চীন–পবিত্র আসন সম্পর্ক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
গণপ্রজাতন্ত্রী চীন—ভ্যাটিকান সম্পর্ক
মানচিত্র China এবং Vatican City অবস্থান নির্দেশ করছে

চীন

ভ্যাটিকান সিটি

চীন–ভ্যাটিকান সিটি সম্পর্ক বা চীন–পবিত্র আসন সম্পর্ক হল গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এবং ভ্যাটিকান সিটির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ১৯৫১ সাল থেকে এ দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

একটি জটিল সমস্যাকে কেন্দ্র করে বেইজিং সরকার ১৯৫১ সালে পবিত্র আসন'র সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। ১৯৫০ এবং ১৯৫১ সাল জুড়ে চীন "স্বাধীন ক্যাথলিক সম্প্রদায়" এর বিচ্ছিন্নতার উপর ভ্যাটিকানকে চাপ দিয়ে আসছিল। অনেক পাদ্রীই এ আন্দোলনের বিরোধিতা করেন, এবং চৌ এন-লাই মধ্যপন্থা অনুস্ররণ করেন।[১] এর পরপরেই মারাত্মক বিতর্ক দেখা দেয়, যে পবিত্র আসন ইন্টারনানশিয়েচার ১৯৩০-এর সময়ের একটি মর্টার তার বাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলেন। অ্যান্টনিও রিভা নামের এক ব্যবসায়ী মর্টারটি লক্ষ্য করেন এবং এর অকার্যরত একটি অংশ বাড়িয়ে অ্যান্টিক হিসেবে সংগ্রহে রাখার জন্য নিয়ে আসেন। সমাজতান্ত্রিকেরা রিভার দুর্লভ শিল্পবস্তু দেখতে পেয়ে মাও ৎসে-তুংকে ক্ষমতাচ্যূত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাকে আটক করেন। রিভা এ অভিযোগ অস্বীকার করে। তার মৃত্যুদণ্ড হয় এবং ফলশ্রুতিতে "এসপিওনাজ" এর অভিযোগে দেশটি থেকে ভ্যাটিকার সিটির কূটনৈতিক মিশন সরিয়ে নেওয়া হয়।[২] তার্সিসিও মার্টিনা, আঞ্চলিক অ্যাপস্টোলিক প্রিফেক্টকে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিতে করা হয়,[৩] এবং ১৯৬১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অন্য চার "ষড়যন্ত্রকারীদের" এর চেয়ে নিম্ন সময়সীমার কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।[৪]

বেইজিং সরকার সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের জন্য দুটি শর্ত দেন। প্রথমটি হল পবিত্র আসন "চীনের কোনো প্রকার ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না" এবং দ্বিতীয়টি হল, বেইজিংয়ের এক-চীন নীতি মত অনুসরণ করতে হবে, অর্থাৎ তাইপেই সরকারের সাথে সম্পর্ক ভেঙে দিতে হবে যেটি আর্চবিশপ রিবেরির নির্বাসনের পর স্থাপিত হয়েছিল। জাতিসংঘ চীনের সরকার হিসেবে বেইজিং সরকারকেই স্বীকৃতি দিয়েছে, যা এখন চার্ক দ্য অ্যাফেয়ার্স লেভেলে মেনে চলা হয়।[৫] পবিত্র আসন জানায় যে দ্বিতীয় শর্ত মানতে তাদের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু প্রথম শর্তটির কনক্রিটের ন্যায় শক্ত আলোচনার প্রয়োজন আছে।[৬] তর্কের মূল বিষয় ছিল চীনের মূল ভূখণ্ডে ক্যাথলিক বিশপের নিয়োগ, যা বর্তমানে চাইনিজ প্যাট্রিওটিক ক্যাথলিক এসোসিয়েশন (সিপিসিএ) হিসেবে পরিচিত। নিয়োগের ক্ষেত্রে কখনও কখনও পবিত্র আসনের সাথে একমত হওয়া যেত, আবার কখনও কখনও সরাসরি মতানৈক্য হত। পিআরসি সরকারের মত ছিল যে বিশপের নিয়োগ তারাই দিতে পারে আর পবিত্র আসনের মত ছিল যে বিশপ নিয়োগের অধিকার রয়েছে কেবলমাত্র পোপের,[৭] কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী।[৮]

২০০৭ সালে পবিত্র আসন পিআরসি'র সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ধি করার চেষ্টা করে।[৯] রোমান ক্যাথলিক চার্চের গুরুত্বপূর্ণ বিশপেরা এধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব বলে মতপ্রকাশ করেন,[১০] এবং পিআরসি বর্তমান আরো বেশি ধর্মীয় স্বাধীনতা দিচ্ছে বলে জানায়।[১১] বর্তমান চীনের মূল ভূখণ্ডে চার্চের যাজকতন্ত্র নিয়ে কম মাথা ঘামানো হচ্ছে বলেও মনে করেন তারা।[১২]

২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পিআরসি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ফাদার জোসেফ লি শানের নিয়োগকে ভ্যাটিকান "অঘোষিত অনুমোদন" হিসেবে অভিহিত করে।[১৩] ২০০৮ সালের মে মাসে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে আগত চায়না ফিলহার্মোনিক অর্কেস্ট্রা ভ্যাটিকানের অভ্যন্তরে পোপের জন্য একটি কনসার্টের আয়োজন করে, যাকে বিশ্লেষকেরা দুই দেশের "পুনর্মিলনের সংকেত" হিসেবে দেখেন।[১৪] ২০১৩ সালের মার্চ মাসে পোপ ফ্রান্সিসের অভিষেকের পর তিনি গণমাধ্যমে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে চীনে যাবার ইচ্ছা এবং চীনের সাথে বিদ্যমান সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।[১৫] ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে দক্ষিণ কোরিয়ায় হতে যাওয়া পেপাল সফরের সময় চীন পোপের জন্য তাদের বিমানবন্দর খুলে দেয় এবং চীন থেকে চলে যাবার সময় একটি টেলিগ্রামে পোপ চীনের জনগণকে "শুভেচ্ছা" জানান বলেও জানা গেছে।[১৬]

