চুসোক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Chuseok
Korean ancestor veneration-Jesa-01.jpg
Jesasang, ceremonial table setting on Chuseok.
আনুষ্ঠানিক নামচুসোক (추석, 秋夕)
অন্য নামহাঙ্গাউই, যু্ংচুজিওল
পালনকারীকোরিয়ান
ধরনসাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ( বৌদ্ধ, কনফুসিয়াস, মুইস্ট )
তাৎপর্যনতুন ফসল কাটা উদযাপন
পালনপৈতৃক নিবাস/পারিবারিক বাসস্থান দর্শন/ভ্রমণ, পিতৃপুরষদের উপাসনা করা, সংপ্যেওন এবং ভাতের ওয়াইন এর সাথে নতুন ফসল সংগ্রহ উৎসব উৎযাপন করা।
শুরুঅষ্টম চন্দ্র মাসের ১৪ তম দিন
সমাপ্তিঅষ্টম চন্দ্র মাসের ১৬ তম দিন
তারিখ15th day of the 8th month of the Chinese lunar calendar
সংঘটনবাৎসরিক
সম্পর্কিতমধ্য-শরৎ উৎসব (চীন ও ভিয়েতনামে)
সুকিমি (জাপানে) অশ্বিনী/ কৃত্তিকা (একই ধরনের উৎসব যা সাধারণত একই দিনে কম্বোডিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, লাওস এবং থাইল্যান্ডে হয়)
Korean name
হাঙ্গুল추석
হাঞ্জা秋夕
সংশোধিত রোমানীকরণchuseok
ম্যাক্কিউন-রাইশাওয়াch'usŏk
আইপিএ[tɕʰu.sʌk̚]
Original Korean name
হাঙ্গুল한가위
সংশোধিত রোমানীকরণhangawi
ম্যাক্কিউন-রাইশাওয়াhan'gawi
আইপিএ[han.ɡa.ɥi]

একই দিনে উদযাপিত চন্দ্র সম্পর্কিত উৎসবগুলির জন্য, মধ্য-শরৎ উত্সব (চীনা প্রবাস এবং ভিয়েতনাম জুড়ে) এবং সুসকিমি (জাপান) চুসোক (কোরীয় ভাষায়: 추석; হাঞ্জা: 秋夕); আক্ষরিক অর্থে "প্রাক শারদিয়া", যা 'হাঙ্গাউই' নামেও পরিচিত (কোরীয় ভাষায়: 한가위;), একটি প্রধান ফসল উৎসব এবং উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া উভয় অঞ্চলে তিন দিনের ছুটি পালিত হয়। এই উৎসব পূর্ণ চাঁদে ক্যালেন্ডারের ৮ ম মাসের ১৫ তম দিনে পালিত হয়।[১] বিশ্বের অন্যান্য বহু ফসল উৎসবগুলির মতো এটিও শরৎকালিন বিষুবের চারপাশে অনুষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ গ্রীষ্মের একেবারে শেষে বা শরতের শুরুর দিকে। এটি কোরিয়ার অন্যতম বৃহত্তম ঐতিহ্যবাহী ছুটির দিনগুলি এর মধ্যে একটি।

ভাল ফসলের উদযাপন হিসাবে, কোরিয়ানরা তাদের পৈতৃক শহরগুলিতে যান এবং  সংপ্যেওন (কোরীয় ভাষায়: 송편 ; হাঞ্জা: 松 餠) এর মতো কোরিয়ান সনাতনী ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং 'শিন্দোজু' (কোরীয় ভাষায়: 신도주; হানজা: 新稻酒) এবং 'ডংডংজু' (কোরীয় ভাষায়: 동동주; হাঞ্জা: 浮 蟻 酒) এর মত ভাতের তৈরি সনাতনী ওয়াইন পরিবেশনের সাথে উৎসব এর মরসুম উপভোগ করেন। চুসোকের সাথে সম্পর্কিত দুটি প্রধান ঐতিহ্য রয়েছে: 'ছারে' (কোরীয় ভাষায়: 차례; হাঞ্জা: 茶 禮), বাড়িতে পূর্বপুরুষের স্মৃতিসৌধ পরিষেবা, যা যিশা নামেও পরিচিত), এবং 'সংমেয়' (কোরীয় ভাষায়: 성묘; হাঞ্জা: 省墓), পৈত্রিক সমাধিতে পরিবারের পরিদর্শন ), যা সাধারণত বলচো সহযোগে করা হয় (কোরীয় ভাষায়: 벌초; হাঞ্জা: 伐草), সমাধির চারিদিকের আগাছা সরিয়ে পরিপাটি অথবা সুন্দর করে পরিষ্কার করা)।[২]

