জ্যোতিষশাস্ত্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Hand-coloured version of the anonymous Flammarion woodcut.
Astrological glyphs for some of the planets of astrology, including the Sun, the Earth, the Moon, and Pluto.

জ্যোতিষশাস্ত্র (ইংরেজি: Astrology) হল কিছু পদ্ধতি, প্রথা এবং বিশ্বাসের সমষ্টি যাতে মহাকাশে জ্যোতিষ্কসমূহের আপেক্ষিক অবস্থান এবং তৎসংশ্লিষ্ট তথ্যাদির মাধ্যমে মানব জীবন, মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং মানবীয় ও বহির্জাগতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়। কিছু লোক বিশ্বাস করেন যে জ্যোতিষ্কসমূহের আপেক্ষিক অবস্থান পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষের জীবনধারায় প্রভাব বিস্তার করে।[১] যিনি জ্যোতিষশাস্ত্রের মাধ্যমে কর্মজীবন অতিবাহিত করেন, তিনি জ্যোতিষী নামে পরিচিত। তিনি গ্রহের অবস্থান নির্ণয় করে ব্যক্তির জীবনধারা সম্বন্ধে আগাম ধারণা তুলে ধরেন। আধুনিককালের জ্যোতিষীগণ প্রতীকের মাধ্যমে জ্যোতিষশাস্ত্র অধ্যয়ন করে থাকেন।[২][৩] এছাড়াও এটি একধরনের কলাশাস্ত্র বা ভবিষ্যৎকথন হিসেবে পরিচিত।[৪][৫] জ্যোতিষীগণ প্রায়ই বলে থাকেন যে, তাঁরা গ্রহ-তারার অবস্থানের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানতে পারেন কিন্তু তারা প্রকৃতপক্ষে তা করতে পারেন না।[১]

প্রাচীনকালে জ্যোতিষশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। যেমন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ইয়োহানেস কেপলার একই সাথে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং জ্যোতিষী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে মানুষ বুঝতে পারে যে, জ্যোতিষমাস্ত্র পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক এবং অযৌক্তিক। এটা ভাবা হাস্যকর যে, লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের কোন তারা পৃথিবীর কোন ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করছে। তারপরও জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি অনেক মানুষের এখনও বিশ্বাস আছে। এজন্য বিজ্ঞানীদের অনেকেই জ্যোতিষশাস্ত্র যে ভ্রান্ত সেটা সাধারণ মানুষকে বোঝানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। যেমন, ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য হিউম্যানিস্ট পত্রিকায় অনেক বিজ্ঞানী আনুষ্ঠানিকভাবে জ্যোতিষ শাস্ত্রের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।[৬] এছাড়া বিখ্যাত বিজ্ঞান লেখক কার্ল সেগান তার একটি প্রামাণ্য চিত্রে এ নিয়ে আলোচনা করেছেন।[৭]

জন্মরাশি[সম্পাদনা]

প্রতিটি শাস্ত্রের মতো জ্যোতিষশাস্ত্রেরও কিছু একক আছে। জন্মরাশি সেই এককগুলোর একটি।পৃথিবীকে কেন্দ্র করে চন্দ্রের আবর্তন পথকে প্রায় ৩৬০ ডিগ্রী সমমানের একটি বৃত্ত আকারে এঁকে ১২ টি অংশে বিভক্ত করলে প্রায় ৩০ ডিগ্রী সমমানের যে বৃত্তচাপ পাওয়া যায় তার প্রত‌্যেকটিকে এক একটি রাশি বলা হয়। বাংলায় বারোটি রাশির প্রচলিত নামঃ ১) মেষরাশি ২) বৃষরাশি ৩) মিথুনরাশি ৪) কর্কটরাশি ৫) সিংহরাশি ৬) কন্যারাশি ৭) তুলারাশি ৮) বৃশ্চিকরাশি ৯) ধনুরাশি ১০) মকররাশি ১১) কুম্ভরাশি ১২) মীনরাশি। চন্দ্র প্রায় ৫৪ ঘন্টায় একটি রাশি অর্থাৎ ৩০ ডিগ্রী অতিক্রম করে।শিশুর জন্মের স্থানীয় সময়ে চন্দ্র যে রাশিতে থাকে সে রাশিকে শিশুর জন্মরাশি বলে। বর্ষপঞ্জিতে চন্দ্রের অবস্থান উল্লেখ থাকে। বর্তমানে পঞ্চাঙ্গ বিষয়ক জ্যোতিষশাস্ত্র সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটে জন্মতারিখ ও সময় দিয়ে চন্দ্রের অবস্থান জানা যায়। যেমনঃ ১৯৭৮ ইংরেজী সালের ৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ২টা ৩০ মিনিটে (সফটওয়্যারে ৮ নভেম্বর ২:৩০ পি.এম. দিতে হবে) চন্দ্র তুলারাশিতে ছিল তাই জন্মগ্রহণকারীর রাশি হল তুলারাশি।[৮]