তবুও ক্যাথলিক চার্চ এবং পিআরসির মধ্যকার সম্পর্ক বেশকিছু ক্ষেত্রে এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি। চার্চের অভ্যন্তরে কার্ডিনাল জোসেফ জেন জে-কিউন, হংকং-এর রোমান ক্যাথলিক ডায়োসেজ বিশপ এমিরেটাস প্রমুখ সমালোচকদের উপস্থিতি এর অন্যতম কারণ।

১৯৯০-এর শেষ দিকে বেইজিং-এর রোমান ক্যাথলিক আর্চডায়োসেজের কর্মকর্তারা ধারণা করে যে কোনোদিন হয়ত এটিই পবিত্র আসন'র দূতাবাস হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এ কথার মাধ্যমে তারা আর্চডায়োসেজ অব্যবহৃত স্থাপত্যক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্যধারী এ প্রাসাদকে ভেঙে ফেলা থেকে রক্ষা করতে চায়। এ ভবনটি চাওনেই নম্বর ৮১তে অবস্থিত, এবং হানাবাড়ির তালিকভুক্ত[১৭]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Religion: Catholics in China" (ইংরেজি ভাষায়)। Time। ২ জুলাই ১৯৫১। ৮ আগস্ট ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  2. "Religion: Prayer for China" (ইংরেজি ভাষায়)। টাইম। ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৫১। ৯ আগস্ট ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  3. Dikötter, Frank (২০১৩)। The Tragedy of Liberation: A History of the Chinese Revolution 1945-1957 (ইংরেজি ভাষায়)। Bloomsbury Publishing। পৃষ্ঠা 117। আইএসবিএন 978-1620403471 
  4. Bertuccioli, Giuliano (১৯৯৯)। "Informatori, avventurieri, spioni, agenti più o meno autentici in duemila anni di storia delle relazioni italo-cinesi" (ইতালীয় ভাষায়)। Mondo Cinese 101। ২০ জুলাই ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ নভেম্বর ২০১৬  ইংরেজি অনুবাদ, গুগল ট্রান্সলেটর থেকে
  5. "China: the Vatican denounces the arrest of bishop, priest and layperson" (ইংরেজি ভাষায়)। এশিয়ানিউজ। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৫। ৬ অক্টোবর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  6. "Taiwan "Religious Freedom The Key To Beijing-Holy See Ties"" (ইংরেজি ভাষায়)। ইউনিয়ন অব ক্যাথলিক এশিয়া নিউজ। ২২ জুলাই ২০০৪। ২৯ মে ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  7. Reynolds, James (৯ মে ২০০৮)। "China-Vatican relations" (ইংরেজি ভাষায়)। বিবিসি নিউজ। ৩ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  8. (ইতালীয়) ১৯৬৬ সালে আর্জেন্টিনার সাথে সম্মতির ঘটনাটি একটি উদাহরণ মাত্র, যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশপ নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।"Agreement between the Holy See and the Republic of Argentina"। Vatican.va। ১০ অক্টোবর ১৯৬৬। ২ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা।  ইংরেজি অনুবাদ, গুগল ট্রান্সলেটর থেকে
  9. "Pope offers olive branch to China" (ইংরেজি ভাষায়)। বিবিসি নিউজ। ২০ জানুয়ারি ২০০৭। ১১ নভেম্বর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৭ জুন ২০০৭ 
  10. "HK bishop hints at Vatican switch" (ইংরেজি ভাষায়)। BBC News। ৫ এপ্রিল ২০০৫। ১১ নভেম্বর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৭ জুন ২০০৭ 
  11. "China welcomes Vatican initiative" (ইংরেজি ভাষায়)। বিবিসি নিউজ। ২২ জানুয়ারি ২০০৭। ১১ নভেম্বর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৭ জুন ২০০৭ 
  12. "China ordains new Catholic bishop" (ইংরেজি ভাষায়)। বিবিসি নিউজ। ৩০ নভেম্বর ২০০৬। ১১ নভেম্বর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৭ জুন ২০০৭ 
  13. "China installs Pope-backed bishop" (ইংরেজি ভাষায়)। বিবিসি নিউজ। ২১ সেপ্টেম্বর ২০০৭। ১৫ আগস্ট ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  14. Willey, David (৭ মে ২০০৮)। "Chinese orchestra plays for Pope" (ইংরেজি ভাষায়)। বিবিসি নিউজ। ১৩ মে ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  15. "Pope Francis wants to visit mainland China" (ইংরেজি ভাষায়)। এএনএসএ। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫। 
  16. "Pope Francis Sends Message to China in Telegram From Papal Plane" (ইংরেজি ভাষায়)। দ্য ওয়াল স্ট্রীট জার্নালl। ১৪ আগস্ট ২০১৪। 
  17. Qin, Amy (সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৩)। "Dilapidated Mansion Has Had Many Occupants, Maybe Even a Ghost"দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ অক্টোবর ১২, ২০১৪ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:চীনের বৈদেশিক সম্পর্ক টেমপ্লেট:ভ্যাটিকান সিটির বৈদেশিক সম্পর্ক