উৎপত্তি[সম্পাদনা]

জনপ্রিয় বিশ্বাস অনুসারে, চুসোকের উৎপত্তি গাবে থেকে (কোরীয় ভাষায়: 가배; হাঞ্জা: 嘉 俳 · 嘉 排)। সিল্লা রাজ্যের তৃতীয় রাজার রাজত্বকালে (৫৭ খ্রিস্টপূর্ব? ৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ) যখন দুটি দলের মধ্যে এক মাস ব্যাপী বুনন প্রতিযোগিতা চলেছিল, সেই সময় গাবে শুরু হয়েছিলো।[৩][৪] গাবের দিনে, যে দলটি বেশি কাপড় বুনন করেছিল তারা জিতেছে এবং হেরে যাওয়া দলটি উত্তীর্ণ দলটির জন্য ভোজের আয়োজন করবে। বিশ্বাস করা হয় যে, এই উৎসবগুলির অংশ হিসাবে বয়ন প্রতিযোগিতা, তীরন্দাজ প্রতিযোগিতা এবং মার্শাল আর্ট প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল।[৫]

অনেক বিশেষজ্ঞও বিশ্বাস করেন যে, চাঁদের প্রাচীন শমনবাদী উদযাপন এর সময় ফসল কাটার থেকে চুসোক উদ্ভূত হতে পারে।[৪] স্থানীয় দেবদেবীদের এবং পূর্বপুরুষদের কাছে নতুন ফসল দেওয়া হয়, যার অর্থ চুসোকের উপাসনাটি পূজার আচার  হতে পারে।[৬] কিছু অঞ্চলগুলিতে, যদি ফসল না হয়, পূজার অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়, বা যেসব অঞ্চলে বার্ষিক ফসল হয় না, চুসোক উদযাপিত হয় না।

সনাতন রীতিনীতি[সম্পাদনা]

টেবিল যার উপর অনেক ঐতিহ্যগত খাবার নৈবেদ্য রয়েছে

সমসাময়িক দক্ষিণ কোরিয়ায়, চুসোকে, জনসাধারণ তাদের পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বড় শহর থেকে তাদের নিজেদের শহরে ( জন্মস্থান/পৈতৃক বাসস্থান ) প্রত্যাবর্তন করে।[৭] তারা চুসোকে প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপন্ন করে এবং পরবর্তী বছরটিতে শেষের চেয়ে ভাল ফসল উৎপন্ন করার চেষ্টা করে। মানুষ খুব ভোরে পৈতৃক পূজার অনুষ্ঠান বা আচার সম্পন্ন করে। তারপরে, তারা গাছগুলি ছাঁটাই করে পূর্বপুরষদের সমাধির আশেপাশের অঞ্চলটি পরিষ্কার করার জন্য এবং তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে খাবার, পানীয় এবং ফসল সরবরাহ করার জন্য তাদের নিকটবর্তী পূর্বপুরুষদের সমাধিসৌধে যান।[৭] দক্ষিণ কোরিয়ানরা পরিষ্কার আকাশ, শীতল বাতাসের কারণে শরত্কালকে বছরের সেরা মরসুম হিসাবে বিবেচনা করে এবং এটি একটি  ফসল কাটার সঠিক মরসুম। ফসল শস্য পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ হিসাবে মনে করা হয়। চুসোককে সাধারণত আমেরিকান ইংরেজিতে "কোরিয়ান থ্যাঙ্কসগিভিং" হিসাবে অনুবাদ করা হয়।[৮] যদিও বেশিরভাগ দক্ষিণ কোরিয়ানরা তাদের পরিবার এবং পৈতৃক বাড়িগুলি পরিদর্শন করেন, যদিও কোরিয়ার জাতীয় ফোক মিউজিয়ামে উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই জাতীয় ছুটির দিনে ব্যাংক, স্কুল, ডাকঘর, সরকারী বিভাগ, স্টোর ইত্যাদিসহ অনেক জায়গা বন্ধ থাকে। এই সময় ভ্রমণ এর টিকিট সাধারণত তিন মাস আগে বিক্রি হয়ে যায় এবং রাস্তাঘাট ও হোটেলগুলিতে মানুষের ভীষন ভিড় থাকে।[৯]