পাশ্চাত্য এবং ভারতীয় জ্যোতিষের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পাশ্চাত্য জ্যোতিষ সূর্যভিত্তিক। এখানে সূর্যোদয়ের সময়কে একটি চিহ্ন বা রাশি বলা হয়। যেমন ২১ মার্চ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সূর্যোদয়ের চিহ্ন মেষরাশি। এ সময় যার জন্ম হয় তার রাশি হয় মেষ। জ্যোতিষ গণনায় ভারতীয় পদ্ধতিতে চন্দ্রকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। চন্দ্র এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে অবস্থান পরিবর্তন করে আড়াই দিনে। এভাবে চন্দ্র এক মাসের মধ্যে সৌরপথের বারোটি চিহ্ন বা রাশিই অতিক্রম করে। ভারতীয় জ্যোতিষে ২৭টি নক্ষত্রপূঞ্জকেও বিবেচনা করা হয়। জ্যোতিষী কারও কোষ্ঠী নির্ণয়ে তার জন্মচিহ্ন (চন্দ্রচিহ্ন) এবং জন্মনক্ষত্র উভয়ই বিবেচনা করেন।[৯]

জন্মলগ্ন[সম্পাদনা]

লগ্ন হচ্ছে সূর্যকর্তৃক মেষাদি রাশি সংক্রমণের মুহূর্ত, অর্থাৎ সূর্য যখন যে রাশিতে অবস্থান করে তখন লগ্নও হয় সে রাশির নামানুসারে। যেমন সূর্যের মেষ রাশিতে অবস্থানকালে যদি কারও জন্ম হয় তাহলে তার লগ্ন হবে মেষলগ্ন। লগ্নের মেয়াদ হলো দুই ঘণ্টা, অর্থাৎ দুই ঘণ্টা পরপর লগ্ন পরিবর্তিত হয়। কোষ্ঠী তৈরির সময় এ রাশি, গ্রহ ও লগ্ন নির্ণয়ে কোনোরূপ ভুল হলে জাতকের ভবিষ্যৎ গণনাও ভুল হবে।

শুভাশুভত্ব[সম্পাদনা]

