের গভীর প্রেমই তার অবাধ্যতার একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাইবেলের আদমের বিপরীতে, মিল্টনের আদম স্বর্গ ত্যাগের আগে প্রধান দেবদূত মাইকেলের মাধ্যমে মানবজাতির ভবিষ্যতের এক ঝলক দেখতে পান, যাতে পুরাতন ও নতুন উভয় নিয়মের কাহিনি অন্তর্ভুক্ত থাকে।

ইভ ঈশ্বরের সৃষ্ট দ্বিতীয় মানুষ। ঈশ্বর আদমের একটি পাঁজর নিয়ে ইভকে গঠন করেন। সৃষ্টির পর জেগে উঠে ইভ একটি হ্রদের ধারে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মুগ্ধ হন, তখনও বুঝতে পারেননি সেটি তারই ছবি। একটি কণ্ঠস্বর তাকে আদমের কাছে নিয়ে যায় এবং তাদের পরস্পরের পরিচয় জানিয়ে দেয়। আদমের সাথে প্রথম সাক্ষাতে ইভ ফিরে যেতে চান জলের প্রতিবিম্বের কাছেই, যা নার্সিসাসের পুরাণকথার প্রতি মিল্টনের ইঙ্গিত। চতুর্থ খণ্ডে ইভ আদমের কাছে তার সৃষ্টির স্মৃতিচারণ করেন, যা কাব্যে ইভের প্রথম সংলাপ।

নবম খণ্ডে আদম ও ইভের মধ্যে একটি গার্হস্থ্য বিতর্ক দেখা যায়, তারা কি বাগানের ভিন্ন অংশে আলাদাভাবে কাজ করবে কিনা তা নিয়ে। ইভ যুক্তি দেন যে আলাদাভাবে কাজ করলে অধিক কার্যকর হবে, এবং শেষপর্যন্ত আদম রাজি হন। শয়তানের প্রলোভন নির্ভর করছিল ইভকে একা পাওয়ার উপর। সাপের মুখে প্রবেশ করে শয়তান ইভের কাছে গিয়ে তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে থাকে, যা তাকে প্রায় ঐশ্বরিক করে তুলেছে বলে দাবি করে। ইভ জিজ্ঞেস করলে কীভাবে একটি সাপ কথা বলতে পারে, শয়তান জানায় যে জ্ঞানের বৃক্ষের ফল খাওয়ার ফলেই তার কথা বলা ও চিন্তা করার ক্ষমতা এসেছে, এবং একই ফল খেলে ইভও দেবত্ব অর্জন করতে পারবে। এভাবে শয়তান ইভের বাধ্যতাকে জয় করে; ইভ ফল খায়।[]

ঈশ্বরপুত্র

[সম্পাদনা]

ঈশ্বরপুত্র সেই আত্মা যিনি পরবর্তীতে যিশু খ্রিস্ট রূপে মানবদেহ ধারণ করবেন, যদিও কাব্যে তাকে সরাসরি নামে উল্লেখ করা হয়নি কারণ তিনি তখনও মানবরূপে অবতীর্ণ হননি। ঈশ্বরপুত্রই কাব্যের প্রকৃত নায়ক এবং তিনি অসীম শক্তিশালী— তিনি একাই শয়তান ও তার অনুসারীদের পরাজিত করে নরকে বিতাড়িত করেন। মানবজাতির পতনের পর ঈশ্বরপুত্র আদম ও ইভকে ঈশ্বরের বিচার সম্পর্কে জানান।

ঈশ্বর পিতা

[সম্পাদনা]

ঈশ্বর পিতা স্বর্গ, নরক, পৃথিবী এবং সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টা, যা তিনি নিজ পুত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করেন। মিল্টন ঈশ্বরকে সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, এমন এক সত্তা হিসেবে যাকে শয়তানের বিশাল দেবদূত বাহিনীও উৎখাত করতে পারে না।