ছারে[সম্পাদনা]

চুসোক চলাকালীন পৃত্তিপুরুষদের এবং অতীত প্রজন্মকে জ্ঞাপিত সম্মানের প্রতীক হিসাবে উদযাপিত এক অন্যতম পূর্বসূরী স্মরণীয় অনুষ্ঠান হলো 'ছারে'।[১০] এই আচারের মাধ্যমে পরিবারের পূর্বপুরুষদের জন্য স্মরণসভা এর আয়োজন করা হয়। পরিবার এর সবাই একত্রিত হয়ে ফসল সংগ্রহ করে, খাদ্য প্রস্তুত করে ও উপস্থাপন করার মাধ্যমে পৃত্তিপুরুষদের সেই খাদ্য উৎসর্গ করা হয়।[১১] এই আচারটি শারীরিক মৃত্যুর বাইরে আধ্যাত্মিক জীবনের ঐতিহ্যগত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিমূর্ত করে, মৃত্যু পরবর্তী আত্মা কে সম্মান করা যা তাদের বংশধরদের রক্ষা করার জন্যও কাজ করে বলে বিশ্বাস করেন। যে খাবারগুলি উৎসর্গ করা হয় তার উপর নির্ভর করে প্রদেশগুলিতে ঐতিহ্যগতভাবে বৈচিত্র্য রয়েছে, তবে সাধারণত নতুন চাল, চালের কেক (সংপ্যেওন) এবং ভালো মাংস, ফলমূল এবং শাকসব্জি উৎসর্গ করা হয়।[১২] ছারে উপলক্ষে টেবিলে খাবারের ব্যবস্থা ও সুসজ্জিত স্থাপন লক্ষণীয়: সনাতনী ভাত ও স্যুপ উত্তরে এবং ফল ও শাকসব্জি দক্ষিণে রাখা হয়; মাংসের পদগুলি পশ্চিম ও মাঝখানে পরিবেশন করা হয়। চালের পিঠা ও কিছু পানীয় যেমন মাকগোল্লি বা সোজু ( কোরিয়ান সনাতনী স্থানীয় পানীয় ) টেবিলের পূর্বদিকে রাখা হয়। এই বিবরণগুলি অঞ্চলভিত্তিক পৃথক হতে পারে।[১৩]

সংমেয় এবং বলছৌ[সম্পাদনা]

'সংমেয়' এবং 'বলছৌ' চুসোক সপ্তাহকে ঘিরে করা হয়। 'সংমেয়' হল পূর্বপুরুষের সমাধিস্থান পরিদর্শন করা এবং তাদের পূর্বপুরুষের সমাধি স্থান পরিসরের আগাছা সরিয়ে পরিস্কার করার কাজটি হল 'বলছৌ'।[১৪]

উৎসবি খাদ্য[সম্পাদনা]

সংপ্যেওন[সম্পাদনা]

সংপ্যেওন

চুসোক ছুটির দিনে প্রস্তুত এবং খাওয়া অন্যতম প্রধান খাবার হ'ল 'সংপ্যেওন' (হান্‌গল্: 송편), একটি কোরিয়ান ঐতিহ্যবাহী সনাতনী চালের পিঠা। এটিতে তিল, কালো মটরশুটি, মুগ ডাল, দারুচিনি, পাইন বাদাম, আখরোট, চেস্টনাট, জুজুব এবং মধু এর সহযোগে তৈরি স্টাফিং রয়েছে। সংপ্যেওন তৈরি করার সময়, পাইন-সূঁচের একটি জালিকা ন্যায় স্তরের উপর তাদের বাষ্পয়িত করা গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন কাজ। সংপ্যেওন শব্দে সং শব্দটির অর্থ কোরিয়ান ভাষায় একটি পাইন গাছ। পাইনের সূঁচগুলি কেবল সংপ্যেওনকে সুগন্ধযুক্ত সুবাসে সুবাসিত করার অবদান রাখে না, সংপ্যেওন এর সৌন্দর্য এবং স্বাদও প্রদান করে।[১৪][১৫]