রবি মঙ্গল শনি রাহু ও কেতু সর্বদা পাপ ফল দিয়ে থাকেন।কৃষ্ণাষ্টমী হতে শুক্লাসপ্তমী পর্যন্ত ক্ষীণ চন্দ্রও পাপ ফল প্রদান করেন।বুধ পাপ গ্রহযুক্ত হলে পাপ অন্যথায় শুভ গ্রহ বলে বিবেচিত হবে।বৃহস্পতি ও শুক্র সর্বদাই শুভফল দিয়ে থাকেন।সাধারণত পাপগ্রহ যে ঘরে বা ভাবে থাকেন সেই ভাবের অশুভ এবং শুভ গ্রহ যে ভাবে থাকেন সেই ভাবের শুভ হয়।দশমে ও একাদশে যে গ্রহই থাকুন শুভফল প্রদান করেন। ষষ্ঠস্থ অর্থাৎ শত্রুভাবস্থ শুভগ্রহ শত্রু বৃদ্ধি করেন।অনুরুপভাবে শত্রু ভাবস্থ পাপ গ্রহ ভাবের অশুভ করায় অর্থাৎ শত্রুর অশুভ করায় কার্য্যতপক্ষে জাতকেরই শুভ করেন।তৃতীয় অর্থাৎ ভাতৃভাবস্থ শুভ গ্রহ জাতকের পক্ষে অশুভ ফলপ্রদ।কিন্তু ভাতৃ পক্ষে শুভ। লগ্ন চতুর্থ সপ্তম ও দশম রাশির নাম কেন্দ্র। লগ্ন নবম ও পঞ্চম রাশির নাম ত্রিকোণ।কেন্দ্রত্ব ও কোণত্ব উভয়ের বিচার ক্ষেত্রে লগ্নের কেন্দ্রত্বই প্রধান বলে বিবেচিত।কেন্দ্রস্থ শুভ গ্রহ বিশেষ শুভ ফল এবং কেন্দ্রস্থ পাপগ্রহ বিশেষ ভাবে অশুভ ফল প্রদান করেন। ষষ্ঠ অষ্টম ও দ্বাদশ স্থানের নামান্তর দুঃস্থান।দুঃস্থানে যত কম গ্রহ অবস্থান করেন ততই ভালো।

জন্মপত্রিকা[সম্পাদনা]

কোষ্ঠী জন্মপত্রিকা। এতে নবজাতকের জন্মসময়ে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও সঞ্চরণ অনুযায়ী তার সমগ্র জীবনের শুভাশুভ নির্ণয় করা হয়। এ জন্য জন্মসময়টি সঠিকভাবে নির্ণীত হওয়া প্রয়োজন, তা না হলে কোষ্ঠী গণনা সঠিক হয় না। প্রাচীনকালে বিশেষ পদ্ধতিতে এ জন্মসময় সূক্ষ্মভাবে নির্ণয় করা হতো।[১০]

বারোটি ভাব[সম্পাদনা]

কোষ্ঠী অনুযায়ী কারও ভবিষ্যৎ গণনার সময় তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা বারোটি ভাগে ভাগ করা হয়, যার নাম ‘ভাব’। বারোটি ভাব হচ্ছে তনু (শরীর), ধন, সহজ (সহোদর), বন্ধু (এবং মাতা), পুত্র (এবং বিদ্যা), রিপু (এবং রোগ), জায়া (বা স্বামী), নিধন (মৃত্যু), ধর্ম (এবং ভাগ্য), কর্ম (এবং পিতা), আয় ও ব্যয়। যে রাশিতে লগ্ন অবস্থিত সেখান থেকে তনুর বিচার শুরু হয়, তারপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ভাব গণনা করা হয়।[১১]

পঞ্জিকা[সম্পাদনা]

পঞ্জিকা বছরের প্রতিদিনের তারিখ, তিথি, শুভাশুভ ক্ষণ, লগ্ন, যোগ, রাশিফল, বিভিন্ন পর্বদিন ইত্যাদি সংবলিত গ্রন্থ। একে পঞ্জী বা পাঁজিও বলা হয়। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে একে বলা হয়েছে ‘পঞ্চাঙ্গ’। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও এটি এই নামে পরিচিত। এর কারণ এতে বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণ প্রধানত এই পাঁচটি অঙ্গ থাকে। বাংলায় অবশ্য এটি পঞ্জিকা নামেই সুপরিচিত। [১২]

যোটক বিচার[সম্পাদনা]

বিবাহের পূর্বে বর ও কন্যা পরস্পেরর জন্মরাশ্যাদি নিয়ে যে শুভাশুভ বিচার করা হয় তাহাকে যোটক বিচার বলা হয়। সে যোটক বিচার আট প্রকারঃ বর্ণকুট, বশ্যকুট, তারাকুট, যোনিকুট, গ্রহমৈত্রীকুট, গণমৈত্রীকুট, রাশি কুট, ত্রীনাড়ীকুট। [১৩]

হস্তরেখাবিদ্যা[সম্পাদনা]

