পারমাণবিক ব্যাটারি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
HD.6D.205 (10822491265).jpg

পারমাণবিক ব্যাটারি, নিউক্লিয়ার ব্যাটারি, রেডিওআইসোটোপ ব্যাটারি অথবা রেডিওআইসোটোপ জেনারেটর হচ্ছে এমন এক ধরনের যন্ত্র যা তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ক্ষয় থেকে প্রাপ্ত শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পারমাণবিক চুল্লীগুলির মতোই এরা পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করে, কিন্তু এক্ষেত্রে পার্থক্যটি হচ্ছে এগুলিতে কোনো ধরনের শৃঙ্খল/শিকল বিক্রিয়া সংঘটিত হয় না। সাধারণভাবে এগুলিকে ব্যাটারি বলা হলেও, এগুলি কিন্তু কোনো ইলেক্ট্রোকেমিকাল ব্যাটারি নয় এবং এগুলিতে চার্জিং ও রিচার্জিং এর ব্যবস্থা নেই। তুলনামূলকভাবে পারমাণবিক ব্যাটারিগুলির দাম অনেক বেশি হলেও এগুলির অত্যন্ত দীর্ঘ আয়ু এবং উচ্চ শক্তি-ঘনত্ব রয়েছে, একারণে মহাকাশযান, পেসমেকার, আন্ডারওয়াটার সিস্টেম ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় সায়েন্টিফিক স্টেশনসমূহ, যেগুলি অনেক দীর্ঘ সময়ের জন্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে সক্রিয় থাকা অত্যাবশ্যক, এগুলিতেই শক্তির উৎস হিসেবে প্রধানত পারমাণবিক ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। [১][২]

১৯১৩ সালে পারমাণবিক ব্যাটারি প্রযুক্তির বিকাশ শুরু হয়েছিল, যখন হেনরি মোসলে সর্বপ্রথম প্রদর্শন করেছিলেন যে কিভাবে চার্জযুক্ত কণার বিকিরণ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকজুড়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা যাবে এমন শক্তি-উৎসের প্রয়োজনীয়তা থাকায়, পারমাণবিক ব্যাটারি প্রযুক্তির উপর যথেষ্ট গভীরভাবে গবেষণা করা হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে আরসিএ ছোট রেডিও-রিসিভার এবং হিয়ারিং এইডগুলোতে ব্যবহারের জন্য ছোট পারমাণবিক ব্যাটারি নিয়ে গবেষণা করেছিল। [৩] ১৯৫০ এর দশকের শুরুর দিকে আরসিএ -এর প্রাথমিক গবেষণা ও অগ্রগতির পর থেকে পারমাণবিক শক্তি উৎস থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি রুপান্তরকরণের অনেক ধরনের পদ্ধতি তৈরী করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক নীতিগুলি সুপরিচিত, তবে আধুনিক ন্যানো-স্কেল প্রযুক্তি ও নতুন ওয়াইড-ব্যান্ডগ্যাপ সেমিকন্ডাক্টরগুলির মাধ্যমে নতুন অনেক ধরনের ডিভাইস তৈরি হয়েছে এবং এগুলোতে এমন অনেক আকর্ষণীয় বস্তুগত বৈশিষ্ট্য পাওয়া গিয়েছে যা সম্পর্কে আগে কখনো জানা ছিলনা।

শক্তি রূপান্তরের প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে পারমাণবিক ব্যাটারিগুলিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: তাপীয় (থার্মাল) রূপান্তরকারী এবংঅ-তাপীয় (নন-থার্মাল) রূপান্তরকারী । তাপীয় রূপান্তরকারী ধরনের ব্যাটারিগুলো পারমাণবিক ক্ষয় থেকে উৎপন্ন তাপশক্তির কিছু অংশকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর (আরটিজি), যা প্রায়শই মহাকাশযানে ব্যবহৃত হয়। অপরদিকে অ-তাপীয় রূপান্তরকারী ব্যাটারিগুলো তাপ উৎপন্ন হবার পূর্বেই সরাসরি পারমাণবিক বিকিরণ থেকে শক্তি গ্রহণ করে। এধরনের ব্যাটারিগুলোর সাইজ সহজেই ছোট করা সম্ভব এবং এগুলো চালানোর জন্য কোনো ধরনের থার্মাল গ্রেডিয়েন্ট প্রয়োজন না হওয়ায়, ছোটখাটো বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনে ব্যবহারের জন্য এগুলো যথোপযুক্ত। এর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো বিটাভোল্টাইক সেল ।