সংপ্যেওন তার আকারের দ্বারাও তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ বহন করে। সংপ্যেওনের বাইরের চালের গুণ্ঠনটি একটি পূর্ণিমার চাঁদের আকারের মতো, তবে যখন স্টাফিংয়ের মোড়ক খোলা হয় তখন চালের গুণ্ঠনের আকারটি অর্ধচন্দ্রের মতো হয়। কোরিয়ান ইতিহাসে থ্রি কিংডম যুগের পর থেকে, একজন কোরিয়ান কিংবদন্তি বলেছিলেন যে এই দুটি আকার বাইকজে এবং সিল্লার মতো দুটি সেরা প্রতিদ্বন্দ্বী রাজত্বের ভাগ্যগুলিকে বিধান করেছিল। বাইকজের রাজা উজির যুগে একটি এনক্রিপ্ট করা উক্তি "বাইকজে পূর্ণ চাঁদ এবং সিল্লা অর্ধচন্দ্র" যা একটি কচ্ছপের পিঠে পাওয়া গিয়েছিল এবং এতে বাইকজেয়ের পতন এবং সিল্লার উত্থানের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যদ্বাণীটি সত্য হয়েছিল যখন সিল্লা বাইকজেকে পরাজিত করেছিল। আর সেই সময় থাকে কোরিয়ানরা বিশ্বাস করেছে যে অর্ধ-চাঁদ আকারটি একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত বা বিজয়ের সূচক ।[১৫] অতএব, চুসোক এর সময়, পরিবারগুলি একত্রিত হয় এবং পূর্ণ চাঁদের অধীনে অর্ধ-চাঁদযুক্ত আকারের সংপ্যেওন খায়, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করে।[১৪]

হাংওয়া[সম্পাদনা]

চুসোক এর সময় খাওয়ার জন্য আরেকটি জনপ্রিয় কোরিয়ান খাদ্য হলো হাংওয়া। এটি একটি শৈল্পিক খাবার যা প্রাকৃতিক রং দিয়ে সুসজ্জিত এবং নকশা করা। চালের গুঁড়ো, মধু, ফল এবং শিকড় দিয়ে তৈরী হয় হাংওয়া। মানুষেরা বিভিন্ন রঙ, স্বাদ এবং স্বাদ প্রকাশ করতে ভোজ্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে। এর সাজসজ্জা এবং পুষ্টির কারণে কোরিয়ানরা কেবল চুসোক এর সময়ই নয়, বিশেষ অনুষ্ঠানে যেমন বিবাহ, জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও খাওয়ার রীতি লক্ষণীয়।[১৬]

হ্যাঙ্গওয়ার সর্বাধিক বিখ্যাত ধরণগুলি হ'ল ইয়াকগওয়া, ইউগওয়া এবং দাশিক। ইয়াকগওয়া হ'ল ঔষধি কুকি যা ভাজা চালের ময়দার বল দ্বারা তৈরি হয় এবং ইউগওয়া একটি ভাজা কুকি যা ফুলকেও বোঝায়। দাশিক একটি চায়ের পিঠা যা মানুষ চায়ের সাথে উপভোগ করে।[১৭]

বেকজু[সম্পাদনা]

চুসোকের একটি বিশেষ রীতি হলো মদ্যপান। এই মদ্যপানকে বলা হয় বেকসেজু (যার অর্থ "সাদা লিক্যুয়র"), অপর নাম সিনদোজু (যার অর্থ "নতুন চালের লিক্যুয়র") যা সদ্য ফলিত চাল দ্বারা প্রস্তুত।[১৮][১৯]

গুকসুনদাং, যিনি একজন কোরিয়ান প্রচলিত লিক্যুয়র প্রস্তুতকারক, তিনি "ইহোয়াজু" (রাইস ওয়াইন) জমিয়ে রেখেছিলেন গোরিও সময়কালে (৯১৮-১৩৯২) থেকে, যা পরবর্তীকালে জোস্যন যুগের (১৩৯২-১৯১০) অভিজাতরা "সংজ্যলজু" নামে উপভোগ করেন। এটির "জাময়্যাং বেকসেজু" প্যাকেজটি বিভিন্ন ধরনের লিক্যুয়র প্রস্তুত করে - জায়াং বেকসেজু, জাং বেকসেজু, বেকওকজু - বলা হয় এগুলি মানুষের শক্তি বৃদ্ধি করে।[২০]