রাফায়েল

[সম্পাদনা]

রাফায়েল একজন প্রধান দেবদূত, যাকে ঈশ্বর ইডেনে পাঠান আদম ও ইভকে শয়তানের বিরুদ্ধে সবল করার জন্য। পঞ্চম থেকে অষ্টম খণ্ড পর্যন্ত আদম ও ইভের সাথে তার কথোপকথন বিস্তৃত, যেখানে স্বর্গের দেবদূতদের প্রকৃতি, সৃষ্টির প্রক্রিয়া এবং স্বর্গের যুদ্ধের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।

মাইকেল

[সম্পাদনা]

মাইকেল একজন প্রধান দেবদূত, যিনি সামরিক দক্ষতায় শ্রেষ্ঠ। ঈশ্বর তাকে ইডেনে পাঠান আদম ও ইভকে বিতাড়িত করার জন্য, তবে তাদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে সান্ত্বনা দেওয়ার দায়িত্বও তাকে দেওয়া হয়।

আবদিয়েল

[সম্পাদনা]

আবদিয়েল একজন সেরাফ, হিব্রু ভাষায় যার অর্থ "ঈশ্বরের সেবক"। শয়তানের বিদ্রোহের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সে একাই শয়তানের বিরুদ্ধে যুক্তি দেখায় এবং বিদ্রোহে যোগ দিতে অস্বীকার করে। স্বর্গের যুদ্ধে সেই প্রথম শয়তানের বিরুদ্ধে আঘাত হানে।

পাপ (সিন)

[সম্পাদনা]

পাপ কাব্যে উপস্থাপিত প্রথম নারী চরিত্র, দ্বিতীয় খণ্ডে যার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তাকে ভয়ংকর সর্পরূপী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা হোমারের ওডিসিতে সাইলা, এডমন্ড স্পেন্সারের ফেয়ারি কুইনে এরর এবং গ্রিক পুরাণের লেমিয়ার সাথে তুলনীয়। সে শয়তানের কন্যা ও প্রেমিকা, স্বর্গেই জন্মলাভ করে। দেবদূতদের পতনের পর ঈশ্বর তাকে নরকের দরজা পাহারার দায়িত্ব দেন।

মৃত্যু

[সম্পাদনা]

মৃত্যু কাব্যে অস্পষ্ট, ছায়াময় এক অবয়ব হিসেবে উপস্থাপিত। দ্বিতীয় খণ্ডে নরকের দরজায় শয়তানের সাথে মৃত্যুর সাক্ষাৎ ঘটে। পাপের অজাচারী সন্তান হিসেবে মৃত্যুর জন্ম, ফলে তাকে শয়তানের বিদ্রোহের সরাসরি পরিণতি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

বীলজেবাব

[সম্পাদনা]

বীলজেবাব শয়তানের দ্বিতীয় সেনাপতি এবং স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর দানবদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনকারী চরিত্র। তাকে কূটকৌশলী, প্ররোচক ও রাজনৈতিকভাবে দূরদর্শী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

স্থান

[সম্পাদনা]

কাব্যের প্রথম খণ্ডে নরককে বর্ণনা করা হয়েছে এক ধ্বংসপ্রাপ্ত, বিরান ও বন্য স্থান হিসেবে, যেখানে আগুনের শিখা আলো নয় বরং "দৃশ্যমান অন্ধকার" ছড়ায়। প্যানডিমোনিয়াম নামক নগরী নরকে নির্মিত হয় শয়তানের অনুসারী ম্যামনের নেতৃত্বে।

বিষয়বস্তু

[সম্পাদনা]

বিবাহ

[সম্পাদনা]

মিল্টনের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আদর্শ বিবাহ সম্পর্কে। তার স্ত্রী মেরি পাওয়েল বিয়ের কয়েক সপ্তাহ পরই তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার এক বছর পর মিল্টন বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত তার মতামত নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। কাব্যে আদম ও ইভের সম্পর্কে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে বিবাহের প্রতি মিল্টনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন।