পারমাণবিক ব্যাটারিগুলি সাধারণত ০.১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর্মদক্ষতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। তবে উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন বিটাভোল্টাইক ডিভাইসগুলির কর্মদক্ষতা ৬-৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। [৪]

সকল নিউক্লিয়ার ব্যাটারি সিস্টেমের ডিজাইনগত দিক দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই মিল রয়েছে তবে ব্যাটারির কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যাটারির সাইজ ছোট করার উদ্দেশ্যে ডিজাইনে অনেক সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনা হয়। যেকোনো নিউক্লিয়ার ব্যাটারি প্রযুক্তির কর্মক্ষমতা মূলত ৩ টি বিষয় দিয়ে বিবেচনা করা হয়ঃ রেডিওআইসোটপের পিছনের পদার্থবিদ্যা, রেডিয়েশন ট্রান্সপোর্ট এবং শক্তি রূপান্তর ট্রান্সডিউসার।[৫]

তাপীয় রূপান্তর[সম্পাদনা]

থার্মিয়োনিক রূপান্তর[সম্পাদনা]

থার্মিয়োনিক রূপান্তরক একটি গরম তড়িৎদ্বার দিয়ে গঠিত যা তাপীয়ভাবে ইলেক্ট্রন নির্গত করে যেগুলো স্পেস-চার্জ বাঁধা অতিক্রম করে একটি শীতল তড়িৎদ্বারে গিয়ে পৌঁছায়, ফলে আউটপুট হিসেবে একটি কার্যকর শক্তি পাওয়া যায়। তড়িৎদ্বারের কার্যাপেক্ষকের(ওয়ার্ক-ফাংশন) মান উন্নয়নের জন্য এবং একইসাথে ইলেকট্রন-স্পেস-চার্জের প্রভাব নিষ্ক্রিয় করতে আয়ন সরবরাহের ( তাপীয় আয়নীকরণের মাধ্যমে) জন্য সিজিয়াম বাষ্প ব্যবহৃত হয়। [৬]

থার্মোইলেকট্রিক রূপান্তর[সম্পাদনা]

পারমাণবিক শক্তি কমিশন কর্তৃক প্রস্তুতকৃত রেডিওআইসোটোপ-শক্তি দ্বারা চালিত কার্ডিয়াক পেসমেকার, যেটির মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ হৃৎপিন্ডের স্পন্দনকে উদ্দীপিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সার্কা ১৯৬৭।

রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটরে (আরটিজি) থার্মোকাপল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রতিটি থার্মোকাপল দুইটি তার দিয়ে তৈরী এবং তার দুইটি পরস্পর ভিন্ন ধাতু (অথবা অন্য কোনো পদার্থ) দ্বারা গঠিত। প্রতিটি তারের দৈর্ঘ্য বরাবর যে তাপমাত্রার গ্রেডিয়েন্ট থাকে, তা তারের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে একটি ভোল্টেজ গ্রেডিয়েন্ট উৎপন্ন করে; তবে এক্ষেত্রে ভিন্ন পদার্থসমূহ প্রতি এক ডিগ্রি তাপমাত্রা-ব্যবধানের জন্য ভিন্ন মানের ভোল্টেজ উৎপন্ন করে। প্রথমে তার দুটির প্রত্যেকটির যেকোনো এক প্রান্তকে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করা হয় এবং সেই প্রান্তকে তাপে উত্তপ্ত করা হয় এবং অপর প্রান্তটিকে শীতল করা হয়, যার ফলে তারদুটির সংযোগবিহীন প্রান্তদ্বয়ের মাঝে একটি ব্যবহারযোগ্য তবে ক্ষুদ্র মানের(মিলিভোল্ট) ভোল্টেজ উৎপন্ন হয়। যেহেতু তাপ গরম অংশ থেকে শীতল অংশের দিকে প্রবাহিত হয়, এজন্য প্রায়োগিকক্ষেত্রে বৃহৎ আকারে ভোল্টেজ(অথবা কারেন্ট) উৎপাদনের জন্য অনেকগুলো থার্মোকাপল সিরিজ সংযোগে(অথবা সমান্তরাল সংযোগে) সংযুক্ত করা হয়ে থাকে। ধাতব থার্মোকাপলগুলির তাপশক্তি থেকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরের কর্মদক্ষতা কম হয়। যাহোক, বিস্‌মাথ টেলুরাইড এবং সিলিকন জার্মেনিয়ামের মত অর্ধপরিবাহী পদার্থে আধান ও বাহকের ঘনত্ব সঠিকভাবে সামঞ্জস্যকরণের মাধ্যমে আরো উচ্চ কর্মদক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। [৭]

থার্মোফটোভোল্টাইক রূপান্তর[সম্পাদনা]

থার্মোফটোভোল্টাইক(টিপিভি) সেল্গুলি ফটোভোল্টাইক সেলের মতোই একই নীতি অনুসারে কাজ করে, তবে এক্ষেত্রে পার্থক্যটি হচ্ছে, থার্মোভোল্টাইক সেল্গুলি একটি গরম ধাতবপৃষ্ঠ থেকে নির্গত অবলোহিত আলোকরশ্মি-কে (দৃশ্যমান আলোকরশ্মির পরিবর্তে) বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে। থার্মোইলেকট্রিক কাপলের তুলনায় থার্মোফটোভোল্টাইক সেলগুলির দক্ষতা কিছুটা বেশি এবং এগুলোকে থার্মোইলেকট্রিক কাপলের উপরে স্থাপন করার মাধ্যমে সম্ভাব্য দক্ষতা দ্বিগুণ পর্যন্ত করা সম্ভব। হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের টিপিভি(থার্মোফটোভোল্টাইক) রেডিওআইসোটোপ শক্তি রূপান্তর প্রযুক্তি উন্নয়ন - এর লক্ষ্য হচ্ছে থার্মোকাপলের সাথে একযোগে থার্মোভোল্টাইক সেলের সমন্বয়করণ, যার ফলে এখনকার থার্মোইলেকট্রিক রেডিওআইসোটোপ জেনারেটরগুলির তুলনায় সিস্টেমের দক্ষতা ৩ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত উন্নয়ন করা যাবে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

স্টারলিং জেনারেটর[সম্পাদনা]

স্টারলিং রেডিওআইসোটোপ জেনারেটর হচ্ছে একধরনের স্টারলিং ইঞ্জিন যা রেডিওআইসোটোপের কারণে তৈরীকৃত তাপমাত্রা-ব্যবধান দ্বারা চালিত হয়। এর আরো অধিক দক্ষ সংস্করণ হচ্ছে এডভান্সড স্টারলিং রেডিওআইসোটোপ জেনারেটর যেটি নাসা-এর তত্ত্বাবধানে নির্মানাধীন ছিল, কিন্ত অতিবৃহৎমাত্রায় খরচজনিত কারণে ২০১৩ সালে এর কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।

অতাপীয় রূপান্তর[সম্পাদনা]

অতাপীয় রূপান্তরকগুলো তাপ উৎপন্ন হবার পূর্বেই নির্গত বিকিরণ থেকে শক্তি গ্রহণ করে। থার্মোইলেকট্রিক এবং থার্মিয়োনিক রূপান্তরকগুলির মত এদের আউটপুট তাপমাত্রা-ব্যবধানের উপর নির্ভরশীল নয়। ব্যবহৃত কণার ধরন এবং শক্তি রূপান্তরকরণের পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে অ-তাপীয় জেনারেটরগুলিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক রূপান্তর[সম্পাদনা]