বড়রা বলেন, কেউ যদি পূর্বপুরুষদের পান করা এই মদ্যপান করে তবে সে আর কোনোকিছুকেই আর ভয় পায় না।

অন্যান্য[সম্পাদনা]

অন্যান্য খাদ্য যেগুলি প্রস্তুত হয়, সেগুলি হল - জাপ্চে, বুলগোগী, কোরিয়ান প্যানকেক ও ফলের মিশ্রণ।

উপহার[সম্পাদনা]

চুসোকের উপহারের ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯৬০ এর দশকে, কোরিয়ান মানুষজন চিনি, সাবান, কন্ডিমেন্ট প্রভৃতি চুস্যকের উপহার হিসেবে নিজেদের ভাগ করে নিতে শুরু করে নিজেদের মধ্যে। পরবর্তীকালে কোরিয়ান অর্থনীতির সাথে সাথে উপহারগুলোরও পরিবর্তন আসে। ১৯৭০ এর দশকে কোরিয়ানরা চিরচারিত উপহারগুলির আরোও বিকল্প খুঁজে পান, যথা - রান্নার তেল, টুথপেস্ট, ইনস্ট্যান্ট কফি সেট, কসমেটিকস, টেলিভিশন, রাইস কুকার। ১৯৮০-র দশকে, তারা ফল, মাংস, কসমেটিকস এর সেটকে উপহার হিসেবে বেছে নেন। ১৯৯০ এর দশকে, চুস্যকে গিফট ভাউচার উপহার দেওয়ার প্রচলন ছিল। বর্তমানে, একবিংশ শতাব্দীতে, আরো বাস্তবসম্মত উপহার দেওয়া হয়, যেমন - অলিভ অয়েল, ভিনিগারের সেট, ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা চুস্যকের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।[২১]

উপহারের ধরন এবং মূল্য[সম্পাদনা]

কিছু অতি মূল্যবান উপহারও কেনা হয়ে থাকে চুস্যকে: এক কিলোগ্ৰাম বন্য পাইন মাশরুম, যেগুলি কৃত্রিম উপায়ে ফলানো না যাওয়ার দরুন মূল্যবান হয়ে থাকে (৫৬০,০০০ উওন) US$৪৮০.২৭ এবং লাল জিনসেং (নির্মিত) দ্রব্যসামগ্রী (১.৯৮ মিলিয়ন উওন) US$১৬৯৮.১১। সবচেয়ে মূল্যবান এবং অবাক করানোর মতো উপহার হলো লট্যে ডিপার্টমেন্ট স্টোর এ্রর, ছয় বোতল ওয়াইন, যার মূল্য প্রায় US$২৮,৩০১.৮৯ (৩৩ মিলিয়ন উওন)।[২২]

চুস্যকের উপহার সমূহ কোরিয়ার এক বিশাল ব্যবসার জায়গা, যেখানে উপহারের মূল্য আকাশ ছোঁয়া।[২৩]

লোকক্রীড়া[সম্পাদনা]

চুসোকে, শরত এবং সমৃদ্ধ ফসল উৎপাদন উদযাপনের জন্য বিভিন্ন ধরনের লোকক্রীড়ার প্রচলন আছে। গ্ৰামবাসীরা গরু অথবা কচ্ছপের অনুকরণে নির্মিত পোশাক পরিধান করে এবং সাথে থাকে নোঙ্গাক-এর গান। চুস্যকের অন্যান্য প্রচলিত লোকক্রীড়াগুলি হল তীরন্দাজী, শিরম (কোরিয়ান কুস্তি), টাগ অফ ওয়ার এবং জুলদারিগি। লোকক্রীড়াগুলি স্থান বিশেষে ভিন্ন হয়ে থাকে।

শিরম[সম্পাদনা]