মূর্তিপূজা

[সম্পাদনা]

মিল্টনের সমসাময়িকরা তাকে অনেকাংশে র‍্যাডিক্যাল মনে করতেন, বিশেষত তার প্রজাতন্ত্রী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অপ্রচলিত ধর্মতাত্ত্বিক মতামতের কারণে। মূর্তিপূজা সম্পর্কে মিল্টনের ধারণা কাব্যে গভীরভাবে প্রোথিত। একাদশ খণ্ডে আদম তার পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য ঈশ্বরের উদ্দেশে বেদি নির্মাণের প্রস্তাব দেন, কিন্তু দেবদূত মাইকেল ব্যাখ্যা করেন যে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করতে ভৌত বস্তু নির্মাণের প্রয়োজন নেই।

রাজতন্ত্রের সমালোচনা

[সম্পাদনা]

যদিও শয়তানের বাহিনী শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত হয়, শয়তান নরকে ক্ষমতার আসনে বসে তার অনুগত পতিত দেবদূতদের নিয়ে শাসন শুরু করে। মিল্টন পণ্ডিত জন লিওনার্ড স্বর্গ ও নরকের মধ্যকার এই "ধর্মদ্রোহী যুদ্ধ"কে গৃহযুদ্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। মিল্টন ইংরেজ রাজতন্ত্র উৎখাতকারী জনগণের সাহসের প্রশংসা করলেও কাব্যে তিনি "স্বর্গের ভীতিপ্রদ রাজা"র পক্ষ নিয়েছেন, যা সমালোচকদের কাছে একটি আকর্ষণীয় বৈপরীত্য হিসেবে বিবেচিত।

নৈতিক অস্পষ্টতা

[সম্পাদনা]

সমালোচক উইলিয়াম এম্পসন দাবি করেছিলেন যে কাব্যটি নৈতিকভাবে অস্পষ্ট, যেখানে শয়তানের জটিল চরিত্রায়ন এই দাবির একটি বড় কারণ। এর বিপরীতে সি. এস. লুইস যুক্তি দিয়েছেন যে কাব্যটি প্রকৃতপক্ষে একটি খ্রিস্টীয় নীতিকথা, এবং যেকোনো কাজ বিচার করার প্রথম শর্ত হলো সেটি কী উদ্দেশ্যে নির্মিত তা বোঝা।

স্বাধীন ইচ্ছা

[সম্পাদনা]

কাব্যের অন্যতম প্রধান বিষয় স্বাধীন ইচ্ছা, যা মানুষের প্রতি ঈশ্বরের কর্মকাণ্ডকে যৌক্তিক প্রমাণ করার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিছু গবেষকের মতে আদম ও ইভের চরিত্রের মাধ্যমে মিল্টন ঈশ্বরের প্রতি বাধ্য থাকার সিদ্ধান্তকে তুলে ধরেছেন, যদিও ইভের আত্মমুগ্ধতা এবং ইভের প্রতি আদমের মোহ তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বিশ্বতত্ত্ব

[সম্পাদনা]

প্যারাডাইস লস্ট-এ মিল্টন এমনভাবে বিশ্বজগতের কাঠামো বর্ণনা করেছেন যা সরাসরি সূর্যকেন্দ্রিক বা পৃথিবীকেন্দ্রিক কোনো মতবাদকে সমর্থন করে না, বরং কাব্য রচনার সময় মিল্টন নিজেই এক অনন্য কাঠামো তৈরি করেছেন। কাব্যে বিশ্বজগৎ তিনটি প্রধান স্তরে বিভক্ত— স্বর্গ, বিশৃঙ্খলা (কেয়স) এবং নরক, যেখানে পৃথিবী স্বর্গ থেকে নেমে আসা এক সোনালি শৃঙ্খলে ঝুলে থাকে।