যখন কোনো পরিবাহীতে চার্জ জমা হয়ে একটি তড়িৎবিভব সৃষ্টি হয়, তখন নির্গত চার্জযুক্ত কণাগুলি থেকে শক্তি আহরণ করা যায়। যদি শক্তির কোনো ক্ষয় না হয়, তাহলে বিকিরিত কণাগুলির শক্তি পর্যন্ত ভোল্টেজ বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব এবং এর মান কয়েক কিলোভোল্ট(বিটা রেডিয়েশনের ক্ষেত্রে) থেকে মেগাভোল্ট(আলফা রেডিয়েশনের ক্ষেত্রে) পর্যন্ত হতে পারে। এই ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক শক্তি -কে নিম্নলিখিত উপায়গুলির যেকোনোটির মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

ডিরেক্ট-চার্জিং জেনারেটর[সম্পাদনা]

একটি ডিরেক্ট-চার্জিং জেনারেটর একটি ক্যাপাসিটর নিয়ে গঠিত যেটি একটি ইলেক্ট্রোডের উপর জমা হওয়া তেজস্ক্রিয় পদার্থের স্তরের আধানযুক্ত কণাগুলির প্রবাহের ফলে উৎপন্ন বিদ্যুতপ্রবাহ দ্বারা চার্জড হয়। এখানে ফাঁকা স্থানটি হয় শূন্যস্থান কিংবা ডাই-ইলেক্ট্রিক পদার্থ দ্বারা পূর্ণ থাকতে পারে। এক্ষেত্রে ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত বিটা কণা অথবা ধনাত্বক চার্জে চার্জিত আলফা কণা, পজিট্রন অথবা নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়ার প্রাপ্ত উৎপাদ্-কে‌ ব্যবহার করা যেতে পারে। যদিও এধরনের নিউক্লিয়ার-ইলেকট্রিক জেনারেটরের বিকাশ শুরু হয়েছিল সেই ১৯১৩ সালে, তারপরেও অতীতে খুব অল্প কিছুক্ষেত্রেই এর প্রয়োগ দেখা গিয়েছে, এর কারণ হচ্ছে ডিরেক্ট-চার্জিং জেনারেটরগুলো থেকে অত্যন্ত সামান্য মাত্রায় তড়িৎ প্রবাহ এবং অসুবিধাজনকভাবে উচ্চ মাত্রায় ভোল্টেজ তৈরী হয়। এক্ষেত্রে অসিলেটর/ট্রান্সফরমার ব্যবহার করে ভোল্টেজ কমানো হয়, এরপর রেক্টিফায়ার ব্যবহার করে এসি পাওয়ারকে ডিরেক্ট কারেন্টে রূপান্তরিত করা হয়।

ইংরেজ পদার্থবিদ এইচ. জি. জে. মোসলে সর্বপ্রথম এধরনের জেনারেটর তৈরী করেছিলেন। মোসলের যন্ত্রপাতির মধ্যে ছিল কাঁচের তৈরী একটি গ্লোব যার ভেতরে সিল্ভারিং করা ছিল এবং কেন্দ্রে ছিল একটি রেডিয়াম নিঃসারক যা একটি তারের অগ্রভাগের সাথে সংযুক্ত ছিল। রেডিয়াম থেকে চার্জযুক্ত কণাগুলো গতিশীল হয়ে দ্রুত গোলকের ভিতরের পৃষ্ঠে চলে যাওয়ায় বিদ্যুৎ প্রবাহের সৃষ্টি হত। ১৯৪৫ সালে এসেও তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিকিরণ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম ব্যাটারি তৈরীর বিভিন্ন পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টাকে মোসলের তৈরী মডেল অনেক সাহায্য করেছে।

ইলেকট্রোমেকানিকাল রূপান্তর[সম্পাদনা]