শিরম (হান্‌গল্: 씨름)হল চুসোকের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, যেটি মূলত ছুটির দিনে খেলা হয়ে থাকে। শিরম, গোগুরয়েও সময়কালেও খেলা হতো, জ্ঞানী ব্যক্তিরা যার প্রমাণ পেয়েছেন । শিরম এর প্রায় ৫০০০ বছরের পুরনো ইতিহাস আছে বলে মনে করা হয়। দুজন প্রতিযোগী, একে অপরের সতবা (একটি লাল ও নীল ব্যান্ড) ধরে কুস্তি লড়ে। একজন খেলোয়াড়ের দেহের উপরাংশ মাটি ছুঁলে, সে হেরে যায় এবং বিজয়ী, হয়ে যায় চিওনহা জাঙ্গসা, বেকদু জাঙ্গসা অথবা হাল্লা জাঙ্গসা, যার অর্থ হলো "সর্ব শক্তিমান"। বিজয়ী একটি ষাঁড় ও এক কেজি চাল পায় পুরস্কার হিসেবে।[২৪] নবীন-প্রবীন সকলের মধ্যেই এই খেলা জনপ্রিয় হওয়ায়, প্রায়শই এই প্রতিযোগিতা হয়, কিছু বিশেষ ছুটির দিনেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

তেক্ক্যয়ন[সম্পাদনা]

তেক্ক্যয়ন (হান্‌গল্: 태껸 or 택견) হলো কোরিয়ার অন্যতম প্রাচীন মার্শাল আর্ট। জোস্যন সময়কালে এটি খুবই জনপ্রিয় ছিল। সে সময়ে এটি শিরম এর সাথে চুস্যক এবং অন্যান্য উৎসবে প্রদর্শন করা হতো। প্রকৃতপক্ষে হাতে হাতে লড়াই করার নিয়ম থাকলেও লোকজন সুবিধা মতো লাথির ব্যবহার করতেন। খেলোয়াড় ধাক্কা, লাথি, সোয়াইপের দ্বারা, তার প্রতিপক্ষের গতির ব্যবহার করে, প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করে।[২৫] বিভিন্ন গ্ৰামের মধ্যে টুর্নামেন্ট আয়োজিত হতো যা শুরু হতো বাচ্চাদের (এগি তেক্ক্যয়ন) দিয়ে এবং শেষ হতো বড়োদের দিয়ে।

জাপানের রাজত্বকালে (১৯১০-১৯৪৫) তেক্ক্যয়ন প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এটিকে কোরিয়ার সাংস্কৃতিক সম্পদ (১৯৮৩) এবং 'ইউএনইএসসিও ইনট্যানজিবল কালচারাল আইটেম' (২০১১) বলে মনে করা হয়।[২৬]

গাংগাংসুল্লে[সম্পাদনা]

গাংগাংসুল্লে (হান্‌গল্: 강강술래) নাচ হলো একধরনের লোকনৃত্য যা চুসোকের রাতে পূর্ণচন্দ্রের নীচে প্রদর্শন করা হয়।[২৭] মহিলারা চিরচারিত কোরিয়ান পোষাক হানবোক পরিধান করে, পরস্পরের হাত ধরে, গোল করে দাঁড়ায় এবং গোল বরাবর চলতে চলতে গান গায়। গাংগাংসুল্লে নামটি একই কথা পরপর বলার থেকে এসেছে যার প্রকৃত কোন অর্থ নেই।

এই নাচের উৎস জোস্যন যুগে, দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকায়। গাংগাংসুল্লে নাচের একটি ভিডিও ক্লিপ দেখতে, এখানে ক্লিক করুন।

অন্যান্য লোকক্রীড়াগুলির মধ্যে, তারা নেওলত্তউইগি (কোরিয়ান প্ল্যাঙ্ক নামে পরিচিত) খেলে থাকে যেটি একটি চিরচারিত খেলা। এটি কাঠের বোর্ডে খেলা হয়।[২৮]

জুলদারিগি[সম্পাদনা]

জুলদিরিগি (হান্‌গল্: 줄다리기) বা টাগ অফ ওয়ার খেলায় গ্ৰামের সকলে আনন্দের সাথে অংশগ্রহণ করত। মানুষজন, দুটো দলে ভাগ হয়ে যেত এবং প্রকৃতির নারী ও পুরুষ শক্তিকে চিত্রিত করত। এই খেলাকে কৃষিক্ষেত্রের একধরনের আচার বলে মনে করা হতো যার ওপর সেই বছরের কৃষির ভালোমন্দ নির্ভর করত। যদি নারীশক্তির প্রতীক দলটি জিতে যেত, তবে মনে করা হতো সে বছরের ফলন‌ ভালো হবে।