ব্যাখ্যা ও সমালোচনা

[সম্পাদনা]

অষ্টাদশ শতকের সমালোচক

[সম্পাদনা]

লেখক ও সমালোচক স্যামুয়েল জনসন লিখেছিলেন যে প্যারাডাইস লস্ট মিল্টনের বিস্ময় সৃষ্টির অসাধারণ ক্ষমতা প্রদর্শন করে।

উইলিয়াম ব্লেক তার দ্য ম্যারেজ অব হেভেন অ্যান্ড হেল গ্রন্থে বিখ্যাতভাবে মন্তব্য করেছিলেন যে মিল্টন যখন দেবদূত ও ঈশ্বর সম্পর্কে লিখেছেন তখন তিনি শৃঙ্খলিত অবস্থায় লিখেছেন, আর যখন শয়তান ও নরক সম্পর্কে লিখেছেন তখন মুক্ত অবস্থায়— কারণ তিনি প্রকৃত কবি ছিলেন এবং না জেনেই শয়তানের পক্ষের লোক ছিলেন। এই মন্তব্যটি অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের কিছু রোমান্টিক ইংরেজ কবির মিল্টন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে।

খ্রিস্টীয় মহাকাব্য হিসেবে

[সম্পাদনা]

পণ্ডিত টোবিয়াস গ্রেগরির মতে প্রাথমিক আধুনিক যুগের মহাকাব্য রচয়িতাদের মধ্যে মিল্টন ছিলেন সবচেয়ে ধর্মতত্ত্বে সুপণ্ডিত। গির্জা এই কাব্যের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একে নিষিদ্ধ গ্রন্থের তালিকায় (ইনডেক্স লিব্রোরুম প্রোহিবিটোরুম) অন্তর্ভুক্ত করে।

চিত্রকলা

[সম্পাদনা]

প্যারাডাইস লস্ট-এর সাথে প্রথম চিত্রকর্ম যুক্ত করা হয় ১৬৮৮ সালের চতুর্থ সংস্করণে, যেখানে প্রতিটি খণ্ডের আগে একটি করে খোদাইচিত্র স্থান পায়, যার অধিকাংশ জন ব্যাপটিস্ট মেডিনার আঁকা। কাব্যটির উল্লেখযোগ্য চিত্রশিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন উইলিয়াম ব্লেক, গুস্তাভ দোরে এবং হেনরি ফুজেলি। এছাড়া জন মার্টিন, রিচার্ড ওয়েস্টল এবং ফ্রান্সিস হেম্যানের মতো আরও অনেক শিল্পী কাব্যটির চিত্র এঁকেছেন। সালভাদর দালিও ১৯৭৪ সালে কাব্যটি অবলম্বনে দশটি রঙিন খোদাইচিত্র তৈরি করেছিলেন।

অনুবাদ

[সম্পাদনা]

তামিল

[সম্পাদনা]

প্যারাডাইস লস্ট-এর প্রথম খণ্ড ১৮৯৫ সালে তামিল ভাষায় স্বর্গ নীকম মুথারকাণ্ডম শিরোনামে অনুবাদ করেন ভি. পি. সুব্রামানিয়া মুদালিয়ার (১৮৫৭-১৯৪৬)। অনুবাদক এতে টীকা ও মিল্টনের জীবনী যুক্ত করেছিলেন।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "Paradise Lost"। Encyclopaedia Britannica। {{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: লেখা "Summary & Facts" উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  2. "Paradise Lost Summary and Study Guide"। SuperSummary।
  3. 1 2 "Paradise Lost"। Encyclopaedia Britannica। {{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: লেখা "Summary & Facts" উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  4. 1 2 "Paradise Lost: Full Poem Summary"। SparkNotes।
  5. "Introduction to Paradise Lost"। Poetry Foundation।
  6. "Paradise Lost: Full Poem Summary"। SparkNotes।

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]