ইলেকট্রোমেকানিকাল পারমাণবিক ব্যাটারিগুলোর ক্ষেত্রে, দুটি প্লেটের মাঝে চার্জ জমা হবার কারণে তড়িৎ বিভব পার্থক্য তৈরী হয়, যার ফলে একটি নমনীয় প্লেট অপর প্লেটটির দিকে অগ্রসর হতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত প্লেট দুটি একে অপরকে স্পর্শ করছে, এরপর প্লেট দুটি চার্জমুক্ত হয়ে যায় ও উভয় প্লেটের তড়িৎ বিভব সমান হয়ে যায় এবং তারপর নমনীয় প্লেটটি আগের অবস্থানের দিকে স্পন্দিত হতে থাকে। এখানে যে যান্ত্রিক গতির সৃষ্টি হয়, সেটিকে পাইজোইলেক্ট্রিক পদার্থের ফ্লেক্সিং অথবা লিনিয়ার জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তর করা সম্ভব। এক্ষেত্রে মিলিওয়াট এককে পাল্‌স রূপে পাওয়ার উৎপন্ন হয় যা মূলত চার্জিং এর হারের উপর নির্ভরশীল, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই হার প্রতি সেকেন্ডে বেশ অনেকবার হয়ে থাকে (৩৫ হার্টজ)। [৮]

রেডিওভোল্টাইক রূপান্তর[সম্পাদনা]

একটি ফটোভোল্টাইক কোষ যেভাবে ফোটনকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে অনেকটা একইরকমভাবে রেডিওভোল্টাইক(আরভি) ডিভাইস একটি অর্ধপরিবাহী-জংশন ব্যবহার করে আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের শক্তিকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে। রেডিয়েশন বা বিকিরণের ধরনের উপর ভিত্তি করে ডিভাইসগুলোকে আলফাভোল্টাইক(এ ভি, আলফা ভি), বিটাভোল্টাইক(বি ভি, বিটা ভি) এবং/অথবা গামাভোল্টাইক(জি ভি/ গামা ভি) বলা হয়ে থাকে। যেহেতু (স্বল্প-শক্তি)বিটা নিঃসারকগুলি ন্যূনতম পরিমাণে রেডিয়েশনগত ক্ষতির সৃষ্টি করে যার ফলে সক্রিয়কাল(অপারেটিং-লাইফ) দীর্ঘ হয় এবং শিল্ডিং কম হয়, একারণে বিটাভোল্টাইক ডিভাইসগুলোই প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। সম্ভাব্য উচ্চতর দক্ষতার কারণে আলফাভোল্টাইক এবং (আরো সম্প্রতি) গামাভোল্টাইক ডিভাইসগুলো মানুষের আগ্রহের কারণ হচ্ছে।

আলফাভোল্টাইক রূপান্তর[সম্পাদনা]

আলফাভোল্টাইক ডিভাইসগুলি একটি অর্ধপরিবাহী-জংশন ব্যবহার করে উচ্চ-শক্তি সম্পন্ন আলফা কণা থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন করে।[৯][১০]

বিটাভোল্টাইক রূপান্তর[সম্পাদনা]

বিটাভোল্টাইক ডিভাইসগুলি অর্ধপরিবাহী-জংশন ব্যবহার করে উচ্চ-শক্তি সম্পন্ন বিটা কণা (ইলেকট্রন) থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন করে। এক্ষেত্রে বিটা-কণার উৎস হিসেবে সাধারণত হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ট্রিটিয়াম ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

স্বল্প-ক্ষমতা সম্পন্ন বিভিন্ন ইলেক্ট্রিকাল অ্যাপ্লিকেশন যেখানে শক্তি-উৎস দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকা আবশ্যক, যেমন- ইমপ্ল্যান্টেবল মেডিকেল ডিভাইস অথবা মিলিটারি এবং মহাকাশ সংক্রান্ত বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন, এসকল ক্ষেত্রের জন্য বিটাভোল্টাইক ডিভাইসগুলি বিশেষভাবে উপযুক্ত।

গামাভোল্টাইক রূপান্তর[সম্পাদনা]