'সো-নোরি' হলো একধরনের হাস্যরস পূর্ণ অনুষ্ঠান যেখানে মানুষজন খড়ের তৈরি মাদুর পরিধান করে গরুর ছদ্মবেশ ধারণ করত এবং বাড়ি বাড়ি ডাক দিত একত্রিত হওয়ার জন্য ও খাবার ভাগ করে নেওয়ার জন্য।

মুরগির লড়াই (দাক সা উম)[সম্পাদনা]

কোরিয়ান মানুষেরা মুরগির লড়াই দেখত (হান্‌গল্: 닭싸움) এবং মুরগির লড়াই কৌশল রপ্ত করেছিল। যার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীকালে একটি খেলার আবিষ্কার হয়।

খেলাটি খেলবার জন্য তারা দুটো সুষম দলে ভাগ হয়। একজনকে তার পা মুড়ে ওপরে করতে হবে এবং হাঁটু বের করে ধরে রাখতে হবে। খেলোয়াড়রা তখন একে অপরকে আক্রমণ করবে, তাদের হাঁটু অল্প ভাঁজ করা অবস্থায় এবং কারো পা মাটি ছুঁলে সে হেরে যাবে। শেষ খেলোয়াড় যার হাঁটু ভাঁজ করা অবস্থায় ওপরে থাকবে, সে বিজয়ী হবে।

এই খেলাটির মূল বিষয়টি হল শক্তি, গতি ও ভারসাম্য, বেঁচে থাকার জন্য একজনের লড়াই করার এই ক্ষমতা গুলো থাকা খুব জরুরি।[২৯]

হোয়াতু[সম্পাদনা]

হোয়াতু (হান্‌গল্: 화투, গো স্টপ অথবা গোদোরি নামে পরিচিত) ১২ ধরনের, ৪৮টি কার্ডের খেলা। এই খেলার নিয়মগুলি এবং জল শব্দের উৎপত্তি ঘটে তুজিয়ন থেকে। প্রাথমিকভাবে হানাফুদা-র সাথে মিল থাকার দরুন এটি পরবর্তীকালে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এটি একটি পর্বের মধ্যে দিয়ে যায়, যার ফলে বেস কালারের রঙ কমে চারটে হয় এবং পূর্বের থেকে পাতলা হয়। এটি ছড়ানো হতো, বস্তু সামগ্রীর বিপুল উৎপাদনের আকাঙ্খায়।

উত্তর কোরিয়ার চুসোক[সম্পাদনা]

যেহেতু কোরিয়া ভাগ হওয়ার আগে থেকেই চুসোক, চিরচারিত ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে, তাই উত্তর কোরিয়া-ও চুসোক পালন করে। যদিও যেই আদর্শগত বিভেদের কারণে কোরিয়া বিভক্ত হয়, তার প্রভাবে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ায় চুসোক পালনে বিভিন্নতা দেখা যায়।[৩০] এমনকি ১৯৮০ সালের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত, উত্তর কোরিয়া চুসোক এবং অন্যান্য জাতীয় ছুটির দিনগুলি পালন করত না।