হস্তরেখাবিদ্যা হাত ও হাতের রেখা বিশ্লেষণের মাধ্যমে কারও মানসিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের শুভাশুভ নির্ধারণ করার বিদ্যা। প্রাচীন ব্যাবিলন ও কালদিয়া ( Chaldea) অঞ্চলে এ বিদ্যার শুরু বলে মনে করা হয় এবং সেখান থেকে তা সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। [১৪]

ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্রের গুরুত্ব যে কতখানি , আজকের যুগে সারা বিশ্বের মানুষ তা জানতে পেরেছেন। মানুষের করতল এবং তার ভেতরের রেখাসমূহ দেখে – তার ভূত – ভবিষ্যৎ বর্তমান বেশ সহজেই বলা যায় । হাজার হাজার বছরেরও পূর্ব থেকে ভারতে এই জ্যোতিষ – বিদ্যা ও সামুদ্রিক বিদ্যা চলে আসছে । তারপর কালক্রমে যত দিন যেতে থাকে, ততই এই বিদ্যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এক্ষেত্রে বলা যায় যে, প্রাতঃস্মরণীয় জ্যোতিষী বরাহমিহিরেরও আগে এই শাস্ত্রের প্রচলন । তারপর বিভিন্ন মনীষী এই বিষয় নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন । তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সারা পৃথিবীর মধ্য জ্যোতিষচর্চ্চা , সামুদ্রিক বিচার অর্থাৎ হস্তরেখা বিচার প্রভৃতি সর্বপ্রথম শুরু হয় ভারতবর্ষে । তারপর ভারত থেকে আরব-বণিকদের মাধ্যমে এই বিদ্যা আরবে চড়িয়ে পড়ে । তারপর মিশরে পৌঁছায় এবং অনেক উন্নত হয় । ক্রমে মিশর থেকে গ্রীস, রোম এবং অন্যান্য দেশ গুলিতে এই শাস্ত্র ছড়িয়ে পড়ে ।

বাড়তি পঠন[সম্পাদনা]

জ্যোতিষ বনাম বিজ্ঞান[সম্পাদনা]

  • অলৌকিক নয় লৌকিক (৩য় খণ্ড), প্রবীর ঘোষ।
  • বিজ্ঞান জ্যোতিষ সমাজ, উৎস, মানুষ সংকলন।
  • রাশিফল বিশ্বাস করি না নিবন্ধ, মো. আ. জব্বার; মহাকাশ বার্তা, নভেম্বর ১৯৯৩ সংখ্যা।
  1. ১.০ ১.১ The cosmic perspective (4th ed. সংস্করণ)। San Francisco, Calif.: Pearson/Addison-Wesley। ২০০৭। পৃ: 82–84। আইএসবিএন 0805392831 
  2. Reinhold Ebertin (১৯৯৪)। Combination of Stellar Influences। Tempe, Ariz.: American Federation of Astrologers। আইএসবিএন 978-0866900874 
  3. Alan Oken। Alan Oken's As Above So Belowআইএসবিএন 978-0553027761 
  4. "Merriam-Webster Online Dictionary"। Meriam-Webster। সংগৃহীত ২০০৬-০৭-১৯ 
  5. ""astrology" Encyclopædia Britannica"। Britannica Concise Encyclopedia। ২০০৬। সংগৃহীত ২০০৬-০৭-১৭ 
  6. জ্যোতিষশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান শব্দকোষ, ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, পৃষ্ঠা ২০
  7. কসমস, কার্ল সেগান
  8. ফলিত জ্যোতিষ, শ্রীহরিহর মজুমদার, জ্যোতিঃশাস্ত্রী, বি.এল. (কলি), এ.সি. আই. (লণ্ডন),পৃষ্ঠা ২২
  9. http://bn.banglapedia.org/index.php?title=জ্যোতিষ
  10. http://bn.banglapedia.org/index.php?title=কোষ্ঠী
  11. http://www.rajeshshori.com/দ্বাদশ-ভাব-থেকে-কি-কি-বিচার-হয়
  12. http://bn.banglapedia.org/index.php?title=পঞ্জিকা
  13. http://www.ebangladictionary.org/রাজযোটক/
  14. http://bn.banglapedia.org/index.php?title=হস্তরেখাবিদ্যা