গামাভোল্টাইক ডিভাইসগুলি অর্ধপরিবাহী-জংশন ব্যবহার করে উচ্চ-শক্তি সম্পন্ন গামা কণা (উচ্চ-শক্তি সম্পন্ন ফোটন) থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন করে। সম্প্রতিই (২০১০ এর দশকে) শুধুমাত্র এগুলোকে বিবেচনায় আনা হয়েছে। [১১][১২][১৩]

পেরোভস্কাইট সোলার সেলগুলিতে এক ধরনের গামাভোল্টাইক প্রভাব দেখা গিয়েছে। [১১] আরেকটি ডিজাইনে গামা-কণার বিক্ষেপণ প্রত্যক্ষ হয়েছে, এই বিক্ষেপণ ততক্ষণ পর্যন্তই হয় যতক্ষণ না পর্যন্ত এর শক্তি যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পেয়ে প্রচলিত ফটোভোল্টাইক সেল্গুলির শোষণের উপযুক্ত হয়। হীরক এবং শটকি ডায়োড ব্যবহার করে গামাভোল্টাইক ডিভাইসের ডিজাইন করা নিয়েও অনেক অনুসন্ধান করা হচ্ছে।[১২][১৩]

রেডিওফটোভোল্টাইক (অপটোইলেক্ট্রিক) রূপান্তর[সম্পাদনা]

একটি <i id="mwqg">রেডিওফটোভোল্টাইক</i> (আরপিভি) ডিভাইসে পরোক্ষভাবে শক্তির রূপান্তর ঘটেঃ প্রথমে একটি রেডিওলুমিনাসেন্ট পদার্থ(একটি সিন্টিলেটর বা ফসফর) ব্যবহার করে নির্গত কণিকাসমূহকে আলোতে রূপান্তর করা হয়, পরবর্তীতে একটি ফটোভোল্টাইক সেল ব্যবহার করে আলোকশক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়। কণিকার ধরনের উপর ভিত্তি করে শক্তি রূপান্তরের ধরনকে আরো যথাযথভাবে আলফাফটোভোল্টাইক (এপিভি বা আলফা-পিভি)[১৪], বিটাফটোভোল্টাইক (বিপিভি বা বিটা-পিভি) [১৫] কিংবা গামাফটোভোল্টাইক (জিপিভি বা গামা-পিভি) হিসেবে সুনির্দিষ্টকরণ সম্ভব।[১৬]

শক্তি-রূপান্তরের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য রেডিওফটোভোল্টাইক রূপান্তরকে রেডিওভোল্টাইক রূপান্তরের সাথে সমন্বিত করা যেতে পারে। [১৭]

পেসমেকার[সম্পাদনা]

মেডট্রনিক এবং অ্যালকাটেল, নিউমেক এনইউ -৫ নামের একটি প্লুটোনিয়াম চালিত পেসমেকার তৈরী করেছিল, যা প্লুটোনিয়াম-২৩৮ এর ২.৫ সিআই স্লাগ দ্বারা শক্তিপ্রাপ্ত হত। ১৯৭০ সালে সর্বপ্রথম পেসমেকারটি মানব রোগীর শরীরে স্থাপন করা হয়। ১৯৭০ এর দশকে যেসব ১৩৯ নিউমেক এনইউ-৫ নিউক্লিয়ার পেসমেকার মানব শরীরে স্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলো আর কখনোই প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়বে না, নন-নিউক্লিয়ার পেসমেকারগুলোর তুলনায় এটা একটা সুবিধা, কারণ নন-নিউক্লিয়ার পেসমেকারগুলোর ক্ষেত্রে প্রতি ৫ থেকে ১০ বছর পরপর প্রতিস্থাপন করা আবশ্যক। প্লুটোনিয়াম ব্যাটারিগুলো, প্লুটোনিয়ামের অর্ধায়ু ৮৮ বছরের চেয়েও বেশি সময় ধরে সার্কিটকে সক্রিয় রাখার মত পর্যাপ্ত শক্তি তৈরী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।[১৮][১৯][২০][২১]

ব্যবহৃত রেডিওআইসোটোপসমূহ[সম্পাদনা]