একদিকে দক্ষিণ কোরিয়াবাসী চুসোক-এর দিনটি পরিবারের সদস্যদের সাথে আনন্দ করে কাটালেও উত্তর কোরিয়াবাসী কোনোপ্রকার পারিবারিক মিলনে অংশগ্রহণ করে না। কিছু জন, বিশেষত চাকুরীজীবিরা চুসোক পূর্বপুরুষদের কবরস্থানে ঘুরে আসার চেষ্টা করে। তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো, তাদের যাওয়ায় বাধা দিচ্ছে।[৩১] তার উপর উত্তর কোরিয়ার অত্যন্ত খারাপ পরিকাঠামো, বিশেষ করে গণপরিবহন ব্যবস্থা খুব খারাপ হওয়ায়, তাদের পরিবারের সাথে দেখা করা অথবা পূর্বপুরুষদের কবরস্থানে ঘুরে আসা প্রায় অসম্ভব।[৩২] উত্তর কোরিয়ার অতি সাধারণ গরীব মানুষেরা এরূপ সমস্যার সম্মুখীন হলেও, মধ্যবিত্ত ও এলিট শ্রেণীর মানুষেরা ছুটির দিনটি, নিজের ইচ্ছেমত কাটায়, সহজেই যেখানে ইচ্ছা সেখানে ঘুরতে যায়।[৩২]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Korean Culture and Information Service Ministry of Culture, Sports and Tourism দ্বারা প্রকাশিত Passport to Korean Culture
  2. "Chuseok - A Korean Thanksgiving - Chuseok 2021" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  3. কোরিয়ান স্টাডিজ একাডেমি (1991 সংস্করণ) "চুসোক", কোরিয়ান পিপল অ্যান্ড কালচারের এনসাইক্লোপিডিয়া, উওংজিন (কোরিয়ান ভাষায়).
  4. Farhadian, Charles E. (2007.) Christian Worship Worldwide. Wm. Bm. Eerdmans Publishing.
  5. Yun, Sŏ-sŏk Yun. (2008.) Festive occasions: the customs in Korea, Ewha Women's University Press, Seoul. ISBN 978-8-9730-0781-3.
  6. কোরিয়া ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট অফ কোরিয়ান কালচার, (1982 সংস্করণ) "Social Life", Korean Heritage Overview, 1, Korea University (কোরিয়ান ভাষায়).
  7. "Travel Highlights : VisitKorea Travel Highlights Traditional Korean Holiday of Bountiful Harvest, Chuseok | Official Korea Tourism Organization"english.visitkorea.or.kr (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  8. "Chuseok: Korean Thanksgiving Day"Asia Society (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  9. Lee, Cecilia Hae-Jin (2010). Frommer's South Korea. Hoboken, N.J, Chichester: Wiley, John Wiley. pp. 21, 22, 25. ISBN 0470591544.
  10. "Korean Ancestral Memorial Rites, Jerye. - South-Korea - korea4expats"www.korea4expats.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  11. "A time for families, food and festivities - JEJU WEEKLY"www.jejuweekly.com (কোরীয় ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  12. "Travel Highlights : VisitKorea Travel Highlights Traditional Korean Holiday of Bountiful Harvest, Chuseok | Official Korea Tourism Organization"english.visitkorea.or.kr (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  13. "메세지 페이지"www.nfm.go.kr। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  14. "Official Site of Korea Tourism Org.: Chuseok – Full Moon Harvest Holi…"archive.ph। ২০১৩-০২-২১। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  15. "No Chuseok Without Songpyeon"english.chosun.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  16. "Hangwa –Korean Traditional Confectionaries Good for the Body and the Soul - INSIDE Koreabrand.net"web.archive.org। ২০১২-০১-১৮। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  17. "Korea Tour Guide" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে. English.visitKorea.or.kr
  18. "추석(秋夕) - 한국민족문화대백과사전"encykorea.aks.ac.kr। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  19. "Let's Share the Happiness of Harvest on Chuseok - AgraFood"web.archive.org। ২০১৬-১২-২০। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  20. "Korea Herald"www.koreaherald.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  21. "한국을 대표하는 글로벌 방송! The World On Arirang!". Arirang.com.
  22. "dollar : 네이버 통합검색"m.search.naver.com (কোরীয় ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  23. "10 Ridiculously Priced Korean Chuseok Gift Sets | 10 Magazine Korea" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  24. "Welcome to WHAT'S ON's Homepage"english.whatsonkorea.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  25. Service (KOCIS), Korean Culture and Information। "Expats practice traditional martial art taekkyeon : Korea.net : The official website of the Republic of Korea"www.korea.net। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  26. "UNESCO - Taekkyeon, a traditional Korean martial art"ich.unesco.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  27. "Chuseok origin and rituals"archive.ph। ২০১৩-০৪-১৯। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  28. "Festivals, events to delight on Chuseok holidays". Korea.net.
  29. "Wikispaces"web.archive.org। ২০১৮-০৭-৩১। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  30. AM, IBT Staff Reporter 09/10/11 AT 5:49 (২০১১-০৯-১০)। "Chuseok— A Festival With Two Faces"International Business Times। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০ 
  31. www.dailynk.com http://www.dailynk.com/english/read.php?cataId=nk01500&num=4075%5D। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০  |শিরোনাম= অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য)
  32. Jin, Im Jeong (২০১০-০৯-২৩)। "Welcome to Chuseok, North Korean Style"Daily NK (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৮-২০