গ্যাবনের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
গ্যাবন দেশে বুনো হাতি

ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগের পূর্বে গ্যাবনের ইতিহাস সম্পর্কে খুব কমই জানা গিয়েছিল। চোদ্দো শতকের শুরুর দিকে বান্টু অভিবাসীরা এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছিল। পনেরো শতকের শেষ দিকে পর্তুগিজ অভিযাত্রী এবং ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে এসেছিলেন। পরবর্তীকালে ষোলো শতকে আগত ডাচ, ইংরেজি এবং ফরাসি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এই উপকূল দাস ব্যবসায়ের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। ১৮৩৯ এবং ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স এই উপকূলে একটা সুরক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করেছিল।

১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে লাইবারভিলে আটক করা একটা ক্রীতদাস জাহাজ থেকে পাওয়া বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়ছিল। ফ্রান্স ১৮৬২ থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল সমেত তার নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে সেখানে সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব গ্রহণ করেছিল।

গ্যাবন ফরাসী নিরক্ষীয় আফ্রিকার একটা অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে এবং এই দেশ স্বাধীন হয় ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে।

গ্যাবনের স্বাধীনতার সময়কালে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব ছিল: একটা হল গ্যাবনিজ ডেমোক্র্যাটিক ব্লক (বিডিজি) যার নেতৃত্বে ছিলেন লিয়ন এম'বা এবং গ্যাবনিজ ডেমোক্র্যাটিক অ্যান্ড সোশ্যাল ইউনিয়ন (ইউডিএসজি), এই দলের নেতা হলেন জিন-হিলার আউবাম। সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত স্বাধীনতার পরবর্তী প্রথম নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি; পরবর্তীকালে নেতারা একটা দ্বি-দলীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সহমত হয়েছিলেন এবং সব প্রার্থীদের নিয়ে একটা একক তালিকা দিয়ে নির্বাচন হয়েছিল। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নতুন রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতিতে এম'বা প্রেসিডেন্ট এবং আউবাম পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে এক-দলীয় শাসন ব্যবস্থা ভেঙে যায় এবং ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে একদিনের একটা রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটে। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে লিওন এম'বা এবং ওমর বনগো যথাক্রমে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ওই বছরের পরের দিকে এম'বা মৃত্যুমুখে পতিত হন। গ্যাবনকে বনগো একদলীয় রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন, বিডিজিকে ভেঙে দিয়েছিলেন এবং গ্যাবনিজ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (পিডিজি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সর্বাত্মক রাজনৈতিক সংস্কার দ্বারা ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে একটা নতুন সংবিধান প্রণীত হয়েছিল এবং পিডিজি ৩০ বছরের মধ্যে দেশের প্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। বিরোধী দলগুলির অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও, বনগো ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

প্রারম্ভিক ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রায় ১০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে অভিবাসী বান্টু মানুষেরা উত্তর থেকে ফ্যাং মানুষদের মতো আদিবাসী পিগমিদের সমাজগুলোকে ব্যাপকভাবে বাস্তুচ্যুত করেছিল।[১] ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগের আগে পর্যন্ত উপজাতীয় জীবন সম্পর্কে খুব কম পরিচিতি ছিল, কিন্তু উপজাতি শিল্পকলা একটা সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারণা দেয়।

পনেরো শতকের শেষদিকে আগত পর্তুগিজ অভিযাত্রী এবং ব্যবসায়ীরা গ্যাবনের প্রথম নিশ্চিত ইউরোপীয় পরিব্রাজক ছিলেন। এই সময়ে দক্ষিণ উপকূল লোয়াঙ্গো রাজত্ব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোত।[২] পর্তুগীজরা উপকূল থেকে দূরে সাও তোম, প্রিন্সিপি এবং ফার্নান্দো পো দ্বীপে বসতি স্থাপন করেছিল, কিন্তু তারা উপকূলের নিয়মিত অভিযাত্রী ছিলেন।

পর্তুগিজ শব্দগ্যাবাও থেকে তারা গ্যাবোন ভূখণ্ডটার নামকরণ করেছিল; যার অর্থ হল আস্তিন এবং অবগুণ্ঠনওয়ালা একটা কোট। কোমো নদীর মোহনার আকার সেই রকমই ছিল।

ষোলো শতকে পর্তুগিজদের পাশাপাশি ডাচ, ইংরেজি এবং ফরাসি ব্যবসায়ীরা এদেশে এসেছিল; ক্রীতদাস, হাতির দাঁত এবং উষ্ণমণ্ডলীয় কাঠ নিয়ে তারা ব্যবসা করত।[১][২]

ফরাসি ঔপনিবেশিক সময়কাল[সম্পাদনা]

'ফরাসি কঙ্গো। গ্যাবন থেকে অধিবাসীগণ ': ঔপনিবেশিক পোস্টকার্ড। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে গৃহীত

১৮৩৮ এবং ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে গ্যাবনের উপকূলীয় প্রধানদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে ফ্রান্স একটা সুরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করেছিল।

১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে নিউ ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকান মিশনারিরা এসে কোমো নদীর মোহনায় একটা মিশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি কর্তৃপক্ষ একটা বেআইনি ক্রীতদাস জাহাজ পাকড়াও করে এবং অধিবাসীদের জাহাজে ছেড়ে দেয়। মিশন স্টেশনের কাছে যে জায়গায় অধিবাসীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে তারা একটা উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল যার নাম দেওয়া হয়েছিল লাইবারভিল (ফরাসি শব্দের অর্থ 'উন্মুক্ত শহর')।

১৮৬২ এবং ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে ফরাসি অভিযাত্রীরা গ্যাবনের গভীর জঙ্গলে অনুপ্রবেশ করেছিল। কঙ্গো নদীর উৎস খোঁজার জন্য খুবই বিখ্যাত স্যাভরন্যান ডি ব্র্যাজা, গ্যাবোনিজ বাহক এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে তাঁর কাজে লাগিয়েছিলেন। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স গ্যাবন দখল করেছিল, কিন্তু ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই ভূখণ্ড শাসন করেনি। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের সময়কালে গ্যাবনের প্রথম রাজনৈতিক দল জিউনিস গ্যাবনাইস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

গ্যাবন ফরাসি নিরক্ষীয় আফ্রিকার চারটে অঞ্চলের মধ্যে একটা হয়ে ওঠে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুলাই গ্যাবনের পূর্ণ স্বাধীনতার ব্যাপারে ফ্রান্স সহমত হয়েছিল।[৩] ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ আগস্ট গ্যাবন একটা স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

  • আফ্রিকার ইতিহাস
  • গ্যাবনের সরকার প্রধানদের তালিকা
  • গ্যাবন রাষ্ট্রের প্রধানদের তালিকা
  • গ্যাবনের রাজনীতি
  • লাইবারভিল ইতিহাস এবং সময়রেখা

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "History of Gabon - Lonely Planet Travel Information"www.lonelyplanet.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৬-০১ 
  2. "Gabon - History"Encyclopedia Britannica (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৬-০১ 
  3. "Gabon Is Granted Sovereignty; Remains in French Community; Debre Hails the 11th African Republic Made Free Under Paris Accords in 1960"nytimes.com। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০১৮ 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

  • নানং নদং, লিয়ঁ মদেস্তে (২০১১)। এল'এফর্ট দে গুয়েরে দে আই'আফ্রিক:লে গ্যাবন দাঁস লা দিউক্সিমে গুয়েরে মন্দিয়ালে, ১৯৩৯-১৯৪৭। এল'হার্মাতন। আইএসবিএন 9782296553903 

বহির্সংযোগসমূহ[সম্পাদনা]