পারমাণবিক ব্যাটারিগুলি রেডিওআইসোটোপ ব্যবহার করে যা স্বল্প-শক্তি সম্পন্ন বিটা কণা অথবা মাঝেমধ্যে পরিবর্তনশীল শক্তিসম্পন্ন আলফা কণা সৃষ্টি করে। উচ্চ ভেদনক্ষমতা সম্পন্ন ব্রেমস্‌ট্রেলাং রেডিয়েশনের (এটির জন্য ভারী শিল্ডিং/প্রতিরোধক প্রয়োজন) উৎপাদন রোধ করতে স্বল্প-শক্তি সম্পন্ন বিটা কণা প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে ট্রিটিয়াম, নিকেল-৬৩, প্রমিথিয়াম -১৪৭, এবং টেকনিশিয়াম-৯৯ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। প্লুটোনিয়াম-২৩৮, কিউরিয়াম-২৪২, কিউরিয়াম-২৪৪ এবং স্ট্রনশিয়াম-৯০ ব্যবহার করা হয়েছে। [২২]

মাইক্রো-ব্যাটারি[সম্পাদনা]

ম্যাডিসনের উইস্‌কনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক প্রকৌশলীরা পোলোনিয়াম বা কিউরিয়াম জাতীয় পদার্থের তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসকে কাজে লাগিয়ে বৈদ্যুতিক শক্তি সৃষ্টি করতে সক্ষম খুবই ক্ষুদ্রাকার ব্যাটারি উৎপাদনের সম্ভাবনাসমূহ নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। একটি সমন্বিত, স্ব-চালিত অ্যাপ্লিকেশনের উদাহরণস্বরূপ, গবেষকরা একটি স্পন্দনশীল ক্যান্টিলিভার বিম তৈরী করেছে যেটি পুনরায় জ্বালানী প্রয়োগের কোনো রকম প্রয়োজন ছাড়াই অতিদীর্ঘ পর্যায়কাল সম্পন্ন ধারাবাহিক, পর্যায়বৃত্ত স্পন্দনগতিতে গতিশীল থাকতে সক্ষম। এই ক্যান্টিলিভার নিয়ে চলমান কাজসমূহ থেকে দেখা যায় যে, ক্যান্টিলিভারটি রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি প্রেরণ করতে সক্ষম যার ফলে এমইএমএস (মাইক্রোইলেক্ট্রোমেকানিকাল সিস্টেম) ডিভাইসগুলো একে অপরের সাথে তারবিহীন সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে।

এই মাইক্রো-ব্যাটারিগুলি খুবই হালকা হয়ে থাকে এবং এমইএমএস ডিভাইসগুলিতে ব্যবহারের জন্য ও ন্যানোডিভাইসগুলিতে প্রয়োজনীয় শক্তির জন্য এই মাইক্রো-ব্যাটারিগুলি পর্যাপ্ত পরিমাণে শক্তি সরবরাহ করে। [২৩]

বিকিরিত শক্তি, বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং এই বৈদ্যুতিক শক্তি ডিভাইসের যে জায়গায় প্রসেসর ও শক্তি সরবরাহকারী মাইক্রো-ব্যাটারি থাকে ততটুকু জায়গার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। [২৪] :১৮০–১৮১

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

  • বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারির তালিকা
  • বাটন সেল
  • নির্দিষ্ট নিউক্লিয়ার আইসোমারের এর দীর্ঘ সময় ধরে উত্তেজিত থাকা নিউক্লিয়াস থেকে আবিষ্ট গামা রশ্মির নির্গমন।
  • রেডিওআইসোটোপ হিটার ইউনিট
  • রেডিওআইসোটোপ রকেট এবং পারমাণবিক বৈদ্যুতিক রকেট

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "A nuclear battery the size and thickness of a penny". Gizmag, 9 October 2009.
  2. "Tiny 'nuclear batteries' unveiled". BBC News, Thursday, 8 October 2009.
  3. "Atomic Battery Converts Radioactivity Directly Into Electricity". Popular Mechanics, April 1954, p. 87.
  4. "Thermoelectric Generators"electronicbus.com। ১০ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ 
  5. Nuclear Batteries and Radioisotopes। Springer। পৃষ্ঠা ২। 
  6. Fitzpatrick, G. O.। "Thermionic converter"। ওএসটিআই 6377296 
  7. McCoy, J.C। "An overview of the Radioisotope Thermoelectric Generator Transportation System Program"। ওএসটিআই 168371 
  8. Lal, Amit; Rajesh Duggirala (২০০৫)। "Pervasive Power:A Radioisotope-Powered Piezoelectric Generator" (PDF): 53–61। ডিওআই:10.1109/MPRV.2005.21। ২১ জুন ২০০৭ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। 
  9. NASA Glenn Research Center, Alpha- and Beta-voltaics ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৮ অক্টোবর ২০১১ তারিখে (accessed 4 October 2011)
  10. Sheila G. Bailey, David M. Wilt, Ryne P. Raffaelle, and Stephanie L. Castro, Alpha-Voltaic Power Source Designs Investigated ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৬ জুলাই ২০১০ তারিখে, Research and Technology 2005, NASA TM-2006-214016, (accessed 4 October 2011)
  11. Segawa, Cojocaru, Uchida (৭ নভেম্বর ২০১৬)। "Gammavoltaic Property of Perovskite Solar Cell - Toward the Novel Nuclear Power Generation"Proceedings of International Conference Asia-Pacific Hybrid and Organic Photovoltaics (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১ সেপ্টেম্বর ২০২০ 
  12. MacKenzie, Gordon (অক্টোবর ২০১৭)। "A Diamond Gammavoltaic Cell"UK Research and Innovation 
  13. Mackenzie, Robbie (১৯ জুন ২০২০)। "Diamond Gammavoltaic Cells for Biasless Gamma Dosimetry"South West Nuclear Hub (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১ সেপ্টেম্বর ২০২০ 
  14. Purbandari, Dessy; Ferdiansjah, Ferdiansjah (২০১৯)। "Optimization of the Alpha Energy Deposited in Radioluminescence Thin Film for Alphaphotovoltaic Application" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৩১ আগস্ট ২০২০ 
  15. Berman, Veronika; Litz, Marc Stuart (২০১৮)। "Investigation of Electrical Power Degradation in Beta Photovoltaic (βPV) and Beta Voltaic (βV) Power Sources Using 63Ni and 147Pm" 
  16. LIAKOS, John K. (১ ডিসেম্বর ২০১১)। "Gamma-Ray-Driven Photovoltaic Cells via a Scintillator Interface": 1428–1436। আইএসএসএন 0022-3131ডিওআই:10.1080/18811248.2011.9711836অবাধে প্রবেশযোগ্য 
  17. Guo, Xiao; Liu, Yunpeng (১ জুন ২০১৮)। "Multi-level radioisotope batteries based on 60Co γ source and Radio-voltaic/Radio-photovoltaic dual effects" (ইংরেজি ভাষায়): 119–128। আইএসএসএন 0924-4247ডিওআই:10.1016/j.sna.2018.04.010 
  18. "MedTech Memoirs: The Plutonium-Powered Pacemaker".
  19. "Nuclear pacemaker still energized after 34 years".
  20. R L Shoup. "Nuclear-Powered Cardiac Pacemakers".
  21. Crystal Phend. "Extra Battery Life Not Always a Plus for Nuclear-Powered Pacemaker".
  22. Bindu, K.C.; Harmon, Frank (২০১৩)। "Optimization of commercial scale photonuclear production of radioisotopes": 407–411। ডিওআই:10.1063/1.4802359 
  23. Waldner, Jean-Baptiste (২০০৭)। Inventer l'Ordinateur du XXIème SiècleHermes Science। পৃষ্ঠা 172। আইএসবিএন 978-2-7462-1516-0 
  24. Waldner, Jean-Baptiste (২০০৮)। Nanocomputers and Swarm IntelligenceISTE John Wiley & Sonsআইএসবিএন 978-1-84704-002-2 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]